আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > আন্তর্জাতিক শ্রমিক স্মরণ দিবস: চাই নিরাপদ কর্মস্থল

আন্তর্জাতিক শ্রমিক স্মরণ দিবস: চাই নিরাপদ কর্মস্থল

আন্তর্জাতিক শ্রমিক স্মরণ দিবস

ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার এবং মোঃ নাছির আহম্মেদ পাটোয়ারী:

মানুষ অবিনশ্বর নয়, এই পৃথিবীতে যার একবার জম্ম হয়েছে, তার একদিন মৃত্যু হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম, তাই বলে প্রতিটা মূহুর্তে মৃত্যু কামনা করে বসে থাকলে চলবে না, জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, কর্মের মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে। শুধুমাত্র অনিরাপদ কর্মস্থলের কারণে প্রতিবছর অনেক শ্রমিক দুর্ঘটনার শিকার হয়, এমনকি প্রাণও হারায়। ১৯৭০ সালে American Federation of Labor and Congress of Industrial Organizations (AFL-CIO) কর্মস্থলে আহত ও নিহত শ্রমিকদের সম্মানার্থে ২৮ শে এপ্রিলকে “আন্তর্জাতিক শ্রমিক স্মরণ দিবস (International Workers’ Memorial Day)” এর ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে প্রতি বছর ২৮ শে এপ্রিল আন্তর্জাতিক শ্রমিক স্মরণ দিবস পালন করা হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন International Labour Organization (ILO) এর মতে, প্রতিবছর ২ মিলিয়ন পুরুষ ও মহিলা পেশাগত দুর্ঘটনা ও রোগের কারণে মারা যায়। কর্মস্থলে দুর্ঘটনার পরিমাণ প্রতিবছরে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন এর মধ্যে ১৬০ মিলিয়ন দুর্ঘটনায় কর্মীরা আহত হয়ে থাকেন। বিপদজনক পদার্থের প্রভাবে প্রতিবছর ৪ লক্ষ ৪০ হাজার জন শ্রমিক এবং শুধুমাত্র এসবেস্টস ১ লক্ষ জন শ্রমিকের জীবন কেড়ে নেয়। এইসব হিসাব অনুযায়ী সারাবিশ্বে প্রতি ১৫ সেকেন্ডে একজন এবং প্রতিদিন ৬ হাজার জন শ্রমিক মারা যাচ্ছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিক মারা যাওয়ার চেয়েও বেশী।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পেশাগত দুর্ঘটনার পরিমাণ কম নয়। Bangladesh Occupational Safety, Health and Environment Foundation (OSHE) জানুয়ারি ২০১২ সাল থেকে মার্চ ২০১৭ সাল পর্যন্ত একটি পরিসংখ্যান করেন, পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতিমাসে পেশাগত দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭৮ জন, আহতের সংখ্যা প্রায় ১৪৩ জন। ৫ বছর ২ মাসে ৯৩৮৪ জন শ্রমিক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন, এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা ৪৯১০ জন এবং আহতের সংখ্যা ৪৪৭৪ জন। Housing and Building Research Institute কর্তৃক ২০১৪ সালে প্রকাশিত “অগ্নিকান্ডে নিরাপত্তা” নামক নির্দেশিকা অনুযায়ী ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মোট অগ্নিকান্ডের সংখ্যা ৩২ টি এবং এতে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৭ জন ও আহতের সংখ্যা ৫ হাজার ১৯৫ জন। শুধু “রানা প্লাজা” দুর্ঘটনায় নিহত ১ হাজার ১৩৮ জন ও আহত ২ হাজার ৫০০ জন এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৩২৯ জন। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর পরিবশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষনায় দেখা যায় যে, “মহিলা গার্মেন্টস কর্মীদের বেশীর ভাগ নানান ধরণের রোগের বা সমস্যায় ভুগছেন যেমনঃ মাথা ব্যথা (৪৪ শতাংশ), গ্যাস জনিত পেটে ব্যথা (৪৮ শতাংশ), কোমর ব্যথা (৪৪ শতাংশ), ক্লান্তি জনিত দুর্বলতা (৫৪ শতাংশ), ক্ষুদামন্দে (৫৪ শতাংশ), গিরায় ব্যথা (৪০ শতাংশ), পায়ের তালু ও হাটুর সমস্যায় (৪০ শতাংশ), চর্মরোগ (৩০ শতাংশ), মাথা ঘুরানো (২২ শতাংশ), শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় (৪ শতাংশ)”।

এতসব সমস্যা বা জান মালের ক্ষতির কারণ কি হতে পারে? সমস্যার কারণ অনেক হতে পারে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল, যথাযথ নিরাপত্তা সরঞ্জামাদির না থাকা বা সরঞ্জামাদি থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার না করা কিংবা সরঞ্জামাদি ব্যবহারের জ্ঞান না থাকা, উন্নত কর্ম পরিবেশের অভাব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড না মেনে শিল্প কারখানা তৈরি করা, দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না দেওয়া, কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়া, দীর্ঘসময় বিরতিহীন কাজ করে যাওয়া,  একই কাজ বার বার করতে দেওয়া, উপযুক্ত মেশিন অপারেটর নিয়োগ না দেওয়া, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও মেশিন ব্যবহার, শিশু শ্রমিক নিয়োগ ইত্যাদি।

দুর্ঘটনায় যে শুধু আহত বা নিহত হচ্ছে এমন নয়, কিছু কিছু শিল্পের শ্রমিক আছে যারা মারত্মক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মধ্যে সর্বদা থাকেন, ভুগছে নানাবিধ রোগে। যেমনঃ ট্যানারি শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বেশীরভাগই জন্ডিস, চর্মরোগ, বাত জ্বর, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, আলসারের মত ভয়াবহ রোগে। পেশাজীবীরা প্রতিবছর কোন না কোন কারণে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হচ্ছে হাজার হাজার শ্রমিক, কিন্তু তারা পাচ্ছে না দুর্যোগ পরবর্তী কোন সম্মাননা বা আর্থিক সাহায্য। নিহতের পরিবার দিন কাটাচ্ছে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে আর যারা আহত হচ্ছেন তাদের এক অংশ জীবিকা হিসাবে বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তি। যারা নিহত হচ্ছে তাদের পরিবারের কাছে মালিক পক্ষ মিডিয়ার সামনে এককালীন কিছু টাকা তুলে দিলেও এর মধ্যে কিছু জটিলতা থেকে যায়, কোন কোন ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে নিহতের পরিবার সম্পূর্ণ টাকা বুঝে পায় না।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ সনের ৪২ নং আইনের ধারা ১৯ (২০১৩ দ্বারা সংশোধিত) অনুযায়ী- “মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ। যদি কোন শ্রমিক কোন মালিকের অধীন অবিচ্ছিন্নভাবে অন্ততঃ ০২ (দুই) বৎসরের অধিককাল চাকুরীরত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, তাহা হইলে মালিক মৃত শ্রমিকের কোন মনোনীত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির অবর্তমানে তাহার কোন পোষ্যকে তাহার প্রত্যেক পূর্ণ বৎসর বা উহার ০৬ (ছয়) মাসের অধিক সময় চাকুরীর জন্য ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৩০ (ত্রিশ) দিনের এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় অথবা কর্মকালীন দুর্ঘটনার কারণে পরবর্তীতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) দিনের মজুরী অথবা গ্র্যাচুইটি, যাহা অধিক হইবে, প্রদান করিবেন, এবং এই অর্থ মৃত শ্রমিক চাকুরী হইতে অবসর গ্রহণ করিলে যে অবসর জনিত সুবিধা প্রাপ্ত হইতেন, তাহার অতিরিক্ত হিসাবে প্রদেয় হইবে।”

জীবনের প্রতিটা বাঁকে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে তাইতো শিল্পী ফিরোজ সাই গেয়েছিলেন “এক সেকেন্ডের নাই ভরসা”। মানুষের ভাগ্য মানুষ নিজ হাতে গড়ে নিতে পারে, শ্রমিক ভাইরা যদি তার নিজ কাজ দক্ষতা, সাবধানতা ও সুনিপুণ ভাবে করে তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে লোপ পাবে। অপরদিকে মালিক পক্ষগণ যদি যথাযথ আইন মেনে, শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও উন্নত কর্মস্থল এর পাশাপাশি পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তবে দুর্ঘটনায় তাদের আর্থিক লোকসান কম হবে অধিকন্তু অনেক জান-মাল রক্ষা পাবে।

এএস

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে