আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

স্মৃতি ভদ্র

পর্ব ২
জলভরা কালো মেঘের পরত বাড়তে থাকে। একের পর এক মেঘ জমে আকাশটা যেন ঐ দূরের গ্রামের সবুজ গাছগুলোকে ছুঁয়ে দিয়েছে। আর সেদিকে তাকিয়েই দীপেন্দ্যু আবারো তাড়া দেয় করিম শেখ কে। কালো আকাশ আরোও কালো হয়। ক্ষেতের আইল বেয়ে করিম শেখ আর দীপেন্দ্যু বাড়ুজ্জে পা চালিয়ে এগোয়। ক্ষেত ছেড়ে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কাঁদা হয়ে থাকা রাস্তায় এসে ওঠে দু’জনে।

রাস্তার ঠিক এখান টায় একটা পাকুড় গাছ। গাছময় অসংখ্য ঝুড়ি জানান দেয় এর বয়স। বেশ পুরাতন এই পাকুড় গাছ। এই গ্রামের সাথে গাছটির সম্পর্ক বেশ অনেকদিনের। তা বেশ আগের কথা। তখন জমিদার বিনয় চট্টোপাধ্যায় সাতবাড়িয়াসহ আশেপাশের আরোও সাতটি গ্রামের খাজনা আদায় করতো। আর পাশের গ্রামের চাষিদের সাথে এই গ্রামের চাষিদের বচসা লেগে থাকতো জমির অধিকার নির্ণয় নিয়ে। তাই জমিদার বিনয় চট্টোপধ্যায় এই পাকুড় গাছ বুনে সীমানা নির্ধারণ করে দেন। পাকুড় গাছটির দক্ষিণ দিকে রামচন্দ্রপুর গ্রাম। আর উত্তরে সাতবাড়িয়া।

কদিন আগেও গাছভর্তি তামাটে কচি পাতা ছিল। কিন্তু বর্ষার জল পেয়ে পাতাগুলো খুব সবুজ হয়ে উঠেছে। দীপেন্দ্যু কয়েকটি পাকুড় পাতা ছিড়ে নেয়। এরমধ্যে দু’এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেছে।

হঠাৎ রামচন্দ্রপুরের দিক থেকে “বনে কানুর বাঁশি বাজিল” বোষ্টমী দি’র গান ভেসে আসে। একটি বড় কচুর পাতা মাথায় দিয়ে গাইতে গাইতে এই গ্রামের দিকেই আসছে। পাকুড় গাছের নিচে করিম শেখ আর দীপেন্দ্য বাড়ুজ্জে কে দেখে গান থামিয়ে বোষ্টমী দি বলে ওঠে,”এই বরষার দিনে অবেলা করে দাদাভায়েরা পাকুড় তলায় কেন? জানো নে বুঝি পাকুড় গাছে আঁধার নামলেই তেনাদের (ভুত) বাস! চলে আসো দেখি নি এই কচুর পাতার তলায়। মায়ের ছেলেদের মায়ের কাছে দিয়ে আসি।”

রাই বোষ্টমী সদা হাস্যময়ী এক রঙিন মানুষ। গান গেয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে মুষ্টি ( একসময় গৃহিনীরা রান্না চাল থেকে এক মুঠো চাল সরিয়ে রাখতো। এটা আসলে সে সময়ের সঞ্চয় প্রথা। প্রয়োজন হলে সেই সরিয়ে রাখা চাল ব্যবহার হতো। তবে বোষ্টমীদের ভিক্ষা দেওয়া ছিল, এই চালের প্রাত্যহিক ব্যবহার) ভিক্ষে করে। গেরস্থ বাড়ির বউগুলোর সাথে ভারি খাতির এই বোষ্টমী দি’র। কোন গ্রামে কি ঘটেছে, কোন বাড়ির বউ কাপড়ে ফুল তুলেছে, কার ডালের বড়ি ভালো ওঠে, কাদুন্দি কোন বাড়ির ভালো, কার ছেলের বউ সতীন কাঁটায় জ্বলছে তার সব খবর থাকে এই বোষ্টমী দি’র থলে তে। আর হ্যাঁ, সেই থলে থেকে মাঝে মাঝেই গজা, নাড়ু, ক্ষীরের তক্তিও বের হয় বাচ্চা ছেলেপুলের জন্য। তাই বোষ্টমী দি তাদেরও কম প্রিয় নয়।

বোষ্টমী দি’র সাথে করিম শেখ আর দীপেন্দ্যু বাড়ুজ্জে বাড়িতে পৌছে।

“করিম একটু সবুর কর এখানে। আমি তড়া করেই আসবো। ” দীপেন্দ্যু বলে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। আধভেজা হয়ে ফিরে আসে সেই পাকুড় পাতায় আমের আচার নিয়ে। করিম শেখের হাতে দিয়ে বলে,” মা তোকে দিতে বলেছিলো সেই পরশু। আমিই তা ভুলে বসে ছিলাম।”

“তা আমার বেলায় বুঝি বেড়ে ( এক সময় কোনো কিছু ফুড়িয়ে যাওয়া বলা কে অমঙ্গল ধরে উল্টো বেড়ে যাওয়া বলা হতো)গেলো আমের আচার দাদাভাই!” কৌতুক হাসি বোষ্টমীর গাল ছাড়িয়ে যায়।

” তা তুমি জেঠিমার কাছে চেয়েই দেখো না কেনো রাই দি” করিম শেখ বলে ওঠে।

” তা তো চাইবো, কিন্তু দুই সখার এই যে প্রাণের সুর তা জীবনভর একসুরে বাজবে তো দাদাভায়েরা!! জীবনের বাড়বাড়ন্তে আবার এই সুর বেসুরো হয়ে না পড়ে, তবে কিন্তু খুব মুশকিল হবে এই আমি বলে দিলাম!!” বলেই রাই বোষ্টমী হাঁটা শুরু করে।

” ও রাই দি, কোন দিকে চললে, বাড়ির ভিতরে গেলে না যে!” দীপেন্দ্যু গলা বাড়িয়ে বলে।

” আজ অদৃষ্টে এই গ্রামের অন্ন নেই গো দাদাভাই” তোড় বেড়ে যাওয়া বৃষ্টিতে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হতে থাকে রাই বোষ্টমী। [ক্রমশ]

ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে