আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

স্মৃতি ভদ্র

পর্ব-১

বৈশাখের কালবোশেখির তোড় কমে এখন জৈষ্ঠ্যের যখন তখন বৃষ্টির দিন শুরু। কখনো অবিরাম আবার কখনো ঝিরিঝিরি। একটানা বৃষ্টিতে খাল ডোবা সব ভরে যায়। ক্ষেতজুড়ে সদ্য মাটিফুঁড়ে বের হওয়া সবুজ তলিয়ে যায় বৃষ্টিজলে। ক্ষেত আর খালের সন্ধি হয় বৃষ্টির হাতধরে। খালের মাছের অবাধ বিচরণ শুরু হয়ে ক্ষেতের জমা পানিতে। পুঁটি, কৈ, গোলশা, শিং এমনকি শোল মাছ সাঁতড়ে বেড়ায় ক্ষেত জুড়ে।

সাতবাড়িয়া গ্রামের ক্ষেতও আজ বৃষ্টির জলে বন্দী। আর সেই জলে ভেসে বেড়ানো মাছ ধরতে সদ্য কৈশোরে পা রাখা করিম শেখ খালুই কাঁধে। আর তার সাথে পাশের বাড়ির দীপেন্দ্যু বাড়ুজ্জে। বুদ্ধি হবার পর থেকেই করিম আর দীপেন্দ্যু একসাথে বড় হচ্ছে। রাতের ঘুমটুকুন বাদে সারাদিন একই সাথে থাকে দুই বন্ধু। একই সাথে তিন গ্রাম পরের স্কুলে যায়, স্কুল থেকে ফিরে পুষ্করিণীর জলে ঘন্টাভর ডুবসাঁতার, দুপুরে কোনোরকমে দু’নলা ভাত খেয়েই বারিন ঠাকুরের আমবাগানে চিনে চিনে কাঁচামিঠা আম, গুলতি দিয়ে পাড়া আবার কোজাগরী পূর্ণিমায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারু, মোয়ায় পুটলি ভরা সব একসাথে করে দু’জন। যদিও এসব কিছুতে করিম শেখের আগ্রহটা বরাবর একটু বেশী থাকে। করিম শেখের তুলনায় কিছুটা চুপচাপ দীপেন্দ্যু বাড়ুজ্জে। সব কিছুতে করিম শেখের সাথে থাকলেও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে একটু কম। তবে প্রতি সেমুই ঈদে (রোজার ঈদ) আমিনা চাচীর হাতের দুধ সেমুই খাবার উচ্ছ্বাস টা কখনোই অপ্রকাশ থাকে না দীপেন্দ্যুর।

আমিনা চাচী করিমের মা। শেখ আর বাড়ুজ্জে বাড়ির সম্পর্কটা বেশ আদিকালের। শোনা যায় বাড়ুজ্জে বাড়ির এক সময় খুব বাড়বাড়ন্ত ছিল। কুলীন বাড়ুজ্জেরা পুজো আর্চা করে আর শিষ্যদের দান সামগ্রীতে বেশ অবস্থাসম্পন্ন হয়েছিল। আর কোলকাতার এক ধনী শিষ্যের দান করা দুইশ বিঘা মাঠের জমি বাড়ুজ্জে দের দিন বেশ করে পালটে দেয়। আর সেই জমিতে বর্গা দিত শেখেরা। বিভূতি বাড়ুজ্জে দীপেন্দ্যুর ঠাকুর দার বাবা ছিলেন খুব দিলখোলা লোক। আইজুদ্দিন তখনো শেখ হয়ে ওঠেনি। তাকে নিজের জায়গায় বাড়ি করে নিয়ে আসে বিভূতি বাড়ুজ্জে। তখন থেকেই বাড়ুজ্জেদের জমিজমা দেখাশোনা শুরু করে আইজুদ্দিন, পরে আইজুদ্দিনের কর্মঠ দুই ছেলে আস্তে আস্তে নিজেদের জমি করতে থাকে। আর সেই দুই ছেলের আমলেই এনারা শেখ হয়ে ওঠেন।

শেখ হবার পরেও বাড়ুজ্জেদের সাথে এদের সম্পর্ক পালটায় নি। বিভূতি বাড়ুজ্জের তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলেই অকাল প্রয়াত। আর বাকী এক ছেলে বছরের বেশীর ভাগ সময় ভুগতো শ্বাসকষ্টে। আর এই সময় থেকেই একটু একটু করে কমতে থাকে বাড়ুজ্জেদের প্রাচুর্য। আর এর দুই প্রজন্ম পর আসে করিম শেখ আর দীপেন্দ্যু বাড়ূজ্জে। দীপেন্দ্যুর বাবা অবণী বাড়ুজ্জে পুজো আর্চার পাশাপাশি একটি ছোট স্কুলে শিক্ষকতা করেন। আর করিম শেখের বাবা মোতালেব শেখের গঞ্জে বিশাল চালের আড়ত আছে।

একটানা চারদিন বৃষ্টির পর আজ সকাল থেকে একটু ধরে এসেছে বৃষ্টি। করিম খালুই নিয়ে বেড়িয়েছে দীপেন্দ্যুকে সাথে নিয়ে। ক্ষেতের আইলে বসে আছে দীপেন্দ্যু। আর করিম জমির বদ্ধ জল টলটলে জল কাঁদায় ভরিয়ে দিচ্ছে মাছের পিছনে দৌড়ে দৌড়ে। সকাল থেকে প্রায় দুপুর হতে আসলো। এখন পর্যন্ত মাত্র ১০/১২ টা পুঁটি আর হাতের কব্জি সমান বাইম মাছ পেয়েছে করিম। আবার আকাশ কালো হয়ে আসছে দীপেন্দ্যু তাড়া দেয় করিম কে। খালুই নিয়ে উঠতে যাবে ঠিক তখন একটু দূরে টলটলে জলের নিচে একটা বড় মাগুরমাছ। গায়ের জামা হাতে পেঁচিয়ে করিম শেখ প্রায় নিঃশব্দে মাছটার কাছে গিয়া দাঁড়ায়। এরপর খালুই ক্ষেতের পানিতে ডুবিয়ে এক মুহূর্তে ধরে ফেলে মাছটা। করিম শেখের হাতে বন্দি হওয়া মাগুর মাছ লেজ নাড়িয়ে নিজেকে মুক্ত করতে চায়। ঘাড়ের কাটা বিঁধোতে চায় করিম শেখের হাতে। তাড়াতাড়ি করে টুকরির মধ্যে মাছটা ফেলে দেয় করিম শেখ। খলবলিয়ে ওঠে মাগুরমাছ। [ক্রমশ]

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে