আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > অপরাধ > চাকরির প্রলোভনে ধর্ষণ, বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে এবরশন!

চাকরির প্রলোভনে ধর্ষণ, বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে এবরশন!

আর্য সূবর্ণ:

পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল আইন বিষয়ে সদ্য গ্রাজুয়েশন শেষ করা মেয়েটির। কিন্তু, বাবা না থাকায় তার সেই ইচ্ছাটাই দায়িত্বে রূপ নেয়। ভালো চাকরি জুটিয়ে পরিবারের হাল ধরা যেন তার জন্য ফরয হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছিল মেয়েটি।

একদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পরিচয় হয় রাজিবের সঙ্গে। রাজধানীর গুলশান অভিজাত এলাকার বাসিন্দা রাজিব পেশায় একটি গ্রুপ অব কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তার পৈত্রিক নিবাস বরিশালে।

কথপোকথনের একটা পর্যায়ে পরিচয়টা বন্ধুত্বে রূপ নেয় তাদের। নিজের ইচ্ছা ও দুর্বলতার কথা রাজিবকে জানায় মেয়েটি। সহজ-সরল মেয়েটির সেই ইচ্ছা ও দুর্বলতাকে পুঁজি করেই নিজের স্বার্থ হাসিল করে বন্ধুবেশী রাজিব। চাকরি ও বিয়ের মিথ্যা প্রলোভনে তার বাসা ও অফিসে দিনের পর দিন ধর্ষণে গর্ভবতী হয় মেয়েটি। এরপর জোরপূর্বক গর্ভপাতও করানো হয়।

সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা এক মামলার নথি অনুসন্ধান করে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য সামনে আসে। মামলা সূত্রে জানা গেছে, ধর্ষণের শিকার মেয়েটি পেশায় শিক্ষানবীশ আইনজীবী। আর অভিযুক্ত রাজিব কর্ণফুলি গ্রুপ অব কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর। পুরো নাম মোহাম্মদ রাজিবুল ইসলাম।

এই রাজীবুল ইসলামের বিরুদ্ধেই চাকরি ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগে মামলা করেছে ভুক্তভোগী ওই নারী শিক্ষানবীশ আইনজীবী।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ জুন (সোমবার)  রাজধানীর চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ কায়সারুল ইসলামের আদালতে এ মামলাটি দায়ের করা হয়। এসময় আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে প্রেরণ করেন। একইসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বিচার বিভাগীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা মোঃ গোলাম নবীকে দায়িত্ব দেন।

পরে ২৫ জুন এ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করে বিভিন্ন প্রমাণের সাপেক্ষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত মোঃ রাজিবুল ইসলামকে গ্রেফতার করতে গুলশান থানা-পুলিশকে নির্দেশ দেন আদালত।

তবে, অভিযুক্ত রাজিব বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করায় আদালতের পক্ষ থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও রাজিবকে গ্রেফতার করতে পারেনি গুলশান থানা পুলিশ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক প্রতিচ্ছবিকে বলেন, ‘ঢাকা সিএমএম আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা পেয়ে আমরা দুই দিন অভিযুক্ত রাজিবুল ইসলামের বাসায় অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু, একবারও তাকে বাসায় পাওয়া যায়নি। তবে, আমরা খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছি। পাওয়ামাত্র আমরা রাজিবুলকে গ্রেফতার করবো।’

এদিকে অনুসন্ধানে নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ রাজিবকে খুঁজে না পেলেও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। এমনকি নিয়মিত অফিসও করছেন রাজধানীর কাকরাইলের এইচআর ভবনে।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে। তিনি প্রতিচ্ছবিকে বলেন, ‘২০১৬ সালে রাজিবের সঙ্গে ফেসবুকে আলাপ হয় আমার। চাকরির আশ্বাস দিয়ে বেশ কয়েকবার নিজের অফিসে ডেকে নিয়ে যায় আমাকে। একপর্যায় আমার সাথে শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হতে চায় রাজিব। এজন্য বিভিন্ন সময় ফোন করতো এবং দেখা করতেও চাইতো।

‘একদিন ব্যক্তিগত কথা বলার জন্য রাজিব তার বনানীর ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় মেয়েটিকে। ওই সময় তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে রাজিব। দিনের পর দিন চাকরি ও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণ করে আমাকে। এমনকি আমি গর্ভবতী হলে জোরপূর্বক এবরশন (গর্ভপাত) করায় রাজিব।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ ঘটনার কয়েক মাস পর রাজিবের অফিস থেকে আমার নামে একটি চাকরির নিয়োগপত্র আসে। কিন্তু, নিয়োগপত্র নিয়ে রাজীবের অফিসে গেলে আমাকে ভেতরেই ঢুকতে দেয়নি। সেখানকার এইচআর/এডমিন ওই নিয়োগপত্রকে ভুয়া বলে দাবি করে।’

ওই সময়ে রাজিবের সঙ্গে বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারেননি বলে জানান তিনি।

ভুক্তভোগীর বক্তব্য থেকে আরো জানা যায়, ভূয়া নিয়োগপত্র পাওয়ার কিছুদিন পর রাজিব নিজেই যোগাযোগ করে অফিসে আসতে বলে তাকে। এরপর একইভাবে বিভিন্ন অজুহাত এবং আবারো চাকরি ও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফের তাকে ধর্ষণ করে। এবারও ধর্ষিতা গর্ভবতী হলে রাজিব তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করতে বাধ্য করে।

এরপর রাজিবের ধর্ষণ ও প্রতারণার অভিযোগে মামলা করার কথা বললে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দিলেও পরে রাজিব তার সঙ্গে সব রকম যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় বলে জানান, ধর্ষণের শিকার ওই শিক্ষানবীশ আইনজীবী।

তিনি আরও বলেন, গত ৪ জুন রাজিবের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় রমনা থানা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অভিযুক্ত রাজিবুল ইসলাম প্রথমে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চান। পরে প্রতিচ্ছবিকে তিনি বলেন, ‘আমাকে হেনস্থা করার জন্য একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমি এখন অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে আছি। আমার অ্যাডভোকেটই সব ব্যবস্থা করেছেন।’

এদিকে, অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে রাজিবের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আদালত সূত্র বলছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর কোনো আসামী স্বশরীরে উপস্থিত না হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পাবেন না।

এএস/এআর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে