আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > লাইফ-স্টাইল > বাণিজ্যের মোড়কে সপ্তাহ জুড়ে ‘ভালবাসা’

বাণিজ্যের মোড়কে সপ্তাহ জুড়ে ‘ভালবাসা’

বাণিজ্যের মোড়কে সপ্তাহ জুড়ে ‘ভালবাসা’

জোহরা সিজন:

সপ্তাহ জুড়ে ভালবাসার ফুলঝুড়ি! ফেব্রুয়ারির ৭ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত উদযাপিত হয় বিভিন্ন দিবস। অন্যান্য ডে-গুলোর তাৎপর্য না থাকলেও ভ্যালেন্টাইন ডে-র রয়েছে হৃদয়স্পর্শী ইতিহাস। আর বাকি দিনগুলো আসলে বাণ্যিজের মোড়কে ভালবাসার আদিখ্যেতা।

যেমন- ৭ই ফেব্রুয়ারি রোজ ডে; ৮ই ফেব্রুয়ারি প্রপোজ ডে; ৯ই ফেব্রুয়ারি চকলেট ডে; ১০ই ফেব্রুয়ারি টেডি ডে; ১১ই ফেব্রুয়ারি প্রমিজ ডে; ১২ই ফেব্রুয়ারি হাগ ডে; ১৩ই ফেব্রুয়ারি কিস ডে এবং ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে।

এক ইতিহাস বলে এই ঘটনা ঘটে ২৭০ খ্রিস্টাব্দে বিবাহবিদ্বেষী রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের রাজত্বকালে। তাকে বিবাহবিদ্বেষী বলা হয় কারণ তিনি নারী-পুরুষের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে যুদ্ধের প্রতি পুরুষদের অনীহা সৃষ্টি হয়; এরূপ ধারণা থেকেই তিনি এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

অপরদিকে ‘ভ্যালেন্টাইন’ নামের এক ব্যাক্তি, যিনি ছিলেন রোমের খ্রিস্টান গির্জার একজন পুরোহিত। ‘ভ্যালেন্টাইন’ রাজার নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গোপনে নারী-পুরুষের বিবাহ বন্ধনের কাজ সম্পন্ন করতেন। এ ঘটনা জানার পর তাকে রাজার কাছে ধরে নিয়ে আসা হয়। ভ্যালেন্টাইন রাজাকে জানালেন, খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসের কারণে তিনি কাউকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বারণ করতে পারেন না। রাজা তখন তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় রাজা তাকে খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে প্রাচীন রোমান পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে আসার প্রস্তাব দেন এবং বিনিময়ে তাকে ক্ষমা করে দেয়ার কথা বলেন। ভ্যালেন্টাইন রাজার প্রস্তাব মানতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি অনুগত থাকার কথা পুনঃর্ব্যক্ত করলেন। তখন রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন। অতঃপর রাজার নির্দেশে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বাণিজ্যের মোড়কে সপ্তাহ জুড়ে ‘ভালবাসা’

পরে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্মের প্রাধান্য সৃষ্টি হলে গির্জার কমিটি থেকে ভ্যালেন্টাইনকে `Saint’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৩৫০ সালে রোমের যে স্থানে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল সেখানে তার স্মরণে একটি গির্জা নির্মাণ করা হয়। অবশেষে ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পোপ গ্লসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে `Saint Valentine Day’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

আরেক ইতিহাস অনুসারে, কারাগারে অবস্থানকালীন ভ্যালেন্টাইন কারারক্ষীর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কন্যার প্রেমে পড়েন। কথিত আছে, তার অকৃত্রিম ভালোবাসায় সেই কন্যা দৃষ্টি ফিরে পান। তিনি প্রেমিকার উদ্দেশে এক বার্তায় লেখেন, ‘ইতি তোমার ভ্যালেন্টাইন’ (From Your Valentine)। এই বার্তাটি শত শত বছর ধরে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মুখে মুখে সঞ্চারিত হয়ে আসছে।

তবে, ভ্যালেন্টাইন কারারক্ষীর যুবতী মেয়েকে ভালোবাসার কারণে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পোপ গ্লসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ ঘোষণা করেননি। কারণ, খ্রিস্ট ধর্মে পুরোহিতদের জন্য বিয়ে করা বৈধ নয়। তাই পুরোহিত হয়ে মেয়ের প্রেমে আসক্তি খ্রিস্ট ধর্মমতে অনৈতিক কাজ। তা ছাড়া, ভালোবাসার কারণে ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে যেতে হয়নি। কারণ, তিনি কারারক্ষীর মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন কারাগারে যাওয়ার পর। সুতরাং, ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে নিক্ষেপ ও মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাই ভ্যালেন্টাইনের কথিত ভালোবাসা সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে’র মূল বিষয় ছিল না। বরং ধর্মের প্রতি গভীর ভালোবাসাই তার মৃত্যুদণ্ডের কারণ ছিল।

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় উৎসব কিভাবে প্রেমিক-প্রেমিকাদের উৎসবে পরিণত হলো এটা জানার জন্য আমাদের প্রাচীন রোমান পৌত্তলিক ধর্মীয় উৎসব ‘লুপারকেলিয়া’ সম্পর্কে জানতে হবে। ১৪ ফেব্রুয়ারি খ্রিস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক ‘Saint Valentine Day’ হিসেবে ঘোষণার আগে এ দিনটি পৌত্তলিক ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন তারা ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত লুপারকেলিয়া উৎসব পালন করত।

বাণিজ্যের মোড়কে সপ্তাহ জুড়ে ‘ভালবাসা’
খামে মোড়ানো কার্ডে লেখা প্রিয় মানুষটির ভালবাসার কথা

ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন ‘Valentine Day’ কার্ডে Cupid-এর প্রতীক ব্যবহার করা হয়। এ দিনে রোমানদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি ছিল, প্রেমের দেবী জুনুর আশীর্বাদ কামনায় যুবকদের মধ্যে যুবতীদের বন্টনের জন্য লটারির আয়োজন। তারা যুবতী মেয়েদের নাম লিখে একটি বাক্সে রাখত এবং লটারির মাধ্যমে যুবকরা এসে নাম তুলত। লটারিতে যার সঙ্গে যার নাম উঠত এক বছরের জন্য তারা এক সঙ্গে বসবাস (লিভ টুগেদার) করত। এ ধরনের নানা অনৈতিকতা, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাসে আচ্ছন্ন লটারির মাধ্যমে যুবতীদের বন্টনের রীতি ফ্রান্স সরকার ১৭৭৬ সালে নিষিদ্ধ করেছিল। ক্রমান্বয়ে এটি ইটালি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মান থেকেও উঠে যায়। ইংল্যান্ডেও এক সময় এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আধুনিক সভ্যতার এ যুগে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত প্রেমিক উৎসব চালু হলো কিভাবে? ইস্টার এ হল্যান্ড নামক এক চতুর কার্ড বিক্রেতা কোম্পানি প্রথম ‘What Else Valentine’ নামে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আমেরিকান ভ্যালেন্টাইন ডে কার্ড বানায় এবং প্রথম বছরই ৫০০০ ডলারের কার্ড বিক্রি হয়। পরে সুযোগসন্ধানী মিডিয়া কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় ভ্যালেন্টাইন ডে ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

বাণিজ্যের মোড়কে সপ্তাহ জুড়ে ‘ভালবাসা’

সুযোগসন্ধানী নীতিহীন ব্যবসায়ী ও সস্তা জনপ্রিয়তাকামী একশ্রেণীর মিডিয়া ২৫০০ বছরের পুরনো লটারির মাধ্যমে যুবকদের মাঝে যুবতীদের বন্টনের মতো একটি ঘৃণ্য রীতিকে ভালোবাসা দিবসের মোড়কে প্রেমিক-প্রেমিকার উৎসবে পরিণত করেছে।

এই ব্যবসায়ী নীতিকে রীতি হিসেবে পরিচালনা করে আসছে ব্যবসায়ী দল। বর্তমানে এটিকে আরও বর্ধিত করে ভালোবাসা দিবস থেকে ভালোবাসা সপ্তাহে পরিনত করা হয়েছে এবং সপ্তাহের প্রতিটি দিনকে সাজানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন উৎসবের আমেজে।

ক্লিওপেট্রা’র যুগ থেকে প্রচলিত ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত লাল গোলাপকে ভালোবাসার অনুসঙ্গ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করা শুরু হয় চতুর্দশ শতাব্দি থেকে। ভালোবাসার সপ্তাহের একটি দিন নিয়ে নেয় এই ‘রোজ ডে’। যা একটি ব্যবসায়িক মহলের সৃষ্টি। এরই পথ ধরে চলে আসে ‘চকলেট ডে’, ‘টেডি ডে’-র মতো আরও কিছু ‘ডে’।

বাঙালী উৎসব প্রিয় জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের উৎসবে সামিল হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়া বাঙ্গালীর সহজাত বৈশিষ্ট। কিন্তু একটি অশুভ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত প্রেমিক উৎসব, যেটি কিনা কোন ধর্মই সমর্থন করেনা। সেই দিনটিতে ভালোবাসার মতো পবিত্র শব্দটি জড়িয়ে দিয়ে বিশেষ উচ্চারণ করে উৎসব পালন করা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সূত্র: ওয়েবসাইট

জে এস / এম এম

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে