আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > সেদিন আকাশ ছিল খয়ের রঙা

সেদিন আকাশ ছিল খয়ের রঙা

নাজমুন নাহার তুলি

নাজমুন নাহার তুলি:

এই শহরটা একদম ঘুমায়না। তীব্র শীতেও কাঁচঘেরা আরামদায়ক গাড়িতে সেলো কিংবা মোজার্ট বাজিয়ে দাপিয়ে বেড়ায় শহরের অলিখিত মালিকেরা। এসময় অত্যাধিক ট্রাফিক কিছুটা লজ্জা পেয়ে আড়াল হয় খানিকটা। তবে একদম যে বিজয়নগরের রাস্তার মত হয় তা একদমই নয়। একটু একটু করে কুয়াশার সাথে নিয়ন আলোর জড়াজড়ি ভেঙ্গে আস্তে আস্তে এগুচ্ছে গাড়িটা।

রাত প্রায় ১ টা , ক্লান্তিহীন শহরে ক্লান্ত সাদেকের চোখের পাতা নেমে আসে বিনা নোটিশেই। বস্তাভর্তি শীতটাও হার মানিয়ে দিচ্ছে বারবার। মাঝে মাঝেই ব্রেক কষে থেমে যাচ্ছে মহান চার চক্রযান। খোলা বিস্তৃত আকাশের রংটা একটু পানের খয়েরের মত লাগে সাদেকের কাছে। এই শহরের আকাশ, বাতাস, পানি, গাছ সবকিছুই অন্যরকম ঠেকে তার কাছে। আসলেই আলাদা নাকি, চোখের ভ্রম কে জানে?

ঘুম তাড়ানোর জন্য আশপাশ ভালভাবে মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করে সাদেক। ঘুম এলে এটা করলে ঘুম চলে যায় সহজে। নির্মানাধীন ভবনে কামলা দেয়ার সময় ঘুম পেলে, আশেপাশের মানুষ, ক্রেন, ইট , সুরকি, কংক্রিট কাটার, ওয়ারিং সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলে সুড়সুড় করে ঘুম চলে যেত তার। কিছুতেই ঘুমানো যাবেনা , কিছুক্ষণ পরেই নামতে হবে। প্রতি সপ্তাহের এটা তার বাঁধা রুটিন, ঢাকায় আসা। এবার অবশ্য ব্যাতিক্রম।

টানা দুমাস পর শহরের বাতাসে নিঃশ্বাস নিল সে। রাত ৯টার দিকে বিজয়নগর থেকে মালের কিছু ট্রাক আসে ঢাকায়, টাকা বাঁচানোর জন্য প্রতি সপ্তাহে এই ট্রাকেই ঢাকা আসে সাদেক। চুরি ছিনতাইয়ের ভয়ে এবার অবশ্য ভেবেছিল বাসে করেই যাবে, সাথে বেশ কিছু টাকা। তবে বাসে এলে বেশ কিছু টাকা অতিরিক্ত চলে যেত। এই টাকাটুকু খরচ করতে মন চায়নি। আলেয়ার এখন টাকাটা খুব দরকার। মেয়েটা এত খেটে খুটে দুটো পয়সা কামাই করে। আর অযথা খরচ করার মত টাকাও তো নেই তাদের।

একটু একটু করে পথের দূরত্ব মাড়াচ্ছে গাড়ি। দমকা হাওয়ায় কাঁপন ওঠে শিরায় শিরায়। থেমে থেমে অপেক্ষার সময় বয়ে যাচ্ছে ধীর গতিতে। ব্যস্ততার খোলস ছেড়ে শহর যেন গা এলিয়ে দিয়েছে ভেজা পিচের রাস্তায়। এমনিতেই  নিয়নআলোগুলো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অপারেশন টেবিলের আলোর মত। যে আলো দ্রুত টেনে নিয়ে যায় অদ্ভুত অন্ধকারে, গহীন অনিশ্চয়তার দিকে। তবে কুয়াশামাখা আলোগুলো তেজহীন  বিস্বাদ তেলের পিঠার মত। নির্বাক মূর্তি হয়ে সময় গুনে ভোরের। থেমে থাকা গাড়ি থেকে সাদেকের চোখ যায় অন্ধকার ফুটপাতের দিকে। আবছা ছায়ায় কিছু দেখে চমকে ওঠে সে। সেজেগুজে অল্পবয়সী কিছু মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে আলোর ঠিক পেছনেই। অন্যরকম একটা আলো তাদের মধ্যে রয়েছে যা সন্তর্পণে আকর্ষণ করে খোলসযুক্ত প্রাণীদের। রাত একটু গভীর হলেই এখানে পসরা বসে রূপপোজীবীনীদের। সেজেগুজে মেকি হাসি আর ভগ্ন মন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তারা ভয়াল ভবিষ্যতের জন্য। মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো সাদেক। কি সুন্দর একেকটা মেয়ে। মলিন মুখগুলো গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে মনে। অবসাদগ্রস্ত মন ডুকরে উঠতে চায় কেন জানি। তাদের দেখলেই মনে হয় কোন এক অজানা কারণে গভীর গোপন প্রকোষ্ঠে জমে আছে হাজার অভিমান। এই মেয়েদের দেখলেই আলেয়ার কথা মনে পড়ে সাদেকের। কোন এক শীতের রাতে এদের মধ্যে থেকেই একজনের সাথে খুব ভাব হয় সাদেকের। সে জানে একমহাদেশ সমান জমানো কথা ছিল আলেয়ার, ছিল এক পৃথিবী সমান স্বপ্ন।  সেইস্বপ্নগুলো প্রস্ফুটিত করার স্বপ্ন দেখেছিল দুজন। গরীবের নাকি স্বপ্ন দেখাও পাপ তাই আর ওসব নিয়ে আর ভাবেওনা সাদেক। সেইসব স্বপ্ন একশীতের গাঁদাফুল গাছের মত শুকিয়ে গেলেও আজো সাদেকের ঘরের ফেরার অপেক্ষা করবে আলেয়া। হয়তো অন্যসব সময়ের মত নীল চুড়ি, লাল টিপ পরে অপেক্ষা করবেনা, তবু মন থেকে সাদেকের অপেক্ষা সে করবেই।

রাত প্রায় ৩টায় কমলা পাড়ায় ঢুকলো সাদেক। অপেক্ষা করার জন্য ছোট একটি ঘর আছে এখানে। একটা ময়লা বিছানা আর কয়েকটা টুল নিয়ে রঙচটা ঘর। সাদেক এই নির্জীব ক্লান্তিকর বিচ্ছিরী শীতের রাতে একা একা বসে থাকবে ভোর পর্যন্ত। ঘরটা অনেকদিনের চেনা সাদেকের। ঘরের প্রতিটি জিনিসের সাথে তার ভালই সখ্যতা। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কিছু তেলচিটচিটে বালিশ ময়লা বিছানা চাদর আর ভাংচুরা চায়ের টেবিল গুলো যেন আগ্রহ নিয়ে সাদেককে দেখছে। দেয়ালে টানানো সাকিব আর শাবনূরের ছবিটার এককোণা খুলে ঝুলে আছে, কাছেই পেটমোটা টিকটিকিটা জিরিয়ে নিচ্ছে নিশ্চিন্তে। সবকিছু আগের মত থাকলেও কিছু ফেলে দেয়া কাগজ আর সিগারেটের প্যাকেটগুলো বরাবরের মতই নতুন। টেবিলের মধ্যে তাকানো যায়না এমন পাতলা বইগুলোও অনেক বছর আগের। কেন যে এরা এসব বদলায়না এরাই জানে। আলেয়ার ঘরে খদ্দের তাই এখানে বসে থাকা ছাড়াও কোন উপায় নেই তার। অপেক্ষা করতে মন খারাপ লাগেনা অবশ্য সাদেকের। আলেয়ার প্রতি রাগ- অভিমান কিছুই হয়না। শুধু বুকের ভেতরে শক্তমুঠো করে চেপে রাখা একটা কষ্ট খুব ভোগায় খুব…বয়লারের আগুনে অর্ধেক শরীর পুড়ে যাওয়ার থেকেও বেশী ভোগায়।

সকাল ৬টা, সাদেককে দেখে অচেনা নিজেকে বারবার হারিয়ে ফেলা আলেয়ার মুখে ঝলমলে রোদহাসি। পরক্ষণেই মিইয়ে যায় আলেয়া। সাদেক টাকার ব্যাবস্থা করতে পেরেছেতো? সাদেক আশ্বাস দেয়। মাত্র গোসল সেরে আসা আলেয়াকে মুগ্ধ হয়ে দেখছে সে। এই মেয়েটাকে দেখলে পৃথিবীর সবকিছু উলট পালট হয়ে যায় সাদেকের। খুব মনে হয়, ইশ সময়টা যদি এখানেই থেমে যেত। প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে হাত ধরে রাস্তায় নামে দুজন। ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠে পৌঁছেও যায় গন্তব্যে। ডাক্তারের ঘরে ঢুকার আগে পুড়ে যাওয়া জীর্ণ হাত দিয়ে চাদরের নিচ থেকে টাকা বের করে আলেয়ার হাতে দেয় সাদেক। একমুহুর্ত কঠিন কিন্তু ছলছল চোখে এক দৃষ্টিতে সাদেকের দিকে তাকিয়ে থেকে ভেতরে ঝড়ের গতিতে ছুট দেয় আলেয়া। ভালবাসা, আস্থা, বিশ্বাস, দুঃখ , আকুতি, যন্ত্রনার সেই দৃষ্টি অনেকক্ষণ মনের গোপনস্থানে নিরব ঘাঁটি গেড়ে থাকে। ধীর পায়ে সাদেক বিশাল হাসপাতালের করিডোর দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে সাধারণ ওয়ার্ড এর সামনে এসে দাঁড়ায়।

এখান থেকে বেশ ভালভাবে দেখা যাচ্ছে রূপাকে। নিঃসাড় পাথরের মত শুয়ে আছে সে। চাদরে ঢাকা পুরো শরীর, মায়া ভরা মুখটা দেখা যাচ্ছে শুধু। যেখানে দৃশ্যয়মান কিছু গভীর ক্ষত। সেদিনের ছোট রূপা আজ কত বড় হয়ে গেছে, একধাক্কায় একদম ক্লাস ফাইভ। মায়ের মত কাটা কাটা থুতনি, সুন্দর দাঁত, আর এত কথা বলতে পারে মেয়েটা, বাপরে। আস্ত পাড়া নাচিয়ে বেড়ানো মেয়েটা কি অসহায় হয়ে চুপচাপ শুয়ে আছে। বালিশে ছড়িয়ে আছে ঘণ স্বর্ণকেশ।

আলেয়া খুব দুশ্চিন্তা করতো, বলতো, “এই মেয়ের ক্যান এমুন পিঙ্গল চুল হইলো কও দেহি, এমুন ঢকের মাইয়াগো কপাল পোড়া থাকে। আর মাইয়্যাগো অতরূপবতী হওন ও ঠিক না, পস্তানো লাগে”।

এইটাই কি সেই পস্তানো? যেদিন রূপার জন্ম হল, এমন সময় ই হবে, সকালের ঠিক পরে পরে, আড়মোড়া দিয়ে শহর জেগেছে ঠিক তখন। অনেকদিনের জমানো টাকা দিয়ে আলেয়ার জন্য একটি রূপার চুড়ি গড়িয়ে দিয়েছিল সাদেক। সুন্দর ঝকঝকে নতুন রূপার চুড়ি পেয়ে আলেয়া খুশিতে মেয়ের নাম রেখেছিল রূপা। যদিও রূপা নামটা সাদেকের তেমন পছন্দ হয়নি, কেমন যেন শহুরে গন্ধ। তবু আলেয়ার খুশির জন্য না করেনি সে। এখন এই নামটাই তার সবচেয়ে প্রিয়। সেদিন আলেয়া ছিল বাইরে, স্কুল থেকে ফিরেই কমলা পাড়ায় এক পিশাচের খপ্পরে পড়ছিল রূপা। অনেকেই বাঁচানোর চেষ্টা করেছে লাভ হয়নি শেষমেশ। ছোট্ট তেজী মেয়েটাকে ভুগতে হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরেই।

জ্ঞান ফিরেনি এখনো, আজ তার অপারেশন। রূপার খুব পাশে গিয়ে বসতে ইচ্ছে করছে সাদেকের, কিন্তু কি ভেবে যেন গেলনা তাকিয়ে রইলো ঠায়। ঝাপসা হয়ে আসা দুটো চোখ ফিরিয়ে নিল সাদেক। উল্টো ঘুরে পাঁচতলা থেকে নিচে তাকালো সে। দুপুর ঘনিয়ে আসছে। ক্রমেই বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। প্রতিদিন এত মানুষ আসে হাসপাতালে! সাদেক ভাবে আর অবাক হয়। অনেকদিন আগে বয়লারের আগুনে দগ্ধ হয়ে সেও এসেছিল এখানে। তখন রূপা খুব ছোট। আলেয়া কোলে করে নিয়ে আসত তাকে।

ছোট রূপা সারক্ষন অবাক হয়ে চারপাশের মানুষ দেখতো। হাতটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর থেকে আজ অবধি কত বছর হল রূপাকে কোলে নেয়না সাদেক। ঠিক এইমুহুর্তে রুপার হাত ধরে বসে থাকতে খুব ইচ্ছা করছে তার। ধীরে ধীরে রূপার বিছানার দিকে এগুচ্ছে সাদেক, বড্ড অথর্ব লাগে নিজেকে।  চারপাশে মানুষের কোলাহল, চিৎকার, আর্তনাদ,কান্না,শীত, স্ট্রেচার, ঔষধ, ইঞ্জেকশন, পা ঘষে হাঁটা সবকিছুর শব্দ তীব্র হয়ে কানে বাজছে। আলেয়া এখনো আসছেনা কেন? মাথার ভেতর দৌড়াচ্ছে রূপা, ঝলমলে রূপা, দূর থেকে ভেসে আসছে রূপার হাসি, অনবরত কথা বলছে রূপা, বাবা… ও বাবা…

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

Leave a Reply

উপরে