আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > মিশেল ফুকো: শাসনপ্রণালী ও জৈব ক্ষমতার কথকতা

মিশেল ফুকো: শাসনপ্রণালী ও জৈব ক্ষমতার কথকতা

লেখক: সারোয়ার তুষার
লেখক: সারোয়ার তুষার

“আমার ভূমিকা হলো- এবং তা হয়ত বাড়িয়ে বলা হবে- মানুষকে দেখানো যে, তারা যেটুকু অনুভব করে তারচেয়েও তারা বেশি স্বাধীন। লোকে যা সত্য ও প্রামাণিক বলে মেনে নেয়, ইতিহাসের নিরুপণ মুহুর্ত থেকে যে বিষয়গুলো পুঞ্জিভূত হয়ে ওঠে সেই তথাকথিত সাক্ষ্যপ্রমাণের সমালোচনা হতে পারে এবং তাকে ধ্বংসও করা যেতে পারে। একজন বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা হলো মানুষের বদ্ধমূল ধারণাকে পালটে দেয়া।“

বিংশ শতাব্দী নানা কারণে মানব ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই শতাব্দীতেই পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে ঘৃণ্যতম দুটি বিশ্বযুদ্ধ,  আবার এই শতাব্দীতেই রুশ বিপ্লব, চীন বিপ্লব সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তের মুক্তিকামী জনগোষ্ঠী ও জনগণের নবতর উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। এক রুশ বিপ্লবকেই ঐতিহাসিকেরা বর্ণনা করেছেন- ইসলামের উত্থানের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, এই বিপ্লব হলো খ্রিস্টের জন্মের পরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা- ইত্যাদি বিভিন্ন অভিধায়।

hhhদুটি বিশ্বযুদ্ধে ক্লান্তধ্বস্ত ইউরোপ যখন ধুঁকছে, প্রচলিত ও প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তা-ভাবনা যখন খুব বেশি এগিয়ে নিতে পারছে না মানুষকে, তখন বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে আবির্ভূত হলেন যিনি, যাঁর প্রতিবেদনে চিন্তার প্রচলিত সব সীমান্ত ও বিশ্লেষণ ভেঙে পড়েছে,  ইতিহাস ও দর্শনের যুগপৎ পাঠ নিয়েছেন যিনি, তিনি মিশেল ফুকো- আধুনিক সময় ও সমাজের ‘চিন্তা পদ্ধতির ইতিহাস’ এর অধ্যাপক।

মিশেল ফুকোকে অনেকেই বলে থাকেন ‘ধোঁয়াটে তাত্ত্বিক’, কেউবা তাঁকে মনে করেন ‘জটিল ও দুর্বোধ্য’, কারো কাছে তিনি ‘তত্ত্বজ্ঞানী’ কিংবা ‘ফুকোশীয় চিন্তার জনক’। বর্তমান প্রবন্ধে ফুকোকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। আমরা তাঁর তত্ত্ববিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি ডিসকোর্স ‘গভার্নমেন্টালিটি’ ও ‘বায়ো পাওয়ার’ নিয়ে এখানে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। তার আগে ‘ডিসকোর্স’ শব্দটিকেও আমরা ব্যাখ্যা করতে চাই। ডিসকোর্সের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘কথকতা’ ব্যবহার করবো। ডিসকোর্সকে জ্ঞানকান্ডের একেক শাখায় একেকভাবে আলোচনা করা হয়। আমাদের বর্তমান প্রবন্ধের জন্য ডিসকোর্স বা কথকতা বলতে আমরা বুঝবো ভাষার মধ্য দিয়ে চিন্তা প্রকাশের রাজনৈতিক বিন্যাস। অর্থাৎ চিন্তার রাজনৈতিক সংগঠনের একটা উপায় হলো কথকতা। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাকরণই একমাত্র নিয়ামক নয় বরং তার বাইরেও কিছু পলিটিক্যাল নিয়ম থাকে যা আমাদের ভাষাকে, আমাদের কথাকে শাসন করে। এমনকি আমাদের চিন্তাভাবনাকেও শাসন করে কারণ ভাষা ও চিন্তা খুব আলাদা কিছু না। ‘কথকতা’ কোন বিষয়ে কী ভাবতে হবে, কী বলতে হবে এবং কী বুঝতে হবে তা রাজনৈতিকভাবে নির্ধারণ করে দেয় এবং প্রতিটি বিষয়েরই আলাদা আলাদা ‘ডিসকোর্স’ বা ‘কথকতা’ থাকে।

শাসন নিয়ে কথা হচ্ছিলো। ইংরেজি ‘Govern’ শব্দটিকে বাংলায় ‘শাসন’ বলা হয়। আবার অনেক সময় পরিচালনা করাও বোঝানো হয়। নিজেকে ‘গভার্ন’ করা প্রয়োজন বলতে নিজেকে পরিচালনা করাই বোঝায়। ব্যাপক অর্থে ফুকো তাই ‘গভার্নমেন্ট’ কথাটিকে বলেছেন ‘কন্ডাক্ট অভ কন্ডাক্ট’ বা আচরণের পরিচালন পদ্ধতি। অর্থাৎ গভার্নমেন্ট হলো এমন এক কার্যপ্রণালী যা মানুষকে, মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ও প্রভাবিত করে। এই পরিচালনা তাই ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির হতে পারে, ব্যক্তির সাথে গোষ্ঠীর হতে পারে কিংবা রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।

কলেজ দ্যা ফ্রান্সে অধ্যাপক থাকাকালীন ফুকো নানা বিষয়ে বক্তৃতা রাখেন। এসব বক্তৃতায় তিনি শাসনের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করেন। এসব বক্তৃতামালা, অন্যান্য সময়ে বিভিন্ন লেখালেখি ও সাক্ষাতকারে ফুকো সম্পূর্ণ নতুন একটি শব্দ প্রবর্তন করেন- ‘গভার্নমেন্টালিটি’, যাকে আমরা বলতে পারি শাসনপ্রণালী, শাসনতান্ত্রিকতা কিংবা প্রশাসনিকতা। ফুকো শাসনকে আনুষ্ঠানিক বা কেতাবী সংজ্ঞায় না বুঝে তার কার্যকলাপ, অভ্যাস বা প্রয়োগের মাধ্যমে বুঝতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে বোঝার ক্ষেত্রে ‘শাসনপ্রণালী’ কথকতাটি এখনো পর্যন্ত অবিকল্প। শাসনপ্রণালী প্রচলিত অর্থে শাসন বা গভার্নমেন্ট নয় বরং এটা হচ্ছে সেই প্রকৌশল যার মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্র তার শাসনের ন্যায্যতা তৈরি করে। এটি জনসাধারণ বা রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে শাসিত হবার মানসিকতা তৈরি করে। রাষ্ট্র, আইন ও ক্ষমতানীতির যৌক্তিকতা তৈরি করে। ফুকোর এই ডিসকোর্সের ফলে ক্ষমতা সম্পর্কে চিরায়ত সকল ধ্যান ধারণাই বদলে গেছে। ক্ষমতাকে তাই এখন আর স্রেফ রাষ্ট্রীয় আইন, আমলাতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব দিয়ে বুঝলে হবে না, ক্ষমতা প্রয়োগ বা শাসন ক্ষমতাকে বুঝতে হবে তার বিস্তার দিয়ে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রায় সব প্রতিষ্ঠান যেমন- পরিবার, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, পাগলাগারদ, কারখানা ইত্যাকার সব প্রতিষ্ঠানেই ক্ষমতা সর্বব্যাপ্ত। এই ক্ষমতা সবার এবং প্রত্যেকের জন্য হতে চায়।

41uwxwzhknl-_sx311_bo1204203200_প্রাচীন বা মধ্যযুগে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন রাজা। তিনিই সকল ক্ষমতার উৎস ছিলেন। তাঁকে অমান্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান ছিল এবং সেটা প্রয়োগ করা হতো প্রকাশ্যে, সর্ব সম্মুখে। যাতে করে প্রজাগণ বুঝতে পারে সার্বভৌম ক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করলে কী ভয়াবহ শাস্তি পেতে হয়। ফুকো তাঁর ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ: দ্যা বার্থ অভ দ্যা প্রিজন’ গ্রন্থে দেখান যে কিভাবে রাজতন্ত্রের পতনের সাথে সাথে পাল্টে গেল শাস্তির প্রকৌশল। আঠারো শতকে বুর্জেয়া বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর ইউরোপের সর্বত্রই প্রকাশ্যে এই শাস্তি প্রদানের নিষ্ঠুরতা নিয়ে শোরগোল শুরু হয়। বলা হয় এটি চরম অমানবিক ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির কাজ। ফুকো বলেন, রাজতন্ত্রের শেষের দিকে প্রজাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল, শাস্তি প্রদান অনুষ্ঠান চলাকালে প্রজাবিদ্রোহ দেখা দিতে শুরু করলো। ফলে আবিষ্কৃত হলো ‘শাস্তির নম্র উপায়’। জন্ম নিলো কারাগার। অপরাধীকে এখন থেকে আর শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হবে না বরং অপরাধের ধরণ ও মাত্রা অনুযায়ী তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সমাজ থেকে আলাদা করে রাখা হবে। উল্লেখিত গ্রন্থে ফুকো কেবল কারাগারের জন্ম ও উপযোগিতার বর্ণনাই দেন নি, সমাজ জীবনের প্রতিটি সংগঠিত রূপ-  পরিবার, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সেনা ছাউনির মতো প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে কারাগারের সাথে তুলনা করেছেন।

 ফুকোর মতে আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র সমাজের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জালের মতো বিস্তার লাভ করেছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাই আর নির্দিষ্ট কোন ক্ষমতাকেন্দ্র নেই। রাজতন্ত্রের যুগের মতো তাই রাজার ক্ষমতা হরণ করার মধ্য দিয়ে যেভাবে রাজতন্ত্রের পতন সম্ভব হয়েছে, সেভাবে কোন বিশেষ গোষ্ঠী বা অধিপতি শ্রেণীর গদি উল্টে দিলেই রাষ্ট্র ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ে না। সমাজে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে রাষ্ট্র অনুশাসনতন্ত্রের চর্চা ও বিস্তার ঘটাচ্ছে। উল্লেখিত প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রত্যেককে নজরবন্দি করা। কারণ নজরবন্দি করা গেলেই অনুশাসনবদ্ধ করা সম্ভব হয়। ছাত্রকে স্কুলে, শ্রমিককে কারখানায়, রোগীকে হাসপাতালে, আইনভঙ্গকারীকে কারাগারে নজরবন্দী করা হয়। এই শাসন শারীরিক বলপ্রয়োগ করে না, এটি মানুষের চেতনায় কাজ করে। অনুশাসনের উদ্দেশ্য সার্বভৌম শক্তির ভয় দেখানো নয়, তার উদ্দেশ্য স্ব-শাসন। ফলে আধুনিক সমাজের মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেই বুঝে নেয় তার অনুশাসনের মধ্যে থাকা উচিত। কারণ এতে ‘কল্যাণ’ রয়েছে। এই হলো আধুনিক সমাজব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতার আদর্শ সার্বভৌমত্ব নয় বরং কেন্দ্রহীন সর্বব্যাপী এক অনুশাসনতন্ত্র, যেখানে সকলেই স্বাধীন, অথচ স্বাধীনভাবেই তারা অনুশাসনের শৃঙ্খলে যেতে রাজি। ফুকোর মতে আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র কেবল সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করে না, বিচ্ছিন্ন করে রাখে না, এটি সত্য ও বাস্তবতা উৎপাদন করে। এটি নির্ধারণ করে বস্তুর বিচরণসীমা, ‘আদর্শ’ সত্যের তন্ত্রসমুহ।

আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে ফুকো তুলনা করেন ‘ওয়াচটাওয়ার বা প্যানপটিকন’ এর সাথে, যেখান থেকে ‘বিগ ব্রাদার (রাষ্ট্র)’ প্রত্যেক নাগরিককেই নজরের আওতায় রাখে। ফুকো প্রশ্ন করেন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘নিও লিবারাল কারাগর’ কেন বলা যাবে না। সংক্ষেপে এই প্রকৌশল বা মেকানিজমই হচ্ছে শাসনপ্রণালী যার প্রকটতা ও প্রাবল্য ছড়িয়ে পড়েছে বন-জঙ্গল, নদী-নালা থেকে শুরু করে প্রাণ-প্রকৃতির সর্বত্রে।

প্রবন্ধের শুরুতেই রুশ বিপ্লবের কথা এসেছে। আমরা কি বলতে পারি শুধুমাত্র সনাতন সার্বভৌমত্বের উপর নির্ভর করাতেই সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকতে পারলো না?  পশ্চিম ইউরোপীয় ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রসমূহে যতটা নিখুঁত ও সুনিপুণভাবে শাসনপ্রণালীর মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে বা হচ্ছে- সোভিয়েত রাষ্ট্রে তা করা যায় নি। তার মানে সোভিয়েতের পতন যতটা না সমাজতন্ত্রের পতন, তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতার প্রকরণগত ভিন্নতার পরিণাম।

indexমিশেল ফুকোর ভাবনার জগতে আরেকটি প্রভাবশালী ডিসকোর্স হচ্ছে- ‘বায়ো পাওয়ার’ বা ‘জৈব ক্ষমতা’। ফুকোর মতে ক্ষমতার একটি জৈবিক অস্তিত্ব রয়েছে। এটি হচ্ছে ক্ষমতার কিছু টেকনোলজি যা দিয়ে নাগরিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই জৈব ক্ষমতাকে ফুকো মনে করেন আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের কার্য সাধনের অন্যতম প্রধান একটি উপায়। বায়ো পাওয়ারের মাধ্যমে শাসনপ্রণালী নাগরিকের শরীরের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের শরীর রাজনৈতিক কলাকৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পুলিশ, আইন-আদালত, কারাগার, ক্লিনিক থেকে শুরু করে সব ধরণের বল প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্র জৈব ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। শাসিত মানুষের শরীরের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য।

মানুষের শরীরের উপর আইন-রাষ্ট্রের ক্ষমতা টিকা দেয়া থেকে শুরু করে গ্রেফতার, রিমান্ড, হাজতে প্রেরণ এমনকি হত্যা পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে বোঝা অবশ্যই জরুরী যে মানুষের শরীরের উপর রাষ্ট্রের এই ক্ষমতা প্রয়োগ মোটেও আইনী ক্ষমতা নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা।

গুম-খুন, এনকাউন্টার- ক্রসফায়ারের মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যক্তিকে ‘দেহ’তে পরিণত করে। এক্ষেত্রে মিডিয়া ও রাষ্ট্রের প্রেস ব্রিফিং এর ভাষার ডিসকোর্সও খেয়াল করার মতো- “মৃতদেহ উদ্ধার করা গেছে”। মৃতদেহ কী করে ‘উদ্ধার’ করা হয়? কেন হয়? ব্যক্তি উদ্ধার না পেয়ে তার দেহ কী করে ‘উদ্ধার’ পায়? তার মানে রাষ্ট্রের বায়ো পাওয়ারের লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষকে, নাগরিককে, ব্যক্তিকে দেহে পরিণত করা। এটাই রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা, বায়ো পাওয়ার। আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রে ব্যক্তির উপর ‘সার্বভৌমত্ব’।

 উল্লেখ করা আবশ্যক যে, রাষ্ট্র ও তার শাসনপ্রণালীর স্বার্থেই ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি মানুষ ক্রমেই ‘সন্ত্রাসী’, ‘জঙ্গি’ ইত্যাদি বধযোগ্য আখ্যা লাভ করে। কেবলমাত্র ‘সুনাগরিক’ নিয়ে রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না, সর্বাবস্থায় অনুশাসনের ছকে আনার জন্য চাই ‘কু-নাগরিক’। এই কু-নাগরিকদের ‘ন্যায়ের পথে’ আনা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। তার মানে হচ্ছে রাষ্ট্রকে কু-নাগরিক উৎপাদনও করে যেতে হয় ক্রমাগত। অন্যথায় জৈব ক্ষমতা প্রয়োগের অভাবে রাষ্ট্রের হিংস্র দাঁত-নখ-থাবা নিষ্ক্রিয় ও অকেজো হয়ে পড়ার আশংকা থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নিজেরই ‘শুকিয়ে মরার’ ভয় থাকে।

নতুন নতুন সমীক্ষা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগের শাসনতান্ত্রিক জ্ঞান অর্জন করে থাকে। প্রত্যহ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক জ্ঞান বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য মানুষ রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। ব্যক্তিগত, পারিবারিক,  সামাজিক এমনকি মানসিক কার্যকলাপ প্রভৃতির জন্য হাসপাতাল, বিদ্যালয়, মিউনিসিপালিটি, খাদ্যদপ্তর, অর্থদপ্তর, আদালত, পোস্ট অফিস এমন কোন না কোন প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করতে হয়। সাম্প্রতিককালে সমাজ গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা রিসার্চ সমীক্ষার নথিবদ্ধ তথ্যাদি এক বিশাল শাসনতান্ত্রিক জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত হচ্ছে যার উপর ভিত্তি করে জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ ও অনুশাসনবদ্ধ করার নিত্য নতুন কৌশল আবিষ্কৃত হচ্ছে। কেবলমাত্র রাষ্ট্র নয়, এছাড়াও বহু প্রতিষ্ঠান এই ব্যাপক শাসনপ্রণালীর অংশ।

ফুকোর মতে, যত ধরণের প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান রয়েছে তাদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতি হলো জীবনের উত্তরোত্তর বিকাশ সাধন। কিন্তু আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সে কথা বলে না। জীবনকে সূক্ষ্ম ও স্থূল, দৃশ্য ও অদৃশ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবদমন করাই প্রাতিষ্ঠানিক অধিপতি ডিসকোর্সের একমাত্র লক্ষ্য। জীবনের পরিচর্যা নয়, জীবনকে বশে আনাই এদের উদ্দেশ্য। ফুকো আরো দেখিয়েছেন প্রাচীন গ্রীক সমাজে প্রচলিত বিবিধ ধরণের রাজনৈতিক সংগঠন কখনো নাগরিকের জৈবিক প্রয়োজনের উপর খবরদারি করত না। কিন্তু সমসাময়িক রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানসমুহ নাগরিকদের জৈবিক প্রয়োজনকে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জ্ঞান, যৌনতা, ব্যাধি, স্বাস্থ্য প্রকৌশল সহ জীবনঘনিষ্ঠ প্রতিটি অনুষঙ্গকে শাসনপ্রণালীর অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে মানুষের জৈবিক অস্তিত্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার শর্তাধীন হয়েছে। আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং ক্ষমতার অপরিহার্য হস্তক্ষেপ বর্তমান সময়ের (নির্মিত) বাস্তবতা। এ সময়ে বিপুল হারে রাজনৈতিক সংগঠনের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটেছে এবং ক্লাসরুম থেকে কাঁচাবাজার পর্যন্ত এদের বলয় সম্প্রসারিত হয়েছে। এদের ক্ষমতার আগ্রাসন পৌঁছে গেছে সর্বত্র। অথচ এরা মহাসমারোহে জীবনের কথা প্রচার করে, বিভিন্ন ধরণের মৌলিক প্রয়োজন সম্পর্কিত দাবি পেশ করে এবং দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে আনুগত্য চায়। সমাজে অপ্রতিহত বেগে বাড়তে থাকে সংঘর্ষের প্রবণতা। এই সমস্ত কিছুকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয় ক্ষমতাতন্ত্র ও তার শাসনপ্রণালী।

michel-foucault

আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের কাছে মানুষের অসহায়ত্ব উন্মোচন করে মিশেল ফুকো নৈরাশ্য ছড়িয়েছেন- এমন অভিযোগ অনেকের। কিন্তু ফুকো তা মনে করেন না। তিনি মনে করেন লেখালেখি তাঁর সার্বিক অস্তিত্বের অংশ এবং তাঁর সার্বিক অস্তিত্বকে সঠিকভাবে বিচার করেই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে মূল্যায়নের পরামর্শ দেন তিনি। জীবদ্দশায় অসংখ্য রাজনৈতিক সংগঠন ও সংগ্রামের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। ফুকো মনে করেন পরম সত্য বলে কিছু নেই বরং ক্ষমতা সত্য নির্মাণ করে (এক্ষেত্রে কার্ল মার্ক্সের ‘Ruling ideas are the ideas of the ruling class’ উক্তিটিও স্মরণীয়)। এই প্রবন্ধের শুরুতেই ফুকোর যে উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে সেটি স্পষ্টভাবে তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা দেয়।

শেষ করবো এই বলে যে, জৈব ক্ষমতা ও শাসনপ্রণালীই রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখে। এও অনুমান করা যায় আজ রাষ্ট্র যা হয়েছে তা তার শাসনপ্রণালীর ফলেই। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও সীমা নির্ভর করে শাসনপ্রণালীর বিস্তারের উপর। কেবলমাত্র জৈব ক্ষমতা প্রয়োগ করে রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না, টিকে থাকতে হলে তার দরকার জনগণের শাসিত হবার সম্মতি। সেই অর্থে রাষ্ট্রের নাগরিকরাও রাষ্ট্র। বিদ্যমান সম্পর্কপ্রণালীই রাষ্ট্র। নাগরিকদের কথাবার্তা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক সম্পর্কের ধরণ কেমন হবে তার উপরই নির্ভর করে রাষ্ট্রের হিংস্র দাঁত-নখ-চোয়াল হিংস্রতর হতে হতে সমাজ শুকিয়ে মরবে নাকি তার (সমাজ) পরিসর বাড়াতে বাড়াতে রাষ্ট্রকে অকেজো, মৃত ঘোষণা করবে। সমাজ থেকে উদ্ভূত রাষ্ট্র শক্তি সঞ্চার করতে করতে সমাজকেই গ্রাস করে ফেলেছে। তার মানে মানুষ ও জীবনকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভবিষ্যতের মানবপ্রকৃতি কী হবে- ক্ষমতা নাকি ন্যায়নিষ্ঠা?  এক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক মিশেল ফুকো ;যিনি বলেন- ‘Society must be defended.’

লেখক: সারোয়ার তুষার

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে