আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > এক স্বার্থপরের চিঠি

এক স্বার্থপরের চিঠি

লেখক

অনিক ইসলাম: 

প্রিয় শৈলী,

যখন বাজারের ব্যাগটা হাতে করে ঘরের পথ ধরেছি তখন কেন যেন একটা দৃশ্যে চোখে আটকে গেলো। লেকের ধারে শ্বেতাঙ্গ এক বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা হাত ধরে বসে আছে। ইংল্যান্ডে এই দৃশ্য যে খুব বিরল তেমনটা নয় কিন্তু দৃশ্যটা দেখে আসলে অনেকদিন অন্ধকার স্টোররুমে বাক্সবন্দী করে রাখা এক টুকরো স্মৃতি গড়িয়ে গড়িয়ে আলোতে চলে এলো। তুমি যেদিন আমার চোখে চোখ রেখে খুব আদেশ দেওয়ার মতন বলেছিলে “এই! এক সাথে বুড়ো হবা?” আমিও কি মনে করে যেন মাথা কাত করে সায় দিয়েছিলাম। হায়! শৈলী, বুড়ো হয়তো আমরা হবো কিন্তু এক সাথে হয়ে উঠবেনা।

ছাত্র জীবনের প্রেমগুলো মানুষের জীবনের ভুল হয় কিন্তু আমি বিশ্বাস করি সেটাই ছিলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু। অন্তত সেই অল্প কিছু বছর আমি বেঁচেছিলাম। আমাদের টং এর দোকানের ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা আর দেশ সমাজ রাষ্ট্র উদ্ধারের বড় বড় বুলি গুলো মনে করলে খুব হাসি পায়। আর এখন? খুব ভালো আছি প্রোফাইলে কিংবা পরিবার ও আত্মীয়দের পরিচয় পর্বে, কিন্তু বেঁচে নেই সেটা আমি নিশ্চিত।

শৈলী, তোমার মনে আছে আমাদের ঝগড়া হলে দুজনই অভিমান ভোলাতে লোভনীয় খাবার খেয়ে সান্ত্বনা দিতাম নিজেদের। তুমি এক পাগল একবার তো গায়ে পড়ে ঝগড়া করলে, খুব ভয় পেয়েছিলাম এই বুঝি ছেড়ে চলে যাও পরে বুঝলাম হাতে কিছু টাকা পেয়েছো এখন বাহানা লাগবে ডায়েটের রুটিন ভেঙে বাধ্যতামূলক সান্ত্বনা খাবার খাওয়ার। বিশ্বাস করো ছোটবেলায় স্কুলের খেলা গুলোতে পুরষ্কার কখনই জিততে পারতাম না, প্রতিবার মুখ কালো করে সান্ত্বনা পুরষ্কার নিয়ে ফিরতাম কিন্তু তোমার সেদিনের ঐ সান্ত্বনা খাবারটা আমার কাছে অলিম্পিক গেমস এর সোনা জেতার থেকে কম কিছু ছিলোনা।

গ্রেজুয়েশনের শেষ বর্ষে এসে যেন মাথায় আস্ত একটা আকাশ ভেঙে পরলো। দায়িত্বের বোঝা এমন একটা জিনিস যা কেউ চাপিয়ে দেয়না কিভাবে যেন আমরা নিজের থেকেই তা তুলে নেই। হঠাৎ খেয়াল হলো জীবনটা টিউশনি করে চালিয়ে দেওয়া যাবেনা। খুব বড় মানুষ হবো এমন ব্রত না করলেও চেয়েছিলাম তুমি আমার পরিচয়টা তোমার বাবার কাছে বিয়ের অনুমতির জন্য নয় বরং বিয়ের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বলবে। থাক নাহয় সেসব কথা।

বাবার গত হবার পরে মামার হাত ধরে এই বিদঘুটে আবহাওয়ার লন্ডনে চলে আসা। তোমাকে খুব স্বার্থপরের মতন একা করে চলে এসেছিলাম। আমি একেবারেই নিশৈলীয় ছিলাম। সাফাই গাইছিনা শুধুই বাস্তবতা বলছি। যেই পরিবারটাকে দাঁড় করাবো তখনি এখানে থাকা নিয়ে খুব ঝামেলায় পরে গেলাম, এই সময় এখানেই বেড়ে ওঠা একটা বাঙালি মেয়ে আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলো। ভালোবাসা থেকে কিনা তা জানিনা তবে নিশ্চিত কৃতজ্ঞতার জন্যই তাকেই বিয়ে করি আমি।

মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে নিজের দেশে ফিরে আসতে, টি এস সি তে আড্ডা দিতে, বলাকাতে ছবি দেখতে কিংবা পুরান ঢাকায় কোন নতুন বিরিয়ানির খোঁজ করতে। কিন্তু আমার অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার খরচটাতো আর দেশপ্রেম বা স্মৃতিচারণা থেকে আসবেনা যেটা আসে এখানকার বীমা থেকে।

প্রতিদিন ভাবি তোমাকে এই চিঠিটা পাঠাবো, কিন্তু পাঠিয়েই বা কি হবে? না আমি অকৃতজ্ঞ হতে পারবো আমার পরিবারের এবং বিপদের সঙ্গিনীর সাথে আর না তোমারো উচিত হবে আমাকে ঘৃণা করার সাধনা থেকে মুক্তি নিতে। সবাই ভালবাসার মানুষের জীবনে হিরো হয়ে থাকতে চায়, আমি না হয় থাকলাম খল নায়ক হয়েই।

মানুষ মারা গেলে তাকে নিয়ে আর অভিমান করতে নেই। আমি তো মারা গেছি সেই কবেই তবে যেদিন এই শরীরটা নিস্তেজ হয়ে যাবে, ব্যবস্থা করে যাবো যাতে এই চিঠিটা পৌঁছে যায় তোমার কাছে। অন্তত তখন আমার দোষগুলোকে ঢেকে দিও তোমার সান্ত্বনার আঁচল দিয়ে। এর আগে হয়তো কখনো পারিনি তবে আমি চাইবো আমার কথা গুলো শেষ হোক তোমার প্রিয় রবি ঠাকুরের কয়েকটি লাইন দিয়ে-

“তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান-

গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায় ।”

ইতি,

রঞ্জু

বি দ্রঃ এই গল্পের লেখকের সাথে “পদ্মদিঘির জলের মত পাপোশ” লেখকের কোন সম্পর্ক নেই, শুধুমাত্র গল্পের প্রয়োজনে, গল্পের স্বার্থে “এক স্বার্থপরের চিঠি”র লেখক পাঠকের কাছে অনুভূতিটি প্রকাশ করেছেন মাত্র।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে