আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > গল্প ‘শোধ’ (পর্ব-১০)

গল্প ‘শোধ’ (পর্ব-১০)

লুনা নুসরাত
লুনা নুসরাত

লুনা নুসরাত:

৯ম পর্বের পর…

অফিসটা গুলশানের সাউথ এভিনিউয়ে বিশাল এক চোখ ধাঁধানো বিল্ডিংয়ের তিনটা ফ্লোর জুড়ে। নীচের লিফটের পাশে ওয়ালে বড় করে বিল্ডিংয়ে আবাস গেড়ে বসা নামী দামী কোম্পানী গুলোর নাম একটা বোর্ডে পেতলের ঝকঝকে অক্ষরে শোভা পাচ্ছে। সেখান থেকেই ফ্লোর নাম্বারটা জেনে নিয়ে লিফটে ঢুকে বাটন প্রেস করলেন আপাত গন্তব্যের। সিকিউরিটি গার্ড দুজন কাঁচের দরজার বাইরে পাহারায়,নাম এন্ট্রি করে ঢুকতে হবে। খাতাটা চেয়ে নিজের নাম লিখলেন মাজহারুল ইসলাম। তিনটে দিন শুধু ভেবেছেন যাবেন কি যাবেন না। মনের সাথে যুদ্ধে শেষে মেয়ের মুখটাই জয়ী হয়েছে। যেন হিমঘরে দেখা সেই পিঁপড়ে খুঁটে খাওয়া মুখটা তাকে আর্জি জানাচ্ছে,বাবা দেখো আমার খুনী যেন পাপের শাস্তি-টা পায়। যেন আইনের ফোঁকর গলে বেড়িয়ে না পরে।

আইন! এ দেশে আইন তো আমাদের মত সাধারন মানুষের জন্য না। ওটা বিত্তবানদের পকেটের ফাঁকে আটকা পরে থাকে। মেয়ের খবরটা দিয়েছিলো পুলিশের লোক। এসেছিলোও পরে। রুটিন মাফিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আবার হয়ত আসবে। ইচ্ছে করেই তিনি ডায়েরী আর তার ভেতরের কথাগুলোর কথা গোপন করেছেন। কি হবে জানিয়ে? কটা দিন তাকেই হয়ত ঘোরাবে থানায়। আর যদি প্রকৃত অপরাধীর দোরে পৌঁছেও যায় তবুও সেখানে শুরু হবে খেলা,টাকার খেলা,ক্ষমতার খেলা। সে খেলায় পরাজয় লাবণ্যর ই হবে তিনি নিশ্চিত। শুধু শুধু যেচে মৃত মেয়েটাকে আরো লজ্জা আর অপমানের সূঁচ বেঁধাতে তার মন চাইলো না। বিচারের ভার তিনি উপরে বসে যিনি কলকাঠি নাড়ছেন তার উপরেই দিলেন। খোদার বিচার সুক্ষ,তাতে তিল পরিমাণ অন্যায় ও প্রশ্রয় পাবে না এ বিশ্বাস তার অটল। তবু তিনি একবার লোকটাকে দেখতে চান,তার মুখে শুনতে চান তার পাপের কথাটা। শুনে যে তিনি কিছু করতে পারবেন বা তার কষ্ট কম-বেশী হবে তা না। তবু তিনি একবার অন্ততঃ মুখোমুখি দাঁড়াতে চান ঐ প্রবল ক্ষমতাধারী লোকটার যে তার ছোট্ট শান্ত নিরুপদ্রব জীবনটাকে দুমরে মুচড়ে তছনছ করে দিয়েছে।

সিকিউরিটি খাতাটায় চোখ বুলিয়ে জানালো,বড় স্যার তো অফিসে নেই,আসেন না তিনদিন হলো। আপনি পরে আসুন।

নেই!মনের সাথে যুদ্ধ করে এতটা পথ এলেন যার সাথে দেখা করবেন বলে সে লোকটা নেই!কবে আসবেন বলতে পারেন?

আমার ঠিক জানা নেই। আপনি বরং ভেতরে রিসেপশনে জিজ্ঞেস করুন,ওনারা বলতে পারবেন। যান ভেতরে,বলে একটা ভিজিটরস্ কার্ড হাতে ধরিয়ে দিলো আর দরজায় রাখা আইডেনটিফিকেশন মেশিনে নিজের কার্ড পাঞ্চ করে দরজাটা মেলে ধরলো। মাজহার সাহেব পা রাখলেন পাপের স্বর্গে। ভেতরটা ঠান্ডা,একটু বেশীই। তার গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। মর্গের হিম ঘর টাও এমনি ঠান্ডা ছিলো সেদিন। পায়ে পায়ে এগিয়ে রিসেপশনের চোখে প্রশ্ন ঠোঁটে হাসি নিয়ে বসে থাকা কেতাদুরস্ত মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিলেন।

:হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ স্যার?
:আই এ্যাম লুকিং ফর মীর সালাউদ্দীন।তারপর বাংলায় স্পষ্ট করে বললেন,আমি মীর সালাউদ্দীন কে খুঁজছি।উনি কি আছেন অফিসে?
:জ্বী না স্যার।এম.ডি স্যার অফিসে নেই।ইন ফ্যাক্ট উনি দেশে নেই এ মুহূর্তে।
:দেশের বাইরে!আচ্ছা,তো উনি ফিরবেন কবে?
:সরি স্যার,বলতে পারছি না।উনি বিজনেস ট্রীপ এ আছেন।ঠিক কতদিন থাকবেন আমাদের এ ইনফরমেশন দিয়ে যাননি।
:আমার ওনাকে ভীষণ দরকার।একটু খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবেন প্লীজ?আমি তখন না হয় আবার আসব।
:সরি স্যার,তারচে এক কাজ করুন। এই যে,এটা অফিসের রিসেপশনের নাম্বার। আপনি কদিন পর এ নাম্বারে কল করে জেনে নিবেন উনি এসেছেন কিনা।
:ঠিক আছে..ঠিক আছে,ধন্যবাদ বলে কার্ডটা হাতে নিয়ে বের হয়ে এলেন অফিস থেকে। সিকিউরিটির কাছে ভিজিটর লেখা কার্ড টা ফেরত দিয়ে লিফটে করে নীচে নেমে এলেন। দুটো সিড়ি নেমে রাস্তায় গরম আর রোদে ঝলসাতে ঝলসাতে ফিরে চললেন বাড়ির দিকে। পেছনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দালানটার দিকে মুখ ফিরিয়ে একবার মনে মনে উচ্চারন করলেন,আমি আবার আসব সালাউদ্দীন…আবার আসব। তোমার মুখোমুখি আমাকে হতেই হবে।

***

খবরটা ঠিক কানে পৌঁছে গেল। কথা কি আর লুকানো থাকে? এ কান ও কান,এ মুখ ও মুখ ঘুরে ঠিক এসে পৌঁছে যায় যার জানা দরকার তার কাছে। এক বান্ধবী র মুখেই শুনতে পেল কাল রাতে সামারার পার্টিতে গিয়েছিলো রাতুল।সাথে ঐ সান অব আ বিচ সাফিন টা।ব্লাডি ডগ,অলওয়েজ প্রভোকস রাতুল ফর সামথিং নিউ। রাতুলের ন্যাচার তার জানা খুব ভালো করেই। আর তাই সে খুব সুক্ষ ভাবে রাতুলকে ঠেলে দেয় তার যাতে ইন্টারেস্ট তার থেকে দূরে।এই যেমন জুলিয়া। জুলিয়াকে সাফিনের ও মনে ধরেছে। সে টারে টারে আছে কখন তাকে পটিয়ে মজা নিবে। সে ইঙ্গিত ও করেছে। জুলিয়া সব বোঝে তবু এ মুহূর্তে কিছু করার নেই। রাতুলকে ধরে রাখতে হলে সাফিনকে এখনই ক্ষেপিয়ে তোলা যাবে না। আগে রাতুলকে একটা স্ট্রং বাইন্ডিংস এর ভেতরে আটকাতে হবে যে করেই হোক। তবে এ কদিনে এটা বুঝেছে জুলিয়া যে রাতুলের মন বড় বেশি চঞ্চল,কখন কি ভাবে কি করে আগে থেকে সে হয়ত নিজেও জানে না। আর তাকে যে এভয়েড করতে শুরু করেছে এটা ক্লিয়ার জুলিয়ার কাছে। তা না হলে স্টেডি গার্লফ্রেন্ড কে না নিয়ে ঐ সাফিন টাকে নিয়ে বিচ সামারার পার্টিতে যেত না।দিনে ফোন করেছে কতবার,রাতুল ফোনটা পিক তো করেইনি একটা রিপ্লাই পর্যন্ত করেনি।

আর সামারা!হাউ কুড শি!ও জানে যে রাতুল রাইট নাউ আমার সাথে আছে তারপরেও কেমন জাল বিছাচ্ছে দেখ!বিচ!
রাতুলের সাথে দেখা করতে হবে আর তার আগে এই সামারা কে একটা শিক্ষা দিতে হবে। রাতুলকে তার কাছ থেকে এতো ইজিলি যেতে দেবে না জুলিয়া। দরকার হলে সাফিনের হেল্প নিব,ও কি চায় সে তো জানাই আছে। ছিটেফোঁটা কিছু দিয়ে যদি ওকে সন্তুষ্ট করা যায় তবে রাতুলকে ধরে রাখতে ও হেল্প করতে পারবে। এমন ইশারাও সাফিন দিয়েছে আগে। ওকে ডান,মনে মনে ডিসাইড করে নিল জুলিয়া। প্রথমে সামারাকে একটা কঠিন থ্রেট দিবে,তারপর সাফিনের সাথে বসবে। এর একটা সুরাহা না করতে পারলে সে শান্তি পাবে না। তাকে এত ইজিলি কেউ ডিচ করবে এটা মেনে নেয়া কঠিন।

কাঠের ওয়াল আলমারী খুলে একটা ছোট বোতল বের করলো। তারপর বোতলে মুখ লাগিয়ে ডিরেক্ট গলায় ঢেলে দিল ভেতরের লাইট গোল্ডেন কালারের লিকুইড টা। উফফ্!পুরো গলাটা যেন জ্বলে গেল। খালি পেটে জিনিসটা পড়তে মুখটা কুঁচকে গেলেও থামলো না। পরপর আরো দুটো চুমুক দিয়ে কর্ক টা ভালো করে আটকে আবার ঢুকিয়ে রাখলো বোতলটা। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলো খুঁটিয়ে। মৃদু হেসে আয়নার সামনে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,

“মিরর মিরর অন দ্যা ওয়াল,হু ইজ দি মোস্ট বিউটিফুল অফ দেম অল?”

মিরর হেসে রিপ্লাই দিল,

“ইটস ইউ …ইটস ইউ সুইটি”

খুশীতে সুন্দর মুখটা আরো সুন্দর হয়ে উঠলো। নিজের উপর আর নিজের সুন্দর ফিগারের উপর তার ওভার কনফিডেন্স। সে তো আর সামারার মত বাপের জোরে এ ক্লাসে বিলং করা মেয়ে না। তার নিজের ট্যালেন্ট আর বিউটি দুটোই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। বাপ বড় ব্যবসায়ী এটা যেমন তাকে সোসাইটিতে এন্ট্রি নিতে হেল্প করেছে তেমনি তার নিজের রুপ আর বুদ্ধির জোরে সে এই ক্লাসের অনেকের মনে আর মাথায় বাসা বেঁধেছে। শুরুটা কম বয়সেই। কো-এডুকেশন স্কুলের লিবারেল আর ফ্রি এনভায়নমেন্ট এ বয়ফ্রেন্ড ছিলো ন্যাচারাল বিষয়। বয়ফ্রেন্ড নেই এমন মেয়ে তো পুরা ঘ্যাম। এ লেভেলে পড়ার সময় একটা বিউটি কনটেস্ট এ পার্টিসিপেট করেছিল। আয়োজকদের সাথে খানিকটা সুন্দর সময় কাটিয়ে বিজয়ী হওয়াটা কেউ ধরতেই পারেনি। তারপর আর কি? নিত্য নতুন কন্ট্রাক্ট,প্রোডাক্ট মডেল, র‍্যাম্প মডেলিং,টুকটাক অভিনয়। তার ফিগার আর চেহারার চটক এড়ানো ছেলেদের জন্য একটু কষ্টকর। চাইলে যে কাউকে সে খেলাতে পারে আর খেলায়ও। তবে এই রাতুলের সাথে তার রিলেশন টার ব্যাপারে সে সিরিয়াস। আর সেজন্যই ওকে হাতে রাখতে ওর সব ডিমান্ড ফুলফিল করেছে। পনের দিনের রিলেশনশিপে যা চেয়েছে দিয়েছে। এখন এত সহজে ফস্কে বেরোবে এটা মানা যায় না। রাতুলকে বাঁধতে কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে জুলিয়া সে আইডিয়া রাতুলের নেই। থাকলে সামারর দিকে নজর দেবার আগে দুবার ভাবতো। রাতুলের পয়সা আর পাওয়ার থাকতে পারে কিন্তু তার আছে যে জিনিস সেটার ব্যবহার কতটা বিধ্বংসী হতে পারে রাতুল জানে না।

আয়নার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারন করলো,

ইউ কান্ট ডিচ মি ডার্লিং,ইউ কান্ট। মাই নেম ইজ জুলিয়া,আই ক্যান গো লং ফর ইউ। বাট,যদি আমাদের মাঝে অন্য কেউ আসে তো,তোমাদের দুজনকেই পস্তাতে হবে। ইয়েস,বোথ অফ ইউ হ্যাভ টু পে ফর ইট। যে আমার হবে না তাকে আমি অন্য কারো হতে দিব না,কখনোই না।

স্লিভলেস পাতলা নাইটিটা গা থেকে খুলে ফেলে দিলো জুলিয়া,

“মিরর মিরর অন দ্যা ওয়াল,হু ইজ দি মোস্ট বিউটিফুল অফ দেম অল?”

মিরর হেসে রিপ্লাই দিল,

“ইটস ইউ …ইটস ইউ সুইটি”

আয়নার দিকে একটা চোখ টিপে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে শাওয়ার নিতে ঢুকে পড়লো জুলিয়া।

চলবে…

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে