আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > পাহাড়ে বিপর্যয়

পাহাড়ে বিপর্যয়

আতোয়ার হোসেন

বেসরকারি টেলিভিশনে চাকরি করি, ভিডিওগ্রাফার। ঢাকাস্থ অফিসে কাজ করি। সাধারণত ঢাকা শহরে ঘুরে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করে থাকি। বিশেষ প্রয়োজনে ঢাকার বাইরে এমনকি দেশের বাইরেও সংবাদ সংগ্রহ করতে যেতে হয়। এরকম এক একটা সফর মানে আমাদের জন্য বিস্তর অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং সফল হলে ইজ্জতের ব্যাপার হয়।
সম্প্রতি এরকম একটি সফর শেষ করে এসে ভেতরে ভেতরে অভিজ্ঞতা যেন বুদ্বুদ করছে। গত ১৩ জুন দুপুরে অফিস থেকে একটি টিম রাঙ্গামাটি পাঠানোর পরিকল্পনা হয়। আগের রাতে স্মরণকালের রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। একের পর এক মাটি চাপা পড়া লোকের প্রাণহানির সংবাদ আসতে থাকে। প্রয়োজনীয় ইকুপমেন্টসহ ইউনিট গুছিয়ে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউজ কাভারেজের জন্য রাঙ্গামাটির পথে রওনা হই।  সাথে একজন রিপোর্টার, অফিসের একটি গাড়ি এবং চালক। রাতের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছে যাই। রাতে পাহাড়ের পথে অনিরাপদ হবে মনে করে সেই রাত চট্টগ্রামে অবস্থান করে পরের দিন ভোরে আবার রওনা করি। তারপর থেকে অভিজ্ঞতা আর অভিজ্ঞতা।
এর আগে একবারই পাহাড়ে গিয়েছিলাম, বান্দরবানে। তখনকারটা কেবলই বেড়াতে যাওয়া। সুন্দর সুন্দর পাহাড়, আঁকাবাঁকা-উঁচুনিচু পথ, পাহাড়ি জনপদ আর পাহাড়ের মাথায় মাথায় আটকে থাকা মেঘ দেখে অশেষ মনোরঞ্জন হয়েছিলো। তখন শুনেছিলাম, রাঙ্গামাটি আরও আকর্ষক। এবার সেই রাঙ্গামাটি। তবে সৌন্দর্য্য দেখতে নয়, যাওয়া হচ্ছে দুর্যোগের সংবাদ সংগ্রহ করতে। সে যাই হোক, পাহাড়ে তো যাচ্ছি। পাহাড়ে চ্যালেঞ্জ থাকে শুনেছি, নানান চ্যালেঞ্জ। সবকিছুর জন্য মানসিক প্রস্তুতি আছে। আছে সংবাদ সম্প্রচারের জন্য সকল টেকনিক্যাল ও টেকনোলজিক্যাল প্রস্তুতিও।
ধীর গতিতে পাহাড়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে আমাদের সংবাদ দলের গাড়ি। দুইপাশে পাহাড়-ছোঁয়া পানি থৈ থৈ করছে। কোথাও পানি সরে যাওয়ার দাগ, কোথাও আবার যেতে হচ্ছে রাস্তা-ডোবা পানি ভেঙ্গে। কোথাও কোথাও চোখে পড়ছে পাকা রাস্তায় ব্যস্ত মাছশিকারের দৃশ্য। এসব নিখাদ সুন্দর দৃশ্য। আমাদের মনোযোগ অন্যখানে, দুর্যোগকবলিত মানুষের দিকে। দ্রুত পৌঁছাতে হবে। খবর সংগ্রহ করে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে, ধীরে কিন্তু একনাগাড়ে। হঠাৎ থামতে হলো একবার, পাশের পাহাড় ছিঁড়ে এসে রাস্তা আটকে দিয়েছে। দমকলকর্মীরা তা পরিস্কার করছে। চলার সুযোগ হলে আবারও চলা শুরু হয়। কিছুপথ গিয়ে আবার পথরোধ করে থাকে ভাঙ্গা পাহাড়। আমাদেরকে থামতে হয়। পথে পথে চলাচলকারী লোকের কাছে কিছু তথ্য পাচ্ছি। দমকলের লোকদের মুখে কিছু বিবরণ শুনছি। সংবাদের জন্য ছবি তুলছি আর গাড়িসহ সামনের বাধা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। এমন সময় জানতে পারি, এরকম সময় নষ্ট করে করে অনেকদূর আগানো যাবে। কিন্তু রাঙ্গামাটি পৌঁছানো যাবে না। কোথাও বড় কোনও পাহাড় ভেঙ্গে এসে রাস্তায় পড়েছে, কোথাও আবার স্বয়ং রাস্তাই ধসে গেছে কয়েক-শ ফুট নিচের দিকে।
আয়োজন করে গুছিয়ে নেওয়া বিরাট ইউনিট গাড়িতে ফেলে রেখে হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। সাথে কেবল কোনও রকম কাজ সম্পন্ন করার মতো কিছু ইকুইপমেন্ট। ক্যামেরা, লাইভ করার যন্ত্র, সেগুলোর ব্যাটারি এবং ব্যাটারির চার্জার, নেহায়েত কম ওজনের নয়; হাঁটা শুরু হয়। আমরা হাঁটতে থাকি রাঙ্গামাটির পথে আর আমাদের গাড়ি ফিরে আসে চট্টগ্রাম শহরে। এটা রানীর হাট, এখান থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে রাঙ্গামাটি শহর। চ্যালেঞ্জ, এবং আমরা সেটা নেই, হাঁটতে থাকি।
কেথাও রাস্তার ডান পাশের পাহাড় নেমে এসেছে, কোথাও বাম পাশ থেকে রাস্তা খুলে নদীতে নেমে গেছে। কোথাও আধাভাঙ্গা ঘরবাড়ি নিয়ে লোকেরা ব্যস্ত, কোথাও আবার গালে হাত দিয়ে নিশ্চুপ মানুষের হতবাক বসে থাকা। পথে পথে নতুন কবর আর লাশের খাটিয়ার সাথেও সাক্ষাৎ হতে থাকে। প্রতিঘণ্টার সংবাদে লাইভে যুক্ত হই, কিছু ছবি তুলি, তারপর নতুন করে হাঁটতে থাকি। ঘাগড়া বাজারে এসে রাস্তার পাশে বসা বাজার দেখে আর হাঁটতে ইচ্ছা করে না। পাহাড়ি আনারস দেখে মন ছটফট করে। আমরা সব ফেলে মানুষের অসহায়ত্ব আর পাহাড়ের খামখেয়ালি দেখতে দেখতে এগিয়ে যাই। এক ঘণ্টা হাঁটি, নতুন ধ্বংস থেকে সরাসরি সংবাদে যুক্ত হই। প্রতি সংবাদে মৃতের সংখ্যা বাড়ে। মৃতের সংখ্যা মানে উদ্ধারকৃত লাশ। ঠিক কতো লোক যে মাটিচাপা আছে তার কোনও খোঁজ কারও কাছে নেই। এমনকি প্রশাসন বা রাষ্ট্রের কাছেও নেই। কতো লোক পাহাড়ের গায়ে বাস করে তারও কোনও হদিস নেই, কারও কাছে নেই।
সাপছড়ি এলাকায় পাহাড় নেমে যাওয়ার সময় কয়েক-শ ফুট রাস্তাসহ নিয়ে গেছে। একটা বড়, উঁচু, কোণাকৃতির আইসক্রিম চামচ দিয়ে উপর থেকে নিচের দিকে কেটে নিলে যেমন ঢাল হয়, তেমন দশা। কোথাও যেন পা রাখার স্থান নেই। সেখানে পারাপার যেন অসম্ভব। আমরা পার হয়েছি। নিজেদেরকে তখন ডিসকোভারি চ্যানেলের ভিনদেশি মনে হচ্ছিলো। পাহাড়ের বাকি অংশ ধসে যেতে পারে। পা পিছলে গেলেও বিপদ। নেমে যাবো গহীনে প্রবল বেগে বয়ে চলা ঘোলা জলে। প্রাণের ভয় যে ছিলো না, সে-কথা বলবো না। কাজ করতে নেমেছি, রাঙ্গামাটি পৌঁছাবো। থামার সুযোগ নেই।  সেখানে অপেক্ষা করছে লাশ, লাশের খবর।
মানিকছড়ির এক স্থানে পাহাড় ধসের মাটি সরাতে গিয়ে নতুন ধসে চাপা পড়েছে কিছু লোক। সাথে কয়েকজন সেনা সদস্য। সেখান থেকে কিছুটা সামনে হেঁটে গিয়ে প্রথমবারের মতো একটা অটোরিক্সায় উঠে বসতে পারে। পা-জোড়া খানিকটা আরাম পায়। কিছদূর গিয়ে আবারও নেমে পড়তে হয়। আবারও হাঁটা, আবারও ছবি, এবং অটোরিক্সা। একসময় পৌঁছাতে পারি রাঙ্গামাটির খুব কাছে। আর মাত্র আটদশ কিলো। জায়গার নাম ভেদভেদি মুসলিম পাড়া। দমকলকর্মীদের নিরলস চেষ্টা ছলছে আটকে পড়া মরদেহ উদ্ধারের। তারপর শুরু হয় মূল কাজ। এখন এখানে, তো তখন আরেকখানে। দমহীন কাজ। যেখানেই লাশের খবর, আমরা আছি। যেখানেই উদ্ধার অভিযান, দমকলকর্মী, আমরা সেখানেই। প্রায় সাড়ে চার দিন রাঙ্গামাটির বুকে, মাটিরাঙ্গা শহরে মনভাঙ্গা মানুষের সাথে সাথে। মাটিচাপার খবর, পাহাড় ধসের খবর, উদ্ধারের খবর, সেনাবাহিনির খবর, সুযোগে সবকিছুর দামবৃদ্ধির খরব, জেলা প্রশাসকের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার খবরসহ সব, সবকিছু নিয়ে আমার প্রতিঘণ্টার বুলেটিনে ব্যস্ত। সকালে ঘুম থেকে উঠে মাঝরাতে ঘুমাতে যাওয়া, দমহীন অভিজ্ঞতা।
স্থানীয়দের বরাতে খবর আসছে এখানে খুঁড়লে লাশ পাবেন। খোঁড়া হচ্ছে। বৃষ্টির বাধা আসছে। পাহাড় কলাপস করার নতুন ভয় থাকছে। উদ্ধার চেষ্টা চলছে। উদ্ধার হচ্ছে। লাশ মিলছে বা মিলছে না। এমনও আছে যে, এক পরিবারের সবাই চাপা পড়েছে। আহাজারি করারও কেউ নেই। সেখানের খবরও হচ্ছে না।
প্রশাসন দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। দায় সারছে। আমরা খবর নিচ্ছি, দিচ্ছি। ত্রাণের ঘোষণা আসছে, ত্রাণ দেখা যাচ্ছে না। ত্রাণ পাওয়া লোকেরা হয়তো কথা বলছে না, নয়তো কেউ পাচ্ছেই না।
এসবের ফাঁকে ফাঁকে স্থানীয় বাঙ্গালি ও পাহাড়িদের সাথে একান্তে আলাপ, ত্রাণের অবস্থা, সাধারণ জীবনযাপন, পাহাড় ভাঙ্গার কারণ, সশস্ত্র দলের ভয়, চাঁদাবাজি, পর্যটন, পর্যটক এবং বিবিধ বিষয় নিয়ে চলছে খোঁজাখুঁজি। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদ সন্ধানও তো করতে হয়।
স্থানীয় বাঙ্গালিরা সেখানে মাইনরিটি। পাহাড়ের গায়ে গায়ে আশ্রিত। সংবাদের লোক কাছে পেয়ে কান্নার ঝাঁপি খুলতে দেখেছি অনেককে। আমাদের করার কিছু নেই। পাহাড় ভাঙ্গায় পাহাড়ের মূল বাসিন্দাদের চাপা আনন্দও দেখতে পেয়েছি। রাগ করারও নেই আমাদের।
সাংবাদিক দেখলে বাঙ্গালিরা ভরসা পাচ্ছে। হয়তো নিজের আত্মীয়দের মতো ভাবছে। কেউ কেউ ভয় পাচ্ছে। ভাবছে, অনিরাপদ বসত নিয়ে রিপোর্ট করলে সরকার হয়তো তাদের উচ্ছেদ করে দিবে। আমরা কেবল সংবাদ নিচ্ছি আর দিচ্ছি। আমরা রাষ্ট্র নই, সরকার নই, পাহাড়ি শক্তি নই, কেউ নই আমরা। কিচ্ছু করার নেই আমাদের।
সংবাদের সূত্রে পাহাড় ধসের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছি। কারও মতে পরপর তাপ ও অতিবৃষ্টি যেমন কারণ, তেমনি অপরিকল্পিত, অনিরাপদ এবং অননুকূলভাবে পাহাড় কেটে বসতবাড়ি নির্মাণও কারণ হিসেবে দেখা গেছে। পাহাড়ের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গাছ কেটে চাষবাসও ছোট কারণ নয়। ব্যাপারটা স্বাভাবিক। পাহাড়িরা পাহাড়ে বসত করে পাহাড় না কেটে ঘর বানিয়ে। পক্ষান্তরে আনঅ্যাডাপ্টেবল বাঙ্গালিরা পাহাড়ের তলদেশে মাটি কেটে সমতলের বৈশিষ্ট্যে বাড়ি করেছে। ফলে অতিবৃষ্টির পর পানি গড়িয়ে মাটি ধসে পড়া অস্বাভাবিক মনে হয়নি। তাদের দোষও চোখে পড়েনি। চোখে খচখচ করেছে রাষ্ট্রের দুর্বলতা। পাহাড় দখলের কৌশল হিসেবে রাষ্ট্র বাঙ্গালির বীজ বপণ করেছে সেখানে, পরিচর্যা করে না। ফলে ভূক্তভোগী বাঙ্গালির কপালের লিখন আর মুছে যাওয়ার নয়। বরং সেখানে মানিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাদের। যুদ্ধ করতে হচ্ছে পাহাড়ের সাথে, পাহাড়িদের সাথে আর নিজেদের ভাগ্যের সাথে। সশস্ত্র বাহিনীর কাছে প্রায় পরাধীন জীবনযাপন তাদের। সেসব বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আবার আছে সেনাবাহিনী। দুই দিকে অস্ত্র, মাঝেখানে কিছু অসহায় মানুষ। অসহায়ের দলে বাঙ্গালিই বেশি, তবে কিছু অবাঙ্গালিও আছে।
পাহাড়ি সৌন্দর্য্য দেখতে গেলে এসব চোখে পড়ার কথা নয়। বড় বড় পাহাড়ের ওপাশে নজর যাওয়া সহজ নয়। পাহাড়ের জঙ্গল আর তলদেশও অগোচরে থেকে যায়। ভ্রমণকারীরা মোহে থাকে। রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্রের ভাব, স্বাধীন দেশে পরাধীনতার স্বাদ, মুক্তির নেশায় ছোটাছুটি কেবল বেড়াতে গেলে দেখতে পাওয়ার কথা নয়। পাহাড়ি আনারস আর আনারসিরা মোহনীয়, ভয় অতীব ভয়ঙ্কর।
পাহাড়ের দোষও দিতে পারি না। পাহাড় তো পাহাড়, সমতল নয়। ওখানে সমতলের রাজনীতি কার্যকর না-ও হতে পারে। কেবল রাষ্ট্র নিয়ে ভাবনা হয়। মনে হয়, কারও হয়তো কিছু করার আছে, করতে পারে। ওরা আমাদের হতে পারে, আমরা তাদের। মিলেমিশে থাকতে পারি আমরা।
অফিসের দেওয়া বাজেট শেষ হলে আমরা ফিরে আসি। কয়দিন পরে আর কিছু মনে থাকবে না। না থাকুক, যার দায়, সেই রাষ্ট্র যদি ভুলে না যায়, যদি করণীয় নির্ধারণ করতে পারে, যদি কিছু করে, করুক। পাহাড় রক্ষা করুক, পাহাড়িদের রক্ষা করুক আর বাপ-মাহীন বাঙ্গালিদেরকে কেবল ঢাল হিসেবে নয়, নাগরিক হিসেবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিক।

লেখক: সংবাদকর্মী ও কবি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে