আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > আইন-মানবাধিকার > বিডিআর বিদ্রোহ: দ্বিতীয় দিনে হতে পারে পূর্ণাঙ্গ রায়

বিডিআর বিদ্রোহ: দ্বিতীয় দিনে হতে পারে পূর্ণাঙ্গ রায়

২০০৯ সালে রাজধানীর পিলখানায় আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহ

প্রতিচ্ছবি প্রতিবেদক:

২০০৯ সালে রাজধানীর পিলখানায় আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ঐতিহাসিক রায় পড়ার দ্বিতীয় দিন আজ। আজকের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ রায় দিবেন বলে জানিয়েছেন বিচারপতিরা।

গতকালের মত আজও সকাল সাড়ে দশটায় হাইকোর্টে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে রায়ের বাকি অংশটুকু পড়া হবে।

বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই বিশেষ বেঞ্চ গঠিত হয়। বাকি দুই বিচারপতি হলেন মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার।

এদিকে দশ হাজার পৃষ্ঠার উপরে রায়ের নথিটিতে প্রায় এক হাজারের মত পর্যবেক্ষন রয়েছে। আর এই পর্যবেক্ষনগুলোই স্পষ্টত তুলে ধরেছেন বিচারপতিরা। ফলে গতকাল ১০ টা ৫৫ মিনিটে শুরু হয়ে মাঝে এক ঘন্টা বিরতি নিয়ে বিকেল সাড়ে চারটা অবধি এ রায় পড়া শেষ করতে পারেননি বিচারপতিগণ।

রায়ের পর্যবেক্ষনে বলা হয়- সংরক্ষিত কাগজপত্র, বিজ্ঞ কৌঁসুলিদের যুক্তিতর্ক, প্রচলিত ও বিধিবদ্ধ আইনের ব্যাখ্যা, প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সাংবিধানিকভাবে আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মামলাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এটি একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায়। যার প্রেক্ষিত হবে প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যত স্থিতিশীল সমাজ বিনির্মাণে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সর্বজনীন টেকসই ও নির্মোহ দৃষ্টান্ত।

পর্যবেক্ষনে বিচারপতি বলেন, ধ্বংসের সে চক্রান্ত রুখে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। সদ্য নির্বাচিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসীম ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সঙ্গে দৃঢ় মনোবল নিয়ে শক্ত হাতে বিদ্রোহ দমনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

বিচারপতি আরও বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার পূর্বাপর আলোচনা ও পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, এ ঘটনা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র। শুধু তাই নয়, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একটি দক্ষ, প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ধ্বংসেরও চেষ্টা।

বিডিআর বিদ্রোহ [১]

পর্যবেক্ষনে আরও বলা হয়, উক্ত ঘটনা ইতিহাসের জঘন্যতম ও বর্বরোচিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৭ জন মেধাবী ও প্রতিভাবান অফিসারসহ ৭৪ জন নিরস্ত্র মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।’

বিদ্রোহীদের নৃশংসতার কথা তুলে ধরে আদালত বলেন, ‘নারী, শিশুসহ গৃহকর্মীকেও পাশবিকতা থেকে রেহাই দেওয়া হয়নি। অভিযুক্তরা বিদ্রোহের জন্য অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, নৃশংস হত্যাকাণ্ড, অমানবিক নির্যাতন, বাড়ি ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ,অস্ত্রাগার ও ম্যাগাজিন ভেঙে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুণ্ঠন, গ্রেনেড বিস্ফোরণ, সশস্ত্র মহড়ার মাধ্যমে সন্ত্রাস ও জনজীবনে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি, লাশ গুম, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্তসহ নানাবিধ জঘন্য অপরাধকর্ম সংগঠিত করে।’

পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ‘২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ মাত্র ৪৮ দিনের নবনির্বাচিত সরকারকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে; যা ছিল গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য প্রচণ্ড হুমকিস্বরূপ। বিডিআর সদস্যরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯.৩০ মিনিটে বিডিআর সদর দফতর পিলখানার দরবার হলে। উক্ত বিদ্রোহে হত্যাকাণ্ড ছাড়াও নানাবিধ জঘন্যতম অপরাধ সংগঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত দেশের এই সুশৃঙ্খল আধাসামিরক বাহিনীর অস্তিত্ব বিপর্যয়ে নির্বাসিত হয়।’

ঐ সময়ের পিলখানার পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন আদলতের বিচারপতিগণ।

এদিকে গতকাল এক সবাদ সম্মেলন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, এই নরকীয় হত্যাযজ্ঞের মামলার রায় পৃথিবীর ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যা মামলায় কয়জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে, কয়জন আসামির যাবজ্জীবন বহাল থাকবে, কতজন খালাস পাবেন-এসব দণ্ডের বিষয়ে তিন বিচারপতিই একমত হয়েছেন বলে আদালত জানিয়েছেন।

বিডিআর বিদ্রোহ [২]

উল্লেখ্য, বিডিআর বিদ্রোহের পর ৫৭টি বিদ্রোহের মামলার বিচার হয় বাহিনীর নিজস্ব আদালতে। আর হত্যাকাণ্ডের বিচার চলে বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত মহানগর দায়রা জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে।

ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর এই হত্যা মামলায় যে রায় ঘোষণা করেন, তাতে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়া বিডিআরের উপ সহকারী পরিচালক তৌহিদুল আলমসহ বাহিনীর ১৫২ জওয়ান ও নন কমিশন্ড কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ আসে। পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

এ মামলার সাড়ে ৮০০ আসামির মধ্যে ওই রায়ের দিন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন ৮৪৬ জন। তাদের মধ্যে ১৬১ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

পাশাপাশি অস্ত্র লুটের দায়ে তাদের আরও ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জারিমানা, অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারক। এছাড়া ২৫৬ আসামিকে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। কারও কারও সাজার আদেশ হয় একাধিক ধারায়।

অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় রায়ে ২৭৭ জনকে বেকসুর খালাস দেয় বিচারিক আদালত। পরে রায়ের বিরুদ্ধে খালাসপ্রাপ্ত ২৭৭ জনের মধ্যে ৬৯ জন আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল ও ডেথ রেফারেন্স দায়ের করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত ৪১০ জন আসামির সাজা বাতিল চেয়ে আপিল করেন তাদের আইনজীবীরা।বিডিআর বিদ্রোহ [৩]

এর মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েক আসামির মৃত্যুদণ্ড ও কয়েকজনের সাজা বাড়াতে আরও দুটি আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু দেরিতে আবেদন করায় গত ১৩ এপ্রিল আবেদন দুটিও বাতিল করে দেয় হাইকোর্ট। পরে এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশই বহাল রাখে।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর গত ১৩ এপ্রিল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে আদালত। তার সাত মাস ১২ দিন হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করছে।

এ মামলার হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা, মোমতাজ উদ্দিন ফকির, মোশাররফ হোসেন কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোশাররফ হোসেন সরদার, শেখ বাহারুল ইসলাম ও  জাহিদ সরওয়ার কাজল।

অন্যদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী ছিলেন হাসনা বেগম। আইনজীবী ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুল বাসেত মজুমদার, মহসীন রশীদ, এস এম শাহজাহান, এ এস এম আবদুল মুবিন, মো. আমিনুল ইসলাম, দাউদুর রহমান মিনা ও শামীম সরদারসহ আরও অনেকে।

এ এস/ আর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে