আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > গল্প ‘শোধ’ (পর্ব-১৫)

গল্প ‘শোধ’ (পর্ব-১৫)

গল্প ‘শোধ’
লুনা নুসরাত

লুনা নুসরাত:

১৪ পর্বের পর…

I’m seeing the pain, seeing the pleasure
Nobody but you, ‘body but me
‘Body but us, bodies together
I love to hold you close, tonight and always
I love to wake up next to you
I love to hold you close, tonight and always
I love to wake up next to you.

গানের কথাগুলো যেমন রোমান্টিক রাতটাও ততটাই রোমান্টিক। পিছুটান হীন দুটো মানুষ, ফাস্ট রানিং কার সাথে বিধি নিষেধের অদৃশ্য সুতোর আ্যাবসেন্স, এ এক দুর্দান্ত লাইফ! হু নোজ হোয়াট নেক্সট! দে ডোন্ট ওয়ান্ট টু নো অর ইভেন থিংক। এই উদ্দামতা এই ছুটে চলা, বেপরোয়া জীবনেই এরা অভ্যস্ত। কেউ বলার নেই, কেউ বাঁধা দেবার নেই, আর অগাধ-অঢেল এ মানুষ হওয়া এই হায়ার সোসাইটির জেনারেশনের কাছে দিস ইজ লাইফ! লিভ-লাভ-লাফ-এনজয়!
রেস্ট অব দ্যা ওয়াল্ড ইজ মিনিংলেস, শ্যাবি।

ঘন্টা দুয়েকের ড্রাইভে চলে এসেছে শহর থেকে অনেকটা দুরে। অন্ধকার কালো রাতে হেডলাইটের আলোয় আলোকিত পিচ ঢালা মসৃন, শীতের আলসে সাপের মত পরে থাকা পথ আর মাথার ওপর বিছিয়ে থাকা নক্ষত্রের চাদর রাতের একাকীত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে আরো বেশী। দ্রুত গতিতে ছুটে চলা দু একটা নাইট কোচ আর ক্যারিয়িং ট্রাক ছাড়া পথটা মোটামুটি নির্জন। স্পীডের কাঁটা টা একশোর ঘর ছাড়াতে তাই বাঁধা মানেনি। চুপচাপ চালাচ্ছিল রাতুল, পাশে সিটে হেলান দিয়ে সামারা। শুধু গানের কথাগুলো ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়ির কাঁচ আটা বন্দী এখতিয়ার টুকুতে।

সামারার মনে কুটকুট করছে সকালবেলায় আসা জুলিয়ার ফোন টার কথা। বলবে কি বলবে না এ দুইয়ের দ্বন্দ্ব। এমন রাত, এই ছুটে চলা জুলিয়ার হিংসায় নষ্ট করা কি ঠিক হবে? উহু, সি শ্যুড টেক এ্যাডভান্টেজ অফ দিস নাইট এজ মাচ এজ সি ক্যান। রাতুল টা একটু অদ্ভুত আছে। সেধে নিয়ে এলো ড্রাইভে কিন্তু জার্নি স্টার্ট করার পর থেকে চুপচাপ। ওঠার পর পর যে কান্ড টা করল তাতে জার্নি টা কতটা এক্সাইমেন্টে ভরপুর হবে ভেবেই গা শিরশির করছিলো। অথচ দেখ, দু ঘন্টা পেরিয়ে গেল, তার মুখে কথাই নেই। নাকি সে আশা করে বসে আছে সামারাই আগে এ্যাক্টিভ হবে! হুম, রাতুলকে বাঁধতে হলে তার ভাব বুঝেই এগোতে হবে। অহেতুক তাড়াহুড়ায় হিতে বিপরীত হয়ে সব বরবাদ হতে পারে। তারচে অপেক্ষা করাই ভালো, দেখাই যাক না কতদূর যায় এভাবে। গানের বিটের সাথে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গুনগুন করে গলা মেলালো সামারা।

রাতুলের মনে চলছে অন্য খেলা। সামারার মনোভাব বুঝে নিতে তার সময় লাগেনি। লাগার কথাও না, এ খেলায় সে পুরনো প্লেয়ার। শুরুতেই তাড়াহুড়া করবে না, ধৈর্য নিয়ে সুতা ছাড়ো, খেলিয়ে প্রতিপক্ষকে উত্তেজিত কর তারপর আস্তে ধীরে সুতো গুটিয়ে ঘরে তুলে নাও পুরষ্কার। তবেই না খেলার মজা! ছিপ ফেললাম আর মাছ তুললাম, এতে কোন মজা আছে? অনেকেই হয়ত “ধর তক্তা মারো পেরেক” এ বিশ্বাসী। কিন্তু রাতুল জাত খেলোয়ার। রয়ে সয়ে খেলার ধৈর্য আর কৌশল তার জানা। ফলাফল যে ডিলিশিয়াস সেটাও কনফার্ম। তবে মাঝে মাঝে একটু টোকা দিতেও ভুল হয় না তার। পারফেক্ট টাইমিং তার। এই যেমন এখন, সামারা যে তাকে খুঁটিয়ে দেখছে এটা সে ওর দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারছে। বোর হয়ে যাবে মেয়েটা এভাবে আর কিছুক্ষণ চললে। কোথাও থামা দরকার।
সামনে একটা বাঁক পেরিয়ে হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট আছে একটা। ওটা পেরিয়ে একটু সামনে থামবে। আগে মেয়েটাকে একটু তাতানো যাক, পরে না হয় কফি খেতে ব্যাক করবে। মনে মনে প্ল্যানটা এঁটে নিয়ে স্পীড টা বাড়ালো রাতুল।

হঠাৎ করে স্পীড বাড়ায় সামারা চোখ মেলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। প্রশ্ন করতে চেয়েও চুপ করে গেল। কি হলো হঠাৎ? দেখাই যাক না! দু জনের মাঝে যেন এক খেলা চলছে নিঃশব্দে। চলতে থাক, কি হবে শেষে সময়ই বলে দেবে। চুপচাপ সামনের রাস্তায় তাকিয়ে রইলো দুচোখ মেলে। হেড লাইটের আলোয় শুধু পথের উপরটাই দেখা যায় আর দুপাশে গাঢ় অন্ধকার। হঠাৎ হঠাৎ দু একটা পোকা আছড়ে পড়ছে ফ্রন্ট গ্লাসে, বাতাসের তোড়ে সেকেন্ডের মাঝেই সরে যাচ্ছে। আচমকা মৃত্যু এসে নিয়ে যাচ্ছে ছোট প্রাণ গুলো। সেদিকে তাকিয়ে একটু গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো সামারার। হাত বাড়িয়ে এসি র নব টা একটু ঘুরিয়ে দিলো, শীত শীত লাগছে কেন?

রেস্টুরেন্ট টার সামনে দিয়ে আলোর চমক তুলে পার হয়ে গেল রাতুলের গাড়ি। নতুন কেনা গাড়িটা প্রায় নিঃশব্দে চলে। গতির কারনে শব্দ হয় পথের কাঁকড় আর পাথরের টুকরোর উপর টায়ারের সংঘর্ষে। একটু সামনে একটা বড় গাছের নীচে ব্রেক করে থামালো গাড়ি। সামারা তাকিয়ে রইলো ওর দিকে, এখনও নিশ্চুপ। আজ কি তবে নিঃশব্দে ই চলবে খেলা?

: সামারা, আর ইউ ফিলিং বোর?
: সার্টেনলি নট! কেন বলতো? গান বাজছে, তুমি আছ পাশে বোর হব কেন?
: গুড, না হলেই ভালো। আই এ্যাম এ বিট বোরিং পারসন, তুমিও হলে বড় বিরক্তিকর হবে, বলে হেসে হাত বাড়িয়ে সামারার চুলে আঙুল চালিয়ে দিতে লাগলো।
: হুম তাই বুঝি? তুমি বোরিং? আমার তো তা মনে হচ্ছে না। বরং ইন্টারেস্টিং বলেই মনে হচ্ছে।
: হুমমম… ইজ ইট? লেটস মেক ইট মোর ইন্টারেস্টিং। কাছে এগিয়ে এসে কানের কাছে মুখটা নামিয়ে এনে লতিতে ঠোঁট দিয়ে আলতো চাপ দিল।

সামান্য এ ছোঁয়ায় কি জানি কি যে ঘটলো সামারার ভেতরে দুহাতে খামচে ধরলো রাতুলের পিঠ। গাড়িটা ডোর গুলো লকড্, ভেতকটা অন্ধকার, টেনে রাতুলকে ব্যাক সিটে নিয়ে গেল সামারা, ফ্রন্ট দু সিটের মাঝখান দিয়ে। রাতের রাস্তায় ছুটে চলা বেপরোয়া গতির গাড়ির হেড লাইটের আলোয় বাস ড্রাইভার বা যাত্রীরা একটা থেমে থাকা গাড়ির ভেতরটা মুহূর্তের জন্য দেখতে পেলেও সেটা শূন্যই মনে করে। চলন্ত গাড়ির ভেতরের কেউ রাস্তায় থেমে থাকা গাড়ির নড়চড় টের পায় কি?

**********

নিকুন্জ এক থেকে বনানী আসতে ঘন্টাখানেকের বেশী সময় লাগলো। জ্যামে বসে কি বলবে সাফিন কে সে কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলো মনে মনে। জুলিয়ার ভয় একটাই রাতুল না হাতছাড়া হয়ে যায়। যে করেই হোক সামারা ডাইনী টার খপ্পর থেকে ওকে সরিয়ে আনতে হবে। বেঁধে ফেলতে হবে ওকে এমন করে যেন আর না ছুটতে পারে চাইলেও।

হোটেলের রুফটপে পৌঁছে দেখল এক কোনের টেবিলে ড্রিংকস সামনে নিয়ে বসে আছে সাফিন। ব্লাডি ডগ, খাবারের গন্ধে আগেই হাজির, তর সইছে না। কিন্তু হাত পা বাঁধা জুলিয়ার, রাতুলকে পেতে যে সাফিনের হেল্প লাগবেই তার। দুর থেকেই হাত তুলে ইশারা দিল বদমাশ টা, ঠোঁটে ফিচেল হাসিটা পার্মানেন্ট। উফ্, অসহ্য কিন্তু কি আর করা, নিজের ঠোঁটেও ভুবন ভোলানো হাসিটা ঝুলিয়ে এগিয়ে গেল এলোমেলো পেতে রাখা টেবিল গুলোর মাঝখান দিয়ে।

: হাই সাফিন, ওয়েটিং ফর লং? যে ট্রাফিক রাস্তায়, ঢাকা শহর ইজ বিয়িং রোটেন ডে বাই ডে।
: ডিয়ার, ওসব থাকবেই। তুমি এত ভাবছো কেন এগুলো নিয়ে? যারা বাসে-রিক্সায় চলে ওরা ভাবুক। ইউ হ্যাভ এয়ার কন্ডিশনড কার, হাউস। ইউ ডোন্ট নিড টু সাফার ইন ট্রাফিক।
: ডাম্প ইট সাফিন, লেটস কাম টু দ্যা পয়েন্ট। রাতুল কোথায় জান?
: কেন ডার্লিং? হি ইজ ইউর স্টেডি বিএফ রাইট নাও। হোয়াই আর ইউ আস্কিং মি?
: ওহ্ সাফিন ডোন্ট বি সো ড্রামাটিক। ইউ নো বেটার, হি ইজ নট আ বার্ড অফ মাই কেজ। বাট কেজ এ লকড করব কিভাবে সেই হেল্প চাচ্ছি।
:আমার কাছে? হা.. হা… ডিয়ার, হ্যাভ ইউ গন ম্যাড। রাতুলকে বন্দী করবে? নট পসিবল, ইউ বেটার গো ফর এনাদার ওয়ান। দ্যাট উইল ওয়ার্ক।
: শাট আপ সাফিন, কাকে করব আর কাকে না সেটা তোমার কাছ থেকে শুনতে আসিনি। তুমি হেল্প করতে পারবে কিনা বা করবে কিনা সেটা বল।
: হুম ইউ লুক ডেসপারেট।
: ইয়েস আই এ্যাম, নো ওয়ান ক্যান ডিচ্ জুলিয়া.. নো ওয়ান।

এ মেয়ে তো দেখি পুরা আউলায় গেছে.. গুড, যত ডেসপারেট ততই ভালো আমার জন্য। ফায়দা নিতে সুবিধা। আরে বাবা পাখি নিজে থেকে এসে ধরা দিয়েছে, তাকে ফিরিয়ে দেবে এতটা বোকা আর যেই হোক না কেন, সাফিন না। রাতুল জুলিয়ার ঝুড়িতে টপকাক বা না টপকাক তাতে এই সাফিনের কি? বোকা মেয়ে, জেদ খুব খারাপ জিনিস। দেখ কই আর কতদূর নিয়ে যাই তোমাকে!

: রাইট জুলি ডার্লিং, তোমাকে ডিচ্ করবে এমন হৃদয়হীনও আছে! কত দিওয়ানা তোমার এ শহর জুড়ে। এই দেখ না, তোমার সামনেই বসে আছে তোমার আশিক! বলে তার সবচেয়ে সুন্দর হাসিটা ছুঁড়ে দিল জুলিয়ার দিকে।
: ন্যাকামী রাখো সাফিন, তুমিও জানো আমিও জানি তুমি কি চাও। তুমি যদি হেল্প কর, রাতুল কে ফিরে পেতে তবে তুমি যা চাও তাই হবে। শুধু মেক শিওর সামারা দ্যাট বিচ যেন একটা কঠিন শিক্ষা পায়। কি পারবে?
: জুলি লাভ, কিচ্ছুটি ভেবো না। যদি তুমি আমার খেয়াল রাখ তবে আমি কথা দিলাম সামারাকে ফিল্ড থেকে বোল্ড আউট করে দিব। আর রাতুলকে এমন প্যাঁচে ফেলব যে সুরসুর করে তোমার কোলে ফিরে আসবে। আমি তো রাজী তোমার শর্তে এখন তুমি বল আমায় খুশি করবে কিনা?

ব্লাডি ডগ, জানতাম তুই এমন টাই বলবি। তই কি চাস, আমি কি আর জানিনা? আই এম নট আ ফুল! মিষ্টি হেসে বলল, সাফিন, আই এ্যাম এগ্রীড। নাউ টেল মি, হোয়্যার ইজ রাতুল? ইজ হি উইথ দ্যাট বিচ্?

মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো সাফিন। মুহূর্তে সুন্দর মুখটা তীব্র হিংসা আর ঘৃণায় কুঁচকে উঠল। ওফ্ রাতুল ইউ বাস্টার্ড, ইউ হ্যাভ টু পে ফর ইট, শিওরলি ইউ হ্যাভ টু। বাট আগে তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনি, দেন ইউ উইল সি, হোয়াট জুলিয়া ক্যান ডু? এন্ড সামারা মাস্ট পে ফর দিস অলসো। কোন ম্যাজিকে রাতুল কে সরিয়ে নিবি? রূপ? হা.. হা.. যদি না থাকে ঐ রূপ, তখন?

: সাফিন, দ্যাট বিচ সামারা, ওকে পুড়তে হবে। আই ওয়ান্ট টু সি হার ক্রাই, ক্রাইং ইন পেইন ব্যাডলি। ওর দিকে রাতুলের যে কারনে যাওয়া সেটাই আর থাকবে না, তাহলে কি আর যাবে ওর কাছে রাতুল? ক্যান ইউ ডু দ্যাট? ক্যান ইউ মেক দ্যাট হ্যাপেন? ইফ য়্যু ক্যান, আই উইল ডু হোয়াট এভার য়্যু ওয়ান্ট।
বলো .. বলো .. করবে কাজটা?
: হুমম… করব… বাই দ্যা ওয়ে, রাতে বাসায় ফেরার তাড়া নেইতো? ডিনার টা করবে একসাথে? তারপর না হয় তোমার সাথেই ফিরলাম..
: ওকে… অর্ডার কর…

খুশিতে সাফিনের মনে থাউজ্যান্ট ওয়াটের বাল্ব জলে উঠলো… উপ্স… বেবী ইউ আর সো সুইট! লাভ ইউ ডার্লিং.. লাভ য়্যু আ লট…

চলবে….

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে