আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > জাতীয় > ‘ঢাকা: অ্যা সিটি উইথ নো রুম ফর দ্য ডেড’

‘ঢাকা: অ্যা সিটি উইথ নো রুম ফর দ্য ডেড’

শাহবাগ মোড়, ঢাকা

প্রতিচ্ছবি ডেস্ক:

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এ শহরের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৪ হাজার ৫০০ জন মানুষের বসবাস। এক পরিসংখ্যানে এ জেলার জনসংখ্যা বলা হয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৬১ জন।

গত সোমবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি বিশ্বের অন্যতম এই মেগাসিটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিল ‘ঢাকা, অ্যা সিটি উইথ নো রুম ফর দ্য ডেড।’

ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরের অধিকাংশ কবরই অস্থায়ী। কারণ এখানে কাউকে কবর দেয়ার জন্য নতুন করে আর জায়গা ফাঁকা নেই। কিন্তু যখন কবরের ওপর কবর হয়, তখন তা প্রিয়জনের কাছে কেমন অনুভূতি হয়?

সুরাইয়া পারভীন তার বাবার কবর জিয়ারত করতে যেতে পারেন না কারণ সেটি এখন অন্য এক অপরিচিত ব্যক্তির কবর হয়ে গেছে। বিবিসিকে তিনি জানান, বাবার কবরের জায়গায় গিয়ে দেখি সেখানে এখন নতুন একটি কবর। ওই কবরের জমির মালিকানা এখন তারাই দাবি করছেন। কথাটি শুনে তিনি ভীষণ মর্মাহত হলেন। মনে হল, মাথায় যেন বাজ পড়ল। আর সুরাইয়া যখন কথাগুলো বলছিলেন তার দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছিল। আগে জানলে হয়তো কবরটা বাঁচানোর চেষ্টা করতেন। ওই কবরটিই ছিল বাবার শেষ স্মৃতি। মিরপুরের কালশির ওই কবরস্থানে তিনি এখনও যেতে চান কিন্তু সেখানে তার বাবার কবর আর নেই।

gravyard2

সুরাইয়ার এমন ঘটনা এ শহরে নতুন নয়। একইভাবে তিনি সন্তান, মা ও স্বজনের কবরও হারিয়েছেন। আর এ সমস্যায় অনেকেই চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার স্থায়ী একটি জায়গা পাচ্ছেন না। কাউকে কবর দেয়ার জন্য জায়গা খুঁজে পাওয়াটা মোটেও কঠিন কাজ না।

রাজধানী ঢাকার বনানী, জুরাইন, আজিমপুর, মিরপুর, শাহজাহানপুর, মোহাম্মাদপুরসহ মোট ৭/৮টি কবরস্থান রয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য এ সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অতি নগণ্য। এছাড়াও কয়েকটি পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে। অস্থায়ী কবরগুলো বেশ শস্তা।

কিন্তু শহরের আইন অনুযায়ী, প্রতি দুই বছরে কবরগুলোতে নতুন কাউকে সমাহিত করা হবে। তাই অস্থায়ী কবরে একাধিক ব্যক্তির লাশ দাফন করা হচ্ছে। এভাবেই ঢাকা চলছে। বিষয়টি খুব কষ্টদায়ক হলেও কিছুই করার নেই। মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশে শবদাহ কার্যকর কোন পদ্ধতি নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় ইসলাম তা সমর্থনও করে না।

২০০৮ সাল থেকে স্থায়ী কবরের জন্য জমি বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে। আর আধা স্থায়ী কবরের জমির জন্য খরচ পড়ে ১৫ লাখ টাকার বেশি। যদিও বনানী সেনা কবরস্থানের বিষয়টি ভিন্ন। এখানে তিন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, পরিবারবর্গ ও মুক্তিযোদ্ধারা চির শায়িত হন। এদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় কবরগুলো স্থায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক আয় গড়ে দেড় লাখের কম।

gravyard3

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আজিমপুর দেশের বড় দুটি কবরস্থান। হাজারো কবরে সব দিকেই এর সীমানা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ১২ বছর আগে সাবিহা বেগমের বোন আত্মহত্যা করলে তাকে আজিমপুরে সমাহিত করা হয়। গত ১০ বছর ধরে বোনের কবর রক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য যারা দেখাশোনা করেন তাদের নিয়মিত ঘুষ দেয়ার কথাও স্বীকার করেন।

সাবিহা জানান, যখন ওর দাফন করেছিলাম তখন জানতাম যে কবরের জন্য স্থায়ী জমি বরাদ্দ দেওয়া হয় না। প্রতিবছর আগস্ট বা ফেব্রুয়ারি মাসে যখন নতুন কাউকে কবর দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। তখন কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক ফোন করেন, আমি তাকে মাসিক চুক্তির বাইরেও কিছু টাকা দিয়ে থাকি। আর এভাবেই ১২ বছর ধরে কবরটাকে টিকিয়ে রেখেছি।

ইসলামী গবেষক ও কলামিষ্ট এম.শামসুদ্দোহা তালুকদার জানান, ইসলামে একই কবরে একাধিক ব্যক্তির দাফনের অনুমতি রয়েছে। তবে মানুষ চায় ভালোবাসার মানুষটির কবরে যেন আর কাউকে দাফন না করা হয়। কিন্তু ঢাকায় যা কোনোমতেই সম্ভব নয়। রাজধানীর সবচেয়ে বড় ক্যাথলিক গির্জা হলি রোসারিতে খুব সুন্দর করে সবুজ ঘাসগুলো কাটা রয়েছে। পরিচর্যায় পরিপাটি করে আঁকানো রয়েছে ক্রস।

gravyard4

গির্জার প্রধান যাজক কমল কোরাইয়া বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে ছিমছাম এ চিত্রপটের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর একেকটি গল্প। এত বেশি মানুষ প্রতিদিন নতুন করে ঢাকায় ঢুকছে যে এটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা সমাধিগুলোর খুব যত্ন করি। বেশিরভাগ মানুষই গির্জার ভেতরে সমাধিস্থ হতে চান। কারণ, তারা এটিকে পবিত্র স্থান মনে করেন। কিন্তু আমাদের জমি সীমিত। তাই প্রতি পাঁচ বছর পর পর নতুন কাউকে সমাধিস্থ করতে হয়। তাই মাটি খুঁড়তে গিয়ে প্রায়ই সেখানে হাড় খুঁজে পাওয়া যায়। আর এটিই ঢাকা শহরের কঠিন বাস্তবতা। ৩০০ বর্গকিলোমিটারের সামান্য বেশি আয়তনের যে শহরে দেড় কোটি মানুষের বসবাস।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল জানান, নতুন কবরের জায়গা সংকুলানে এখন মানুষকে নিজ গ্রামের বাড়িতে কবর দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এমনকি এজন্য প্রণোদনার পরিকল্পনাও রয়েছে। ঢাকা শহরে হয়তো এমন অনেকে আছেন যারা তাদের স্বজনদের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে দাফন করতে চান। কিন্তু মরদেহ গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বড় খরচের বিষয় হতে পারে। তাই মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা পরিবহন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনেও কিছু টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করব।

হয়তো এভাবেই ঢাকায় কবর দেওয়া থেকে লোকদের নিরুৎসাহিত করতে হবে। পদক্ষেপগুলো সমস্যা প্রকট হওয়ার হাত থেকে হয়ত বাঁচাবে। কিন্তু সুরাইয়ার মতো আরও যাদের প্রিয়জনের চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার স্থানটি হারিয়েছেন তাদের জন্য এটি খুব বেশি শান্তির সুসংবাদ নয়।

জে এস/এ আর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে