আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > লাইফ-স্টাইল > ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনী: বাউন্ডুলের দিনরাত্রি

ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনী: বাউন্ডুলের দিনরাত্রি

19239593_10211923836123968_944152221_n
মোহাম্মদ আনোয়ার ইতালি থেকে

পর্ব-১

চুরি হয়ে যেতে চাই… প্রিয় একজন আলোকিত মানুষ একবার কোন এক কথা প্রসঙ্গে এমন কিছু বলেছিলেন। কথাটা মনে গেঁথে গেছে। চুরি হতে ভাল লাগবে কিনা ঠিক জানি না, তবে ডাকাতি হয়ে যেতে আমার বেশ লাগে!

একজন বন্ধু আছেন দেশ থেকে মাঝে মাঝে রোমে ঘুরতে আসেন। ব্যাবসায়িক ঘুরা। উনি আমাদের কয়েক বন্ধুকে দুই একদিনের জন্য প্রায়ই ডাকাতি করে নিয়ে যান কোথাও। আমরা ডাকাতি হয়ে যাই, মনের আনন্দে।

জীবন বয়ে বেড়ানোর জন্য যে জীবন আমাদের, তাতে অনেকের জীবন কুঁকড়ে থাকে। জীবন থেকে প্রাণ আলাদা হয়ে যায়। প্রাণ থেকে মন। এমন করে কেউ ডাকাতি করে নিয়ে গেলে জীবন আপাত হাঁফ ছাড়ে, হাঁফ ছেড়ে শ্বাস নেয়, শ্বাসে শ্বাসে বুক ভরে!

আপেলের পুর দেয়া এক ধরণের পিঠা দিয়ে দিনের যাত্রা শুরু। আর আমাদের যাত্রা শুরু বন্ধু মনিরের বাসা থেকে। রোম শহর যদি সুতো দিয়ে ঘেরা দেয়া যেত চারপাশ থেকে তবে মনিরের বাসা একেবারে সেই সুতোর উপর পড়ত, হয়ত। ওদের বাসার পরেই এক উপত্যকা। এরপরে আক্ষরিক অর্থেই আর কোন ঘর-বাড়ি নেই। শহরের সীমানায়!

18157163_10211479501615883_7100025753142460717_n
পাশের এক পাহাড়ের উপর থেকে লাগো দি বলসেনা

অনেকদিন মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে না, এমন নয় যে আমি যেদিকে থাকি সেদিকে মোরগ নেই। তবে এই মোরগগুলা হয়ত শহুরে কায়দা মেনে স্বর নীচু করে ডাকে!সকাল সকাল সবার ঘুম ভাঙ্গাতে চায় না!!! মনিরের বাসায় ঘুম ভাঙল আপাত বুনো মোরগের ডাকে! মোরগরা সভ্য না হলে এদের কী ডাকতে হয় জানা নেই, মানুষ হলে ঘুম ভেঙ্গে অসভ্য বলতে পারতাম! ইদানিং আজানের মধুর সুরে ঘুম ভাঙলেও অনেকে এক ধর্মের লোকেদের সভ্যতা জ্ঞ্যান নিয়ে প্রশ্ন তোলে!

লাগো দি বলসেনা নামের এক ভলকানিক লেকের পাড়ে যাব। রোম থেকে প্রায় ৭০-৮০ কিলো দূরে। এই লেকের পাশে ছোট ছোট কয়েকটা শহর আছে। সেগুলার কোন একটাতে দুপুরের খাবার খাব। কাঠের চুলায় বানানো পিতজা। পিতজার উপরে থাকবে চার ধরণের চীজ এর টপিংস। শুধু চীজ। আগের রাত থেকে এই পিতজা আমাদের চারজনের মাথার ভেতর কাঠের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে। রাত এগারটার পর সাগর পাড়ের এক শহরের কয়েকটা পিতজেরিয়ায় গিয়েও পিতজা খেতে পারিনি। রেস্তোরা গুলো বন্ধ হচ্ছিল তখন। কাজেই আজ খেতেই হবে।

রোম থেকে বের হলেই এক ধরণের সড়ক আছে টাকা দিয়ে চলতে হয়। আমরা তেমন একটাতে উঠলাম। তিন কি চার লেনের সড়ক। ১৬০ কিলো গতিতে চলা যায়। কিন্ত মনির চালাচ্ছে দুইশ কিলোর উপরে। গাড়ির ভেতর গান চলছে সরবোচ্চ ভলিউমে।

বন্দে মায়া লাগাইসে, দিওয়ানা বানাইসে…

তিন বন্ধু গলা ছেড়ে গানের সাথে সুর মেলাচ্ছি। বাকি দুইজন গাড়ির ভেতর হঠাত চালু হওয়া কনসার্ট উপভোগ করছে। এরা শুধু শাওয়ার নেয়ার সময়ই গান ধরে। আর কক্ষনো নয়!

দুই পাশের পাহাড়-উপত্যকা পেরিয়ে ছুটছি আমরা। পিতজা খাব। দুপুরে।

17992343_10211479462574907_7738212846389445067_n
লাগো দি বলসেনা

পাশের উঁচু নীচু পাহাড়ে চোখ আটকে থাকে। কোথাও আঙ্গুর বাগান, কোথাও জলপাইয়ের। মাঝে মাঝে গমের ক্ষেত আছে, আছে এক ধরণের শস্যের ক্ষেত যেগুলো এরা গবাদি পশুকে খাওয়ায়। কয়েক জায়গায় দেখলাম বেড়া দেয়া খেতে গরু চরছে, কয়েক জায়গায় ঘোড়া। ভেড়ার খামার চোখে পড়ে বেশি। দূর থেকে দেখলে ভেড়া গুলোকে ফুলের মত মনে হয়, সবুজ জমিনে সাদা সাদা। আর ভেড়ার পাল চলতে শুরু করলে দারুণ লাগে দেখতে। মনে হয় সবুজের মধ্যে একটা সাদা এক টুকরো জমিন হঠাত চলা শুরু করেছে। কয়েকটা খামারে দেখলাম কয়েকটা কুকুর ভেড়ার পাল সামলাচ্ছে। দারুণ এক ব্যাপার!

উচ্চ গতির রাস্তা ছেড়ে আমরা দুই লেনের ছোট রাস্তা দিয়ে চলেছি এবার। কিছুদুর পরপরই পথের দুপাশের দৃশ্য পালটে যাচ্ছে। সাথে পাল্টাচ্ছে সবুজের ঘনত্ব। কোথাও গাড় সবুজ গাছের সারি তো কোথাও কচি সবুজ।

এক জায়গায় দেখা গেল সবুজ এক জমিতে লাল রঙের ফুল ফুটে আছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে। আমরা থামলাম। এই জমিতে যেতে হবে। গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই অদ্ভুত এক ঘ্রাণ এসে আমাদের ভরিয়ে দিল। ফুল আর ঘাসের মিলিত ঘ্রাণ। ফুলগুলোর নাম কী জানি না। বা আদৌ ফুল কিনা তাও জানিনা। মেরুন লাল। সম্ভবত গো-খাদ্য!

17991051_10211479468175047_2653507320930654227_n
এক মাঠ ফুল। মেরুন লাল, বুনো ঘ্রাণে মৌ মৌ!!

পুরো ক্ষেত থেকে আমরা একটা ফুল নিলাম। দেশে নিয়ে যাবে আমাদের বন্ধু। স্মৃতি হিসেবে।

একটা ফুল নিয়ে আমরা আবার ছুটতে থাকলাম। কোন এক গ্রাম গ্রাম শহরের কাঠে পোড়ানো পিতজা দিয়ে মাথার পোকা দমন করতে হবে…


লাগো- লেক

আপেল পাই- আপেলের পুর দেয়া পিঠা। আমাদের নারিকেল পিঠাকে তাহলে কী নাম দেয়া যায়?

পিতজেরিয়া- পিতজার দোকান।

উচ্চ গতির রাস্তা- আউতোস্ত্রাদা ইতালিয়ানে আর আংরেজিতে মোটরওয়ে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে