আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > পদ্মদিঘির জলের মত পাপোশ

পদ্মদিঘির জলের মত পাপোশ

লেখক

নাজমুন নাহার তুলি:

আমার সাথে রঞ্জুর খুব প্রেম ছিল। সারাদিন লেপ্টে বসে থাকা সেই লেভেলের লুতুপুতু মার্কা প্রেম। তোমাকে ছাড়া বাঁচবনা, তুমি আমার হৃদয়, কলিজা, কিডনী এরকম অনেকটা। আমি অভিমান করলেই সকাল বিকাল রঞ্জু গ্রান্ড নওয়াবের কাচ্চি, বিউটি লাচ্ছি, বনানির ভেলপুরি, ব্যাচেলর পয়েন্টের চাপ ইত্যাদির কসম কেটে প্রেম বহাল রাখত। টানাটানি মধ্যবিত্ত দুটি আলাদা সংসারে আমরা ছিলাম ঝোলাভর্তি শখ উৎপাদনকারী বিদ্রোহী দুই সন্তান। আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক প্রেম ছিল অলি গলিতে রিকশায় ঘুরাঘুরি আর টং দোকান, ফুটপাতের ধারে বসে দেশ জাতি রাষ্ট্র উদ্ধার করা। রাস্তার পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে দামী দামী গাড়ি চলে যেত। মাঝে মাঝে উৎসুক কেউ কেউ চোখে কয়েক পরত মোটা কালো গ্লাস আর মেকাপে চেহারা ঢেকে যখন রাস্তায় নামতো তখন আমাদের মনে হত, “ইশ কতদিন ভাল কিছু খাইনা, আর আমাদের যখন টাকা হবে তখন আমরা হব ‘ক্লাস বড়লোক’, আমাদের ঘর ঠাসা থাকবে ফ্রয়েড, কামুস, হুগো, অরুন্ধুতি আর কাফকায়। ” আমরা সমাজের অধঃপতন দেখে হা-হুতাশ করে মাসের শুরুতে পকেট ভর্তি টিউশনির টাকা নিয়ে ডাস্টবিনে ভরা শহরের ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরায় বাস্তবিক অর্থে হামলে পড়তাম। আমাদের অনেক আগে থেকেই বসে থাকা আশেপাশের মানুষগুলো যখন আয়েশ করে থাই ফ্রাইড চিকেনে কামড় বসাচ্ছে আর আদর করে পাশের মানুষটির মুখে চাওমিন তুলে দিচ্ছে তখন আমরা রেস্তোরার মুখ কালো করা পোতানো পান মশলা চিবোতে চিবোতে অপেক্ষা করছি ভাংতি টাকাগুলো ফিরে আসার।  কিছুক্ষণ পর ভারী মন আর পেট নিয়ে কোনমতে রিকশায় উঠে বসতেই মনে বিশাল ভাবের উদ্রেক হয় । “কেন যে মানুষ এসব খায়, আর হুদাই পয়সা খরচ করে বুঝিনা।” তৎক্ষণাৎ দুজনেই প্ল্যান করে ফেলি, খেয়ে দেয়ে টাকা না উড়িয়ে এরচেয়ে বরং কিছু সংসারের জিনিস কেনা যাক।

ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় পরের মাসের টিউশনির টাকা দিয়ে শুরু হয় আমার আর রঞ্জুর সংসারের কেনাকাটা। আমি কম দামে রাস্তাঘাটে যা পাই তাই কিনে ফেলি। সেদিন কয়েকটা লুছনি কিনে মনে হলো , টিয়া রঙের ওই লুছনিতেই জীবনের সব সুখ। নিজের জন্য এখন আর কিচ্ছু কিনিনা, দুটো টাকা জমলেই কিনে ফেলি  সংসারের জন্য দুটো গ্লাস, দুটো প্লেট, দুটো চামচ, দুটো বাটি, দুটো বোন প্লেট ইত্যাদি। রঞ্জু সবসময় সাথে থাকে। আর মাঝে মাঝে বোকার মত তাকিয়ে থাকে, মাঝে মাঝে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে “দুটো বোনপ্লেট কেন?” আমি খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে উত্তর দেই “এক বোন প্লেটে আমাদের মত দুই খাদকের খাবারের উচ্ছিষ্ঠাংশ জায়গা হবেনা তাই।” রঞ্জু কিছু বুঝেনা, এমনি এমনি হাসে। আমি তার দুই ঠোঁটের মাঝখানে ছোট কয়েকটি দাঁত দেখে আবার নতুন করে প্রেমে পড়ে যাই।

একদিন বিকেলে শহরের নামকরা এক সুপারশপের কাঁচের দেয়ালের ওপাশে আমার চোখ আটকে যায়।   পদ্মফোঁটা দিঘির জলে যদি রংধনুর একটু আলো পড়ে তাহলে যেমন দেখাবে ঠিক তেমন দেখতে একটি পাপোশ। মনে হচ্ছিলো আমার আর রঞ্জুর সংসারের জন্যই এই পাপোশ। একটা পাপোশ এতটা সুন্দর হয় আমার জানা ছিলনা। ভয়ে ভয়ে দাম দেখি, তারপর আবার বিগলিত হই। একদম কনকা টিভির মত সাধ্যের মধ্যে সবটুকু সুখ। তক্ষুনি দাম মিটিয়ে বগলদাবা করে দ্রুত বেরিয়ে পড়ি। পাছে পাপোশের দাম এটা নয় বলে পথ আটকে দেয় , সেই ভয়ে মোলায়েম প্যাকেটটা বুকে জড়িয়ে রাস্তায় নামি। রঞ্জুর কাছে রাখতে দেই সেটা। সেদিন আমি আর সে অনেকক্ষণ অনেকদূর হাঁটি। রঞ্জু আমাকে রাস্তার বাম পাশে নিয়ে হাঁটে। শক্ত করে হাত ধরে রাখে, মাঝে মাঝে কবিতা শোনায় । আমাদের অনাগত সংসারের ছোটখাট জিনিস গুলো নিয়ে ভেবে ভেবে আমরা সুখের ওম পাই। একচিলতে আকাশ দেখা ছোট ঘরের কল্পনায় বিনিদ্র রাত আমাদের খুব ভোগায়। টকশো আর কবিতার প্যারোডি আমাদের রাতকে নিয়ে যায় ভোরের কাছাকাছি । গরম পিচের রাস্তা আর যানজটের শহরে আমার আর রঞ্জুর সংসারি স্বপ্নের সন্ধ্যা নামে। পরস্পরে মুগ্ধ দুজন বোকার মত ভাবি, পৃথিবীটা কি সুন্দর!

এরপর পার হয়ে গেল হাতে গোনা যায় এমন কয়েকটি ভ্যাপসা গরমের বর্ষা। চোখের কোণায় কুচকানো চামড়া, পাতলা চুল জানান দেয় বয়সের। সকালে অফিস যাব বলে তৈরী হচ্ছি সেসময় তিতিলের ফোন। অবাক হলাম, এত সকালে অফিস থেকে ফোন আসার কথা না। তিতিল মেয়েটা বয়সে বেশ ছোট। মাত্রই জয়েন করেছে। নতুন বিয়ে, নতুন সংসার। ফোনটা ধরলাম, ওপাশ থেকে চাপা আর শান্ত গলায় তিতিল বললো “ আপা , আজ সবার জন্য নুডুলস রান্না করেছি , অফিসে নিয়ে আসব। কিন্তু আমার বাসায় চামচ নেই। কেনা হয়নি এখনো। আপনি কি একটু কষ্ট করে নিয়ে আসবেন আপা?” আমি আচ্ছা বলে ফোন রেখে দেই । মাথাটা চক্কর দেয় হঠাৎ। সারা শরীরের সবগুলো লোমকূপে তীব্র ব্যাথা ছড়িয়ে যায়। পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর মত বেকিয়ে আসে মুখাবয়ব। আমার সামনে আলমারীর মধ্যে একটি খাকি কাগজের বাক্স। যার ভেতরে রয়েছে দুটো মানুষের স্বপ্নের সংসারের দুটো দুটো অনেকগুলো জিনিস , অনেকগুলো চামচ। পাপোশ কেনার কয়েকদিনের মাথায় সেটা কোথায় যেন ফেলে দেয় রঞ্জু। ফেলে দেয় নয়তো হারিয়ে যায়। যা কিছু আমার ছিল তার সবকিছু ইচ্ছে করেই হারিয়ে ফেলে সে। হয়তো কোন এক বিশেষ কারনে ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন তার পছন্দ হয়নি। তাই সে বিশাল ধনী দেশে প্রাচুর্‍্যের সংসার গড়েছে। কম দামী পদ্মদিঘির জলের মত পাপোশ কখনোই তার পছন্দ ছিল না বোকা আমি সেটা তখন বুঝিনি। তবে আজও আমি লবণদানীটাও যত্নে আগলে রেখেছি। বাসা থেকে বের হবার আগে তিতিলের জন্য বাক্সটা সাথে নিলাম। নতুন সংসার তার, খুব কাজে লাগবে সবকিছু। কমদামী দুটি প্লেটে বসে ভাত খাবে দুজনে। গল্প অভিমানের ঝাঁপি খুলবে। অফুরন্ত ভালবাসার সাক্ষী হবে নির্বাক দুটো প্লেট, লবণদানী, দুটো বোনপ্লেট। তিতিলের সংসারের ছবি চোখের সামনে ভাসে আর হেলাল হাফিজের দুটো লাইন মাথায় ঘুরপাক পায় ;

কিছুই হলো না, কিচ্ছু হলো না।

হলো না। না হোক,

আমি কী এমন লোক!

আমার হলো না তাতে কি হয়েছে?

তোমাদের হোক।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে