আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > গল্প: সিলেবাস

গল্প: সিলেবাস

হোমায়রা আহমেদ

“আমি ঠিক করেছিলাম, রবীন্দ্রনাথ না পড়লে খুন করে ফেলব আমার মেয়েকে। বন্ধুমহলে আমি এমনি এমনি তো আর extremist বলে পরিচিত নই! আমার মায়ের প্রচন্ড caring nature, যা আমার নিজের মাঝেও আছে, possessiveness-এর আকারে; তা-ই যেন আমায় দিয়ে এমন সব পরিকল্পনা করায়। “করাতো”, বলতে পারলে খুশি হতাম, হচ্ছিনা—কারণ নিজেই যে জানি, ওটাই আমি।

আজ ভোরবেলার ঘুম ভেঙ্গেছে সুস্থতার অভাব নিয়ে—এক গাদা কাজ। যথারীতি অফিস থেকে নিয়ে আসা ফাইলগুলো ছুঁয়েও দেখিনি weekend-এ। আগে থেকেই জানতাম, ছুঁয়ে দেখা হইবেইনা। তবু আনা। অভ্যেস—যদি দেখতে ইচ্ছে করে!

এদেশের শুক্র-শনিবারের খাঁটি বাংলাদেশী উইকেন্ড একান্তই আমার নিজের। গাদা গাদা অকাজে ভরা, অ-কেজো আর অ-বাস্তববাদী বন্ধুদের সাথে এ সপ্তাহান্তে’ঘন্টা-ই দেখা হয়। ওরা কোথায় কে-কী কাজ করে, খুব একটা জানিনা—জানতে ভীষণ ইচ্ছে করে; তেমনও নয়। শুধু জানি, শুক্রবার মধ্যপ্রভাতের ওই দু’ঘন্টা সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাসে (ইদানীংকালে কোনমতে পাকা করা একটা পথে) বা বৃষ্টি এলে টিএসসি’র কোণে বসতে না পেলে নিঃশ্বাস ছাড়তে ভুলে যেতাম এতদিনে; প্রশ্বাসটা নেয়া হত যদিও; ওটা না নেবার দুঃসাহস ক’বার হয়ে থাকলেও অস্বস্তিটা কাটেনা সহজে।

তো, নিঃশ্বাস ফেলবার পর সব দীর্ঘশ্বাস-লুকোতে-দেয়া সুন্দর প্রশ্রয়ের বন্ধুদের কলকাকলী, আর ভারী চশমা আর পাটভাঙ্গা শাড়ির পারিপাট্য সামলে বেশি উঁচু করে বাধানো ফুটপাথটার চায়ের স্টলে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ফিরতি পথ ধরি। কখনো পথে জাতীয় পাখির দেখা মেলে, কখনোবা জাতীয় গ্রন্থাগারের—ত্রিচক্রযান চালকের ইচ্ছে মতন।

দোয়েলের দেখা পেলে টেরাকোটা, চুড়ি আর টবের সযত্ন বৃক্ষ-গুল্ম সম্ভার দেখি, আর পুস্তকালয়ের সামনে দিয়ে এলে স্বাস্থ্যসেবা, প্রজাপতির পক্ষ মিলনের ফুলেল আয়োজন আর রহস্যে ঘেরা উদ্যান আর শৈশব ছোঁয়া স্থির রূপকথা। দু’টোই সমান আনন্দ দেয়। বিশেষতঃ যেহেতু জানা থাকে, আমার সাপ্তাহিক একবেলা ভাতের বরাদ্দ আর উইকেন্ড-স্পেশাল মেন্যু নিয়ে আম্মু তৈরি হচ্ছে।
ফিরতি পথেই দেখি, দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হচ্ছে প্রায়, সব বয়সী মানুষেরা প্রার্থনার পোশাক পরে রওনা হয়েছেন—বাবার সাথে ছেলে, ভাইয়ের সঙ্গে ভাই, বন্ধু আর প্রতিবেশীরা এক সাথে। আমাদের অধুনা আগ্রহের ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে এই সামাজিক ধর্মপ্রাণতার মাঝে কোথায় যেন একটা সত্যিকার সাম্য আর শান্তির সুর লুকিয়ে থাকে। খুব ভালো লাগে দেখতে।

বাড়ি ফিরে “একদিনের সুন্দরী” হয়ে যাবার ব্যর্থ প্রচেষ্টার শেষে পারিবারিক ভুঁরিভোজের পর ভাতঘুমের আয়েস না কাটতেই ছুট, বিকেল আর সন্ধ্যের সাংস্কৃতিক সম্মেলনে। আগে প্রায়ই আম্মু সাথে যেতেন, এখন জীবন মানেই যে চ্যানেল আর তার সহোদর আব্বু-আম্মুর দাম্পত্য রোমান্স বলে আর আম্মুকে নিয়ে একলা বেরোবার মত স্বার্থপর হইনা।

শিল্পকলায় পৌঁছতে দেরি হয়ে গেলে শুধু নাটকটাই দেখি—জাতীয় নাট্যশালায় বড় অনুষ্ঠান থাকলে কখনো পরীক্ষণ হলের উদ্বোধনী শো, কখনো সিঁড়ির সম্মিলিত সংষ্কৃতি কর্মীদের পরিবেশনা। আবার কখনো শুধুমাত্র নাটকের বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর চা।

পাবলিক লাইব্রেরি বা জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠান থাকলে অবশ্য আজিজে ঢুঁ মারবার সুযোগ হয়। আমার যে মেয়েটা হয়তো কখনো হবেনা, তার জন্যে বই কিনি, নিজের জন্যেও । ফিরতে দেরি হয়ে যায় মাঝে মাঝে, আর হলে ওদের দেখতে পাই । সাজ শেষ প্রায়, ঝাঁপ খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—পর্দা গোছানো, বাচ্চাগুলো বাবাদের সাথে বিদায় নিচ্ছে। সকালবেলায় হাঁটতে বেড়িয়ে ফিরবার পথে যে সুখী যৌথ পরিবারকে এক সাথে প্রাতঃরাশ করতে দেখেছি, তাদেরও দেখতে পাই। এটা বাড়ির ম্যাট্রিয়ার্কদের ওয়ার্কিং আওয়ার—বেশ তাড়া সবার মাঝে।

আমার মেয়েটার যে জমজ ভাইটা হবে, তার জন্যে নজরুল পড়া বাধ্যতামূলক। যে জীবন আমার দেখতে আর দেখাতে তিন দশক লেগে গেল, আমি চাই ওরা দু’জনেই তা শুরু থেকে দেখুক।

আলমারি ভরা যে সার্টিফিকেট আর এক্সিলেন্স রিপোর্ট আর মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত এ-দেয়াল ও-দেয়াল জোড়া যে বইয়ের শেলফ আমায় হিসেব মেলাতে শেখালো না, সেটা ওদের আকাশ বড় রেখেই মাটির গন্ধ নিতে শেখাক।

”আপোস করতে শিখতে হবেনা, আত্মরক্ষা করতে শিখুক।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে