আপনি আছেন

গল্প: ভ্রূণ

18011028_352475978480722_3124517869781668533_n
নাঈমা পারভীন অনামিকা

বাথরুম থেকে বের হয়ে শওকত হতভম্ব। মিলি চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে।
” এই মিলি কি হয়েছে?”
মিলির দৃস্টি অনুসরণ করল সে। উহ!! তেলাপোকা দেখে এত ভয় পাওয়ার কি আছে বুঝলাম না!! শওকত স্যান্ডেল দিয়ে তেলাপোকা টাকে মেরে ফেলল। ” দেখ চ্যাপটা হয়ে গেছে, এইবার তো নামো!! ”
মিলি চেয়ার থেকে নেমে রান্নাঘরের দিকে দৌড় দিল।
বমি করার আওয়াজ পেল শওকত। এইবার সত্যি ই সে বিরক্ত হল।
“আরে বমি করতেছ কেন? তোমারে নিয়া তো দেখি মহামুশকিল।”
” তুমি তেলাপোকা টা মারলে কেন? কি কুৎসিত! পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে লেপ্টে গেছে মেঝেতে। এগুলা কে পরিষ্কার করবে? বুয়া আসবে সেই ন’টায়। আর আমি যতবার দেখব ততবার গা গুলোবে।”

“আচ্ছা আমি পেপার দিয়ে ঢেকে দেই, দেখবাও না, গা ও গুলোবে না। হইছে এখন ?
” এখন তুমি আমাকে বল – এই অবস্থায় তুমি চেয়ারের উপর দাঁড়ালে কেন ? পড়ে গেলে কি হত।? তোমাকে না বলছি সবসময় সাবধানে চলাফেরা করবা? তোমাকে নিয়ে অফিসে বসেও সারাক্ষণ আমার টেনশন করতে হয়, এত যন্ত্রণা কেন কর মিলি ?

মিলি হেসে ফেলল, ” এমন ভাবে শাসন করতেছ যেন আমি বাচ্চা। শোন, ছোটবেলা থেকেই আমি তেলাপোকা প্রচণ্ড ভয় পাই, দেখলেই মনে হয় বাথরুম থেকে উঠে আসছে, এখুনি গায়ে হেটে উঠবে। রাগ করোনা প্লিজ!! এসো নাশতা দেই তোমাকে। “

” শোন, সিঁড়ি বেয়ে অযথা ছাদে উঠবেনা, বাথরুমে সাবধানে যাবে, নীচে নামবেনা, কিছু লাগলে বুয়াকে দিয়ে আনিয়ে নেবে, দুপুরে খাওয়ার পর টিভি দেখবেনা, শুয়ে রেস্ট নেবে।”
মিলি গালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল।
” এই মিলি, কি বলি শুনতেছ ? ”
মিলি চোখ খুলল ” প্রতিদিন একই কথা বল, তোমার বিরক্ত লাগেনা? ” মুখস্থ হয়ে গেছে, শুনবা?”
শওকত হাসল ” আচ্ছা আর বলব না।”
দরজায় দাঁড়িয়ে শওকত মিলির কপালে চুমু দিল, “আসি আমি।”

“এই মিলি এদিকে এসো না”। দক্ষিণ দিকের ফ্লাটের খালাম্মা দাঁড়িয়ে আছেন।
এসো ভেতরে এসো “।
ঘরটা বেশ গোছান, পরিপাটি। বসার ঘরে অনেক বড় একটা শেলফ। শেলফ ভরতি শুধু বই। আরও একবার মিলি এসেছে এ ঘরে।
একটা প্লেটে পিঠা নিয়ে এলেন নাদিরা আহমেদ। ” খাও আমার মেয়ে পাঠিয়েছে। ”
“খালাম্মা, এত বই কার?”
নাদিরা হাসলেন “আমার। আমি অনেক বই পড়ি। এখন তো একাই থাকি, বই পড়ে সময় কাটাই। ভাল লাগেনা একা একা।”
মিলি হেটেহেটে বই গুলো দেখল। বেশীর ভাগই সাইক্লোজিক্যাল বই।বিদেশী রাইটারের। ” এসব বই আপনি পড়েন? ভালো লাগে?”
” হ্যা লাগে, আমার শখ এটা।”
” মানে? ঠিক বুঝলাম না।”
নাদিরা আহমেদ হেসে বললেন ” আচ্ছা বুঝিয়ে বলব পড়ে। এখন পিঠা খাও। একটা কথা বলব, কিছু মনে করবে না তো! তোমার স্বামী অফিস যাবার সময় তোমার কাছ থেকে বিদায় নেবার দৃশ্যটা আমি প্রায়ই দেখে ফেলি। লজ্জা পেলে??
মিলি চোখমুখ লাল করে ফেলল।
“এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? লজ্জা পাবার কিছু নেই। আমি তোমাকে অনেক পছন্দ করি মিলি।এটার অবশ্য একটা লজিক্যাল কারন আছে। আমার ছোট মেয়েটা দেখতে কিছুটা তোমার মত।ও কানাডায় থাকে। তুমি কি প্রেগন্যান্ট মিলি?
মিলি অবাক হল “কি করে বুঝলেন? ”
নাদিরা হাসলেন ” আন্দাজ করলাম আরকি। বয়স হয়েছে না!! ক’ মাস চলছে ?
“দুমাস। খালাম্মা, আজ আসি। বুয়া চলে আসবে আবার।”
“আচ্ছা আবার এসো মিলি।”

দুপুরে রোদের তেজ বাড়ল।এত গরম পড়েছে। মিলি রান্না শেষ করে গোসল করতে ঢুকল। ঘামে ভিজে অস্থির সে। শাওয়ার ছেড়ে নীচে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল কতক্ষণ। আহ! এত শান্তি লাগছে!!! হঠ্যাৎ তার মনে হল খুব কাছাকাছি একটা বাচ্চা কাঁদছে। সে চট করে চোখ খুলল।শাওয়ার টা বন্ধ করে শুনতে চেষ্টা করল। বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কোথাথেকে আসবে। এই ফ্লোরে কার ও ছোট বাচ্চা নেই।অবাক কান্ড!! সে স্পষ্ট শুনল।
দুপুরে খাবার খেয়ে সে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করল। বাচ্চার কান্নার বিষয় টা মাথার মধ্যে আটকে আছে।কিছুতেই সরাতে পারছেনা।
ফোনের শব্দে চমকে উঠল সে।রিসিভার তুলেই শওকতের আওয়াজ পেল ” কি ব্যাপার মিলি? ফোন ধরোনা কেন? মোবাইলে কত গুলা মিস কল, যাও দেখ!! শান্তিমত অফিস ও করতে দিবানা নাকি?কই ছিলা এতক্ষণ তুমি? এত কেয়ারলেস হলে কেমনে চলবে?

মিলি হাসল, “লাঞ্চ করছ তুমি, কি খেলে লাঞ্চে??

“ফাজলামি কর? দাড়াও, আম্মাকে ফোন দিতেছি এক্ষুনি।তার মেয়েকে তিনি বোঝাক। আমি ফেড-আপ। বিরক্তের একটা সীমা থাকে ,তুমি সব সীমা পার করছ।

“চিল্লানি বন্ধ করবা? আচ্ছা ভুল হইছে, আর হবেনা। তুমি কখন আসবা?”

“জানিনা, কাজ করতেছি, বিকেলে মিটিং আছে।খট করে ফোন টা নামিয়ে রাখল শওকত। ৬ টা নাগাদ অফিস থেকে বের হল সে।মন টা খারাপ লাগছে মিলির জন্য। ফোন টা ওভাবে রেখে দেয়া ঠিক হয়নি। বাসার ডোরবেলে হাত রাখতেই দরজা খুলে গেল।

মিলি হাসছে ” আজকেও পারলেনা বেল বাজাতে।”

এইটা মিলির একটা ছেলেমানুষি। প্রতিদিন শওকত বেল বাজানোর আগেই সে দরজা খুলে ফেলে।ব্যাপার টা অবশ্য কঠিন কিছু নয়।সামনের বারান্দায় দাঁড়ালে শওকতের গাড়ী দেখা যায়, সিঁড়ি থেকে কেউ উঠলে আওয়াজ পাওয়া যায়, আইহোল দিয়ে তাকালে পুরো ব্যাপার টা করা খুব সহজ। তারপর ও শওকত প্রতিদিনের এই ব্যাপারটায় খুব আনন্দ পায়,কারন পুরো কর্মকাণ্ড টাই ঘটে তার জন্য অপেক্ষা করে।

শওকত গোসল সেরে রান্নাঘরে ঢুকল। ” এই মিলি রাগ করছ? খুব টেনশন করছি জানো? তোমার একটা বাজে অভ্যাস, ফোন দিলে ফোন ধরো না।”

“আবার শুরু করলা তুমি? এখন কিন্তু সত্যি ই রাগ করব!

“তুমি এত লক্ষ্মী ক্যান, কওতো মিলি!!”

“একদম ঢং করবানা! আর এইরকম ক্ষ্যাতমার্কা কথা কই শিখছ তুমি!! বাংলা সিনেমার মত?

হাসল শওকত। মিলির সাথে তার বিয়ে হয়েছে প্রায় দুবছর। পুরাই পাত্রী দেখে বিয়ে। মিলিকে দেখে প্রথম মনে হয়েছিল খুবই শান্ত, ধীর-স্থির, লাজুক। বিয়ের রাতে সে ঘরে ঢুকতেই মিলি অদ্ভুত কান্ড করল। খাট থেকে নেমে পা ছুঁয়ে সালাম করল শওকতকে।তারপর বলল– “শোনেন, এই ছালার বস্তা আমি আর গায়ে রাখতে পারছিনা, এই গয়নাগুলোর ওজন কয়েক কেজি হবে, পার্লার থেকে যে মেকআপ দিয়েছে তা তুলতে বাথরুমের হারপিক লাগবে। আমি আর কতক্ষণ এভাবে থাকলে সত্যি মারা যাবো। আপনি আমাকে প্লিজ একটু সাহায্য করেন। আমার ট্রলি ব্যাগ টা একটু এনে দিন।”

শওকত পুরা হকচকিয়ে গেল।সে মিলির দিকে তাকিয়ে রইল কতক্ষণ, তারপর নীচে গিয়ে ট্রলি নিয়ে আসল।

কাপড় পাল্টে, হাতমুখ ধুয়ে সে শওকত কে বলল ” আপনার কাছে প্যারাসিটামল জাতীয় কোন ওষুধ আছে?
শওকত চিন্তিত হল, ওষুধ তো নেই। এতরাতে দোকান ও নিশ্চই বন্ধ!!
“তাহলে আর কি করা, চলেন শুয়ে পড়ি।
শওকত বিছানায় শুয়ে মিলির হাত ধরতেই মিলি শব্দ করে হেসে উঠল। শওকত খুবই অপ্রস্তুত হয়ে হাত সরিয়ে নিল।
” আপনাকে একটা অনুরোধ করব? আমার কপালে একটু হাত রাখবেন, সত্যি ই মাথা টা অনেক ব্যাথা করছে।”

শওকত মিলির মাথায় হাত রাখল। সেইরাতে ২৩ বছরের এই তরুণীর গভীর প্রেমে পড়ল শওকত।

“চা নাও”, ভিজে তোয়ালে আবার বালিশের উপর রাখছ তুমি? একদম দাত বের করবানা, ” গাইয়াভুত!”

শওকত চায়ে চুমুক দিল, ” এই নাম টা আমার অনেক পছন্দ হইছে!! গতকাল যেন কি ডাকছিলে? “

“ভাদাইম্যা” বলেই মিলি খিলখিল করে হাসতে লাগল। এই শোন, আজ দুপুরে কি হইছে জানো? আমি বাথরুমে গোসল করতেছি, হঠ্যাত শুনি একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ, একবারইই শুনলাম। একদম স্পষ্ট শুনেছি।

শওকত পুরা ঘর কাপিয়ে হাসতে লাগল।
মিলি এইবার সত্যি রাগ করল- ” হাসতেছ ক্যান তুমি?”

শওকত হাসি থামানোর চেষ্টা করছে, পারছেনা। হাসির দমকে কেপে উঠছে বারবার। “দেখি এদিকে এস”। হাত ধরে মিলিকে বসাল সে। তারপর পেটের উপর একটা হাত রাখল, ” এইটা গাইয়া ভুতের বাচ্চা বুঝছ , পাওয়ার দেখছ? দুই মাসেই কান্দে!! “

“তুমি ফাজলামি করতেছো? আমি সত্যি কান্না শুনেছি, বিশ্বাস কর!!”

” শোন মিলি, তুমি সারাদিন বাসায় একাএকা থাক। সারাদিন বাবুটারে নিয়া ভাব।তাই তোমার এরকম হয়েছে।আর কিছুনা। কয়দিন পরে শুনবা সে তোমারে আম্মি আম্মি বলে ডাকতেছে, বুঝছ?? বলেই আবার হাসতে লাগল শওকত।”

মিলি দীর্ঘ শ্বাস ফেলল – “আচ্ছা বাদ দাও।”

রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে শওকত টিভি অন করল।মিলি কাজকর্ম সেরে এসে দেখল শওকত বসে বসে ঘুমোচ্ছে। এত মায়া লাগল তার!! বেচারা সারাদিন পরে কত ক্লান্ত!!

সকাল বেলা শওকত অফিস চলে যাবার কিছুক্ষণ পরই মিলির মা ফরিদা বেগম এলেন একগাদা জিনিসপত্র নিয়ে। এসেই শুরু করলেন তিনি— ” মিলু বাসাটারে কি বানিয়ে রাখছিস!! তোর বুয়া টা তো দেখি মহা ফাঁকিবাজ। আমি শিউলি রে নিয়ে আসছি, ও সমস্ত ঘর পরিষ্কার করবে, তারপর স্যাভলন দিয়ে মুছবে। রান্না বন্ধ আজকে। আমি মোরগ পোলাও নিয়া আসছি।

“কিন্তু আম্মা আমি স্যাভলনের গন্ধ সহ্য করতে পারিনা। স্যাভলন দিওনা প্লিজ!! আর তুমি এসেই কি শুরু করলা? আমার কাছে একটু বসো না!!

“না মিলু, আমি কাজ শেষ করে চলে যাব,বাসায় তোর বাবা আছেন।”
ফরিদা বেগম চলে গেলেন বেলা ১ টার দিকে। যতক্ষণ ছিলেন বকবক করে মাথা ধরিয়ে দিলেন মিলির। “তোমার বুড়া বাপ টা জীবনে শান্তি দিলনা। সারাটা জীবন জ্বালাইয়া কলজে টা তিতা বানাই দিল!!

“আম্মা কলজে জ্বলে তো ছাই হবার কথা, তোমার টা তিতা কেমনে হইল?”

“মশকরা করো মায়ের সাথে? ফাজিল মেয়ে!! শওকত ভাল ছেলে, হইত তোমার বাপের মত, বুঝতা তাহলে। তুমি হাসতেছ কেন মিলি? আমি কি তোমারে জোকস্ শুনাইতেছি?

“জ্বীনা আম্মা, কঠিন কথা বলতেছ।আর হাসবনা। সরি..। বেশী রেগে গেলে ফরিদা মিলিকে তুমি করে বলেন, জানে মিলি।
বাবার জন্য খুব মায়া লাগল মিলির। সারাটা জীবন আম্মার খচখচানি সহ্য করে গেল।

দুপুর দুইটার দিকে মিলি গোসল সেরে নিল।খেয়েদেয়ে হাত ধুতে গিয়ে শুনল বাথরুমের কল থেকে পানি পড়ছে। ভাল করে বন্ধ করা হয়নি।সে বাথরুমের কল বন্ধ করল।বের হতে গিয়েই চমকে পেছন ফিরল সে- কমোডের মধ্যে থেকে অদ্ভুত আওয়াজ আসছে। সে উঁকি দিল, কিছুই দেখতে পেল না। সম্ভাবত সেনিটেরী লাইনে কেউ কাজ করছে।শব্দ রিফ্লেক্ট হয়ে এ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। সে ফ্লাশ করল।আর ঠিক তখনই সে দেখতে পেল ফ্লাশ করা পানির উপর ছোট্ট দুইটা হাত ভেসে উঠেছে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার দিল মিলি।

শওকতের বিদেশী ক্লায়েন্ট দের সাথে আজ মিটিং চলছে।কোনভাবেই সে মনযোগ দিতে পারছেনা। লাঞ্চ আওয়ারে মিলিকে অন্তত ১০ বার ফোন দিয়েছে সে। রিসিভ করেনি। এত রাগ লাগছে।কাল কত করে বোঝাল, কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই মেয়েটার। মিটিং শেষ হল বিকেল ৫ টায়। শওকত আবার ফোনে ট্রাই করল। এবার সত্যি ই সে চিন্তিত হল। ২০ মিনিটের মাথায় সে অফিস থেকে বের হল। বাসায় ক্রমাগত বেল দিয়ে যাচ্ছে, হাত পা কাঁপছে তার। অফিস ব্যাগে একটা চাবি আছে এই দরজার। অতিরিক্ত টেনশনে ভুলেই গিয়েছিল সে কথা। চাবি দিয়ে লক খুলে সে ঘরে ঢুকল। মিলির নাম। ধরে কয়েকবার ডাকল সে। কোন সাড়া নেই। বাথরুমের আধাখোলা দরজার দিকে চোখ পড়তেই সে মিলির পা দেখতে পেল।

চোখ খুলল মিলি। শওকত কে দেখতে পেল সে, চিন্তিত চোখে তাকিয়ে আছে। ফরিদা কাছে এলেন— ” এত করে বললাম এইসময় টা আমার কাছে থাকবি চল, শুনলিনা। ডাক্তার বলছে শরীরে রক্ত শুন্যতা আছে, আর এই সময় টায় এমন হবেই।তুই জেদ করিস না, আমার সাথে চল।”
মিলি শওকতের দিকে তাকাল, তারপর মাকে বলল– “আমি বাসায়ই থাকব আম্মা, তুমি বরং শিউলি কে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও কিছু দিনের জন্য।”
ফরিদা হতাশ চোখে শওকতের দিকে তাকাল, ” আচ্ছা আম্মা আমি বোঝাব ও’কে।এখন চলেন বাসায় যাই।”

” বোঝানোর কি আছে? আমি কি বাচ্চা নাকি!! বললাম তো শিউলি থাকবে আমার কাছে। চল বাসায় যাই।মিলি কঠিন গলায় বলল।”

মিলি বেশ চুপচাপ থাকে ইদানীং। আগের সেই উচ্ছলতা নেই। সেদিন দরজা খুলে দিল শিউলি। ঘরে ঢুকে শওকত দেখল মিলি দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়।ডাক দিতেই চমকে উঠল।গত পড়শু রাতে হঠ্যাৎ ঘুম ভেংগে দেখল মিলি বিছানায় নেই।বাথরুমে আলো জ্বলছে কিন্তু সাড়াশব্দ নেই। সে বাথরুমের দরজায় হাত রাখতেই খুলে গেল, দেখল মিলি দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। শওকত অবাক হল, এখানে কি করছ মিলি, দাঁড়িয়ে আছ কেন? ” মিলি জবাব দিলনা, চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। ভয়াবহ দুশ্চিন্তায় পড়ল শওকত। চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে মিলির। শুকিয়ে যাচ্ছে দিনদিন। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় টা গতকাল রাতে টের পেল সে। মিলি একাএকা কথা বলে।

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বিকেলে মিলিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল শওকত। মিলিকে চেক আপ করে ডাক্তার বললেন— ” সব কিছু তো নরমাল আছে, শুধু রাতে বোধহয় ঘুম কম হয়। আমি একটা ঘুমের ওষুধ লিখে দিচ্ছি, রাতে খাবেন কেমন!! ” মিলি শান্ত মেয়ের মত মাথা কাত করল।

বাসায় ফিরতে ফিরতে শওকত কত গল্প করল, মিলি হু, হ্যা ছাড়া একটা কথাও বলল না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নাদিরা আহমেদের সাথে দেখা। ” মিলি ভাল আছ?”
মিলি হাসল, ” হ্যা ভাল। আপনি ভাল আছেন?বাসায় তো এলেন না খালাম্মা, আপনার মেয়েরা ভাল আছে?”

নাদিরা আহমেদ তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। ” হুম, ভাল আছে সবাই।”

সকালবেলা শওকত অফিসে যাবার জন্য তৈরী হল। মিলি আজ অনেকটা ভাল।কাল রাতে ঘুমিয়েছে।অফিসে যাবার সময় দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল শওকত কে। দরজা বন্ধ করে মিলি রান্নাঘরে এল।শিউলি কে সব বুঝিয়ে দিয়ে বসার ঘরে পা দিতেই ডোরবেল বাজল। কপালে ভাজ পড়ল তার। এইসময় কে এল??
নাদিরা আহমেদ দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়——- “কেমন আছো মিলি?”
“জ্বী ভাল খালাম্মা, আসেন। চলেন আমার শোবার ঘরে বসবেন, চা দিতে বলি?”
“তুমি একদম ব্যস্ত হয়োনা, আমি দেখতে এসেছি তোমাকে।” খাটে বসলেন নাদিরা। ” তোমার শোবার ঘরটা অনেক সুন্দর, এসো আমার কাছে বস।নাদিরা হাত ধরলেন মিলির। ‘”তোমার কি হয়েছে মিলি? কি ভয়ংকর চেহারা হয়েছে তোমার, চোখের নীচ কালো, সারা মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ!!!”
মিলি হাসল- ” কিছু হয়নি, ভাল আছিতো!! “

“শোন, ২৬ বছর আমি ডাক্তারি পেশায় ছিলাম। গাইনী এন্ড অবস্ এ। দীর্ঘ সময় কেটেছে প্রেগন্যান্ট মায়েদের সাথে। আমার স্বামী ছিলেন নাম করা সায়ক্রিয়াটিস্ট, বখতিয়ার আহমেদ। সবাই এক নামে চিনত। যে বই গুলী তুমি দেখেছ , ওগুলো তারই বই। তাকে দেখতাম কোন কোন পেশেন্টের কেসস্ট্যাডি নিয়ে রাতের পর রাত ভাবতেন।মাঝেমাঝে আমার সাথেও অলোচনা করতেন। আমি বেশ মজা পেতাম।সেই ভালোলাগা নিয়ে আমি এই বইগুলো পড়তে শুরু করি।একসময় নেশা ধরে যায়। প্রতিটা বই আমার একাধিক বার পড়া।তাই মানুষের মনজগত সম্পরকে খুব বেশী না হলেও কিছুটা ধারনা করতে পারি। এখন কি বলবে? কি হয়েছে তোমার? তুমি সেই আগের মিলি নেই।”

মিলি চুপ করে রইল অনেক্ষন। ” খালু এখন কোথায়? আর আপনার বড় মেয়ে?
“তিনি মারা গেছেন ৬ বছর হল। বড়মেয়েটা ডাক্তার। আসে মাঝেমধ্যে। পরিচয় করিয়ে দেব একদিন। এই ফ্লাটে আমি এসেছি ৫ বছর। আমার স্বামী কিনেছিলেন এটা। আচ্ছা আমি আসি মিলি, ভাল থেক।”

মিলি উঠে দাড়াল, জড়িয়ে ধরল নাদিরাকে– ” খালাম্মা আমি ভয়ংকর সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কাউকে বলতে পারছিনা। কারন কেউ বিশ্বাস করবেনা। আমি সারাক্ষণ একটা বাচ্চার কান্না শুনি। বাচ্চাটাকে দেখিও।

“কোথায় দেখ এই ঘরে?”
“না, মিলি মাথা নিচু করে রইল।
“তাহলে কই দেখ? নাদিরার চোখে বিস্ময়!!! ”
“বাথরুমে, কমোডের মধ্যে।পুরা দেখিনা, শুধু হাত দুইটা দেখতে পাই।সে হাত দুইটা বাড়িয়ে কমোডের ভেতর থেকে উঠতে চায়।”
“শুধু বাথরুমে গেলেই দেখতে পাও? আর কোথাও না?”
“না, শুধু বাথরুমে।”
“তোমার স্বামী কে বলনি কেন? ভাল সায়ক্রিয়াটিস্ট এর সাথে কথা বলতে পারত।”
“যেদিন আমি প্রথম কান্না শুনলাম,ওকে বলেছিলাম। ও’ ঠাট্টা করে বলে আমি সারাদিন আমার বেবিটার কথা চিন্তা করি বলে এমন হচ্ছে।”
“বাচ্চাটা কি খুব ছোট, মানে হাত দেখে কি মনে হয়েছে তোমার?”
“হ্যা, একদম new born বেবিদের হাতের মত।”

নাদিরা আহমেদ উঠে দাঁড়ালেন। ” দেখ মিলি বাচ্চাটা যদি তুমি ঘরে দেখতে তাহলে চিন্তার বিষয় ছিলনা।এমন হয় অনেক মায়েদের ক্ষেত্রে, প্রথম মা হওয়াটা অনেককে এত বেশী প্রভাবিত করে যে তারা অনাগত সন্তান কে চোখের সামনে দেখতে পান।কিন্তু আমি বুঝতে পারছিনা তুমি কেন কমোডের মধ্যেই বাচ্চাটাকে দেখতে পাচ্ছ, তাও আবার পুরো নয়, শুধু হাত দুটো। আচ্ছা আমি এখন যাচ্ছি, ইন্সুলিন নিতে হবে আমাকে।আবার আসব আমি।আর তুমি বাথরুমে গেলে দরজা বন্ধ করবেনা, কেমন!! অত্যন্ত চিন্তিত ভাবে নাদিরা পা বাড়ালেন।

দুদিন কাটল মিলির চরম ব্যস্ততায়। শওকতের অফিস থেকে পিকনিকে গিয়েছিল তারা। ফিরে এসে প্রচণ্ড টায়ার্ড হয়ে পড়ল সে। লম্বা একটা ঘুম দিয়ে বিকেলের দিকে অনেক টা সুস্থ বোধ করল সে। নাদিরা আহমেদের দরজার সামনে মিলি। ডোর বেলে হাত রাখল সে।

“এসো মিলি, আমি সকালে গিয়েছিলাম, শিউলি বলল তুমি ঘুমোচ্ছ।তাই চলে এলাম। তার পর, কেমন আছ তুমি?
” এইতো ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে আপনার কাছে এলাম।”
” এখন ও দেখেছ বাচ্চাটার হাত?”
মিলি উদাস চোখে তাকাল ” হ্যা, দেখেছি।”

“শোন মিলি, আমি আমার হাসবেন্ডের মত জ্ঞানী নই। শখ থেকে যেটুকু শেখা, আর তার কাছ থেকে যেটুকু জানা। তাই তুমি যদি আমাকে সাহায্য না কর,আমি তোমাকে সন্তোষজনক কোন ব্যাখ্যা দিতে পারবোনা।

“আমি সাহায্য করব, আপনি বলেন। “

“তোমার স্বামীর সাথে বিয়ে হওয়ার আগে কি কারো সাথে তোমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল?”
” মিলি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ, “হ্যা ছিল।তখন আমি কেবল কলেজে ভরতি হয়েছি। আমাদের এলাকারই ছেলে, নাম সজল।

“গভীর সম্পর্ক? বুঝতে পারছতো কি বোঝাতে চাচ্ছি??”

“জ্বী, গভীর সম্পর্ক। ওর একটা বাইক ছিল।আমরা প্রায়ই অনেক দূরে ঘুরতে যেতাম। শহরের বাইরে ওর অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল। কার ও না কারো বাসায় চলে যেতাম।”

“তারপর? “

প্রায় বছর খানেক পর আমার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সিমা আমাকে বলল সজল ছেলেটা ভাল না। তুই খোজ খবর নিয়ে দেখ। আমি খোঁজখবর নিয়ে হতভম্ব। কিছুদিন আগে এই সিমার সাথেই ওর এফেয়ার ছিল। সিমা লজ্জায় বলেনি। পরে জানলাম এমন অজস্র ঘটনার নায়ক সে। আমি প্রচণ্ড ভাবে ভেংগে পড়লাম। সজল কে জিজ্ঞেস করলাম। সে নির্বিকার ভাবে স্বীকার করল সবকিছু। এমন ভাব করল যেন এটা কোন অপরাধ ই না। আমি খুব কান্নাকাটি করতাম সারাক্ষণ। আম্মা তখন বন্ধুর মত পাশে দাঁড়ালেন আমার। একটু ও বকলেন না। এর মাসখানে পরে আমি হঠ্যাৎ একদিন অজ্ঞান হয়ে গেলাম। আম্মা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার বললেন আমি ৪ মাসের অন্তঃস্বত্তা। শোনামাত্র আমি কাঁদতে লাগলাম। আম্মা আমাকে নিয়ে অনেক দূরে কবিরাজ টাইপের একটা লোকের সাথে দেখা করলেন। আমরা বাসায় ফিরলাম রাত ৯টায়।আম্মা আমাকে কতগুলো শেকড়বাকড় এর মত জিনিস খাইয়ে দিলেন। রাত দুটো র দিকে আমার প্রচণ্ড পেটব্যথা শুরু হল। আমি চিৎকার করছি, সহ্য করতে পাড়ছিলাম না।আম্মা আমাকে বাথরুমে নিয়ে গেলেন, চোখে মুখে, মাথায় পানি দিলেন।আমার প্রচণ্ড ব্লিডিং শুরু হল। আম্মা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন— ” কিচ্ছু হবেনা মিলু আমি আছি।”হঠ্যাৎ পেটের মধ্যে কিছু একটা দুমড়েমুচড়ে নীচের দিকে নেমে এল, তারপর প্রচণ্ড গতিতে শরীরের বাইরে বের হয়ে এল। আমি নীচু হয়ে দেখতে গেলাম, আম্মা ধমক দিলেন— “তাকাইওনা ওই দিকে।”

মিলি হাপাচ্ছে।

নাদিরা আহমেদ মিলির মাথায় হাত রাখলেন। ” তারপর নিশ্চই তোমার মা সেই অপরিণত বাচ্চাটাকে কমোডের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আর তুমি যখন তাকিয়ে ছিলে ছোট ছোট হাত পা গুলো দেখেছিলে। কারন ৪ মাসে বাচ্চার হাতপা তৈরী হয়ে যায়।
মিলি কাঁদছে, প্লিজ মিলি কেদোনা…….।

“শোন, সজলের এই ঘটনা টা একটা দুর্ঘটনা ছিল তোমার জীবনে। তুমি ভুলেও গিয়েছিলে প্রায় এই ঘটনা। তোমার সমস্ত জগত জুড়ে শওকতেরই অবস্থান। কিন্তু যখন তুমি কনসিভ করলে,সাথেসাথে তোমার সেই অপরিণত প্রথম বাচ্চার কথা মনে পড়ে। যাকে তুমি নির্মম ভাবে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছ। তুমি প্রচণ্ড অপরাধ বোধে আচ্ছন্ন হলে।যেহেতু তুমি বাচ্চাটার অপরিণত হাত পা দেখেছিলে, তো মার অবচেতন মন সেই স্মৃতি ধারন করে রেখেছে।আর তাকে ফেলে দেয়া হয়েছিল কমোডে, তাই তুমি শুধু কমোডের মধ্যেই তার হাতগুলো দেখতে পাও। তোমার মাতৃত্ববোধ এবং অপরাধবোধ তোমার মস্তিস্কে আর মনে প্রবল অস্থিরতা তৈরী করেছে, যেকারনে তুমি বাচ্চাটাকে দেখতে পাচ্ছো, আর কিছুই না।
আজ সকালে শিউলি বলছিল তুমি নাকি কতক্ষণ পরপর বাথরুমে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাক, কথা বল, কেন মিলি? তোমার কি মনেহয় বাচ্চাটা কখনো না কখনো উঠে আসবে?
এটা তোমার ভুল ধারনা মিলি। তুমি বাচ্চাটাকে ঠিক ততটুকু ই দেখবে,যতটুকু তোমার মস্তিষ্ক ধারন করে আছে। কখনওই তুমি তার বেশী দেখতে পারবেনা। কারন বাস্তবে তো এই বাচ্চার কোন অস্তিত্ব নেই।
“তুমি কি সেদিন বাচ্চাটার মুখ দেখেছিলে? “

মিলি মাথা নাড়ল, ” না দেখিনাই।আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে ওর মুখটা দেখতে কেমন ছিল, আমি ও’কে ডাকি, ওর কাছে ক্ষমা চাই, বলি— ” বাবুটারে মাফ করে দিস।” মিলি আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল।

নাদিরা জড়িয়ে ধরলেন মিলিকে। তার চোখ ও ভিজে উঠেছে। ‘” কেদ না মিলি, তুমি যদি একবার ভাবো, এমন একজনের ভ্রূণ তুমি ধারন করেছিলে, যে ছিল লম্পট, চরিত্রহীন। যে কখনো তোমাকে ভালই বাসেনি। আমার মনেহয় তুমি বাচ্চাটাকে আর দেখবেনা। কিন্তু আমি জানি তুমি তা করবেনা। তুমি বাচ্চাটাকে দেখার জন্য আবার ও বাথরুমে দাঁড়িয়ে থাকবে, ডাকবে তাকে। মাতৃত্ব বড় সাংঘাতিক জিনিস। “

নাদিরাকে পেছনে ফেলে মিলি ধীর পায়ে সামনে এগুলো। শওকত কে দেখতে পেল সে, হাতে অনেকগুলো গোলাপ তার।মিলির মনে পড়ল — আজ তাদের বিয়ের ২ বছর পূর্ণ হয়েছে, ভুলেই গিয়েছিল সে। মিলি সামনে এগুলো গভীর ভালবাসায় সে শওকত কে জড়িয়ে ধরল। শওকত কিছুটা অপ্রস্তুত আর লজ্জায় সংকুচিত কারন দক্ষিনের ফ্লাটের দরজায় ঠোটে স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নাদিরা আহমেদ।।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে