আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > আহসানুল কবির বরনের গল্প ‘কবি’

আহসানুল কবির বরনের গল্প ‘কবি’

আহসানুল কবির বরণ
আহসানুল কবির বরন

(‘কবি’ মূলত একটি অর্থহীন গল্প। ‘কবি’ কেবল তাদের কাছে অর্থবহ, যারা কবির মানসপটে কিছুটা হলেও নিজের চিন্তার ছায়া দেখতে পাবে, কবি আর নেফারতিতির কথোপকথনে যারা জীবনের কিছু অদৃশ্য অনুভূতির খোঁজ পাবে…)

“এই যে কবি, ভাল আছেন??”

“ভাল আছি নেফারতিতি!”

“আপনার পাশে বসতে পারি??”

“তোমার ইচ্ছে করলে অবশ্যই বসতে পারো নেফারতিতি।“ কবি একগাল হেসে বলে। “কিন্তু একটা কথা, আমি কিন্তু কবি নই! আমি কবিদের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত! তবে কবি হওয়ার প্রচেষ্টায় আছি।”

“ও আচ্ছা, তাই!! আপনিও তো আমার নাম ধরে না ডেকে নেফারতিতি ডাকেন!! কেন ডাকেন, সেটাও কখনো বলেন নি!”

“হুম! সবকিছু কি জানতেই হবে?”

“না, হবেনা। আচ্ছা, এই অসময়ে ফুটপাতে বসে আপনি কি করছেন??”

রাস্তার মানুষ দেখছি।

রাস্তার মানুষ দেখছেন??

হ্যাঁ, দেখছি!! একা একা রাস্তার এক কোনায় বসে রাস্তার মানুষ দেখার একটা আলাদা মজা আছে।

তো, কি কি দেখে মজা পাচ্ছেন??

“আসলে সবকিছুই যে মজার, তা না! দেখো, এই রাস্তাতেই একজন বাবা তার বাচ্চা ছেলেটাকে আইস্ক্রিম কিনে দিচ্ছেন, ছেলেটা কি মজা করেই না তা খাচ্ছে! আবার এই রাস্তাতেই একটা বাচ্চা মেয়ে অর্ধ-ছেড়া জামা গায়ে মলিন মুখে ফুল হাতে বসে আছে, কেউ তার কাছে ফুল কিনছেনা!! এই রাস্তাতেই এক জোড়া ছেলেমেয়ে গভীর ভালবাসায়, একে ওপরের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে! আবার এইখানেই একটা ছেলে উদাস হয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে, চোখে একরাশ হতাশা নিয়ে, শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! বুঝতে পেরেছ নেফারতিতি?? এই রাস্তাতেই তুমি ভালবাসা খুঁজে পাবে, একই সাথে ঘৃণা, দুঃখ, অভিমান, আনন্দ-উল্লাস সবই খুঁজে পাবে!! কি অসাধারন এই বাস্তবতা, তাইনা??”

নেফারতিতি কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে। “হ্যাঁ, অসাধারন। বুঝতে পারছি, আপনি এই রাস্তাতেই পুরো জীবনটাকে খুঁজে পাচ্ছেন।“

“এইতো ধরতে পেরেছ!” আবারো একগাল হাসে কবি।

“ইশ!! আমি যদি আপনার মত হতে পারতাম! কত সহজ আর সুন্দরভাবেই না আপনি জীবনটাকে নিয়েছেন!…”

“সহজ?? এই রাস্তার সবকিছুই কি তোমার কাছে সহজ আর সুন্দর মনে হচ্ছে??”

“না, তা না! কিন্তু আপনি আপনার জীবনকে খুঁজে পাচ্ছেন আপনার চারপাশের প্রত্যেকটা জিনিসের মাঝে, কোন না কোন জায়গায় আপনি ঠিক প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছেন! আপনাকে, নিজের জীবনের ক্ষুদ্র কোন দুর্বলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে কষ্ট পেতে হচ্ছেনা!” দীর্ঘশ্বাস ফেলে নেফারতিতি। “যাই হোক, চা খাবেন??”

“চা খাওয়ার মত টাকা এই মুহূর্তে পকেটে নেই!”

“টাকা পয়সা ছাড়াই রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন?? আপনার কি হিমু হওয়ারও ইচ্ছা??”

“নাহহ! হিমু মহাপুরুষ হতে চেয়েছিল! আমি সেটা চাইনা! মহাপুরুষ বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই! আমি শুধু কবি হতে চাই!”

“হুম! বুঝলাম! চলেন চা খাই! আমি খাওয়াব!”

চায়ের কাপে বিষণ্ণ মনে চুমুক দিতে থাকে নেফারতিতি!

“তোমার কি মন খারাপ, নেফারতিতি??”

“মন খারাপ হলে আপনি কি করবেন??”

“আপাতত দু-লাইন কবিতা শোনাতে পারি!”

“তাই?? ঠিক আছে শোনান!”

চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে কবি আকাশের দিকে তাকায়……

“তোমার চোখের জল, মুছে দেবে সেই জন

যে জন তোমায় বাসিবে ভাল

তোমার সুখের স্বপ্ন বাঁধিবে সে

তোমায় কভু ছেড়ে যাবে নাকো একলা ফেলে…”

“ধন্যবাদ কবি!! চট করেই তো কবিতা বানিয়ে ফেলতে পারেন!! অথচ নিজেকে কবি বলবেন না! এত ঢং কেন?? আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি??”

“কর।”

“আপনি কাউকে ভালবাসতে পারেন??”

“কেন পারবনা?? আমি কবিতা ভালবাসি! আমি রাস্তা ভালবাসি! আমি চায়ের কাপ ভালবাসি! আমি ভালবাসতে ভালবাসি!”

“আর?? কাউকে ভালবেসেছেন?? রাস্তার ওই ছেলেমেয়ে দুটির মত??”

“তুমি যদি প্রেমের কথা বলে থাকো, কবিদের জন্য এই প্রেমের প্রয়োজন নেই! কবিতা লেখার জন্য এই প্রেম ক্ষতিকর!!”

“মানে??”

“মানে, ধরো, আমি তোমাকে ভালবাসি। কবিতা সৃষ্টি করতে শব্দের দরকার হয়! তোমার চোখের অসম্ভব মায়াবী দৃষ্টি আমার মাথায় শব্দ সৃষ্টি করে! তোমার হাসির রিনরিন আওয়াজ সেই শব্দে সুর বসায়! কিন্তু এই ভালবাসা যখন ‘প্রেম’ নামক প্রাত্যহিক জীবনের একটা গৎবাঁধা ছকে বাঁধা পরে যাবে, দুজন দুজনার চাওয়া পাওয়ার হিসেব মেলাতে মেলাতে আমরা যখন ক্লান্ত হয়ে যাব, তখন আর ওই শব্দগুলোকে আমি খুঁজে পাব না নেফারতিতি!!”

কিছুক্ষণ অন্যদিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে নেফারতিতি । “আপনি যে আবার আমার মনটা খারাপ করে দিয়েছেন, সেটা জানেন??”

“মানুষের মন অত্যন্ত বিচিত্র জিনিস!! মানুষ নিজেই ঠিক করে জানেনা, কিসে তার মন ভাল কিংবা খারাপ হবে!! আমাকে এখন যেতে হবে, চা খাওয়ানোর জন্য ধন্যবাদ! ভাল থেকো নেফারতিতি!” আবারো একগাল হেসে নেফারতিতির জবাবের অপেক্ষা না করে মানুষের ভীরের মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকে কবি। কবির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নেফারতিতির খুব ইচ্ছা হয় কবিকে একবার ডাকতে, ডেকে বলতে…… নাহহ, কবিদের কখনো পিছু ডাকতে নেই, কবিদের তাদের মত করে থাকতে দিতে হয়!!……

সারাটা দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত নেফারতিতি কোন গন্তব্য ছাড়াই শহরের এদিক সেদিক ঘুরতে থাকে। বিকেল পর্যন্ত তার মন খারাপের পরিমান গানিতিক হারে বাড়তে বাড়তে সন্ধ্যার দিকে সেটা কমতে থাকল! সন্ধ্যার পর পুরো আকাশ জুড়ে ওঠা বিশাল চাঁদের দিকে নেফারতিতি এক ধরনের ঘোর নিয়ে তাকিয়ে থাকে। আচ্ছা, কবিও কি এখন তার মতই মুগ্ধ হয়ে আকাশ দেখছে?? হঠাৎ কবির মুখে শোনা দুটো লাইন মনে পড়ে যায় নেফারতিতির……

  “জীবন মানে শুধুই যদি প্রান রসায়ন

  জ্যোৎস্না রাতে মুগ্ধ কেন আমার নয়ন??”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে