আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > আইন-মানবাধিকার > ২০১৭: ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ আদালত অঙ্গন

২০১৭: ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ আদালত অঙ্গন

২০১৭: ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ আদালত অঙ্গন

আর্য সুবর্ণ:

বছরের পুরোটা জুড়েই আলোচনায় ছিলো আদালত অঙ্গনের নানা ঘটনা। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনীতিতেও। পরে তার ছুটিতে যাওয়া ও পদত্যাগের ঘটনাও ছিলো আলোচিত। এছাড়া বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য রায়ও ছিলো বছর জুড়ে।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা  যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন তা নিয়ে সৃষ্টি হয় নানা বিতর্ক। সেই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও।

এরই এক পর্যায়ে ছুটিতে যান সিনহা। পরে সিনহার অনিয়মের তথ্য জেনে তার সাথে একই বেঞ্চে বিচার কাজে অংশ না নেয়ার কথা জানান আপিল বিভাগের কয়েকজন বিচারপতি। এরই এক পর্যায়ে পদত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা।

যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের কারণে এত আলোচনা বছরের শেষ দিকে অবশ্য ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি তুলে দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ৯৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে বিচারকের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। যেটি ১৯৭২ সালের সংবিধানেও ছিল।

বছরের ঐতিহাসিক রায়ের মধ্যে বিডিআর বিদ্রোহের রায় আদালত অঙ্গনের আলোচিত রায়ের মধ্যে অন্যতম।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানার বিডিআর সদর দফতরে (বর্তমানে বিজিবি)  সংঘটিত হয় নারকীয় হত্যাকাণ্ড। যা ইতিহাসের নজিরবিহীন। হত্যা মামলার রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন  হাইকোর্ট। ১৮৫ জনকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট।

এক মামলায় এতজনকে মৃত্যুদণ্ড ও অন্যান্য সাজা দেয়ার নজির বিশ্বের আর কোথাও নেই। এদিক থেকে দেখলে এবং ঘটনার ব্যাপকতা ও নৃশংসতাকে আমলে নিলে এটি একটি ঐতিহাসিক রায় হিসেবে বিবেচিত হবে নিঃসন্দেহে।

উল্লেখ্য, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রাহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। দেশের অন্যান্য স্থানেও বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়েছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিডিআর সদস্য। বস্তুত এ ঘটনা ছিল দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর এক মারাত্মক আঘাত। তাই বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞের সুষ্ঠু বিচার শুধু ন্যায়বিচারের স্বার্থে নয়, দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধেও রায়টিকে যুগান্তকারী হিসেবে দেখছেন সিনিয়র আইনজীবীরা।

বছরটা অবশ্য শুরু হয়েছিলো নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলার রায় দিয়ে। ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার রায় ঘোষণা করেন নিম্ন আদালত। একসঙ্গে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। তাদের মধ্যে ২৫ জনই ছিলো র‍্যাব কর্মকর্তা ও একজন সাবেক কাউন্সিলর। ওই ঘটনার তিন বছর পর উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সে গেলে আদালত ১৫ জনের মৃত্যদণ্ডাদেশ বহাল রাখে আর বাকী ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন। এ রায়ে প্রমাণ হলো আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়।

দুর্নীতি মামলায় বছর জুড়েই বিশেষ জজ আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে। অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থপান শেষের দিকে। এখন মামলাটি রায়ের পর্যায়ে এসেছে।

জনস্বার্থে বেশ কিছু রায়ও মনে রাখার মতো। হাইড্রোলিক হর্ন উৎপাদন বন্ধসহ হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের রায়গুলো ছিলো উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নির্মাতা তারেক মাসুদের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তিনমাসের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে বলা হয় ওই রায়ে। এর মধ্যে বাস মালিকই দেবেন ৪ কোটি ৩০ লাখ ৮৫ হাজার ৪শ ৫২ টাকা, চালক জমির উদ্দিন ৩০ লাখ টাকা এবং রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স কোম্পানি দেবে ৮০ হাজার টাকা। এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ।

এছাড়া পাইপের ভিতরে পড়ে নিহত শিশু জিহাদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশও ছিলো মনে রাখার মতো।

সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে গ্রিক দেবি থেমিসের মূর্তি সরিয়ে অন্যত্র স্থাপন করার ঘটনাও আদালত অঙ্গনের আলোচিত ঘটনার অন্যতম। মূর্তি সরাতে বার বার দাবি জানিয়ে আসছিলো হেফাজতে ইসলাম। পরে মূর্তিটি সরিয়ে ফেলা হয়। এর প্রতিবাদও জানায় প্রগতিশীল সংগঠনগুলো। পরে মূর্তিটি এনেক্স ভবনের সামনে স্থাপন করা হয়।

অনেক আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট হয়েছে। এখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল ওহাহাব মিঞা। নতুন বছরের শুরুতেই হয়ত নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হবে।

এ এস/এ আর/ডিডিআর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে