আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > বর্তমান প্রজন্ম: আমরা ও আমাদের ভাবনা

বর্তমান প্রজন্ম: আমরা ও আমাদের ভাবনা

sarkar
সত্যরঞ্জন সরকার

এ এক অস্থির সময় পেরিয়ে আলো থেকে অন্ধকারে, না অন্ধকার থেকে আলোর পথের অভিযাত্রী আমরা। এ প্রশ্নের সম্মুখীন দাঁড় করিয়েছে বর্তমান সময় ও প্রেক্ষাপট। অনতিযোজন দূরেও নৈতিকতা, আদর্শ, ব্যক্তিত্ববোধের চর্চা ছিল সমাজ ও সংসারে- আজ তা কি সত্যি হারিয়ে যেতে বসেছে ? প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞজনদের উপদেশ চর্চা অনুধাবনের মত মনমানসিকতার আঁধার সর্বত্র ছিল বিদ্যমান, কিন্তু আজ পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে উপদেশ ও হিতাহিতবোধ সমাজ থেকে লোপ পেতে চলেছে । সর্বজন বিদিত এবং স্বীকৃত মানবিকতা, ন্যায়বোধ, মান্যতা, মূল্যবোধ এসব আজ পুথিঁতে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে ব্যক্তি জীবনে কার্যকারীতা ও এর উপযোগীতা থাকলেও প্রায়োগিক ব্যর্থতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। সমাজের মুখপাত্র গুরুজনরা সামাজিক শিষ্টাচার বর্জিত মানুুষের দিকে রক্তচক্ষু ও তর্জনী দেখিয়ে ভুল শোধরানোর দায়িত্ব পালনে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তারা আজ কোন যাদুর মন্ত্রবলে মুক ও বধির হয়ে গেলেন? মনস্তাত্বিক ভাবে তার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংক্রামিত হয়ে সমাজ উন্নয়নের যাত্রাপথকে পিচ্ছিল করে দিচ্ছে। আগে সমাজে গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তাঁদের সামনে সমীহবোধ প্রদর্শন এমনকি অনুচ্চস্বরে যৌক্তিকতা প্রমানেও ভদ্রতা বা সৌজন্যবোধের ঘাটতি কখনো ছিলনা। না পাওয়ার যন্ত্রনাকে সামান্য প্রাপ্তিতেই খুশীবোধে মেনে নেওয়ার প্রবনতা আজ প্রতি প্রাপ্তির  চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যতাকেই শুধু ভারসাম্যহীন করছে না বরং না পাবার আগ্রাসী মনোভাব হিংস্রতায় পর্যবসিত হচ্ছে। যার ফলে সমাজের মূল্যবোধ, নৈতিকতা আদর্শ এ সব যেন ভেঙ্গে চুরে খান খান হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে বা হোল? এর জবাব খুঁজতে হলে সমাজতাত্বিক বিশ্লেষণ এবং তার অনুষঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সত্যি কথা বলতে কি যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে যাওয়ার সংগে সংগে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের উন্মেষে পারিবারিক জীবনে অতি সুখের উচ্চাশায় যৌথ পরিবারের মূল্যবোধে কুঠারাঘাত পড়লো, সংগে সংগে আমি ও আমরার বিভাজনে শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে “আমিকেই” ধ্রুবতারা করে সামাজিক উন্নয়ন এগিয়ে যেতে থাকলো। এই স্রোতে নতুন নতুন স্বস্তিদায়ী আবিস্কার যেমন টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ, মোবাইল এসব সামাজিক মেলামেশা থেকে মানুষকে ঘরের কোনে আবদ্ধ করে রাখলো। পরিনতিতে গৃহবন্দী মানসিকতায় সৃষ্ট একাকীত্বের আস্বাদন এসব বিলাসবহুল সামগ্রী শুধুমাত্র উপাদেয়ই হোল না, তা জীবন হিসাবেও পরিগণিত হলো। নির্মল সুখের যে আবহ ছিল ভেজাল সুখে তা আত্মস্থ হলো। যৌথ পরিবারের শিশুরা- “আমাদের” বলে ভাবতে শেখে এবং তারা সমষ্টির পূজক  অন্যদিকে একক পরিবারে “আমার” ও আমির জেদ এত বেগবান হয় যে, সেখানে তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য করার মানসিকতার বীজ নিজে নিজেই অংকুরিত হতে থাকে। ফলে মূল্যবোধের ধারণা নীতিবোধের ধারনা- সেখানে জমাট বাঁধে না। সবাই একা একা দৌঁড়াতেই পছন্দ করছে, সমবেত প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে, একা একা দৌঁড়ানোর ফলে হাঁপিয়ে উঠলে কেউ কাউকে হাত ধরে না তোলার কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকছে মাঝপথে, যার কারনে দৌড়াঁনো শেষ হচ্ছে না। অথচ এক সময়ে আপদে বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাসটা সেদিনও দেখেছি। এখন এমন হয়েছে পাশের বাড়ি ডাকাত পড়েছে তাতে আমার কি? অথচ দল বেঁধে সমবেত ভাবে প্রতিহত করার দায়িত্ববোধ সেদিনও আমাদের মাঝে ছিল। রাস্তায় ইভটিজিং হলে মুরুব্বীরা কান ধরে শাষন  করতে পারতেন- আজ কি তা কল্পনা করা যায়? গুন্ডা, বদমায়েশ, শয়তান এদের সংখ্যা কম, এদের কাছে আমরা জিম্মি হবো না, ওরা আমাদের কাছে জিম্মি হবে? সম্মিলিত শক্তির জায়গাটা আজ ভেঙ্গে গেছে- কেউ কারো পাশে আজ নিজের জীবন বিপন্ন করে ছুটে আসার শিক্ষাটা পাচ্ছে না। সবাই গাঁ বাঁচিয়ে চলছে। আমি তো ভাল আছি- এই “আমি ভাল থাকাটাই” কাল হচ্ছে। এই একা আমি ভাল থাকার কারনেই আমরা কেউ ভাল থাকতে পারছি না। আর সেই সুযোগেই নীতিবোধ, আদর্শ, মূল্যবোধ, ব্যক্তিত্ব সব লোপাট হয়ে যাচ্ছে।
আগে বাড়ীতে আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসলে বড়দের সংগে ছোটরাও খুশী হতাম। প্রাপ্তি যোগ থেকেও আপনজনদের কাছে পাবার আনন্দ বড়দের সংগে ছোটরাও ভাগ করে নিতাম। কিন্তু এখন ঠিক ঘটেছে উল্টোটা- নব প্রজন্মের দম্পতিরা অতিথি তো দূরে থাকুক, নগরজীবনে পিতামাতাকেও গ্রহন করতে নারাজ।  যার ফলে এসব পরিবারের শিশুরা মনস্তাত্বিক ভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে বেড়ে উঠছে- কারন ঠাকুরদা ঠাকুরমা, দিদিমার স্নেহ ভালবাসা ছাড়া বেড়ে উঠা সন্তানেরা রোবট হতে পারবে কিন্তু হৃদয়বান হতে পারবে না। আর এর ফলে পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ উপভোগ করার সামর্থ্য কি আমরা হারিয়ে ফেলছি না? অতীত সুখ স্মৃতিতে বিভোড় না থেকেও বর্তমানে দাঁড়িয়ে যে হা-হুতাশ তা প্রশমিত করার জন্য আমি কি আমার দায়িত্ব পালন করছি ? যদি এর উত্তর ‘না ’ বলি তাহলে কি মিথ্যা বলা হবে? অনভ্যস্ত গ্রামীণ জীবনে খাপ খাওয়ানোর জন্য আমরা নগরজীবন থেকে ছুটি নিয়ে কি বাচ্ছাদের সংগে সঙ্গ দেওয়ার কথা আমাদের রুটিনে রাখি? ছুটি কাটানোর মহাব্যস্ততা সমুদ্র সৈকত, পাহাড়-পর্বত, অপরিচিত জায়গায় যতটা পরিলক্ষিত হয় শিকড়ের টানে “ছুটে চল মাটির টানে” তা বোধ হয় ততটা কাজ করে না। করবে কেন? কি আছে গ্রামে? পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের নিমন্ত্রণ আজ ব্যর্থ, সেখানে চটকদারী বিজ্ঞাপনের মোড়কে দেশ বিদেশ ভ্রমনের যে বাহারী ব্যবস্থা- তাতে শিশু মনের উর্বরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তো নয়ই বরং অতি আধুনিক ব্যবস্থায় সকলকে ভুলে আমিত্বকে জাহির করার প্রচেষ্টা মাত্র।
আমি আর আমার বাইরে- আমরাকেও সম্পৃক্ত করার যে চেষ্টা দরকার ছিল, সেটা ব্যক্তি আমার নিজস্ব চাহিদার গন্ডিতে আবদ্ধ করে নিজের ইচ্ছাকে চরিতার্থ করার ফলে। দেশ ভ্রমণ আপাতঃ বিনোদন হলেও আত্মজেব শিক্ষা উপকরণ বিশেষ করে পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষা সেখানে মিলছে না। তা অনুর্বর থেকে যাচ্ছে। অথচ গ্রামীন জীবনের ছোঁয়ায় শিশুদের মন-সরোবরে যতটা কমল ফুটে কাননে সুস্থির ঢেউ তুলতে পারতো তা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। আজ আনন্দটাকে ভাগ করে ভোগ করার মানসিকতা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। নিজের ঘরে শিশুরা নিজেরাই রাজা- নিজেরাই প্রজা- চার দেয়ালের বেড়াজালের  বাইরে তাদের কোন দৃষ্টি নেই, তার বুদ্ধির বিকাশে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা যা তার উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে, তার অনুপস্থিতিতে নিজের বুদ্ধিমত্তার তারিখ একমাত্র পিতামাতা ছাড়া আর করার কেউ থাকছে না- থাকলেও তাদের সংগে সম্মন্ধের যোগসুত্র ক্ষীণ হওয়াতে তারাও ‘নিন্দা বা প্রশংসা’ কোনটাই করতে পারছে না। নিন্দা কথাটা এ জন্য প্রযোজ্য, আগে যৌথ পরিবারের সদস্যদের কেউ অন্যায় করলে সেটা শাসন করার ক্ষমতা, এমনকি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও গুরুজনদের ছিল। আজ সেটার অনুপস্থিতিতে আবেগ প্রবন পিতৃ মাতৃ হৃদয় সন্তানকে সব সময় প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে- যার ফলে ক্ষিদের চেয়ে জিদের জয় জয়াকার। চাইলেই পাওয়া যাবে- এমন ধারনার বশবর্তী হয়ে আদরের মানিকেরা মা বাবাকে জিম্মী করে ফেলেছে। ওমুকের আছে, আমাকেও পেতে হবে- অতএব আদরের সন্তানদের এ হেন আবদার মেটাতে পিতামাতাকেও পরিশ্রমের হালাল উপার্জনের পাশাপাশি উপরি আয়ের ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। সামাজিকভাবে এ অপরাধ প্রবনতা বিবেকের কাছে আজ কাউকে অপরাধবোধের ব্যাথায় ব্যথিত করে না। আত্মসমালোচনায় ভালমন্দের বিচার বিশ্লেষনে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার তাগিদ আজ ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় যোগান বেশী সে জিনিসের দাম কমবে  অর্থনীতির সুত্র আজ যেন অচল। ওয়ান টাইমের যুগে- যোগানও  বেশী চাহিদাও বেশী। বাজারের কোন জিনিসের অভাব নেই, সয়লাব চারিদিকে তারপরেও ক্রেতা ও অর্থের অভাবে কোন জিনিস কিন্তু এখন পড়ে থাকছে না। সবই বিক্রি বাট্টা হচ্ছে। তাহলে চাহিদা যোগানের চিরাচরিত সূত্র যে আজ মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে অচল সেটারও জন্য দায়ী আমাদের ভোগ প্রবণতা। আরো- আরো চাই। উপযোগ মিটলেও আরো পাবার তৃষ্ণা যেন মিটছে না। কতটুকু প্রয়োজন এর পরিমাপের জায়গাটা আজ ব্যক্তির ভাবনায় থাকছে না। তার দায় দায়িত্ব সংসারের সবার ঘাড়ে চাপছে। ফলে অতি প্রাপ্তির যুগে ভোগ করার থেকে নষ্টের দূর্ভোগ বাড়ছে। সবশেষটুকু ভোগ করার যে প্রবনতা তা মনে হয় আজ নতুন প্রজন্মের কাছে ওয়ান ডে ক্রিকেট ম্যাপের মত, পঞ্চাশ ওভারেই শেষ। ছক্কা বাউন্ডারীর আনন্দটাই চাই। এক দুইয়ের ধার ধারে না। ফলে ভোগ যেমন ভোগীর মর্জ্জিমত তেমনি খুশী করার মানসে খরচের ব্যাপার হাত খুলে ব্যাট চালাচ্ছেন বর্তমান অভিভাবকরা।
সন্তানের সব চাহিদাকে মিটাতে যেয়ে অভিভাবকরা নিজেরা যে কষ্ট করেন তাদের সে কষ্টের কথা, নতুন প্রজন্মের কাছে মূল্যহীন। তাদের প্রাপ্তির নিশ্চয়তা তাদের অনন্দবর্ধনে সহায়ক হলেও অভিভাবকদের সে চাহিদা মেটানো পারঙ্গমতা  নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। আগে চাহিদা ব্যক্ত হলেও পুরনের জন্য সামথ্য আছে কিনা সেটার যুক্তি অভিভাবকরা সন্তানের কাছে তুলে ধরলে তারা না খুশী মনে মেনে নিত, সেক্ষেত্রে স্নেহের পরশটাই ছিল বড় অভিভাবকদের মান্য করা হত। আজ প্রতিযোগিতার যুগে পাশের জনের আছে আমারও থাকতে হবে, অতএব অভিভাবকদের উপর চাপ প্রয়োগে নানা কৌশলে তাদের ব্যতিব্যস্ত করে নিজের চাহিদা হাসিলের এ প্রবণতাটাও আজ লক্ষনীয়। আগে যৌথ পরিবারে, সব প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির স্বাদ মিটাতে বয়োজেষ্ঠ্যরাই সিদ্ধান্ত নিতেন কিন্তু এখন একক পরিবারে মা বাবা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন। ভাল মন্দ বিচারের সুযোগ সেখানে থাকছে না, একদিকে জেদ অন্যদিকে অসংলগ্ন প্রতিযোগিতা তাদের আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে- ফলে অতি সুখ যে দুঃখ ডেকে নিয়ে আসছে সে কথা অনস্বীকার্য। “ভোগে সুখ নেই ত্যাগেই প্রকৃত সুখ”- এসব কথা বর্তমান নতুন প্রজন্মের কাছে মূল্যহীন। তাদের পেতে হবে, দিতে হবে-দাও। তাদের ভোগ প্রবণতা এবং নষ্ট করার প্রবণতা এতটাই লাগামহীন যে নিচের দিকে তাকানোর সময় নেই, নেই কোন সহানূভূতির স্পর্শ। এমনতর পরিবেশে অন্যের কথা, অন্যের একটু সুখ, কষ্ট দূর করার জন্য কিছু করা এসব যেন সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অনাগত ভবিষ্যত প্রজন্ম কি তাহলে আমাদের নৈতিকতা, আদর্শ, মমত্ববোধ, সহানুভূতি এসব থেকে আমাদের বঞ্চিত করবে, এ ভাবনা তাড়িত করছে আমাদের।

লেখক: কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে