আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > প্রবাস > বিশ্বলয়ে বিশ্বজয়া নাজমুন

বিশ্বলয়ে বিশ্বজয়া নাজমুন

বিশ্বলয়ে বিশ্বজয়া নাজমুন

আর্য সুবর্ণ:

থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে

দেখবো এবার জগতটাকে…

জাতীয় কবির এই চরণ বাস্তবে পরিণত হলো এক বাঙালির রক্তে। তাও আবার নারী! তিনিই প্রমাণ করেছেন সকল প্রতিবন্ধকতাকে উপরে ফেলে নারীরা এখন ঘরকোণায় আবদ্ধ নয়, তাদের বিচরণ এখন বিশ্বমণ্ডলে, নেশা বিশ্বজয়ের। এর জ্বলন্ত উদহারণ নাজমুন নাহার। এই বিশ্বভ্রমণ বিলাসী নারী বিশ্বের একশটি দেশে পদচারণ করে নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

গতকাল জিম্বাবুয়ের মাটিতে পা রেখে সত্যি হলো বাংলাদেশি ভ্রমণ কন্যার একশতম দেশ জয়ের স্বপ্ন। সুইডেন থেকে শুরু করে পুরো ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার জিম্বাবুয়েতে থেমেছেন। তিনি যেখানেই গিয়েছিলেন তার মাথায়, বুকে কিংবা হাতে বেঁধে রাখতেন বাংলাদেশের পতাকা।

নাজমুন নাহারের শততম যাত্রায় তার ফেইসবুকে লিখেন,

“হ্যালো বাংলাদেশ! আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই বাংলাদেশের পতাকা হাতে আমি পা রাখবো একশতম দেশ জিম্বাবুয়েতে! বাংলাদেশের পতাকা সর্বোচ্চ রেকর্ড প্রাপ্ত দেশে! সবাই থেকো আমাদের এই লাল সবুজ পতাকা তলে! আমি হৃদয়ে ষোলো কোটি মানুষকে নিয়ে পায়ে হেটে যাত্রা করবো জাম্বিয়ার বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত থেকে জিম্বাবুয়েতে!

আজকের এই মুহূর্ত শুধু আমার নয়, এই গৌরবময় মুহূর্তের অংশীদার বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষ! এই মুহূর্তে তাদের যারা একটি বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করেছেন, প্রাণ হারিয়েছেন! আজ এই মুহূর্তে আমি সেই সব শহীদ মুক্তি যোদ্ধাদের কথা স্মরণকরছি! পৃথিবীর বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের উপর যে ব্রিজটি রয়েছে তা আমার শততম দেশের সাক্ষী হবে!

এই ব্রিজটির অর্ধেক জাম্বিয়াতে বাকি অর্ধেক জিম্বাবুয়েতে পড়েছে! আর বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতটি বহমান রয়েছে দু’দেশের মধ্যে!

আজ ভিন্ন এক উদ্দীপনা কাজ করছে! শততম দেশে পায়ে হেটে যাত্রা! নিরান্নব্বইতম দেশ জাম্বিয়া থেকে পায়ে হেটে একশোতম দেশ জিম্বাবুয়েতে যাত্রা! পূর্ণ হবে আমার শততম! হৃদয়ে বাংলাদেশে দুচোখে আমার একশতম!”

বিশ্বলয়ে বিশ্বজয়া নাজমুন

স্বপ্ন তখনই পরিপূর্ণ বাস্তবে পরিণত হয় যখন মানুষ মনের তৃষ্ণা থেকে চায়, বলছিলেন বিশ্বজয়ী নাজমুন। তিনি বলেন, মানুষ চাইলে সবই পারে। তবে ভুলে যেতে হবে বিভাজন ও ভেদাভেদ। বিশ্বাস রাখতে হয় নিজের ও আশেপাশের মানুষের উপর। আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই গিয়েছি এ পর্যন্ত কখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভূগিনাই। বরং সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে প্রত্যেকেই বলেও জানান নাজমুন নাহার।

স্বপ্ন পূরণের আকাঙক্ষায় লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলা নারী নাজমুন জানান, আমি যখন বিভিন্ন দেশে ভ্রমন করতে গিয়েছি তখন অনেক বাঙালির সাথে দেখা হতো। দেখতাম তারা কতই না কষ্ট করছে। রোদ-বরফ উৎরিয়ে কত কষ্টের উপার্জন দেশে পাঠাতো। প্রায়ই কেঁদেই উঠতো দেশের জন্য ও পরিবারের জন্য। তাদের সঙ্গে আমারো চোখ ভিজে যেতো। সে সময়টা আমার জন্য খুব কঠিন ছিলো।

বাঙালি বিশ্বজয়া এই ভ্রমণ কন্যা কোন প্রতিবন্ধকতার ধারধারেন্নি, তার নেশা ছিলো বিশ্ব ভ্রমনে সেঞ্চুরি করার, তার স্বপ্ন দেশকে কিছু দেয়ার।তাই বিভিন্ন দুর্যোগ ও প্রতিকূলতাকে পরাজয় করে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে তিনি ছুটে চলেছেন দেশ থকে দেশান্তরে। বর্তমানে তার অভিপ্রায় সুবিধা বঞ্চিতদের পাশে থাকা। স্বপ্নের কথা জানিয়ে বলেছিলেন একশতম পূরণের সময় সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের সঙ্গী করে ভ্রমণ করবেন ভুটানে। কিন্তু কিছু প্রতিবন্ধকতায় সেটি করা হয়ে উঠেনি। তবে তিনি সাহস হারাননি। খুব শিগ্রই তার এই স্বপ্ন পূরণ করবে বলে জানান।

লক্ষ্মীপুরের জন্ম নেয়া নাজমুন নাহার বড় হয়েছে ঢাকায়। পরে স্নাতকত্তোর নিতে পাড়ি জমান সুইডেন। পান সেদেশের নাগরিকত্বও। তখন থেকে শুরু হয় তার স্বপ্ন ছোঁয়ার যাত্রা।

নাজমুনের ভ্রমণ নেশার উৎসাহ বাবার কাছ থেকেই। কৃতিত্ব ও সাহসের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন তার বাবা। স্কুলে পড়ার সময় তাকে অনেক ভ্রমণকাহিনীর বই এনে দিতো। মাঝেমাঝে নাজমুনের বাবাই শুনাতো ভ্রমণ কাহিনী। চোখ বন্ধ করে অনুভব করতো পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র, বরফ মাখা শহর আর সবুজের স্নিগ্ধ সতেজতা। সেই অনুভব প্রতিনিয়ত রূপ দিচ্ছে বাস্তবে। স্বপ্নের স্থানে দাঁড়িয়ে, বসে কিংবা শুয়ে পরখ করছে সবুজের স্নিগ্ধ সতেজতা। মাকেও করেছেন সঙ্গী। পুরো ইউরোপ ভ্রমণ করেছেন মায়ের হাতে হাত রেখে।

টাকা জমিয়ে মানুষ সম্পদ গড়ে, নাজমুন নাহার জমানো টাকায় ছুটে বেড়াতেন নতুন কোনো দেশে,  ভ্রমণই তার শখ,  এ শখই তাকে নিয়ে গেছে ১০০টি দেশে, পা ফেলেছেন ক্যারিবীয় সাগরের বেশ কয়েকটি দ্বীপপুঞ্জেও।

খুব শিগ্রই দেশের মাটিতে পা রাখবেন নাজমুন। সেঞ্চুরির আনন্দে মেতে উঠবে তার পরিবার ও দেশবাসী। ইতিহাস হবে কোন এক বাংলাদেশি নারী সত্যি বিশ্বজয় করে এসেছে।

এএস/এসএম

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে