আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > অপরাধ > শাহজালালে কার্গোতে চুরি: সিণ্ডিকেটে জিম্মি কর্তৃপক্ষ

শাহজালালে কার্গোতে চুরি: সিণ্ডিকেটে জিম্মি কর্তৃপক্ষ

শাহজালালে কার্গোতে চুরি: সিণ্ডিকেটে জিম্মি কর্তৃপক্ষ

ইদ্রিস আলম:

দেশের প্রধান বিমানবন্দর রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কার্গোতে চুরি এখন আর নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে দিনের পর দিন চলে আসা এ চুরিতে জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এমনকি চুরিতে জড়িত রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও। আর সে কারণে কার্গোতে থাকা মালামালের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠেছে প্রশ্ন? যারা মালামাল রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন তারা কতটুকু সঠিক কর্তব্য পালন করছেন? নাকি হচ্ছে উল্টোটা। যারা নিজেরাই দায়িত্বে উদাসীন, সেখানে কি করে রোধ হবে চুরি।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে পিলে চমকানোর মতো সব তথ্য। বিমান বন্দর থানার ঠিক বিপরীতে কার্গো ৮ নম্বর গেট। একটু সামনে হেটে গেলেই চোখে পড়বে শত শত মালের স্তুপ। একপলকে মনে হবে এটি কোন ডাস্টবিন। আকাশের নিচে পড়ে আছে কয়েক হাজার কোটি টাকার পণ্য। এই হলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ের সামান্য চিত্র।

কখনো রোদে পুড়ে, কখনো বা আবার বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে প্রাপকের মালামাল। আর এসব আমদানি পণ্য নষ্ট হওয়ার জন্য বাংলাদেশ বিমানের উদাসীনতা ও অবহেলাকেই দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা।

‘পরের ধনে যেমন পোদ্দারি’, ঠিক তেমনি অন্যের জিনিসে দরদের অভাব, যেন স্বভাবে পরিণত হয়েছে। কথা কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের বেলায় সীমাবদ্ধ। ঠিক তেমনি দায়িত্বে উদাসীন মনোভাব ষোলকলায় পূর্ণ হলেও, চুরির বেলায় বেশ সচেতন কার্গোর চোর সিণ্ডিকেট। ‘যেন সেরের উপর সোয়া সের’। নিজ দায়িত্বে কড়াগণ্ডায় বুঝে নেয় চুরির ভাগ।

বিধি মোতাবেক কার্গো পরিচালনা করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তবে মালামাল ওঠা-নামা ও সরবরাহের কাজটি হয় চুক্তিভিত্তিক কোম্পানির মাধ্যমে। দীর্ঘদিন চলমান এই ব্যবস্থায় পরিচালিত হয় শাহজালালও। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। মূলত: মালামাল চুরির সিণ্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত চুক্তিভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। শাহজালাল কার্গোতে কাজ করে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল, এফ আর এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডসহ কয়েকটি কোম্পানি। এদের নেই কোন নির্দিষ্ট  জনবল। দিন মজুর দিয়েই চলে কার্গোতে মালামাল ওঠা-নামা, রক্ষনাবেক্ষন ও সরবরাহের কাজ। তবে নিত্য নতুন দিন মজুর নয়, এদের বেশিরভাগই কাজ করে কোম্পানিগুলোর পছন্দের মানুষ হিসেবে। অস্থায়ী পাসের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয় এসব দিন মজুর। কেউ কেউ আছেন ৫/৬ হাজার টাকায় মাসিক বেতনে। তবে কাজ শেষে তারা পাস জমা দিয়ে দায় দেনাহীনভাবে চলে যান বাইরে। এতেই সুবিধা চুরির মাল পাচারের।

মালামাল

বিমান সূত্রে জানা যায়,কার্গো কমপ্লেক্সসহ আউট ইয়ার্ডের প্রায় এক হাজার বর্গফুট বেবিচকের নিয়ন্ত্রণে। আর বাকি মাত্র ৭০০ বর্গফুট আউট ইয়ার্ডের জায়গা আছে বিমানের কাছে। এ কারণে ২/৩টি ফ্লাইট নামলেই লেগে যায় ভয়াবহ কার্গোজট।

বর্তমানে বিমানবন্দরে পণ্য রাখার লোকেশনগুলো হচ্ছে- জিরো, ক্যানোপি-১, স্ট্রং রুম ১, ২, মেইন ওয়্যারহাউস-১ ও ২। আর আমদানি-রপ্তানি পণ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে কাস্টডিয়ান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

ফ্লাইট অফিসারের দেয়া লোকেশন অনুযায়ী পণ্য নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার দায়িত্ব বিমানের লোডারদের। শুল্ক ও গুদাম ভাড়া পরিশোধের পর ডেলিভারির জন্য পণ্য বুঝিয়ে দেয়া হয়। তবে অনেক সময় বিমানের লোডাররা ইচ্ছে করে অন্যত্র পণ্য রেখে, পাওয়া যাচ্ছে না বলে অজুহাত তোলে।

সেই মালামাল তারা কিছু অসৎ অফিসারের সহযোগিতায় চুরি, বিক্রি ও নিজেদের কাজে ব্যবহার করে থাকে বলে জানা গেছে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক লোডার বলেন, লোডারের কাজ করি অল্প বেতনে। আমরা ইচ্ছে করলেই চুরি করতে পারি না। এখানে সিণ্ডিকেট আছে। যাদের সঙ্গে ওদের বনিবনা হয়, তাদের দিয়েই চুরি করায়। ৫ বছর যাবত এটাই দেখে আসছি। লম্বা হাত রয়েছে সিণ্ডিকেটের। ইচ্ছা করলেই, তাদের যেমন থামানো যায় না, তেমনি কিছু করাও যায় না।

পরিচয় গোপন রেখে কথা বলেন এক বিমান সিকিউরিটি গার্ড। তিনি বলেন, শত শত লাখ টাকার মালামাল পরে থাকে। চাইলেই কারো হারিয়ে যাওয়া মাল পাওয়া যায় না। ওসব মালামাল এক সময় কিছু অফিসারের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিদের হাতে চলে যায়। তবে এখানে বিদেশিরা ডিউটিতে আসার পর, লোডাররা চাইলেই চুরি করতে না পারলেও, রাঘববোয়ালরা ঠিকই দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে চুরি।

বিমানের একাধিক যাত্রী অভিযোগের সুরে বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শাহজালালের যাত্রীসেবার মান ক্রমেই নিম্নমুখী। সেবার দায়িত্বে থাকাদের একটি অংশ উল্টো হয়রানি করছেন যাত্রীদের। দায়িত্ব পালন আর সেবার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকাকড়িসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। রক্ষকরাই এখন ভক্ষকে রূপ নিয়েছে। যত বেশি হয়রানি তত বেশি টাকা-এটা এখন বিমানবন্দর ও কার্গোর পরিচিত স্লোগান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন নানা বিশৃঙ্খলার কথা। তবে তিনি বলেন, বিমানবন্দরের স্ক্যানিং তল্লাশির সক্ষমতা বাড়ানোসহ যাত্রী ও কার্গো নিরাপত্তায় যা যা করার দরকার তাই করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশের স্ক্যানিং টেকনোলজির আলোকে আমরা সেদিকে যাচ্ছি। কার্গো হাউসে অনিয়ম হচ্ছে তাও সত্য। এর পরও আমাদের চেষ্টার কমতি নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশি-বিদেশি প্রায় ৩০টি বিমান সংস্থা বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করছে এবং ৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করছে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে। কিন্তু বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার না থাকায় যাত্রীরুপি অপরাধীরা সহজেই বাইরে বের হয়ে আসছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শাহজালাল বিমানবন্দর কার্গো ব্রিজে বেশ কিছুদিন ধরে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা। মালামাল যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকায় বিমানে ওঠানামায় সমস্যায় পড়ছে যাত্রীরা। বিমানের ভেতরেও হচ্ছে সমস্যা।

সিভিল এভিয়েশন, বিমান, কার্গো টার্মিনালের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কুরিয়ার সার্ভিস, থানা পুলিশ, বিমান সিকিউরিটি, কাস্টমস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন থেকে পণ্য লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে আরো জড়িত ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক লীগের সিবিএ নেতারাও।

একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ-সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, বিমান নিরাপত্তাকর্মীদের কাজে সমন্বয়হীনতা এবং তাদের যথাযথভাবে মনিটরিংয়ের অভাবে এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমদানি ও রপ্তানি শাখায় কয়েক হাজার কোটি টাকার মালামাল আটকে আছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন ব্যবসায়ীরা।

সিএন্ডএফ এজেন্ট ও কার্গো আমদানিকারক সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টিতে ভেজা ও খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা হদিসবিহীন শতাধিক টন কার্গো পণ্যের মূল্য হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। ২/৩ মাস আগে আসা মূল্যবান পণ্য এখনও খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে। এ কারণে অনেক গার্মেন্টস কারখানার রফতানির আদেশ বাতিল হয়েছে। আবার অনেকে যথাসময়ে তাদের উৎপাদিত পণ্য পারছেন না রফতানি করতে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অনেকে।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দূর্বল আখ্যায়িত করে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন পাঠিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। তাতে বলা হয়েছে, লোডাররা বিমান থেকে মালামাল নামানোর সময় পাচারের ঘটনা হচ্ছে। লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখায়ও অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, আমরা দীর্ঘ ২ বছর যাবত রেড লাইনের সঙ্গে রাত দিন পরিশ্রম করে কার্গোর সর্বোচ্চ নিরাপত্তার সুনাম অর্জন করেছি। সেই দায়িত্ব এয়ারলাইন্সকে দেয়া হয়েছে। বিট্রিশরা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়ে, তাদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। আমরা সব কাগজপত্র ঠিক রেখেই এয়ারলাইন্সের অধীনে কার্গোর দায়িত্ব তুলে দেই। আমরা শুধুমাত্র কার্গোর মালামাল ওঠা-নামার কাজটুকু করি। এর নিরাপত্তার দায়িত্ব বিমানের।

এ বিষয়ে বিমানের কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি দায়িত্বশীল কাউকে।

এআর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে