আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > জাতীয় > রমজানে ঘরে-বাইরে উভয় সংকটে রাজধানীবাসী

রমজানে ঘরে-বাইরে উভয় সংকটে রাজধানীবাসী

পানি চাই

প্রতিচ্ছবি প্রতিবেদক:

রাজধানীর বাসায় বাসায় চলছে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সঙ্কট। রাস্তায় ভয়াবহ যানজট। সব মিলিয়ে রমজানে নানামুখী সংকটে নাকাল নগরবাসী। রমজান শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা বারবার এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও তা কার্যকর হয়নি। বরং তা আরো কয়েকগুনে বেড়েছে। ফলে রমজানে নগরবাসীকে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। দিন যতই যাচ্ছে সমস্যা ততই প্রকট হচ্ছে। সমাধানে নেই কার্যকরি উদ্যোগ। ফলে ফুঁসে উঠছে নগরবাসী।

পানির সংকট

সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কর্তা ব্যক্তিরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রমজান মাসে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও যানজট সমস্যা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন রমজানে কোনো এলাকায় একসঙ্গে আধঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হবে না। কিন্তু তার এ ঘোষণায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং রোজা শুরু হওয়ার সাথে সাথে এ সংকট দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উপদেষ্টার এ আশ্বাস মিথ্যায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিদিনই রাজধানীতে কোথাও সেহরির সময় আবার কোথাও ইফতার বা তারাবীহ নামাজের সময় লোডশেডিং হচ্ছে।

মগবাজারের পীরপাগলার গলির গৃহিণী পলি আক্তার জানান, গতকাল রোববার সেহরির সময়েও বিদ্যুৎ ছিল না। মোম জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়েছে। ভোর রাত ৩ টা ১৮ মিনিটে বিদ্যুৎ এসেছে। তিনি জানান, মোম জ্বালিয়ে না হয় কষ্ট করে রান্না করলাম, কিন্তু গরমে শিশু সন্তানটি যখন আচমকা চিৎকার দিয়ে ওঠে তখন কি অবস্থা সৃষ্টি হয় বুঝতেই পারেন।

সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র চার হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ঘাটতি থাকছে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের ফলে মোমের আলোতেই মুসল্লিদের সেহরি, ইফতার ও তারাবীহ নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে। ফলে লোডশেডিং করা ছাড়া তাদের কিছুই করার নেই।

এদিকে সারাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ে সরকারের পরিসংখ্যানের দ্বিমত পোষণ করেছেন খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুবিদ আলী ভুঁইয়া। তিনি বলেছেন, দেশে বর্তমান বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এ চাহিদা ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে। তিনি স্বীকার করেন দেশে প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ শতাংশ বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে চাহিদা অনুপাতে বিদ্যুতের পর্যাপ্ত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে এর দায়ভার বর্তমান সরকার নিতে পারে না। কারণ এ সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।

বিদ্যুত সংকট

এদিকে মোমের আলোয় রোযাদাররা সেহরি ও ইফতার সারলেও তা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস ও পানি পাচ্ছে না গৃহিনীরা। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের মতই তীব্র সংকট চলছে পানি ও গ্যাসের। দীর্ঘ সময় মটর ছেড়ে রাখার পরও পানি মিলছে না ট্যাংকিতে। পানির জন্য প্রতিদিন নগরীর কোনো না কোনো এলাকার মানুষ রাস্তায় নামছেই। পবিত্র রমজানে নগরবাসীর ন্যূনতম পানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। পানির চাহিদা, সরবরাহ এবং হিসাবের সাথে ওয়াসার কোনোটিরই মিল নেই। আবার কোথাও খাবার পানির সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি রয়েছে দূষিত ও পচা পানির সমস্যা।

রাজধানীর রায়সাহেব বাজারের নাসিরউদ্দিন সরদার লেন, গোড়ানের নবীনবাগ ও নূরবাগ এলাকা, দক্ষিণ গোড়ান ছাপড়া মসজিদ এলাকা, মাদারটেক বাজার রোড, মগবাজারের মীরবাগ, মধুবাগ, বাসাবো কদমতলা, মায়াকানন, মুগদা প্রভৃতি এলাকায় পানি সংকট ও দূষিত পানি সরবরাহ পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজনের অভিযোগ পানির সমস্যা নিয়ে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার জানালেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

জানা যায়, ঢাকা ওয়াসার মোট ৫৯০টি পাম্প রয়েছে। রাজধানীতে প্রতিদিন পানির চাহিদা ২২৫ কোটি লিটার। এর বিপরীতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে ২১০ কোটি লিটার। তাদের হিসাব মতে মাত্র ১৫ কোটি লিটার পানি ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানান, পাম্পের পানির হিসাব ঠিক না হওয়ায় এ হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতা মিলছে না।

গ্যাস সংকট

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী তাকসিম এ খান জানান, ক্রমান্বয়ে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু সেই হারে রিচার্জ হচ্ছে না। এর মধ্যে চলছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। সব মিলিয়ে নলকূপগুলোতে পানি উত্তোলন কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে রমজানে  পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, শুধু আমাদের চেষ্টা থাকলেই চলবে না, এর পাশাপাশি নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। তাদের পানির অপচয় রোধে এগিয়ে আসতে হবে।

বিদ্যুৎ ও পানি সমস্যার পাশাপাশি রাজধানীতে চলছে তীব্র গ্যাস সংকট। বাসাবো এলাকার বাসিন্দা গৃহিনী আসমা পারভীন জানান, তার এলাকায় সারাদিন টিমটিম করে চুলা জ্বলে। ফলে রান্না করাই দায়। শেষ রাতে চুলার তাপ কিছুটা বাড়লেও তা রান্না শেষ হওয়ার আগেই ঠান্ডা হয়ে যায়। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা আড়াইশ কোটি ঘনফুটের বেশি। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রগুলো থেকে গড়ে ২০০ কোটি ঘনফুটের কম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেসরকারি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ আরো বেশি। আর উৎপাদিত গ্যাসের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয়। যে কারণে বাসা-বাড়িতে সারাবছর জুড়ে গ্যাস সংকট লেগে থাকে। গত কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাপ বাড়ায় এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।

বর্ষায় ঢাকার রাস্তায় জ্বলাবদ্ধতা

এদিকে  বিদুৎ-গ্যাস-পানির ত্রিমুখী সংকটের সাথে যানজট ও জলজট সমস্যা নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। ইফতারের আগে ঘরমুখী মানুষেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি পাচ্ছে না। দুয়েকটি পেলেও তাতে উঠতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে যাত্রীদের মাঝে। গাড়িতে উঠে তীব্র যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে রাস্তায়। রাস্তা বা গাড়িতে বসেই বাধ্য হয়ে অনেককে ইফতার করতে হচ্ছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, শতকরা ২৫ ভাগ রাস্তা না-থাকলে আধুনিক নগরী হয় না। সেখানে ঢাকায় ৯ ভাগ রাস্তা রয়েছে। ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে রাস্তা। যানজট নিরসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত চার সংস্থা বিআরটিএ, ডিসিসি, ডিটিসিবি ও ট্রাফিক বিভাগ এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তার সুফল তেমন পাচ্ছে না মানুষ।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান খান বলেন, প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় ১৫০-১৮০টি নতুন গাড়ি নামছে। রাস্তার তুলনায় যানবাহন বেশি। তাই দিন দিন নগরীতে যানজট তীব্রতর হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টিপাতের কারণে রাজধানীর অনেক  নিচু রাস্তায় পানি উঠেছে। অলিগলি তো বটেই অনেক এলাকার প্রধান সড়কেও পানি জমে জলজটের সৃষ্টি হয়েছে। এসব রাস্তা দিয়ে মানুষ ও যান চলাচল বিঘ্ন ঘটছে। অন্যদিকে ঈদকে সামনে রেখে ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় সাধারণ পথচারীদের পায়ে হাটাও কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে। মোটকথা রমজানে র নানামুখী সংকটে নাকাল নগরবাসী।

এদিকে বিদ্যুৎ ও পানি সংকটকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র এবং পানির পাম্পে যেকোনও মুহূর্তে হামলা হতে পারে এমন আশংকায় রাজধানীতে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানি পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে রাজধানীর ৪১ থানায় গঠন করা হয়েছে ইন্সপেক্টরের (তদন্ত) নেতৃত্বে একটি করে তদারকি টিম। প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ ও পানি পরিস্থিতির ওপর রিপোর্ট দাখিল করতে ক্রাইম জোনের সব ডিসিকে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে। ডিএমপি উত্তরা জোনের ডিসি নিশারুল আরিফ বলেন, বিদ্যুৎ ও পানি পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। প্রত্যেক থানার মোবাইল টিম বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র এবং পানির পাম্প পরিদর্শন করে এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন।

 এসএম

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে