আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > লাইফ-স্টাইল > ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনী: বাউন্ডুলের দিনরাত্রি

ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনী: বাউন্ডুলের দিনরাত্রি

মোহাম্মদ আনোয়ার, ইতালি থেকে

পর্ব ২

মৃতপ্রায় এক শহর দেখতে এসেছি আমরা। চক্করের পর চক্কর খাচ্ছি গাড়ি রাখার মত একটা জায়গা খুঁজে বের করতে। পাশের শহরে। পাশাপাশি দুই পাহাড়ের উপর দুই শহর। মাঝে একটা উপত্যকা। বেশ গভীর। লম্বা এক ব্রীজ দিয়ে সংযুক্ত করা। যে শহরে আমরা এসে পৌঁছালাম এটা আগে সেই মৃতপ্রায় শহরের উপশহর ছিল। আর এখন এটা একটা পুরোদমের শহর। ব্রীজটা দিয়ে শুধু মানুষ পার হতে পারে। তাই গাড়ি নিয়ে সেই শহরে যাওয়া যায় না। এই শহরেও পর্যটকদের গাড়ি ঢুকতে পারে না। শহরের একেবারে প্রান্তে পারকিং আছে, সেখানে গাড়ি রেখে যেতে হয়।

বিকেল এখন। সূর্য আকাশের একদিকে চলে গেছে। বসন্ত হলেও বাতাসে শীতের টান আছে। মাথার উপরের আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ। এই মেঘগুলো সারাদিন ধরে দেখছি। যত জায়গায় গিয়েছি। আজ হয়ত মেঘেরাও ঘুরছে। এদিক ওদিক।

চিভিতা দি বানিওরেজ্জিও। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের বানানো শহর। এটরুসকান নামক এক জাতির হাতে। এই জাতি এদের এই নাম ধরে রাখে প্রায় এগারশ বছর। প্রায় ৪০০ সালের দিকে রোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই শহর ছিল জমজমাট। ১৬০০ সালেরও পরে শুরু হয় এর পতন। বেশ ধীর গতির পতন।

18158025_10211498164482443_2344288447414597488_n
এই শহর টাফ নামক এক শ্রেণীর পাথুরে পাহাড়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই পাথরগুলা আসলে নকল পাথর। ছাই দিয়ে তৈরি। আগ্নেয়গিরির ছাই। সময় নিয়ে জমতে জমতে ছাইগুলা পাথর হয়ে যায়। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই ছাই-পাথর আবার ক্ষয় হতে থাকে। ধিরে। এই শহরও। ক্ষয়ে যাচ্ছে। ধিরে ধিরে।

পুরো শহরে এখন বছরের বেশির ভাগ সময়ে সাকুল্যে ১২ জন অধিবাসী থাকে। তবে, প্রতিদিন শত শত বা হাজার হাজার পর্যটক এই শহরে যায় দেখতে। একটি শহরের মৃত্য। দেখতে পারা কম কথা নয় কিন্ত!

এখনো পর্যটনের মৌসুম শুরু হয়নি। তবু, আমরা গাড়ি রাখার জায়গা পেলাম না!! ফিরে চললাম। মরতে থাকা শহরে পা রাখা হল না। গাড়িতে থাকা আমাদের চারজনের মন খারাপ হল! খুব!! মনিরের মন খারাপ হয়নি বোধহয়। ও কয়েকবার গিয়েছে সেই শহরে।

ফিরে চললাম। মিনিট দশেক আসার পর একটা মোড়ে নেমে সেই শহর দেখার চেষ্টা করলাম। এখানে পথের বাঁক এমনভাবে ঘুরে গেছে যে একটু এদিক ওদিক হলেই সোজা কয়েকশ মিটার নিচে। পথের পাশে বুনো ল্যাভেন্ডার ফুটে আছে। দেশে থাকা বন্ধু আনোয়ার বলেছে ওর জন্য ল্যাভেন্ডার ফুল দিতে। রোমের কয়েকজায়গায় খুঁজেছি। পাইনি। এখন এই পাহাড় থেকে কয়েক গোছা তুলে নিলে হয়! কিন্ত মন সায় দিল না। প্রকৃতিতে এসে একে সম্মান জানানোই উত্তম!

18119604_10211498203523419_8162613588327732330_nগাছের ঘনত্বের কারণে দূরের সেই শহর দেখা গেল না। এখানে ইতালির বনেও এরা গাছের যত্ন নেয়। সময় মত পুরনো গাছ কেটে নেয়, কাটার আগেই নতুন গাছ লাগায়। শিশু বা কিশোর গাছ গুলো ঠিকমত বেড়ে উঠছে কিনা তার তদারকি করে। শুধু গাছ লাগিয়েই ফেলে রাখে না। এই পাহাড়ের সারি সারি গাছ দেখে খানিক মন খারাপ হল। আমাদের দেশের বনের কথা মনে হয়ে।

বাঁকের এক মাথায় একটা বাড়ি। এটা ইতালি বলেই বাড়িটাকে ইতালিয়ান বাড়ি বলতে হবে। এই বাড়িটাও সেই টাফ বা তুফা নামের ছাই পাথর দিয়ে তৈরি। বাড়ির অল্প একটু আঙিনায় একদম বুড়ো এক মহিলা কিছু একটা করছেন। দূর থেকে আমাদের দেখে হয়ত জোরে জোরে কিছু বলা শুরু করলেন। আঞ্ছলিকতার টান থাকায় আমরা তেমন কিছুই বুঝলাম না। বাড়ি আর বাড়ির সামনের বৃদ্ধাকে দেখে কারুর বোঝার বাকি থাকবে না যে এই বাড়ির বাসিন্দাদের অবস্থা সেই পুরনো শহরের মত। যায় যায়। আর এরা যে কোন শহর থেকে এতদূরে এমন একলা একলা বাড়িতে এমন পাহাড়ের কোলে থাকে কী করে এটা আমার মাথায় আসে না।

সামনে আরেকটা বাঁক পেরুনোর সময় ডানদিকের রাস্তা দেখে বুঝলাম সেই রাস্তা ধরে এগুলে আমরা দুরের শহর দেখতে পাব। এই রাস্তা চেনার ব্যাপার স্যাপার আমার মাথায় আসে ভাল। এক আফ্রিকান বন্ধু বলেছে আমি নাকি আগের জন্মে আফ্রিকান ছিলাম। গায়ের রঙ দেখে আমি না বলতে পারিনি। হবে হয়ত!

যেখানে এসে থামলাম সেখান থেকে বেশ সুন্দর করেই দুরের শহর দেখা যাচ্ছে। একটা চত্বরে থামলাম আমরা। খাড়া দেয়ালের মত এক পাহাড়ের একেবারে প্রান্তে এই চত্বর। কয়েকশ মিটার নিচে আবাদি জমির উপত্যকা। খামার আছে। একটা বেশ বড়সড় গাছের নিচে অনেকগুলা গরু জড়ো হয়ে আছে। এই উপত্যকাটার পরেই সেই পাহাড়ি শহর। এখান থেকেই পাহাড়ের পাথরের ক্ষয় বুঝা যাচ্ছে। এই চিভিতা নামের শহরে একজন বিখ্যাত দারশনিক জন্মেছিলেন। উনার বাড়িও ক্ষয় হতে হতে গুঁড়িয়ে গেছে। তবে উনার রেখে যাওয়া জ্ঞ্যান রয়ে গেছে। এইদিক থেকে ভাবলে জ্ঞ্যানের ব্যাপারটা পাথরের চেয়েও শক্ত!

চত্বরে বেশ কয়েকজন দাদু বয়সী আড্ডা দিচ্ছেন। ছোট শহরের এই একটা মজা, এখানে জীবন ধীর গতিতে আগায়। এই বৃদ্ধরা এই শহরের ৯০০ অধিবাসীর কয়েকজন। বন্ধু সালাহউদ্দিন চত্বরে থাকা বিশুদ্ধ পানির কল থেকে আমাদের খালি হয়ে যাওয়া পানির বোতল পূর্ণ করার চেস্টা করছে। কিন্ত এই কলটা রোমের কলগুলো থেকে খানিক ভিন্ন। সালাহ বুঝতে পারছে না কীভাবে পানি বের করবে, দুই-তিনজন দাদু একসাথে এগিয়ে আসলেন সাহায্য করতে। ইতালিয়ানরা অন্য ইউরোপিয়ান জাতিগুলোর চাইতে কম বর্ণবিদ্বেষী। আমার মনে হয়।

চত্বরের একপাশে একটা পিচ্চি মত পার্ক আছে। তিন-চারটা বেঞ্চি মাত্র। একটা মূর্তি আছে। কোন এক খ্রিস্টান পীরের। মূর্তির সামনে দিকে একটা বাইবেলের মূর্তি। সেই বাইবেল আবার একটা রেহেল মত কিছুর উপর রাখা। সবই মার্বেল পাথর কেটে বানানো। শীত সবে গেল। শীতের বৃস্টির প্রভাবে জায়গায় জায়গায় পাথরে শ্যাওলা ধরে গেছে। কিছুদিন পরেই এইসব শ্যাওলা শুকিয়ে ঝরে যাবে যদিও!

পার্কে একটা ইতালিয়ান জুটি বসে আছে। মেয়েটা লোকটার পায়ের উপর দুই পা তুলে দিয়ে বসেছে। মেয়েটার পায়ের গঠন সুন্দর। তিরিশ এর বেশি হবে বয়স। তবু শরীরের গঠন ধরে রেখেছে। ইউরোপের মধ্যে ইতালিয়ানরা এক দারুণ জাতি, শরীর ধরে রাখার ক্ষেত্রে। বয়স যতই হোক এদের শরীরের বাঁধন অটুট থাকে। সত্তুর বছর এর নীচে যাদের বয়স তাদের এখানে বৃদ্ধ বলা যায় না।

18157715_10211498207603521_343316259713311457_n
আমরা জুটিটাকে দেখলাম। নীলচে প্যান্ট। সুন্দর। আমাদের কফির তৃষ্ণা লাগল। তুমুল। কেন কে জানে? চত্বরের পাশে শহরে ঢোকার মুখেই একটা ক্যাফে। খুব মাছি ক্যাফেটাতে। কেন কে জানে? মনির ক্যাফের মহিলাটাকে জিগ্যেস করল, মাছি তাড়ানোর পরামর্শও দিল। এই ক্যাফের ষ্টোররুমে যাওয়ার পথটা পাথর কেটে বানানো। দেখলে ভুতুড়ে ছবির কথা মনে হয়!

শহরে ঢুকার ঠিক মুখেই একটা ভ্যানে ফল আর সবজি বিক্রি হচ্ছে। তাজা। স্ট্রবেরি গুলা এত টকটকে লাল যে দূর থেকেও টের পাচ্ছিলাম খেতে দুর্দান্ত হবে। কিন্ত বন্ধুদের মধ্যে আমি ছাড়া আর কেউই ফল পছন্দ করে না। কেনা হল না!

আমাদের গাড়ির ঠিক সামনে আড্ডা দিতে থাকা দাদুরা হাসিমুখে আমাদের বিদায় দিল। আমরা রোমের পথ ধরলাম। গাড়িতে বসে হিসেব করে দেখলাম সব মিলিয়ে আমরা কম করে হলেও এই শহরের ৫ শতাংশ লোক দেখে ফেলেছি! কী দারুণ এক ব্যাপার।

এই মর মর প্রায় শহর দেখতে আসার আগে আমরা পাহাড়ের উপর এক দারুণ লেকের একদম পাড়ে বসে নীল নীল জলের ওপার হতে ভেসে আসা বাতাসে আরাম করে চার ধরণের চীজ এর টপিং দেয়া পিতজা দিয়ে দুপুরভোজন করেছি।

দুপুরের গল্প আরেকদিন, পিতজার গল্পও।

*চিভিতা দি বানিওরেজ্জিও- Civita di Bagnoregio  *টাফ- volcanic tuff

ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনী: বাউন্ডুলের দিনরাত্রি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে