আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > ছফা- বুদ্ধিভিত্তিক বিগ ব্যাং

ছফা- বুদ্ধিভিত্তিক বিগ ব্যাং

photo-1469702335ছফা আমাদের চিন্তা করতে শেখান ভিন্নভাবে। শুধু নিজের মতের না, নিজ মতের বাইরেও যে মানুষ আছে, তারাও মানুষ, ছফা সেটা জানান দেন।

আমাদের দেশে মৌলবাদি, প্রগ্রতিশীল, হাফ প্রগ্রতিশীল,ভন্ড প্রগ্রতিশীল,কট্টর মৌলবাদি কিংবা বিজ্ঞান ভিত্তিক সেক্যুলারিস্ট সব কিছু মিলেমিশে যে জটিল মানুষের রসায়ন- তা বুঝতে ছফা প্রয়োজন। ছফা একটি বুদ্ধিভিত্তিক বিগ ব্যাং। তার মধ্য দিয়েই নতুন ধরণের বুদ্ধিজীবিতার শুরু। যেটা কেবল মানুষের জন্য।

ছফার নিজের ভাষায়- “আমার কাছে ঈশ্বর-চিন্তা আর মানুষের অমরতার চিন্তা সমার্থক। কেউ যদি আমাকে আস্তিক বলেন বিনা বাক্যে মেনে নেব। আমি আস্তিক। যদি কেউ বলেন নাস্তিক আপত্তি করব না। আস্তিক হোন, নাস্তিক হোন, ধর্মে বিশ্বাস করুন আর নাই করুন,আমি কোন বিবাদের হেতু দেখতে পাইনে। আমার অভীষ্ট বিষয় মানুষ,শুধু মানুষ। মানুষই সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত মূল্যচিন্তা, সমস্ত বিজ্ঞানবুদ্ধির উৎস।”

তিনি আরো বলেন, “আমাদের দেশের পূর্বসুরী বলতে যাদের বোঝায়, তাদের মধ্যে জ্ঞানে, গুণে, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পীদের মধ্যে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এমন কোন বড় বিশ্বমাপের লোক নেই যাদের চিন্তাধারা অনুসরণ করে বেশীদূর এগিয়ে যাওয়া যাবে। সুতরাং “নেই” এটা মেনে নিয়ে কাজ করলে সুফল পাবার সম্ভাবনা রয়েছে।কারণ কুয়াশার চাইতে অন্ধকার ভালো”

আবার বলেছেন, ‘পিতামহ বনস্পতি; বিনীত সন্তানে তুমি দাও এই বর সূক্ষ্ণ শরীর ধরে এই মাঠে- যেনো আমি বেচেঁ থাকি অনেক বছর’। (একটি প্রবীন বটের কাছে প্রার্থনা-আহমদ ছফা।)

বড় বড় নামকরা স্কুলে বাচ্চারা বিদ্যার চাইতে অহংকার টা বেশি শিক্ষা করে। –(পুষ্প ,বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ-আহমদ ছফা।)

ভাঙাচোরা মানুষের শিশুর মধ্যেও মহামানবের অংকুর রয়েছে। মানুষ মাত্রই অমৃতের পুত্র। (পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গ পুরাণ- আহমদ ছফা)

আহমদ ছফা বলেছেন, “বিপ্লব হল কৃষ্ণের গরু চড়ানোর মত। যারা মৌলবাদী তারা শতকরা একশো ভাগ মৌলবাদী। কিন্তু যারা প্রগতিশীল বলে দাবী করে থকেন তাদের কেউ কেউ দশ ভাগ প্রগতিশীল, পঞ্চাশ ভাগ সুবিধাবাদী, পনেরো ভাগ কাপুরুষ, পাঁচ ভাগ একেবারে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন।” (আহমদ ছফা- বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস)

001স্যার(প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক) বললেন, রবীন্দ্রনাথ বড় লেখক, মানুষ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর কিংবা তার মতো মানুষদের ধারেকাছেও আসতে পারেন না। বড় লেখক এবং বড় মানুষ এক নয়। বড় লেখকদের মধ্যে বড় মানুষের ছায়া থাকে। বড় মানুষেরা আসলেই বড় মানুষ। লেখক কবিরা যা বলে সেরকম আচরন না করলেও চলে। হের লাইগ্যা প্লেটো তার রিপাবলিক থ্যাইক্যা কবিগো নির্বাসনে পাঠাইবার কথা বলছিল। আমি বললাম, একথা কি রবীন্দ্রনাথের বেলায় ও প্রযোজ্য। স্যার বললেন, রবীন্দ্রনাথ ব্যতিক্রম অইল কেমনে।তিনিও ত এই ক্যাটাগরির মধ্যে পড়েন। আমার মনের মধ্যে একটু খুঁতখুতাঁনি থেকে গেল। সেজন্য পালটা প্রশ্ন করলাম, রবীন্দ্রনাথ কি বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষাকে উৎকর্ষের একটা বিশেষ স্তরে নিয়ে যান নি? স্যার বললেন বাংলা ভাষাটা বাঁচাইয়া রাখছে চাষাভুষা, মুটোমজুর- এরা কথা কয় দেইখ্যাই ত কবি কবিতা লিখতে পারে। সংস্কৃত কিংবা ল্যাটিন ভাষায় কেউ কথা কয় না, হের লাইগা অখন সংস্কৃত বা ল্যাটিন ভাষায় সাহিত্য লেখা অয় না। (*পুস্তক যদ্যপি আমার গুরু – আহমদ ছফা)

প্রতিভাবান ব্যক্তি বুদ্ধি খাটিয়ে ইচ্ছা করলে খৈ খাওয়ার জন্য ধানের গোলায় আগুন লাগাতে পারে।(আহমদ ছফা)

কম্যুনিজম মানুষকে নতুনভাবে দাসত্ব করতে শেখায়। কিন্তু তারপরও মার্কস পৃথিবীতে একজন মহান ব্যক্তি হিসেবে থেকে যাবেন। – আহমদ ছফা।

মানুষ খুব অসহায়। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলেও কি হবে, মানুষ খুব মূল্যহীন। এগুলো নিয়ে খুব আস্ফালন করার কিচ্ছু নেই।মানুষ পৃথিবী থেকে অনেক কিছু শিখে। কিন্তু মানুষ আরেকটা জিনিস শিখে না, বিনীত হওয়া শিখে না। আজ ৩০শে জুন বাংলাদেশী লেখক, কবি ও সমাজবিজ্ঞানী আহমদ ছফার জন্মদিন। তিনি ২০০২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।জীবদ্দশায় আহমদ ছফা তাঁর প্রথাবিরোধী, নির্মোহ, অকপট দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য বুদ্ধজীবী মহলে বিশেষ আলোচিত ছিলেন।

লেখক: মুরাদ (সামহোয়ারইন ব্লগ থেকে)

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে