আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > গল্প ‘শোধ’ (পর্ব-৪)

গল্প ‘শোধ’ (পর্ব-৪)

লুনা নুসরাত
লুনা নুসরাত

লুনা নুসরাত:

তৃতীয় পর্বের পর…

পোশাকী নামটা বেশ ভারিক্কি, মেহজাবিন বিনতে্ মাজহার, ইন শর্ট লাবণ্য। নামটা শুনেই কেমন শেষের কবিতার লাবণ্য ভেসে ওঠে চোখে, তাই না? ঠিক তাই। লাবণ্য বাবা মাজহারুল ইসলাম ও বুঝি যৌবনে প্রেমে পড়া শেষের কবিতার লাবণ্য কে বুকের কোন কোনে খুব যত্নে লুকিয়ে রেখেছিলেন। রোজকার ঘর সংসার আর তেল-নুনের হিসেবের মাঝেও সে এক ঘোর লাগা সন্ধ্যেয় সদ্য ঘুম ভাঙা রুপালী চাঁদের মতই দ্যুতি ছড়াতো তার মনের আঙিনায়। প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে কি জানি কোন দুঃখে তাকে শূন্য করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছিল সুখ-দুঃখের সাথী জাহানারা। সেই সদ্য জন্মানো তুলতুলে নরম ছানাটা কে বুকে জড়িয়ে নিয় এসেছিলেন বাসায় আজ থেকে উনিশ বছর আগে। আদরে ভালোবাসায় সেই নরম স্বভাবের মেয়েটা কখন যেন এত বড় হয়ে গেছে তা চোখের সামনে দেখেও তিনি বুঝে উঠতে পারেন নি। মা-হারা মেয়েটাকে গড়ে তুলতে চেষ্টা কম করেননি কিন্তু লাবণ্য কোন ফাঁকে কেন যে বন্য হয়ে উঠেছিলো তা তার বোধের অগম্য। যে ভালোবাসা আর মমত্ব তাকে অন্য কোন দিকে মন দিতে দেয়নি সে ভালোবাসা এখন তীব্র ঘৃণা হয়ে তার কোমল চোখ দুটোকে দগ্ধ করছে দিনরাত।

পুলিশ জানিয়েছিল আঠারো উনিশ বয়েশী একটা মেয়ের মৃতদেহ মর্গে পড়ে আছে আজ দুদিন। এসে দেখে যেতে এ তারই মেয়ে কিনা যে গত সাতদিন ধরে নিখোঁজ। থানায় মিসিং রিপোর্ট টা করেছিলেন তিনি লাবণ্যর নিরুদ্দেশে হবার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই। মেয়েটা মাসখানেকের বেশী হলো তেমন করে ঘর থেকে বের হচ্ছিলো না। কথাবার্তাও বলছিলো টুকটাক। এমন না যে তিনি জানতে চাননি। বন্ধ দরজার সামনে থেকে ফিরে আসতে হয়েছে তাকে কোন উত্তর না পেয়েই। কিছুতেই তিনি বুঝতে পারছিলেন না ঘটনাটা কি।

ঘটনাটা যখন জানলেন তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। আর সে ঘটনাটা না জানতে পারলেই তার জন্য হয়তো ভালো ছিলো। হারিয়ে যাওয়া মেয়ে তার মনের মনিকোঠায় রাজকুমারী হয়ে থাকতো আজীবন। মর্গের সিমেন্টের মেঝেতে পড়ে থেকে জমে শক্ত হয়ে যাওয়া ঐ মেয়েটা তার লাবণ্য না হলেই তিনি বেঁচে যেতেন এ যন্ত্রনার হাত থেকে।

পিঁপড়ে খুবলে খাওয়া, ফুলে ওঠা বিভৎস শরীরটা তার মেয়ে লাবণ্যর একথা স্বীকার করেই জানতে পারলেন তার চেয়েও বিভৎস আরেকটা সত্য। পোস্টমর্টেম হয়ে গিয়েছিলো আগেই। ডাক্তার কিছু বলেনি শুধু রিপোর্ট টা হাতে ধরিয়ে দায় সেরেছিল। কথা বলেছিল মর্গের সুইপারটা। কাঁটাছেড়ার কাজটা সেই করেছিল নিজ হাতে দক্ষতার সাথে। লাবণ্য নিজের ভেতর চুপচাপ বয়ে বেড়াচ্ছিল আরেকটি প্রাণ। এই নতুন অজানা বার্তা তার মনের জগৎটাকে একেবারে দুমরে মুচড়ে দিয়েছিল। তিনি মর্গের বারান্দায় নিশ্চল দাঁড়িয়েছিলেন বাজ পড়া গাছের মত। এ সত্য মানতে তার কোমল পিতৃহৃদয় কিছুতেই সায় দিচ্ছিলো না। কিন্তু সত্য কে অস্বীকার করবেন কি করে? পেরেছে কি কেউ কোনদিন!

ফর্মালিটি শেষ করে বাসায় ফিরিয়ে আনেননি আর ওকে। ওখান থেকেই শেষ কাজের ব্যবস্থা শেষে ফিরেছেন নিজ ঘরে,একা। কিন্তু না চাইলেও তার পিছু পিছু এসে হাজির হয়েছে ঘৃণা, ক্ষোভ আর জ্বালা। কেন এমন হলো? তিনি কম তো দেননি মেয়েকে। নিজের সবটা উজার করে ভালবেসেছেন, যা চাই, যখন চাই, যেভাবে চাই। তবে?

মেয়ের সব জিনিস তিনি ফেলে দেবেন। রাখবেন না কোন স্মৃতি জাগানিয়া কিছুই। আর সেটা করতে গিয়েই পেয়ে গেলেন তার মনে কুটকুট করা প্রশ্নের অজানা সব উত্তর। লাবণ্যর ডায়েরী, নতুন লেখা। অল্পকিছু পাতায় শুধু লেখা আছে। তবে কি লাবণ্যর মনেও শঙ্কা ছিলো কোন অঘটনের আর তা জানাতে চেয়েছিল বাবাকে? হয়তো বেঁচে থাকতে লজ্জায় মুখ ফুটে বলতে পারেনি। হাতে ডায়েরীটা নিয়ে নিজের ঘরে চলে এলেন। চোখে চশমাটা এঁটে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন লাবণ্য কাহিনী। না ঠিক লাবণ্য কাহিনী না এ যেন এক অচেনা উনিশ বছর বয়সী মেয়ের বন্য হয়ে ওঠার কাহিনী।

কমলার হালকা চর্বিজমা চকচকে তলপেটে ডান হাতটা সুখ করে হাতরে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে দু আঙুলে চিমটি কাটছে। ইশ্ করে ব্যথার জানান দিলেও মুখে মৃদু হাসি ধরে রেখে চুপচাপ পড়ে থাকা শিখে গেছে বহুদিন। আজ নয় বছর ধরে আছে এ লাইনে। তেরোতে শুরু করেছিল এখন বাইশ। খদ্দেরদের নানান কীর্তিকলাপ তার জানা আছে। কত উদ্ভট কান্ড ই যে করে এরা। মনের যত কুৎসিত অলিগলি উন্মুক্ত করে এরা এই কমলা আর ওদের মত এক রাতের সুখ বিক্রেতাদের শরীরে। তা কমলাও কম যায় না। সুখ নিবি তো পয়সাও দিবি। ডাল ভাত তারও খাওয়া লাগে। তাই কাস্টোমারের চাহিদা মেটায় তাদের মনমত আর সাথে নিজের টাও আদায় করে নিতে ছাড়ে না। এ পাড়ায় এক নামে তাকে সবাই চেনে। তার কাজ হান্ড্রেড পারসেন্ট পয়সা উশুল টাইপ। তার ঘর থেকে খুব সকালে যে খদ্দেররা বের হয় তারা তৃপ্তি নিয়েই বাড়ি যায়। তার খদ্দেররা টুকিটাকি টাইপ না। তার কাছে যারা আসে জানে কমলার কাজ জানে, তাই ফিরে ফিরে আসে। তবে একটাই সমস্যা। কমলা দিনে শোয় না, দিন তার একান্ত নিজের। আর তার রাত উন্মুক্ত একটু উঠতি পয়সা ওয়ালাদের জন্য, যেমন সাফিন। তার কাছে কেন এসেছিলো কে জানে? চেহারা ছবি দেখে ভালো ঘরের মনে হয়। তবে সাদেকের মত নরকের কীটের সাথে তার সখ্য আর সেই সুবাদে কমলার কাছে কেন তা কমলা অনুমান করতে পারে না।

কমলা অবশ্য অত কিছু জানতে চায় না। তার ভাগের পাওনা টাকা পেলেই সে খুশি। সাদেক লোকটা একটু জালিম টাইপ,নামকরা খুনী। তারমতই অনেকটা, টাকা পেলে বাপ চিনেনা, কোমরে যত্নে গুঁজে রাখা দু-ধারী জেনুইন স্টীলের ছুরিতে কেউ বুঝে ওঠার আগেই গলা দু-ফাঁক। পরিষ্কার কাজ, কোন নিশান সে রাখে না। সাদেক নিজেই গল্প করে কমলার সাথে দিল খুশ্ থাকলে। কিন্তু ঐ শালার একটাই দোষ, এক রাতে তার বহুবার চাই আর বহুভাবে। আর সেই সাথে মিহিন অত্যাচার! তা অবশ্য সহ্য হয়ে গেছে এতদিনে। সাদেক তার বান্ধা কাস্টোমার। মাসে তিনবার আসে, বৃহস্পতি-বৃহস্পতি আর শেষ শুক্রবার। গত দু বছরে ব্যতিক্রম হয়নি। শুধু,কাল রাতে হঠাৎ হাজির। ভাগ্য ভালো কেউ ছিলো না ঘরে, নইলো বড় তান্ডব করত। কমলা শুয়ে ছিলো ভেতরের ঘরে। শরীরটা ভালো লাগছিলো না। ফাইফরমাশ খাটা ছেলেটা দরজা খুলে দিতেই একেবারে সটান ঘরে ঢুকে বিছানায় হামলে পড়লো। দরজা দেবার ও সময় দিলো না। কাজের ছেলেটাই বাইরে থেকে দোর টেনে দিলো। হঠাৎ ওঠা ঝড় শান্ত হয়ে এখন উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। আর এক হাত তার তলপেটের উপর চষে বেড়াচ্ছে।

:সরেন,উঠব।

:ক্যান? চুপচাপ থাক। আমি উঠলে উঠবি।

:আপনে থাকেন শুয়ে,আমি আসতেছি।

:চুপ মাগী,কইলাম না এখন না।

 

ফুঁসে উঠে সাদেক কামড়ে দিলো সজোরে কমলার ডান গাল, দাঁত বসে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে পড়ে থাকলো সে। জানে এখন কোন হৈ চৈ করলে সাদেককে থামানো যাবে না। তাই,উঠে আসা চিৎকার টা গলার কাছে আসতেই আবার গিলে ফেললো জোর করে।

 

চলবে…

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে