আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > বাংলাদেশে সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চার ক্রমবিকাশ: সংকট ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশে সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চার ক্রমবিকাশ: সংকট ও সম্ভাবনা

কাজী মাহতাব সুমন

কাজী মাহতাব সুমন

আবৃত্তির সাংগঠনিক চর্চার বয়স খুব বেশী নয়। বর্তমান পর্যন্ত কম বেশী তিন দশক কাল ধরে বাংলাদেশে সাংগঠনিক আবৃত্তিচর্চা বিস্তৃত হয়েছে। প্রাচীনতম শিল্পের যে ধারনা আবৃত্তি বিষয়ে বলা হয় সেটা মূলতঃ ব্যাক্তি পারদর্শিতার সাথেই সম্পর্কিত। অবিভক্ত ভারতবর্ষের পশ্চিম ও পূর্ববাংলায় যাত্রাপালা, কবিগান, পুঁথিপাঠের সঙ্ঘবদ্ধতা ছিল বটে তবে বর্তমান কালের সাংগঠনিক আবৃত্তির ধারনার সাথে সেগুলো মেলানো দুরুহ হবে। দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে কবিতা আবৃত্তি নাগরিক সমাজে ব্যাক্তির বিশেষ গুণাবলি হিসেবে বিবেচিত হতো ।

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ‘৮০এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেশ কয়েকজন গুণীশিল্পী নিজেদের ভালোলাগা শখ ও রুচির তাগিদ থেকে ব্যাক্তিগত ও বিচ্ছিন্নভাবে আবৃত্তি চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে খুলনা ও ঢাকায় আবৃত্তির দুটি সংগঠনের কথা জানা যায়, তবে এই সময়ের পরে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত ছিলনা। ‘৮০র দশকের মাঝামাঝি ও শেষদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা , চট্টগ্রাম , কুমিল্লা , খুলনা ও সিলেট সহ আরও দু’ একটি জেলায় সাংগঠনিক উদ্যোগে আবৃত্তিচর্চা শুরু হয় ।

বাংলাদেশে তখন সামরিক একনায়কতন্ত্র চলছে। রাজনীতি, সমাজ, শিক্ষাঙ্গন, শিল্প সংস্কৃতিচর্চা সবকিছুতেই একটা অবরুদ্ধ অবস্থা … চাপা ক্ষোভ ! এরকম বিরুদ্ধ পরিবেশে সৃজনশীল তারুণ্য কবিতাকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে কণ্ঠে ধারণ করে। কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে দেশের নানা প্রান্তে কবিতা আবৃত্তির চীৎকার — ” এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না … ” দ্রোহ আর বিপ্লবের স্বপ্নে রাজপথে – সভায়- মাঠে- ময়দানে – মঞ্চে উচ্চকিত কণ্ঠে রক্তজবার মত প্রতিরোধের কবিতা আবৃত্তি হতে থাকে ।

১৯৯০ এর ডিসেম্বরে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের মুহূর্তে বাংলাদেশের সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চা প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এস সি কেন্দ্রিক কিছু সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । ১৯৮৮ সালে ১৭টি আবৃত্তির দল মিলে সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চা দেশব্যাপি বিস্তারের অভিপ্রায় থেকে গঠন করে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। স্বৈরতন্ত্রের পতনের পরে নব্বই এর দশক বাংলাদেশের সাংগঠনিক আবৃত্তিচর্চার বিস্তৃতির দশক । সারাদেশের বৃহত্তর জেলাগুলোতে একাধিক আবৃত্তির সংগঠন গড়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা , বাঙালি জাতীয়তাবাদ , ধর্মনিরপেক্ষতা , বিপ্লব , সাম্য আর মানবতার বাণীপ্রধান কিছু কবিতার বৃত্তাবদ্ধ সম্মিলিত বা বৃন্দ আবৃত্তি দলীয় চর্চায় প্রচলিত হয়। সংগঠনগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বোধ থেকে আবৃত্তিকে কণ্ঠে ধারণ করতে সদস্যদের উদবুদ্ধ করেন। দ্রোহ প্রেম ও বিপ্লবের প্রজন্মকণ্ঠ হিসেবে সাংগঠনিক আবৃত্তি জনপ্রিয় হয় নগরে ।

নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক – দালাল নির্মূল আন্দোলন। এর প্রভাব পড়ে সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চায়। একক আবৃত্তি ও বৃন্দ আবৃত্তি সবকিছুতেই “বিচার চাই ” জাতীয় দাবী আদায়ের উচ্চকিত শ্লোগানধর্মী প্রবনতা বাড়ে । আন্দোলনের সফলতা ও জনপ্রিয়তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে সারাদেশে আবৃত্তির সংগঠন।

বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের বার্ষিক কাউন্সিল ২০১৭ এর সূত্র অনুযায়ি, এ মুহূর্তে সমন্বয় পরিষদের প্রাথমিক ও পূর্ণ সদস্য সংগঠনের সংখ্যা তিন শতাধিক। সদস্য পদ পরবর্তীতে বিবেচনা করা হবে এরকম আবেদন আছে প্রায় অর্ধশত। সংখ্যার বিচারে সাংগঠনিক আবৃত্তির সাফল্য ঈর্ষনীয় হলেও শিল্পের গুণগত মানের বিচারে মুদ্রাস্ফীতির লক্ষন দেখা যাচ্ছে। শত শত সংগঠনের অর্ধেকের বেশী ব্যানার প্রধান – নামসর্ব্বস্ব! ধারাবাহিক চর্চা নেই বললেই চলে । স্থানীয় প্রশাসন বা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন জাতীয় দিবসভিত্তিক কর্মসূচিতে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারাকেই সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে এইসব সংগঠন।

বৃন্দ আবৃত্তি বিভিন্ন মঞ্চে প্রায়শই একঘেয়ে ক্লান্তিকর কিংবা কর্ণপীড়াদায়ক হয়ে উঠছে। কর্মশালা করে কিছু সদস্য জড় করে তাদের দিয়ে উচ্চকিত তাল প্রধান শ্লোগানধর্মী বৃন্দ পরিবেশনা করানো হচ্ছে। মঞ্চে উঠার আগের দিন বা খুব বেশী হোলে দুইদিন আগে সিন্থেসাইজার , বাঁশি , তবলা ইত্যাদি এনে যেনতেন করে বিষয়ের সাথে সঙ্গতিহিন আবহসঙ্গীত সংযোজন করা হচ্ছে । আবার কখনো কখনো নিরীক্ষার নামে মঞ্চে ডিজে পার্টির জিগজাগ আলো , স্মোক লাইট , এলইডি স্ক্রিন ব্যাবহার করছে কিছু আর্থিক সচ্ছল সংগঠন। ঢাকার বাইরে বেশ কিছু জেলা শহরেও এই প্রবনতা দেখেছি । লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে স্পন্সর নিয়ে এইসব অনুষ্ঠানে কেউ কেউ মিলনায়তনের বাইরে লেযার লাইট শো, সেলফি স্ট্যান্ড আর আতশবাজি পুড়িয়ে মানুষের হাততালি মনোরঞ্জন বাহবা কুড়িয়েছে, কিন্তু নিজেদের শিল্পমানসম্মত প্রযোজনা মঞ্চায়ন করে আবৃত্তির দর্শক তৈরিতে কোনও বিশেষ উদ্যোগ দেখা যাচ্ছেনা। একই জেলায় বা স্থানে একাধিক সংগঠনের মধ্যে প্রতিযোগিতাও শিল্পসম্মত প্রযোজনা মঞ্চায়নের সাফল্য বিচারের চাইতে অনুষ্ঠান সংখ্যার বিচারকেই বিবেচনা করছে । এইসব অনুষ্ঠানে প্রস্তুত না হয়েই পারফর্মেন্স করছে নবীন আবৃত্তিকর্মীরা। ভুল উচ্চারণে মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রেখে মঞ্চে পারফর্মেন্স করছে তারা। প্রবীণ পরিচিত আবৃত্তিশিল্পীরাও সেখানে উদ্বোধক প্রধান বা বিশেষ হিসেবে মঞ্চে শুভেচ্ছা ফুল উত্তরীয় স্মারক নিয়ে আয়োজক সংগঠনের ভূয়সী প্রশংসা করে দায়সারা দুয়েকটা কবিতা ( যদি সময় থাকে ) করে চলে আসছেন। ফলে দর্শকের কাছে আবৃত্তির আবেদন নষ্ট হচ্ছে সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চায় এখন চলতি ট্রেন্ড বিনিময় প্রথা। পারফর্মারের গুণগত মান এখানে প্রধান বিবেচ্য নয় । আমি তোমাকে তুমি আমাকে এভাবে বলে কয়ে অনুষ্ঠান আয়োজিত হচ্ছে। এপার ওপার যুক্ত হচ্ছে ।

ফুল… উত্তরীয়… সম্মাননা… সেলফি স্ট্যান্ড… ছবিবন্যা ! শিল্পমান অথবা শিল্পী নির্বাচনে গুণবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এখন বিবেচ্য নয়। কয়টি অনুষ্ঠান হচ্ছে ,কয়দিন ব্যাপি কতজন যুক্ত হচ্ছে সেই সংখ্যাটাই প্রধান বিবেচ্য।যাদের নিয়ে অনুষ্ঠান সেই পারফর্মারদের আর্থিক সম্মানি দেয়ার ন্যুনতম চিন্তাও করছেনা আয়োজক সংগঠন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এরকমও হচ্ছে আমন্ত্রিত শিল্পী স্বখরচায় এসে নিজের মত থেকে খেয়ে অনুষ্ঠান করে চলে যাচ্ছেন । এমতাবস্থায় দর্শক শ্রোতার কাছে শিল্পমানের দায়বদ্ধতার প্রশ্নই অবান্তর ! এ অনেকটা এরকম ‘ আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে …’ শিল্প হলো মানুষের বিশেষ সৃষ্টি । আবৃত্তি হচ্ছে সেই স্বয়ংক্রিয় মাধ্যম যেখানে মন পরিচালিত হয় ব্যাক্তির চিন্তা চেতনার দ্বারা। আর সেই চিন্তা চেতনা গড়ে ওঠে পারিপার্শ্বিকতা থেকে , আর্থ- সামাজিক রাজনৈতিক বিচারধারা থেকে , সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে । এই অবস্থান থেকে থেকে সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চা বাংলাদেশের গণমুখী সাংস্কৃতিক চর্চার অপেশাদারিত্ব ও আবেগের সবটা ধারণ করে নির্মিত হচ্ছে। সংখ্যার বিচারে অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের চেয়ে আবৃত্তি অনেক এগিয়ে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়তে এই সাংগঠনিক সংখ্যার শক্তিকে আমরা ব্যাবহার করতে পারিনি ।

জাতীয় গণমাধ্যম বেতার টেলিভিশনে আবৃত্তি শিল্পীরা এখনও তালিকাভুক্ত নয়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী পাঁচ বছর আগে আবৃত্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনও প্রকল্প বা অফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু হয়নি । সামাজিক রাজনৈতিক দাবী দাওয়া আদায়ে আবৃত্তি মুক্তকণ্ঠে উচ্চকিত হলেও এই শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায়ে আবৃত্তির সংগঠনগুলো সমন্বিত কোনো কর্মসূচি নেয়নি ।

সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চায় নতুন নেতৃত্বের বিকাশ না হওয়াটাও একটা বড় সংকট। সারাদেশে পরিচিতি আছে এরকম মুখগুলো প্রায় দুই দশকের বেশী কাল ধরেই নিজ সংগঠন অথবা জাতীয় ফোরামে নেতৃত্ব দিচ্ছেন । পুরনো দল আভ্যন্তরীণ সমস্যায় ভেঙ্গে নতুন দল গঠন হচ্ছে , সেই নতুন দলেও নেতৃত্বে দিচ্ছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রবীণ মুখ। ফলে প্রজন্ম ধ্যান ধারনার পরিবর্তিত রূপ থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত হচ্ছে শিল্প মাধ্যমটি । তবে সাংগঠনিক চর্চা সীমাবদ্ধতা ও সংকটের মধ্যেও আবৃত্তিকে স্বতন্ত্র মাধ্যম হিসেবে নাগরিক সমাজে পরিচিত করে তুলেছে। মানভাষা ও এর প্রমিত উচ্চারণ শিক্ষায় আবৃত্তির সাংগঠনিক কর্মশালা এখন স্বীকৃত । প্রচার মাধ্যমে উপস্থাপনা, সংবাদপাঠ ইত্যাদি পেশায় কাজ করতে চাওয়া মানুষ আবৃত্তির সংগঠনে যুক্ত হচ্ছে। জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউট , বিসিএস প্রশিক্ষণ কিংবা কর্পোরেট কর্মকর্তাদের পারফর্মেন্স স্কিল উন্নয়নে আবৃত্তি সংগঠন চর্চায় যুক্ত অভিজ্ঞ অনেকেই প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। সাংগঠনিক চর্চা শুরু হওয়ার আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ফিলার হিসেবে দুয়েকটি আবৃত্তি রাখা হতো । সে অবস্থা নেই ।

এখন জাতীয় বৃহৎ যে কোন আয়োজনেই পারফর্মেন্স হিসেবে আবৃত্তি স্বীকৃত। আবৃত্তি শিল্পভাবনা উচ্চারণবিধি নির্মাণকৌশল নিয়ে নিয়মিত বই প্রকাশ হচ্ছে। অডিও ক্যাসেট সিডি ও বর্তমানে অনলাইনে আবৃত্তির এ্যালবাম প্রকাশিত প্রচারিত হচ্ছে । শুধু আবৃত্তি নিয়েই অডিও প্রকাশনা কোম্পানি পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশেই বাণিজ্যিক ভাবে আছে। এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে সাংগঠনিক চর্চার। অনলাইনে আবৃত্তির ভিডিও বা ভিজ্যুয়াল বানানোর ক্ষেত্রে আমাদের অনেক গভীর বোধ থেকে ভাবার অবকাশ রয়েছে। কাটপিস মিউজিক ব্যাবহার করলে সেগুলো কপিরাইট এর আওতায় বাণিজ্যিক বিপণনে বাধাগ্রস্থ হবে। আমাদের এতদিনের যে সব অডিও সিডি ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর দশ শতাংশও মৌলিক মিউজিক নেই। মৌলিক আবহ সঙ্গীত কবিতার সাথে ব্যাবহারের একটা সম্ভাবনার বিশাল দিগন্ত তৈরি হবে এখন অনলাইনে । আর ভিজ্যুয়াল এর ক্ষেত্রেও নান্দনিকতা আর কবিতার ধ্বনিরূপ থেকে রূপমূলে যাওয়ার রয়েছে অসীম সম্ভাবনা ।

কবিতার ধ্বনিচিত্র মানে কিন্তু শুধুমাত্র লাল নীল সবুজ পাঞ্জাবি শাড়ি পড়ে তরুন তরুনি যুবক যুবতির হাত ধরে হেটে যাওয়া পার্কে রাস্তায় পোড়াবাড়ি নদীর কিনারে এমন নয়! নাটক আর চলচ্চিত্রের চাইতেও কবিতার ধ্বনিচিত্র অনেক বেশী প্রতিকি ব্যাঞ্জনা দাবি করে। শিল্প মানুষের বিশেষ সৃষ্টি। শিল্পীর সাধনা স্বকীয়তার নতুনত্বের… অনুকরণের নয়। শিল্পকর্মের অমূল্য লেনদেন হয় মনোজগতে তার পরিমাপ হয় সৌন্দর্যের বিমূর্ত মাপকাঠিতে। শিল্পের উত্তরণ প্যাশন আর ভালোবাসার ভিতর দিয়ে ঘটে । এই ভালোবাসার জন্য নেশা ঘোর লাগে … লাগে সংকল্প। সৃজনভাবনা বৃত্তপথে এসে নাড়া দেয় মনোবৃত্তে প্রাণবৃত্তে দেহবৃত্তে … আদান প্রদানের রূপে প্রকাশিত হয় ব্যাক্তিত্বে । আবর্তন আবৃত্তি পুনঃ পুনঃ পুনরাবৃত্তি চলে অনন্তকাল ! শব্দাভিমুখী হলেই শব্দের আশা-আকাংখা, চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বিষাদ ইত্যাদি যাবতীয় ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে যায় , দৃষ্টি হয়ে ওঠে স্বচ্ছ । চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ধারাবাহিক ভাবে ছবির অনন্ত মিছিল চলে আর আবৃত্তিশিল্পী কন্ঠের সাহায্যে তার বর্ণনা শ্রোতার চিন্তা-চেতনার প্রাথমিক স্তরে পৌঁছে দেয় । শ্রোতা তাঁর চেতনার গভীরে সেটাকে নিয়ে যায় । এ অবস্থানে পৌছতে পারলেই আবৃত্তিকারের উত্তরন ঘটে শিল্পের নন্দন বাগানে

বাংলাদেশের সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চার সমূহ সংকটের উত্তরণে শিল্পিত আত্মপোলব্ধিগুলোর যুথবদ্ধতা ও বিনিময় এখন জরুরী। কবিতা সবসময় গণমুখী নয়। সুক্ষ বোধ ও রুচির সীমিত মানুষের কাছে কবিতা ও এর শিল্পিত উচ্চারণ চিরকালীন। এই ধরনের শ্রোতার কাছে আবৃত্তিকে নিয়ে যেতে মানসম্পন্ন প্রযোজনা ও নির্বাচিত শিল্পীদের বৈচিত্রময় পরিমিত অনুষ্ঠান করার জন্য সাংগঠনিক উদ্যোগ জরুরী। আবৃত্তিশিল্পকে পেশাদারি জায়গায় নিয়ে আসতে হোলে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক চর্চায় আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব মনোভাব পরিহার করে গুণগত মানের সাধনায় লিপ্ত হতে হবে। তিন দশক আগে সামাজিক দায়বোধ ও রাজনৈতিক সচেতনতায় সৃজনশীল তারুণ্যের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশে সাংগঠনিক আবৃত্তিচর্চার যে জমি প্রস্তুত করেছে সেই জমির উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পাল্টে যাওয়া সময়ের ঘাত প্রতিঘাত ধারণ করে বর্তমান তারুন্যকেই হাল ধরতে হবে। নবীন প্রবীণের আলোচনা সংলাপ মতবিনিময় মিথস্ক্রিয়া আবৃত্তিশিল্পের নিরীক্ষা শিল্পমান প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও পেশাদারিত্বের অচলবস্থা কাটিয়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে মনে করি ।

শেষ করছি জালালুদ্দিন রুমি ‘র কাব্য দিয়ে -“শব্দকে উচ্চতা দাও, নিচু রাখো স্বর বৃষ্টিরা ফোটাবে ফুল, না আসুক ঝড়।” নতুন কথা নয় , নতুন কোনও কথাও বলিনি আমি এই প্রবন্ধে, এই সব প্রবাহিত সময়ের প্রতক্ষ্যদর্শী অভিজ্ঞতার নির্যাস ।

এএস

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে