আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > আন্তর্জাতিক > কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার সূর্য ও ভবিষ্যৎ

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার সূর্য ও ভবিষ্যৎ

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার সূর্য ও ভবিষ্যৎ

নাজমুন নাহার তুলি:

নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, আইনব্যবস্থা, নিজেদের পার্লামেন্ট, সবমিলে একটি স্বতন্ত্র অংশ; ভালই তো রয়েছে কাতালানরা। এরপরেও কেন দরকার স্বাধীনতার? কিসের নেশায় মত্ত কাতালোনিয়ানরা ছুটছে স্বাধীনতার পেছনে?

স্বাধীনতার উন্মেষ:

কাতালোনিয়ানরা নিজেদের স্পেনের নিপীড়িত জনগোষ্ঠি বলে মনে করে। যদিও তারা সবসময়ই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। চিন্তা চেতনার স্বকীয়তায় আর তাদের চাওয়া পাওয়ার ওপর সরকারের উদাসীনতা সবমিলে কাতালোনিয়া বারংবার জন্ম দিয়েছে বিদ্রোহের। তবে তা কখনোই বন্দুকের নলের মুখে নয়, নয় অযথা নিজ দেশের ক্ষতি করে। তারা হেঁটেছে গণতন্ত্রের পথে।

২০১৪ সালে তারা একবার স্বাধীনতার জন্য গণভোটের আয়োজন করেছিল এতে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পরে স্বাধীন কাতালোনিয়া গঠনের লক্ষ্যে। আরো জোড়ালো হয়ে ওঠে তাদের দাবি। যদিও সে দাবি উপেক্ষিতই ছিল। তবে এ ইতিহাস আরো পুরনো।

স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি বিত্তবান অঞ্চল কাতালোনিয়া। প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস এই এলাকার। ১১৫০ সালে কাতালোনিয়া ইবেরিয়ান দ্বীপপুঞ্জের স্বাধীন অংশ ছিল যা বর্তমানে আধুনিক পর্তুগাল ও স্পেন। তখন থেকে নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতির অনন্য চর্চা ছিল এই অঞ্চলে। ১৪৬৯ সালে ওরাগনের রাজা ফারদিনানন্দ ও স্পেনের রানি ইসাবেলার বিবাহ বন্ধনের মধ্য দিয়ে স্পেনের সঙ্গে মিলন ঘটে ওরাগন ও কাতালোনিয়ার।

পঞ্চম কিং ফিলিপের শাসন পর্যন্ত স্বাধীন ছিল কাতালোনিয়া। এরপর ধীরে ধীরে ১৭১৫ সালে আধুনিক স্পেনের জন্ম হয়। এতে লোপ পায় কাতালানদের স্বাধীনতা। পরবর্তীতে স্পেনের বিভিন্ন রাজারা এই অঞ্চলে জোরপূর্বক স্প্যানিশ ভাষা ও আইন প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। কিন্তু ১৯৩১ সালে কাতালান জনগণ আবার তাদের স্বকীয়তা ফেরত আনতে সক্ষম হন। কিন্তু ১৯৩৮ সালেই জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো ইব্রো যুদ্ধে জয়ী হয়ে প্রায় সাড়ে তিনহাজার মানুষকে হত্যা করেন এবং কাতালান পরিচালনার ক্ষমতা হাতে তুলে নেন।

স্পেনের গৃহযুদ্ধের আগে এই অঞ্চলে ছিলো বড় রকমের স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের সময় কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসনকে নানা ভাবে খর্ব করা হয়। ১৯৭৭ সালে আবার গণতন্ত্রের হাত ধরে কাতালোনিয়ায় স্বায়ত্তশাসন ফিরে আসে। তবে পুরোপুরি স্বাধীনতার প্রশ্ন দানা বাঁধতে থাকে ২০১০ সালের দিকে। ২০০৬ সালে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত স্বতন্ত্র জাতিগোষ্টী হিসেবে তাদের স্বীকৃতি দিলেও কাতালোনিয়া স্পেনের অংশ হিসেবে আইন পাস করে। এই পরিস্থিতি আরো ভয়ানক রূপ ধারণ করে যখন অর্থনৈতিক মন্দা মাথা চাড়া দেয় এবং কাতালানদের উপর সরকারের উদাসিনতার কারনে অবশেষে তারা ২০১৪ সালে অনানুষ্ঠানিক-ভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোটের আয়োজন করে। স্বাধীনতার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ও আসে।

তবে স্পেন সেটি কার্যকর করতে দেয়না, কারণ স্পেনের সংবিধান অনুযায়ী স্পেনকে ভাগ করার কোন আইন নেই। আবার নতুন করে ২০১৭’র ১ অক্টোবরের গণভোটে ২৩ লাখ ভোটারের ৯০ শতাংশ ভোট দিয়েছিল কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে। ভোটগ্রহণের দিন পুলিশের আচরণ, ভোটারদের ওপর লাঠিচার্জ এবং টেনে হিঁচড়ে ব্যালট বাক্সের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়ার ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর দেশজুড়েই বিতর্ক শুরু হয় এ নিয়ে। এর মাঝেই কেন্দ্রীয় শাসন জারির জন্য আবারও এমন কঠোর ব্যবস্থা নিলে বার্সেলোনায় চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নেয়।

কাতালোনিয়ার এমন প্রতিক্রিয়া এড়াতে সরকার ধীরে ধীরে পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়ে স্বায়ত্তশাসন ঠেকানোর হুমকি দেয়। এই গণভোটের প্রেক্ষিতে মুখোমুখি আসেন দুই নেতা, মারিয়ানা রাহয় এবং কার্লেস পুজেদেমন্ড। রাহয় বলেন, কোনভাবেই এই আইন মানা হবেনা, স্পেন অখন্ডিত ছিল, অখন্ডিত থাকবে । আরা কাতালানরা যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় তাহলে তাদের এই ফলাফল ভোগ করতে হবে। ইতোমধ্যে এলাকাটির সরকার ও পুলিশবাহিনীর ক্ষমতা স্পেন নিয়ে নিয়েছে। তবে দমে যাননি পুজদেমন্ড , এতদিন অপেক্ষা করেও শেষমেশ স্বাধীনতার ঘোষণা তিনি দিয়েই দিলেন। তার মতে, ভোটের মাধ্যমে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দরজা খুলে গেছে। কাতালোনিয়ার নাগরিকরা প্রজাতন্ত্রের আদলে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ গড়ার অধিকার অর্জন করেছে।

অর্থনীতির সোনার হরিণ:

কাতালোনিয়ার জনসংখ্যা ৭৫ লাখ। যা প্রায় সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যার সমান। স্পেনের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ এই কাতালোনিয়ায়। স্পেনের উত্তর-পূর্বের এই প্রদেশটির রাজধানী বার্সেলোনা। তাদের আছে নিজস্ব ভাষাও। বার্সেলোনা বিশ্বের অত্যন্ত জনপ্রিয় শহরগুলোর একটি, ফুটবল এবং একই সাথে পর্যটনের কারণে। স্পেনের মোট জিডিপির এক পঞ্চমাংশ আসে এই বার্সেলোনা থেকে। গত ৪০ বছরের সবচেয়ে বাজে অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভুগছে স্পেন। এমনকি অনেক আগে থেকেই এধরনের অর্থনৈতিক মন্দায় কবলিত স্পেন। সেই মন্দা কবলিত দেশটির বাকি অংশের জন্য কাতালোনিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি  খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে স্পেন। স্পেনের শিল্পোন্নত এলাকা বলে বিখ্যাত কাতালান। সামুদ্রিক বিদ্যুত, টেক্সটাইল, ফাইন্যান্স সেবা এবং হাই-টেক কোম্পানিগুলির জন্য কাতালান বেশ সমৃদ্ধ।

বার্সেলোনার পর্যটন শিল্প থেকে বেশ ভাল আয় হত স্পেনের। ২০১০ সালে কাতালানরা স্প্যানিশ সরকারকে কর দিয়েছে ৬১.৮৭ বিলিয়ন ইউরো। আর তাদের কাছে এসেছে ৪৫.৩৩ বিলিয়ন। কেন্দ্রীয় স্প্যানিশ সরকারের হাতে বিপুল পরিমাণ টাকা চলে না গেলে আরও উন্নয়ন করা যেত বলে কড়া মন্তব্য করেছিল কাতালোনিয়া সরকার। সর্বপোরি অর্থনৈতিক দিক থেকে দূর্বল স্পেন আরো বেশি দূর্বল হয়ে যাবে শুধুমাত্র কাতালানরা আলদা হয়ে গেলে। আর যুক্তরাজ্যে স্কটল্যান্ড যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ভূমিকা রাখে তার থেকেও দ্বিগুণ অবদান রাখে স্পেনে কাতালোনিয়ানরা।

তাই কাতালানরা আলাদা হলে স্পেন হারাবে তার সবচেয়ে উন্নত অর্থনৈতিক এলাকা। তার বাজেটের ৮ শতাংশই কমে যাবে। জিডিপি কমে যাবে ১৯ শতাংশ। স্পেনের বিভিন্ন কোম্পানি ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবসা হারাবে। স্প্যানিশদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে। শিক্ষা ও গবেষণা খাতে ব্যাপক ধস নামবে। স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাতালোনিয়ার অর্থে বিপুল গবেষণা হয়ে থাকে।

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার সূর্য ও ভবিষ্যৎ

রাজনৈতিক দোলাচাল:

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানা রাহয় এর দ্যা কনজারভেটিভ পার্টি কেবল কাতালোনিয়াতেই পঞ্চম বৃহত্তম দল। তাই এই এলাকার যেকোন ধরনের স্বাধীনতা আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করবেন রাহয়, এটাই স্বাভাবিক। তাই স্বাধীনতার প্রশ্নে যখন কাতালানরা গণভোটের আয়োজন করে তখন সেখানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে ভোটাভুটি বানচালের চেষ্টা চালায় কেন্দ্রিয় সরকার। মারিয়ানা রাহয় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, কাতালোনিয়াকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রয়োজনে আঞ্চলিক সরকারটির রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার বাতিল করা হবে। চালু করা হবে কেন্দ্রের শাসন। কারণ এই আইন স্পেনের সংবিধানের অনুযায়ী অবৈধ।

কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্লেস পুজদেমন্ড  কাতালানদের স্বাধীনতার প্রশ্নে যিনি সবচেয়ে বেশি রসদ জুগিয়েছেন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পুজদেমন্ড ছোটবেলা থেকে ফ্রাঙ্কোর সৈরাচারী শাসন দেখে বড় হয়েছেন, তাই তিনি স্বাধীনতার  পক্ষে এতটা সোচ্চার । স্পেনের শাসকদের কাছে তিনি পছন্দের না হলেও কাতালানদের কাছে তিনি ঠিক হিরোর মত। কারন তিনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত নন। স্বাধীনতার পথে কাতালানকে এগিয়ে নেয়ার জন্য পদে পদে সব পরিকল্পনাও তৈরি করে রেখেছেন এই নেতা।

অক্টোবরের ১ তারিখে স্বাধীনতার লক্ষ্যে ভোটাভুটিতে অংশ নেয় হাজারো কাতালোনিয়ান। সেদিন কি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা নিয়ে ইউরোপ জুড়ে ছিল টানটান উত্তেজনা। এতে ৯০ শতাংশ ভোটার কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেন। এটি অনুমোদন করে কাতালোনিয়ার পার্লামেন্ট। স্পেনের সাংবিধানিক আদালত এই পার্লামেন্টকে অসাংবিধানিকও বেআইনি বলে বাতিল করেছিল। তবে পুজেদেমন্ড তখনি তাড়াহুড়ো করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তিনি স্পেনের সাথে আলোচনার পথ খোলা রেখেছিলেন। কোন প্রকার সহিংসতা ছাড়াই নিজেদের প্রাপ্য আদায়ের পক্ষে ছিলেন পুজদেমন্ড।

স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ:

কাতালানদের স্বাধীনতার পক্ষে নেই ইউরোপ ও আমেরিকা। শুক্রবার কাতালান পার্লামেন্টে স্বাধীনতা ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়ে স্পেনের সার্বভৌমত্বের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই ধরনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, জার্মানি ও ফ্রান্স। অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানা রাহয়ের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ফ্রান্স ও জার্মানি। ব্রিটেনের আমেরিকার মুখপাত্ররা বলছেন, স্পেনের অখন্ড অংশ কাতালোনিয়া। বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তবে কাতালোনিয়ার বিচ্ছিন্নতা ইস্যুতে কখনোই সমর্থন নেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নেরও।

আবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউ) সদস্যপদ ও সুযোগ-সুবিধা হারাবে কাতালোনিয়া। আর ইইউতে না থাকতে পারলে, ইউরোপের অর্থনৈতিক জোনের একক বাজারের সুবিধাও পাবে না। ইইউর চাহিদা, শর্ত পূরণ করে এসব সুবিধা ফিরে পেতে অনেক বছর সময় লাগবে কাতালোনিয়ার। তাই কাতালোনিয়ার পক্ষে ইইউর এ ধরনের সিদ্ধান্ত এ জোটের প্রভাবশালী সদস্য স্পেন, জার্মানি ও ইতালিকে নিশ্চিতভাবেই নাখোশ করবে। ফলে সদস্যপদ পাওয়া যে দীর্ঘ জটিলতার মধ্যে পড়বে তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা নতুন করে ভাবাবে ইউরোপিয়ান ফুটবল অঙ্গনকেও। কাতালোনিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেলে বার্সেলোনা-ভ্যালেন্সিয়ার মতো দলগুলো স্প্যানিশ লিগে খেলবে কি না, বার্সেলোনা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগে অংশ নিতে পারবে কি না- ইত্যাদি প্রশ্ন ঝুলে আছে ইউরোপের জন্য।

গণভোটকে বানচাল করতে কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নীতির নেতিবাচক প্রভাব কাতালান জাতীয়তাবাদকে আরও উজ্জ্বীবিত করেছে এবং এতে স্বাধীনতার দাবি আরও তীব্র হয়েছে। তবে পুজদেমন্ড এর অহিংস নীতি এবং কাতালানদের বড় একটি অংশ স্পেনের সার্বভৌমত্বের পক্ষে শ্রদ্ধাশীল। এমতাবস্তায়, স্বাধীন হলেও নতুন করে পথ চলায় কতটা দৃঢ়তা পাবে কাতালান তা এখন দেখার বিষয়।

এমএম

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে