আপনি আছেন

গল্প: লুজার

18268669_10155209750642208_7571491469066998758_n
মহসিনা আফরোজ ইলা

বাসে উঠেই রজব আলির মনটা ভাল হয়ে গেল। সুন্দরী মহিলার পাশের সিটটা খালি। বেশ আয়েশ করে মহিলার গা ঘেঁষে বসে পড়ল সে। ভদ্রমহিলা সরে গিয়ে জড়সড় হয়ে বসলেন। আড়চোখে রজব আলী একটু দেখে নেয়। নাহ, ঠিক মহিলা বলা যাবে না। মেয়েই হবে। কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। প্রতিবার বাসে চড়ার সময়ই রজব আলির টার্গেট থাকে কোন মেয়ে মানুষের পাশে বসা। অনেক রকম সুবিধা। দুইজনের আসনের প্রায় দেড়জনের জায়গা পাওয়া যায়। ইচ্ছা মত হাত পা ছড়িয়ে বসা যায়। আর বোনাস হিসেবে নরম শরীরের ছোঁয়া তো আছেই। মেয়ে দের নিয়ে রজব মিয়া যে খুব ভয়ংকর কোন ইচ্ছা পোষণ করে তা নয়। এটা কে তার নির্দোষ বিনোদনই মনে হয়। বাড়িতে তাড়কা রাক্ষসীর মত বউ। মুখে বসন্তের দাগ। নব্বই কেজি ওজনের থলথলে শরীর নিয়ে যখন বিছানায় এপাশ, ওপাশ করে রজব আলীর বুকটা কেঁপে ওঠে। এই বুঝি খাটটা ভেঙ্গে পড়ল। ভাঙলে ওর বাপই কিনে দেবে, এই নিশ্চয়তা নিয়ে আবার ঘুমিয়েও পড়ে সে। এমন কাউকে বিয়ে না করে উপায় ছিল না। জীবন জীবিকার সহজ ব্যবস্থা। শশুর অনেক টাকা যৌতুক দিয়েছিল। মেয়ের নামে জমি লিখে দিয়েছে। ঢাকা শহরে খেয়ে পরে থাকার জন্য ছোট একটা মুদি দোকানও করে দিয়েছে। পালা পার্বণে উপহার মন্দ আসে না। রজব আলী সুখী। কয়জনের কপালে এমন শশুর বাড়ি জোটে? তবে জীবনে সাধ আহ্লাদ বলেও একটা কথা আছে। সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল, শাবনুরের মত টুকটুকে একটা বউ হবে তার। কিন্তু সব কিছু তো আর পায় না মানুষ। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রজব আলী। মনের সেই অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণের জন্যই এই সল্প সময়ের সঙ্গী খোঁজা। সহযাত্রী বেশি সুন্দর হলে ভাড়াটাও দিয়ে দিতে চায় সে। এসব ক্ষেত্রে বেশির ভাগই চমকে উঠে না করে দেয়। সন্দেহের চোখে তাকায়। আবার কিছু ফটকা মেয়েও আছে। হাসিমুখে কথা বলে। বাস ভাড়া দিলে না করে না। যাওয়ার সময় বলে, আসি আঙ্কেল। সেদিন রজব আলির খুব মন খারাপ হয়। আঙ্কেল বলল! সে কি এতই বুড়ো হয়েছে? বাসায় গিয়ে মনোযোগ দিয়ে আয়নায় মুখ দেখে। চুলে যত্ন করে কলপ দেয়। বউ দেখে কিন্তু কিছু বলে না। জানে, মিনসের যাওয়ার জায়গা নাই। যতই রঙ ঢং করুক এখানেই থাকতে হবে। না হলে মুরোদ আছে নাকি নিজের যোগ্যতায় কিছু করে খাওয়ার? …
এই পর্যন্ত কম্পোজ করে নীরা থেমে গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে। লেখাটা এমন হবে শুরুতে ভাবেনি সে।
অফিস থেকে বাসায় আসার সহজ মাধ্যম, বাস। যদিও নামে সিটিং। কিন্তু অফিস ছুটির সময় স্টান্ডিং থেকে হ্যাঙ্গিং পর্যায়ে চলে যায় বাস গুলো। নীরার টার্গেট থাকে জানালার পাশে বসা এবং পাশে কোন মেয়ে সহযাত্রী পাওয়া। প্রায় লটারি পাওয়ার মত ব্যাপার, স্যাপার। প্রায় দিনই লাক ফেবার করে না। মাঝ বয়সই কোন বুড়ো হাবড়া বসে যায়। সহযাত্রী মেয়ে বলেই কি না হাত পা ছড়িয়ে প্রায় দুটো আসনেরই দখল নিয়ে নিতে চায় তারা। পুরো রাস্তা নিজেকে গুটিয়ে রাখতে রাখতে মাঝে মাঝে নীরার চোখে পানি চলে আসে। কি অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক এই পথযাত্রা! স্বভাবজাত ভদ্রতা ভুলে প্রায়ই ছোটখাট ঝগড়া করে ফেলে নীরা। বাসায় ফিরতে ফিরতে তিক্ততায় ছেয়ে যায় মন। ভাবছিল এই নিয়ে একটা ছোট গল্প লিখবে। যেখানে মেয়েদের অসহায় অবস্থাটাই বের হয়ে আসবে।
কিন্তু লিখতে গিয়ে একি! এখন তো পুরুষটার জন্যই করুণা হচ্ছে। অসহায়ত্বর সংজ্ঞা কে ভাল বলতে পারবে? রজব আলির পাশে জড়সড় হয়ে বসে থাকা নারী সহযাত্রীটা? যে কি না একটু পরেই নেমে যাবে? নাকি, খোদ রজব আলি? এই যে অসুস্থ আচরণ করা ভদ্রলোকেরা, তাদের জীবনও কি ঘুরপাক খায় রজব আলীর মত দমবন্ধ করা বাস্তবতায়? বাড়িতে অশান্তি? দুই পয়সা দাম নেই পরিবারে? এই সমাজে? অপরিচিত নারী খুব দুর্বল প্রতিপক্ষ মনে হয়? তাই ভেতরের অশান্তির কিছুটা তাদের মধ্যে স্থানান্তরের অপচেষ্টা?
পরদিন নীরা বাসে চড়ে। পাশে এসে বসে চল্লিশ উরধ পুরুষ। টের পায়, লোকটা খুব সন্তর্পণে ওর দিকে সরে আসছে। নীরা ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার গলায় বলে, কি আঙ্কেল সমস্যা কী? পাবলিক বাস কি বাসার ড্রয়িং রুম মনে হয়? অপ্রত্যাশিত আক্রমণে লোকটা থতমত খেয়ে যায়। তারপর হিংস্র চোখে তাকায়। হয়ত এখনই বলে বসবে, বাসে উঠেন ক্যান আপনারা? প্রাইভেট কারে চইড়া যান। বাসে উঠলে একটু ধাক্কাধাক্কি লাগবই। নীরা জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে হো হো করে হাসতে থাকে। এক রকম অসুস্থ আনন্দ হয় তার। লুজার শালারা!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে