আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > সিলেট > পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে সিলেটের শত শত মানুষ

পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে সিলেটের শত শত মানুষ

পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে সিলেটের শত শত মানুষ

আসমিত অভি:

বর্ষার শুরু যেন তাদের কাছে নিয়ে আসে আতঙ্ক বার্তা। নির্ঘুম কাটে রাতগুলো। না জানি কখন নীরবে টুপ করে পাহাড় ধ্বসে পড়ে। শেষ হয়ে যায় পাহাড়ের গাঁ ঘেষে গড়ে উঠা সাজানো জীবন। গত দুদিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের লাল মাটি গলে গলে নিচে ধ্বসে পড়ছে। অথচ সিলেটে আতঙ্ক-ঝুঁকি নিয়েই পাহাড়ের গাঁ বেয়ে দেড় শতাধিক পরিবারের আবাস গড়ে ওঠেছে। এসব পরিবারে অন্তত ৬ শতাধিক লোক রয়েছেন প্রাণহানির ঝুঁকিতে। এদের মধ্যে শিশু-নারীও আছেন অন্তত ৩ শ।

সিলেট শহরতলির বালুচর, আখালিয়া, নালিয়া, ভাটেরা, আলুরতল ও খাদিমপাড়া ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গুচ্ছগ্রামে পাহাড়ের নিচে এবং ওপর এই ঝুঁকিপূর্ণ আবাস এখন যেন মরণফাঁদ।

চট্রগ্রামের তিন জেলায় গত মঙ্গলবার পাহাড়ধসে সেনা সদস্যসহ দেড় শতাধিক মানুষ চাপা পড়ে মারা গেছেন। চট্রগ্রামের পাহাড়ে এ মহাবিপর্যের পর সিলেটেও অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়-টিলাধসে বড় ধরণের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আতঙ্ক বিরাজ করছে খুদ পাহাড়ের নিচে বসবাসকারীদের মনেও।

সরেজমিনে দেখা গেল, গুচ্ছগ্রামের টিলা কেটে বানানো রাস্তার এক পাশে ছোট-বড় দুটি পাহাড়। বৃষ্টির পানি পাহাড়ের লাল মাটির সবুজ গাছ বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে টপ টপ করে পড়ছে। মাটি ভেঙে পড়ার ক্ষত জড়িয়ে রয়েছে উঁচু পাহাড়ে। নিচ থেকে অনেক উঁচুতে দেখা যাচ্ছে টিনশেডের একটি ঘর। ঘরের পাশেই পাহাড়ের টুকরো ভেঙে পড়ে অবশিষ্টাংশ ধসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ অবস্থায়ও ওই ঘরের উঠোনে দুটি শিশু খেলা করছে। তাঁরা ভাবলেশহীন। পাশেই শিশুদের মা আফিয়া বেগম গৃহস্থালি কাজ করছেন। আশপাশে পাহাড়ের ছড়িয়ে আছে আরও ঘরবাড়ি। কাটা টিলার ফাঁকে রয়েছে আরও কয়েকটি ঘর। এসব ঘরে যাবার কোনো রাস্তা নেই। পাহাড় কেটে পথ বানানো হয়েছিল। বৃষ্টির পানিতে লাল মাটি ধসে সেই পথও আর নেই। ধসে পড়া টিলা বেয়ে ঘরবাড়িতে লোকজন যাওয়া-আসা করেন।

আফিয়া বেগম বললেন, ‘আমরা ১৫ বছর ধরে এখানে আছি। বাড়ি ঘর নাই। স্বামী কাম কাইজ করে। বারিষা এলে মাটি ধসে। ঘরের বেড়া লেপান লাগে।’

পাহাড়ি টিলার ফাঁকে আলিম উদ্দিনের পরিবার একটি খুপরি টিনের ঘর বানিয়ে বাস করেন। আলিম উদ্দিনের কন্যা বলেন, ‘ইকানো (এখানে) আমরা বউতদিন (অনেকদিন) ধরি থাকি। পয়লা ডর (ভয়) করত। এখন একটু কম ডর করে। রাতে ডর লইয়া (নিয়ে) ঘুমাই।’

কথা বলে জানা গেল, অন্তত ৫০ টি পরিবার পাহাড়ের ওপরে থাকেন। টিলার পাদদেশে বসবাস করে আরও প্রায় ৩০ টি পরিবার । ঘর বানানোর আগে কেউ কেউ পাহাড় কেটে রাস্তা বানাচ্ছেন। দুদিকে কাটা দুটি টিলা দেয়ালের মতো রয়েছে। এসব কাটা অংশের ফাঁক দিয়ে শিশুরা আসা-যাওয়া করে। আবার পাহাড়ের নিচেই ধসে পড়া মাটির স্তূপের পাশে পুরানো ও নতুন ঘরবাড়ি। ওপরের মতোই নিচের মানুষেরাও আতঙ্কে দিনযাপন করছেন।

টিলার পাদদেশের নিচের একটি ঘরের বাসিন্দ আম্বিয়া বেগম। তিনি জানান, কিছুদিন আগে টিলা ভেঙে তার ঘরের ওপরে পড়েছে। তবে ওই ঘরে কেউ থাকত না। শুধু ঘরের ক্ষতি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ১৯৯২ সাল থেকে এখানে ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে লোকজন বসবাস করে আসছেন। ওই সময়ে সিলেটের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা গুচ্ছগ্রামের এই টিলার ২০০১ নম্বর দাগের ১২ একর এবং ২০১৫-১৬ নম্বর দাগের ২ একর জমি একশ বছরের জন্য বন্দোবস্ত নেন। শুরুর দিকে কয়েকজন ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ওই পাহাড়ে ঘর বানিয়ে বসবাস করে। পরে তাঁরা পাহাড়কে ভিটায় ভাগ করে বিক্রি করে চলে যান। বর্তমানে পাহাড়ে সকল পরিবারই শ্রমজীবী পরিবার। তাঁরা পাঁচ হাজার টাকায় ওই পাহাড়েই বসবাসের জন্য স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে মৌখিকভাবেই জমি কিনে এসব খুপরি ঘর বানিয়ে বাস করে আসছেন।

স্থানীয়রা জানান, এখানে অনেক দিন ধরেই ঝুঁকি নিয়ে প্রায় একশ পরিবার বসবাস করে আসছে। পাহাড়টি সরকারের খাসজমি। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বন্দোবস্ত হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা কেউ কেউ বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাই নতুন নতুন পরিবার পাহাড়ে ঘর বানাচ্ছে। তাদের যাওয়ার জায়গা নেই; তাই তারা ঝুঁকি নিয়েও পাহাড়েই থাকতে চাচ্ছে। কয়েক বছর আগে সুরাই মিয়া নামের একজন পাহাড়ের মাটি ধসে আহত হয়েছিলেন। পরে তিনি মারা যান।

খাদিমপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনু মিয়া বলেন, ‘মানুষের থাকার মতো জায়গা নেই। তাই তাঁরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। সরকার এসব গৃহহীন পরিবারের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে বলে আমরা আশাবাদী।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক সালাউদ্দিন বলেন, টিলা কাটার বন্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নিচ্ছি। পাহাড়ে বসবাস ভিন্ন একটি বিষয়। খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. রাহাত আনোয়ার বলেন, ‘চট্টগ্রামের ঘটনার পর সিলেটে সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। এখানে কোথাও এরকম ঝুঁকিপূর্ণ আবাস আছে কিনা তা খোঁজ নিতে সংশ্লিষ্টদের বলে দেওয়া হয়েছে।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে