আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > কেমন আছে বাবা?

কেমন আছে বাবা?

19369792_1981029842131701_656536271_n

রাকিব হাসান:

বাবা, বাবার জন্য বিশেষ কোন দিনের প্রয়োজন নেই , জীবনে প্রতিটা দিন হোক বাবার জন্য বিশেষ দিন ।

কিন্ত কি ভাবে হবে তা । কারন বাবা তো আর আগের মতো নেই ,এখন তো বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতে হয় না। এখনতো বাবা কোথাও ঘুরতে নিয়ে যেতে পারে না। বাবারা তো নিজের জন্য কিছুই করেনি ।  শুধুমা্ত্র সন্তানদের জন্য সারাটা জীবন কাজের জগতে বিলিন করেছে নিজের অস্তিত্ব । এই বাবারাই নিজের কষ্টে মোড়ানো সব যন্ত্রনা ভুলে যান ,সন্তানের মুখে হাসি দেখেই ।

মানবতার কষ্টে মোড়ানো যন্ত্রনা নিয়ে বৃদ্ধ বাবাকে পড়ে থাকতে হয় ‍বৃদ্ধাশ্রমে । যে সময়টুকু থাকার কথা ছিল ছেলে মেয়ে ও নাতি নাতনিদের নিয়ে । যে সময় পরিবারের সবার সাথে হাসি আনন্দে কাটানোর কথা ছিল বৃদ্ধ বাবাদের, অথচ নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস , সন্তানদের সাথে না থেকে থাকতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে ।

বাবা যেমন সন্তানের সবচেয়ে বড় আশ্রয় , তেমনি বৃদ্ধ বয়সে সন্তানও বাবার সবচেয়ে বড় নির্ভরতা । কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে অনেক বাবারই সৌভাগ্য হয় না সন্তানকে আঁকড়ে থাকার । এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে অনেক বাবার শেষ আশ্রয়। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে কেমন আছেন বৃদ্ধ বাবারা ?

d2840d5e-fb69-43da-876a-192a756387d1_l_styvpf-gif

বিশ্ব বাবা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ‘হিতৈষী প্রবীণ নিবাস’ ঘুরে জানা গেল অনেক কিছু।

‘হিতৈষী প্রবীণ নিবাসের’ এক কক্ষে তিন বছর ধরে থাকছেন ৭৫ বছর বয়সী জাকির হোসেন । গত ১৭ জুনের তপ্ত দুপুরে জাকির হোসেন হাতে বই নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন খোলা আকাশপানে। পিঠে হাত রেখে জানতে চেয়েছিলাম বাবা কেমন আছেন? মাথা ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকলেন। এরপর শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘বেঁচে আছি। এটাই কি যথেষ্ট নয়?’

পরক্ষণেই বললেন, ‘সামনে বাবা দিবস, তাই জানতে এসেছ কেমন আছি, তাই না? তোমাদের ধন্যবাদ। তাও তো তোমরা বিশেষ দিবসে আমাদের মনে করো। কিন্তু আমার সন্তানরা তো ওদের জীবনের সবচেয়ে বড় খুশির দিনগুলোতেও আমাকে মনে করে না।’

আগারগাঁও থেকে ধানমন্ডির দূরত্ব খুব বেশি নয়। জাকির হোসেনের তিন ছেলে, দুই মেয়ে থাকেন সেখানেই। শুধু ছেলেমেয়েই নয়, ভাইবোনরাও থাকেন আশপাশে। তবুও তাকে থাকতে হয় একা, এই নিবাসে। জাকির হোসেন বলেন, ‘তিন বছর ধরে এই নিবাসে আছি। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিন মাস করে ছেলেদের কাছে থাকতাম। কিন্তু ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়িতে ওঠায় বড় ছেলে জানিয়ে দেয় তার একার পক্ষে আমাকে সারা বছর বাড়িতে রাখা সম্ভব নয়। তাই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গেছে। অবশ্য বাবাকে দেখতে আসার তেমন একটা সময় না পেলেও ছেলেরা প্রতি মাসেই বৃদ্ধাশ্রমের খরচ পাঠিয়ে দায়িত্ব পালন করে। মেয়েরাও আসে, তবে ব্যস্ততায় বেশি আসতে পারে না।’ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি জানালেন, ‘আত্মীয়রা বেড়াতে যেতে বলে কিন্তু যাই না। গেলে কষ্ট বাড়ে। নিবাসে ফেরত আসতে ইচ্ছে করে না।’ ‘আপন যখন পর হয়ে গেছে, তখন পর আর কতটা আপন হবে। এখানে খাওয়া-দাওয়ার মান খুব খারাপ।

এখানে কর্মকর্তাদের অনেকেই ব্যবহার খারাপ। তবুও ধন্যবাদ এরা আমাদের বোঝা তো বহন করছে।’ প্রবীণ নিবাসের পরিবেশ সম্পর্কে এভাবেই জাকির হোসেন জানান তার প্রতিক্রিয়া।

গাজীপুর গিভেন্সি গ্রুপের বৃদ্ধাশ্রম, সাভার বৃদ্ধাশ্রম এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের বৃদ্ধাশ্রমেও বাড়ছে বয়সী বাবা মায়েদের সংখ্যা।

father-son-walking

প্রবীণ নিবাসের ৭০ বয়সী রহমান সাহেব । ধানমন্ডিতে ৭ তলা তিনটা বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তার শেষ আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রম ।তিনি বলেন,”সারা জীবনের অর্জিত সম্পদ দিয়ে একমাত্র সন্তানকে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় পাঠিয়েছিলাম। ছেলে বিদেশ যাওয়ার কিছুদিন পরই স্ত্রী মারা যান। সন্তান মানুষের মতো মানুষ হলেই তো আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! ছেলে মানুষের মতো মানুষ হয়েছে, কিন্তু ছেলের কাছে আমার আশ্রয় হয়নি। সবকিছু হারিয়ে এখন আমি বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। শেষজীবনে নিজের জমানো কিছু টাকা দিয়ে কোনোমতে খেয়ে-পরে বেঁচে আছি”। ছেলের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানালেন, ‘আমার জন্য সমাজে ওর সম্মান নষ্ট হোক তা আমি চাই না। দোয়া করি ও সন্তানদের নিয়ে সুখে থাকুক।’

কথাগুলো বলতে বলতে জলে চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে রহমান সাহেবের । হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলতে থাকেন, ‘ইচ্ছে ছিল শেষ বয়সে নাতি-নাতনির সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করে দিন পার করব। হৈ-হুল্লোড় তো দূরের কথা, ওদের মুখখানিই আজও দেখা হয়নি। খোদা যেন এমন দিন আর কাউকে না দেন।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে