আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > রাণী রাসমণির নেপথ্যকাহন

রাণী রাসমণির নেপথ্যকাহন

37_big

সমাজ ও ধর্মের সেবা করার প্রয়াসেই যেন রাসমণির জন্ম। ১৭৯৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহন করেন তিনি। মাত্র এগারো বছর বয়সে ধণাঢ্য পরিবারে বিয়ে হয় তার। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে বিধবা হন তিনি। তারপর স্বামীর ব্যবসা আর সকল ধন সম্পত্তির মালিক হন রাসমণি। সেই অর্থের কোন কিছুই নিজের ভোগ বিলাসে খরচ করেননি। ধর্মানুরাগীদের জন্য তৈরী করেন মন্দির। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মানুষের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেকে। সে সময়ের গোঁড়া হিন্দু পুরোহিতদের অনেক বাধার মুখেও তিনি তার সমাজসেবায় ছিলেন অটল।

রাসদক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি কলকাতার অদূরে হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত একটি কালীমন্দিরটির ১৮৫৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রাসমণি। যখন মন্দিরটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তখন পুরোহিতরা বাধা দেয় কারণ তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না। কথিত আছে রাণী দেবী কালীর স্বপ্নদর্শন পান, দেবী তাঁকে বলেন, কাশী যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গঙ্গাতীরেই একটি নয়নাভিরাম মন্দিরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা কর। সেই মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েই আমি পূজা গ্রহণ করব। এই স্বপ্নের পর রানি অবিলম্বে গঙ্গাতীরে জমি ক্রয় করেন এবং মন্দির নির্মাণকাজ শুরু করেন।  এই মন্দিরে দেবী কালীকে “ভবতারিণী” নামে পূজা করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট যোগী রামকৃষ্ণ পরমহংস এই মন্দিরে কালীসাধনা করতেন। কথিত আছে, রানি রাসমণি দেবী কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে রামকৃষ্ণ পরমহংসের দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায় রানিকে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন। রামকুমারই ছিলেন মন্দিরের প্রথম প্রধান পুরোহিত। ১৮৫৭-৫৮ সালে কিশোর রামকৃষ্ণ পরমহংস এই মন্দিরের পূজার ভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে সনাতন ধর্মাবলম্বিদের একটি তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয় এই মন্দির।

rani_rashmoniদক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি চত্বরে কালীমন্দির ছাড়াও একাধিক দেবদেবীর মন্দির ও অন্যান্য ধর্মস্থল অবস্থিত। মন্দির চত্বরের উত্তর-পশ্চিম কোণে রয়েছে রামকৃষ্ণ পরমহংসের বাসগৃহ।  মূল মন্দির চত্বরের বাইরে রামকৃষ্ণ পরমহংস ও তাঁর পরিবারবর্গের স্মৃতিবিজড়িত আরও কয়েকটি স্থান রয়েছে, যা আজ পুণ্যার্থীদের কাছে ধর্মস্থানরূপে বিবেচিত হয়।

রাসমণি শুধু মন্দির তৈরী করেই ক্ষান্ত দেননি। তখনকার সময়ে হিন্দুদের প্রচলিত কুসংস্কার এবং ব্রিটিশ শাসনের গ্যাঁড়াকল থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার অভিপ্রায়ে কাজ করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তিনি গঙ্গা নদীতে জেলেদের মাছ ধরার অধিকার আদায় করেন। জেলেদের উপর আরোপিত শুল্ক তুলে নিতে বাধ্য করেন। এজন্য প্রচুর অর্থও ব্যয় করতে হয়েছিলো তাকে।

সাধারণ জনগণ তাকে খুব পছন্দ করতো। তিনি সুবর্ণরেখা থেকে পারি পর্যন্ত তীর্থযাত্রীদের চলাচলের সুবিধার জন্য রস্তা নির্মাণ করে দেন।  তীর্থযাত্রীদের সুবিধার জন্য স্নানাগারের ব্যবস্থা করেন। রাসমণি কলকাতার ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী (বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরী অফ ইন্ডিয়া) এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে বিপুল পরিমান অর্থ দান করেন। আধুনিক মন মানসিকতার রাসমণি যখন যে কাজ সবার জন্য কল্যাঙ্কর মনে করতেন তখন ঠিক সেটাই করতেন। সেই সময়ে নারিশক্তির এক অনন্য রূপ দেখিয়েছিলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। তার সাথে ব্রিটিশদের দ্বন্দ্ব বাংলার ঘরে ঘরে রূপকথার মত প্রচলিত ছিল। জনসাধারণের জন্য তার দরদ, হিন্দু ধর্মের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস, সেবামূলক মনমানসিকতা, প্রতিবাদী কন্ঠস্বরের জন্য সবাই তাকে রাণী বলে সম্বোধন করা শুরু করে। ভারতের বিভিন্ন এলাকার নামকরণ করা হয় তার পরিবারের সদস্যদের নামে। তিনি সকল বাঙ্গালীর মনে অনুসরণীয় শ্রদ্ধা ও ভালবাসার জায়গায় রয়েছেন।

দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির
দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির

সূত্র: উইকিপিডিয়া , সনাতন ধর্মের কথা, সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি ।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে