আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > গল্প ‘শোধ’ (পর্ব-৬)

গল্প ‘শোধ’ (পর্ব-৬)

লুনা নুসরাত
লুনা নুসরাত

লুনা নুসরাত:

৫ম পর্বের পর…

ক্লাবটা হাই প্রোফাইল মানুষদের জন্যই বানানো। রাহেলা আর তার দু বান্ধবী হোটেল থেকে হায়ার করা গাড়িতে করে এন্টি ডোর এর সামনে এসে নামলো। অভ্যস্ত শোফার নেমে এসে দরজা খুলে দিল। ওয়েট করবে কিনা জানতে চাইল কেতাদুরস্ত ভঙ্গী তে। রাহেলা তাকে অপেক্ষা করতে বললে সে পার্কিং লটেই থাকবে, কল দিলেই এসে পড়বে বলে চলে গেল। ধীরে সুস্হে ঢুকলেন তারা তিনজন ক্লাবের ডান্স হলে। এ ক্লাবটা তাদের মত অর্থবান মহিলা আর পুরুষদের জন্য স্পেশাল এরেঞ্জমেন্ট করে রেখেছে। কমবয়সীদের অহেতুক জটলা নেই। স্লো মিউজিক বাজছে আধো আলো ছায়া ঘেরা রুমটায়। ঢোকার মুখেই এক মেয়ে তাদের হাতে তুলে দিল মাস্ক টাইপ একটা জিনিস। এটা মুখে পড়ে নিলে কে রাহেলা আর কে রিহানা অন্তত মাস্কের আড়ালে চলে যাবে। পরে নিলো ওরা। ভালো ব্যবস্থা,খুশি হয়ে উঠল মনে মনে। যাক পরিচিত কারো সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবার সম্ভাবনা রইল না। এখন ব্যাংকক,সিঙ্গাপুর অনেকটা দেশের মতন,অনেকেই আসে ছুটি কাটাতে। না কোন ভয় তার নেই,শুধু একটু অস্বস্তি কাজ করে এই যা। ডান্স রুমের এক পাশে একটা লম্বা কাউন্টার,সামনে বেশ কিছু রিভলভিং উঁচু টুল রাখা। তিনজনে হালকা পায়ে এগুলো সেদিকে। বসতেই বারটেন্ডার হাসিমুখে এগিয়ে এলো,

:গুড ইভনিং ম্যাম। হাউ ক্যান আই সার্ভ ইউ? এনি প্রেফারেন্স?

:গুড ইভনিং মিস্টার। প্লিজ গিভ আস আ লাইট ড্রিংক। হোয়াট ইজ ইউর সাজেশন?

:ইউ আর রাইট ম্যাম। ইটস টু আর্লি টু হ্যাভ এনি হার্ড ড্রিংক। লেট মি প্রেসেন্ট ইউ সামথিং লাইট।

:ওকে।

বোতল থেকে মালিবু রাম, সাথে পাইনাপেল আর ক্রানবেরী জুস একটা শেকারে ঢেলে দক্ষতার সাথে মিক্স করে লম্বা একটা গ্লাসে ঢেলে বরফ দিয়ে তাদের সামনে এনে রাখলো।

:ম্যাম প্লিজ হ্যাভ এ সিপ অব দিস বার্বাডোস অরিজিনেটেড কোকোনাট রাম উইথ জ্যুস কলড্ মালিবু সানরাইজ। আই থিংক এউ উইল লাভ দিস। প্লীজ এনজয়,বলে অন্যদিকের কাস্টোমার দের দিকে চলে গেল।

আপেল জ্যুসের মত দেখতে ড্রিংকের গ্লাসটার গায়ে বরফের ঠান্ডায় জমে ওঠা ছোট ছোট পানির বিন্দু চোখে এমনিতেই মাদকতা ছড়ালো। বারে আসার এই এক সুবিধা। ইউ ক্যান চেক হান্ড্রেডস ভ্যারাইটি অব লিকার উইথ থাউজ্যান্ডস্ অব প্রিপারেশন!

গো গার্লস,বলে সরু গ্লাসটা হাতে তুলে নিলেন রাহেলা। আজ তার হার্ড কিছু দরকার। মনে মনে অস্থির বোধ করছেন। ইচ্ছে আছে এখান থেকেই কাউকে পিক করবেন ফর টুনাইট টু মেক ইট আ ফানফুল নাইট। বাট ইটস হার ফার্স্ট টাইম। একটু তো প্রজাপতি উড়বেই পেটে। চেষ্টা করলেন পাত্তা না দিতে। ছোট ছোট চুমুকে গ্লাস শেষের দিকে মনযোগ দিলেন। বান্ধবীদের দুজনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ওরা অলরেডি ডান।

:লেটস আস্ক ফর এনাদার ওয়ান,বলে উঠলো একজন।

:গো স্লো বেবি। দি নাইট ইজ স্টীল ইয়াং এন্ড উই হ্যাভ এনাফ টাইম। সো রিলাক্স। তারচে চল,খানিকক্ষণ নাচি।

বারের একটু সামনেই একটা বেশ বড় গোলমতো জায়গায় নাচছে অনেকে। বেশীরভাগই মাঝ বয়েসী লোক,ওয়েল ড্রেসড। প্রায় প্রত্যেকের সাথেই কম বয়সী সুন্দরী মেয়ে। তাদের মত দুচার জন সঙ্গীবিহীন মহিলা অবশ্য আছে। সে যাই হোক,কম বয়সী সুন্দরী মেয়েগুলোর বেশীর ভাগই এদেশী,কিছু বিদেশী আর দু একটাকে দেখে মনে হয় বাঙালী,হয়ত বসের সাথে এসেছে বিজনেস কাম প্লেজার ট্রিপে! দেখে হাসলো রাহেলা, তার হাজব্যান্ড মীর সালাউদ্দীন ও হয়তো এমন কোন ডান্স হলে এখন। রিহানা নামের সুন্দরী, সেক্সি পার্সোনাল সেক্রেটারীর কোমর জড়িয়ে নাচছেন। অবশ্য পাবলিক্যালি নাচানাচি করে সময় নষ্ট না করে সে ক্লোজড ডোর এক্সারসাইজেই বেশী আগ্রহী। কথাগুলো মাথায় আসতেই ঘৃনায় মুখে থুতু চলে আসলো কিন্তু ফেলবে কোথায়? তাই ড্রিংকে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে গিলে ফেলল মুখ বিকৃত করে।

এমন না যে রাহেলা দেখতে শুনতে খুব খারাপ,অশিক্ষিত বা তার সাথে মানানসই নন। তবে কেন যে আর কখন সে তার থেকে এতটা দুরে চলে গেল যে ফিরে আসার কোন পথ রইল না। সব সহ্য করেও রাহেলা ছিলেন,রাতুলের কথা ভেবে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে রাতুল ও হাতের নাগালের বাইরে চলে গেল। তিনি চেষ্টা করেছিলেন খুব যেন রাতুল ওর বাবার মত না হয়। কিন্তু হয়নি তার সে আশা পূরণ। কথায় আছে না, “যে দিকে নাও,সে দিকে বাও”, সেটাই হয়েছে। বাবার অগাধ অর্থ ওকে সরিয়ে নিয়ে গেছে রাহেলার থেকে দুরে। এতটাই দুরে যে রাতুলকে আর চিনতে পারেন না তিনি। সংসারে সব থেকেও তিনি যেন একা হয়ে গেলেন। তারপর পরিচয় এই বান্ধবীদের সাথে। কিট্টি পার্টি, ক্লাব, হাউজ স্পেশাল নাইট হল্ট এগুলো শেষে আজ তিনি ব্যাংককে। আপাত সর্বনাশের একেবারে শেষ সীমায়।

গা ঝাড়া দিয়ে মনের ভাবনাগুলোকে ঠেলে ফেললেন। কিসের সর্বনাশ!কিসের অধঃপতন! দে হ্যাভ স্টার্টেড ইট ইয়ারস এগো। কত জনের সাথে বেড শেয়ার করেছে মীর সালাউদ্দীন হু নোজ? কই তখন তো কেউ আসেনি আমার মনের খোঁজ নিতে!কত রাত আমি একলা কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি রেখেছে কি কেউ তার খবর? আর আজ আমি যদি সে কাজটা করি তবে কি এমন ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে কারও? কিচ্ছু আসে যায় না কারো। ঝটকা মেরে উঁচু সুইং টুলটা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বান্ধবীদের নিয়ে নির্ধারিত নাচের জায়গায় এসে দুলতে শুরু করলেন। হাল্কা মিউজিক আর হালকা ড্রিংক তার মনকে ফুরফুরে করে তুললো নিমিষেই। পাখির নরম পালকের মত ভাসতে ভাসতে তিনি নাচতে লাগলেন সঙ্গীদের সাথে।

কমলার মেজাজটা খাট্টা করে আরো ঘন্টাখানেক অমন উপুড় হয়ে পড়ে রইলো সাদেক। এটা তার আপাত বিরতি। ক্লান্ত শরীরকে খানিকটা বিশ্রাম দিয়ে নতুন করে উন্মত্ততায় মাতবার আগে শক্তি সঞ্চয় ও হয়তো আরেকটা কারন। কমলার ট্যাঁফো কানে না তুলে আরেকবার চড়াও হলো ওর ওপর। কাজ শেষে বিষ ওগড়ানো সাপের মতো নির্জীব হয়ে পড়ে রইলো। বিধস্ত কমলা খুব সাবধানে নেমে দোর খুলে বের হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। আজ শরীর খারাপ বলে ঘরে লোক নেয়নি আর আজই কিনা এই জানোয়ার টার আসতে ইচ্ছে করলো! কপাল,সবই কপালের লিখন। নইলে তের বছর বয়সের কমলা কেন যে নিজেকে পাগল প্রেমিক পরিচয় দেয়া সেই লোকটার হাত ধরে এ শহরে আসবে আর কেনই বা সে পাষণ্ড তাকে ব্যবহার করার পর এই পাড়ায় টাকার লোভে বেচে দিবে!

সে নির্দয়,পাষাণ আর বিশ্বাসঘাতকের দেখা পেতে অপেক্ষা করেছে বহুদিন,আসেনি। কিংবা কে জানে হয়ত এসেছে এ পাড়ার অন্যদের কাছে,তার কাছে আসবে এমন সাহস হয়নি।

তবে মনে মনে এ কথা জানে কমলা আর বিশ্বাস ও করে যে,একদিন সে আসবে কমলার কাছে। পাপের বোধ সবারই হয়। কারও আগে কারও পরে। আসতে তাকে হবেই। আর যেদিন আসবে সেদিন ই হবে ঐ শয়তান টার জীবনের শেষ দিন। খাটের নিচে একটা হাত দা রাখা আছে,ভীষণ যত্নে। প্রতি সপ্তাহেই সে ওটা ধার করতে পাঠায়। ঝকঝকে সে দা য়ের ফলা তার চোখে মুখে আলোর প্রতিফলন ঘটায়। খুশিতে তার চোখ দুটো চকচক করতে থাকে শান্ দেয়া দা টার মতই।

ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে কাজের ছেলেটাকে ডেকে তুলল,ঘুমিয়ে পড়েছিলো বেচারা। ছেলেটাকে দেখলে তার মায়া হয়।কতই বা আর বয়স! দশ কি বারো। এর মধ্যেই পৃথিবীর কদর্য রুপটা দেখে ফেলেছে। ইচ্ছে করে ওকে অন্য কোথাও সরিয়ে দিতে। কিন্তু তার সে সামর্থ্য কই? এ পাড়ায় এনজিও দের একটা স্কুল আছে এখানকার বাসিন্দাদের ছেলেমেয়েদের জন্য,ওখানেই ভর্তি করে দিয়েছ। পড়ুক কিছুদিন ওখানে,যদি পারে তো সরিয়ে দেবে অন্য কোথাও।

:খাসনি কেন রে?খাবার তো দেখি সব পড়ে আছে।

:আপনি যে খান নি।

:ইশ্ খুব আহ্লাদ না? ঘরে লোক,দেখিসনি? যা খেয়ে নে। সকালে স্কুল আছে,শুয়ে পর।

:আপনি খাবেন না আম্মা?

আম্মা বলে কি মিষ্টি করে ডাকে ছেলেটা! মনটা ভিজে যায় কমলার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে,কি খাবে? খাওয়ার রুচিটাই চলে গেছে। প্রতিদিন নানান কিছিমের মানুষের খাদ্য হতে হতে তার নিজের আর খাবার খেতে মন চায় না। তবু চলতে হলে,বাঁচতে হলে খেতেই হয়। অবশ্য যদি এ বেঁচে থাকাকে বেঁচে থাকা বলা যায়!

:চল,চল খেয়ে নিই। বলে ছোট্ট রান্নাঘরের দিকে পা চালালো দুজন। মেঝেতে মাদুর পেতে খেতে বসলো। খাওয়া শেষ না হতেই শোবার ঘর থেকে সাদেকের বাঁজখাই গলা শোনা গেল,

:ঐ হারামজাদী,কই যাস বার বার? ঘরে কি দুই লোক নিছস আইজক্যা? এক্ষণি আয় কইলাম, আমি বারাইলে কিন্তুক তোর খবর আছে।

তুই খা,খেয়ে শুয়ে পড়িস,বলে প্লেটের ভাতে হাত ধুয়ে। দৌড় লাগালো এক প্যাঁচে কোনমতে জড়িয়ে শরীর ঢেকে রাখা শাড়িটায় হাত মুছতে মুছতে। ঘরে ঢুকে দোর লাগিয়ে বিছানায় উঠলো। সাদেক সিগারেট ধরিয়েছে। লম্বা লম্বা টানে ধোঁয়া নিচ্ছে ফুসফুসে তারপর ফুঁ দিয়ে বের করে দিচ্ছে সিলিংয়ের দিকে। এক টানে কমলার শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে দিয়ে ওকে শুইয়ে দিলো।তারপর ফুসফুস থেকে বের হওয়া সেকেন্ড হ্যান্ড ধোঁয়াগুলি কমলার নাকে মুখে ছাড়তে লাগলো। খকখক করে কেশে উঠল কমলা কিন্তু কিছু করার নেই। তার এ অসহায় অবস্থা দেখে দারুণ একটা পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করে সাদেক যা তাকে পরের ইভেন্টের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

ক্লান্ত কমলা চোখ বুঁজে পড়ে থাকে মরার মত।

চলবে…

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে