আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মজার খবর > ছেলেদের হাইহিল!

ছেলেদের হাইহিল!

 

high-hill

জোহরা সিজন

বিস্ময়কর হলেও সত্য যে উঁচু হিলের জুতার মূল ব্যবহারকারীরা ছিল পুরুষ। প্রাচীন গ্রীস ও মিশর কিংবা মধ্যযুগীয় পারস্য সবখানেই ছিল এর প্রচলন এবং জনপ্রিয়তা। এবার তাহলে জানা যাক পুরুষ থেকে নারী জগতে হাইহিলের প্রবেশের সেই ইতিহাস।

প্রায় ৪০০ বছর আগে হিল জুতার প্রচলন শুরু হয়। ১৫৯৯ সালের দিকে ইউরোপের অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকজন ইরানি ফ্যাশনের জুতা ব্যবহার করতে শুরু করে। নিজেদের আরও পৌরুষদীপ্তভাবে প্রকাশ করতেই ছেলেরা বেছে নেয় হাইহিল।

high-heel

একপর্যায়ে পুরুষের পোশাক-পরিচ্ছদের বিভিন্ন উপাদান নারীর ফ্যাশনেও অন্তভুর্ক্ত হতে শুরু করে। ১৬৩০-এর দশকে নারীরা ছোট ছাঁটের চুল এবং সেনাদের আদলে কাঁধের অলংকার ও পুরুষালি হ্যাট ব্যবহার এবং পাইপে ধূমপান শুরু করেন। এভাবেই তাঁরা হাই হিলও ব্যবহার শুরু করেন।

১৬৬১ সালে আঁকা ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের অভিষেককালীন প্রতিকৃতিতে তাঁর পায়ে ফরাসি ফ্যাশনের লাল হাই হিল দেখা যায়। যদিও তিনি ছয় ফুট লম্বা ছিলেন।

Luis

১৬৭০-এর দশকে চতুর্দশ লুই কেবল তাঁর রাজসভার সদস্যদের লাল হাই হিল পরার বৈধতা দিয়ে একটি ফরমান জারি করেন। তবে এতে অনুমোদনবিহীন ও নকল হিলের প্রচলন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

১৭০১ সালে ইয়াসান্থ রিগোর আঁকা ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের প্রতিকৃতিতে তাঁকে উঁচু হিল পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। পরবর্তীতে সমাজের সাধারণ মানুষদের মধ্যেও উঁচু হিলের প্রচলন শুরু হয়। অভিজাতরা তখন নিজেদের জুতায় হিলের উচ্চতা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়।

১৭৪০ সালে পুরুষেরা এ ধরনের জুতা ব্যবহার পুরোপুরি ছেড়ে দেয়। তবে মাত্র ৫০ বছর পর ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে নারীরাও হাই হিল বর্জন করে। কিন্তু নারীদের ফটোগ্রাফির প্রচলন শুরুর মধ্য দিয়ে উনিশ শতকে হাই হিলের ফ্যাশনটি ফিরে আসে।

1740s chopines

জুতার সুবিশাল সংগ্রহের জন্য খ্যাত ইমেলদা মার্কোসের মতোই তখনকার যুগে চতুর্দশ লুইয়ের খ্যাতি ছিল। উচ্চতায় তিনি ছিলেন পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। নিজেকে আরও লম্বা দেখাতেই তিনি চার ইঞ্চি উঁচু হিল ব্যবহার করতেন। সেই যুগে হিল এবং জুতার তলিতে সামরিক চিহ্ন হিসেবে লাল রং ব্যবহৃত হতো। সেই রং করার প্রক্রিয়াটি ছিল ব্যয়বহুল।

কানাডার টরন্টোয় অবস্থিত জুতার জাদুঘর বাটা সু মিউজিয়ামের কিউরেটর এলিজাবেথ সেমেলহ্যাক বলেন, প্রাচ্যের কাছাকাছি অঞ্চলজুড়ে কয়েক শ বছর ধরে উঁচু হিলের প্রচলন ছিল। পারস্যে (ইরান) অশ্বারোহী যোদ্ধা পুরুষের পরিচ্ছদ ছিল উঁচু হিল। ঘোড়ার পিঠে পা রাখার স্থানে (রেকাব) দাঁড়িয়ে ধনুক থেকে তির নিক্ষেপকালে যোদ্ধার শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করত তার জুতার হাই হিল।

High_Heels_Middle_East

সেমেলহ্যাক আরও বলেন, তখনকার যুগে সুবিধাভোগী সম্প্রদায়ের মানুষকে কাজ করতে হতো না এবং না হাঁটলেও চলত। তাই বাস্তবতাবিবর্জিত, অদ্ভুত, অস্বস্তিকর ও ব্যয়বহুল পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের আভিজাত্য প্রকাশ করত।

লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামের কিউরেটর হেলেন পারসন বলেন, সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে পরিস্থিতি আবার পাল্টাতে শুরু করে। তখন হিলের ধরনে পরিবর্তন আসে। পুরুষেরা বর্গাকার, শক্ত ও নিচু হিল এবং নারীরা চিকন ও বাঁকা হিল পরতে শুরু করে।

কালের বিবর্তনে পুরুষদের ফ্যাশনে কাজের উপযোগী, সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় বৈশিষ্ট্য গুরুত্ব পায়। তারা অলংকার বর্জন করে এবং পোশাকে সামাজিক বিভেদের চিহ্নও দূর হতে থাকে। ‘হাইটস অব ফ্যাশন: আ হিস্ট্রি অব দি এলিভেটেড সু’ বইয়ের রচয়িতা সেমেলহ্যাক বলেন, এনলাইটেনমেন্টের প্রভাবে পুরুষদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও নারীদের সাধারণত আবেগপ্রবণ, ভাবপ্রবণ ও শিক্ষালাভের অনুপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

নারীদের মাঝে নিজেকে জনপ্রিয় করতে অনেক সময় লেগেছিলো উঁচু হিলের জুতা সম্প্রদায়ের। এর প্রথম নজির খুঁজে পাওয়া যায় পনের শতকের ভেনিসে। প্রায় চব্বিশ ইঞ্চি উঁচু ও কিছুটা বাঁকানো সেই জুতাগুলোকে বলা হতো চপিন (Chopine)। এগুলোর প্ল্যাটফর্ম ছিলো কিছুটা সংকীর্ণ।

Chopine

অবশ্য এত উঁচু জুতা ব্যবহারের অন্য কারণও ছিলো। মূল জুতাটি তৈরি করা হতো মূলত প্রাণীর চামড়া কিংবা সাটিন দিয়ে যা কাদার প্রভাবে সহজেই বিবর্ণ হয়ে যেতে পারতো। আর এ কাদার হাত থেকে সুন্দর জুতাগুলোকে রক্ষা করতেই এ কৌশলের দ্বারস্থ হতেন তৎকালীন নারীরা।

পনের শতকে ভেনিসে উঁচু হিলের জুতা জনপ্রিয় করতে মূল ভূমিকা রেখেছিলো সেখানকার প্রস্টিটিউটেরা। খদ্দের আকৃষ্ট করতে তারা তাদের প্রতিদ্বন্দীদের চেয়ে উঁচু জুতা পরতে চাইতো যাতে করে সহজেই লোকে তাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে তার দিকে!

ইউরোপীয়দের চপিনের মতো জাপানীদেরও ছিলো উঁচু হিলের জুতা, তবে নাম ছিলো ভিন্ন। অনেকদিন ধরে তারাও সেগুলো ব্যবহার করে আসছিলো। তাদের ব্যবহারের উদ্দেশ্যও ছিলো একই- নিজেদের কিমোনোকে (কিমোনো হলো জাপানের একটি ঐতিহ্যবাহী পোষাক ধূলাবালির হাত থেকে রক্ষা করা। সেই সাথে নিজেদের সামাজিক মর্যাদাকে আলাদা করে চেনানোর মানসিকতা তো ছিলোই।

 

high_heel

এভাবেই ক্রমে ক্রমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উঁচু হিলের জুতার জনপ্রিয়তা।পুরুষদের দিয়ে শুরু হওয়া হাই হিল জুতা কালক্রমে নিজেদের স্থান পাকাপোক্ত করে নেয় নারীদের পদযুগলে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে