আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > গল্প “নাজিয়া বলছি”

গল্প “নাজিয়া বলছি”

নাঈমা পারভীন অনামিকা
নাঈমা পারভীন অনামিকা

নাঈমা পারভীন অনামিকা:

১.

আমি নাজিয়া হক। স্বামী ইমতিয়াজ হক। পেশায় ব্যবসায়ী। আমাদের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর। এতগুলো বছরে আমার ব্যক্তিগত এচিভমেন্ট — আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বেশ সমীহ করে আমায়,সাথে সম্মানও। আমার একটি ছেলে ভাল স্কুলে পড়ে, রেজাল্ট ও বেশ ভাল। আমার হাসবেন্ডের বন্ধুরা প্রায় সবাই তার কাধ চাপড়ে বলে “কপাল তোর, অসাধারণ বউ পেয়েছিস! ” মোটামুটি অনেক প্রাপ্তি তাইনা? আমি বুদ্ধিমতী। তারচেয়েও বড় বিষয় হল আমার অভিনয় ক্ষমতা অসাধারণ। সংসারের প্রতিটি জায়গায় আমি আমার বেস্ট পারফরমেন্স দিয়েছি। নিখুঁত অভিনয়। তাই এত পারফেকশন।

কিন্তু এখন যে বিষয় টা হচ্ছে তা হল– আমি আর অভিনয় করতে পারছিনা। সারাক্ষণ অভিনয় করা খুব যন্ত্রনার। ক্লান্ত লাগে মনের উপর সাংঘাতিক চাপ পড়ে। বিশেষ করে লাস্ট দুবছর আমি মানসিক চাপে খুবই অস্থির। কারন হঠাৎ করেই আমি টের পেলাম আমি আমার স্বামী কে ভালবাসি না। আমার পুরো মনজগতে তার কোন অস্তিত্ব নেই। আমি নিজেকে বহুবার প্রশ্ন করেছি, “নাজিয়া তুমি ইমতিয়াজ কে ভালবাস না? ” উত্তর আসে -“না”। ভালবাসার অভিনয় করা যায়না, ভয়াবহ কস্ট তাতে। এই ধরুন গভীর রাতে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল, তার নিঃশ্বাসে উষ্ণতা, চোখে গভীর কামনা, ঠোঁটে প্রগাঢ় আকুলতা। কিন্তু আমার শরীর জাগেনা। প্রচণ্ড বিরক্ত লাগে। তার অবাধ্য স্পর্শ গুলো কি যে অসহ্য লাগে আমার! ইমতিয়াজ বুঝতে পারেনা। কারন আমার অভিনয় ক্ষমতা অসাধারণ!

ডাঃ সাখওয়াত হোসেন সামনে রাখা ধবধবে সাদা প্যাডে গোটাগোটা অক্ষরে “নাজিয়া হক’ লিখলেন, “নাম টা সুন্দর আপনার। বয়স কত?”

নাজিয়া হাসল– ” আমার ৩৭ চলছে।”

” আচ্ছা। দেখুন, দাম্পত্য জীবনের এই স্টেজে এসে এমন টা হতে পারে অনেকসময়। অস্বাভাবিক কিছু না। সব কিছুতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, ডিপ্রেশন বেড়ে যাওয়া। আমি একটু ব্যাখ্যা করি বিষয় টা।”

“ব্যাখ্যা করতে হবেনা। মেনে নিলাম এমন হতেই পারে।”

সাখওয়াত সাহেব একটু হকচকিয়ে গেলেন।ভদ্রমহিলা কে বুঝতে পারছেন না তিনি। বয়স ৩৭ চললেও তার স্নিগ্ধতা পঁচিশের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী একটা অভিব্যক্তি ছড়িয়ে আছে চোখেমুখে। তারকাছে আসা পেশেন্ট গুলো সাধারণত এমন হন না। বেশিরভাগই প্রচণ্ড দ্বিধাগ্রস্ত হতাশাগ্রস্ত থাকেন।যাদের কে তিনি গতানুগতিক স্ট্যাইলে হ্যান্ডেল করেন।

” আপনি ঘামছেন। শরীর খারাপ আপনার? “

“হ্যা। সকালথেকে B.P টা হাই আমার।বাদ দিন। আসলে আমি বুঝতে পারছিনা আপনাকে। আমি যদি আপনার সৃষ্ট পরিস্থিতির কারন ব্যাখ্যা না করি, তাহলে মূল সমস্যায় আসতে পারবনা। আর সেটা আসতে না পারলে সমাধান অসম্ভব। “

“আমি তো সমাধান চাইছিনা আপনার কাছে!”

“ঠিক বুঝলাম না! আমার কাছে মানুষ তো সমাধানের জন্যই আসে!” খানিক টা অপ্রস্তুত সাখওয়াত সাহেব।

“শুনুন, আমার চারপাশের মানুষ গুলোর সাথে আমার সম্পর্ক খুব সাজানো। নাটক বা সিনেমার জন্য সেট তৈরী হয়না! ঠিক সেরকম। আমি সেখানে একজন অতি আদর্শ বান মানুষ। মাঝেমাঝে খুব ইচ্ছে করে কারো সাথে মনখুলে নিজের কথা বলি।একান্ত কথা।আমার এই পরিচিত গণ্ডীর একদম বাইরে। যে আমার সাজানো দৃশ্যপট পর্যন্ত পৌছতে পারবেনা কখনো। আশা করি বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন আপনি।”

সাখওয়াত সাহেব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। সাদা রঙ এর একটা খাম টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল নাজিয়া। ” আপনার ফিস টা। আসি।” সাখওয়াত সাহেবের অতি বিস্মিত দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে এল সে।

২.

বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। ইমতিয়াজকে দেখতে পেল বসার ঘরে। “কখন ফিরেছ? “

“কোথায় গিয়েছিল? কাউকে বলে যাওনি,গাড়ী নিয়ে যাওনি। অদ্ভুত! হাতে এগুলো কি? “

“ভাপা পিঠা।খাবে?”

“রাস্তার পাশ থেকে কিনেছ? এসব আনহেলদি খাবার আমি খাই কখনো? কি রুচি তোমার!”

হাসল নাজিয়া– “খেয়েছ কিছু তুমি?”

“হ্যা খেলাম। কফি দিয়েছে ময়না।”

“ফ্রীজে স্ন্যাকস ছিল, ময়নাকে বললেই গরম করে দিত ওভেনে। শুধু কফি খেলে কেন?”

“মা, কি যে করো না মাঝেমাঝে! কাউকে কিছু না বলে চলে গেলে! ময়না, রশীদচাচা কেউ কিছু বলতে পারেনা! আমি কোচিং থেকে এসে বসে আছি সেই কখন!” ইভান জড়িয়ে ধরল নাজিয়াকে।

“ছাড় তো! এত্তবড় হইছিস, এখনো বাচ্চাদের মত সারাদিন গায়ে লেপ্টে থাকিস!”

ইভান প্রচণ্ড জোড়ে হেসে আরো শক্ত করে মাকে জড়িয়ে ধরল– কি এনেছ, পিঠা নাকি? দারুণ তো!”

“হ্যা, ছোটবেলায় খুব যত্ন করে মা এই পিঠা টা বানাতেন! আমার অনেক পছন্দ ছিল যে! আয় একসাথে বসে খাই। ” বসার ঘরের দিকে চোখ পড়তেই দেখতে পেল- তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমতিয়াজ। সে দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে হাতে পিঠা নিল নাজিয়া।

সকাল বেলা বেশ কুয়াশা পড়ে। শিশিরে পা ভিজে যাচ্ছে। নাজিয়া হাঁটতে হাঁটতে রশীদ মিয়ার ঘরের সামনে দাঁড়াল। কুরআন তিলাওয়াত করছেন তিনি। কি যে ভাল লাগে শুনতে! প্রতিদিন এইসময় টায় সে দাঁড়িয়ে থাকে এখানে। বাবাও খুব সকালে মসজিদ থেকে এসে তিলাওয়াত করতেন। ঘুম জড়ানো চোখে নাজিয়ার কানে বাজত বাবার সুরেলা কন্ঠ। এখনো বাজে। চোখ বন্ধ করলেই সে শুনতে পায়।

শোবার ঘরে ঢোকামাত্র ফোন বাজল। ফোন তুলতেই ইমতিয়াজের গলা– “নাজিয়া- what’s wrong with you? তুমি লাঞ্চে আমাকে কি দিয়েছ এসব!এসব খাই আমি? আর হলুদ হলুদ এইটা কি? কি বিভৎস দেখতে!”

নাজিয়া চুপ করে রইল কিছুক্ষণ – “ঐটা মোচার ঘন্ট। খেয়ে দেখ, অনেক মজা! আমার বাবার খুব পছন্দ ছিল এটা। একবার হয়েছে কি শোন! বাবা সমস্ত বাজার ঘুরে কলার মোচা পেলেন না। তারপর আমাকে নিয়ে ছোট ফুপুর বাড়ীতে গেলেন। তাদের বাড়ীতে অনেক কলাগাছ, পুরো একবস্তা কলার মোচা নিয়ে এলেন। আমাদের বাসায় প্রতিদিনের তরকারী হয়ে গেল কলার মোচা।” ঘর কাপিয়ে হাসতে লাগল নাজিয়া।

প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ফোন নামিয়ে রাখলেন ইমতিয়াজ। মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। ৩ টায় জরুরী একটা মিটিং ডাকা হয়েছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করতে হবে সেখানে। কিন্তু নাজিয়ার ব্যাপার টা মাথা থেকে সরাতে পারছেন না। ইদানীং তার এমন অদ্ভুত সব আচরনের কোন কারন খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। পি.এস. কে ডেকে পাঠালেন,  মিটিং এর আগে সবকিছু একবার দেখে নেয়া দরকার।

ময়না এসে দাঁড়িয়েছে – ছোট ভাইজান আফনারে ডাকে। ঘড়ি দেখল নাজিয়া। নীচে নেমে এল সে। প্লেটে হাত দিয়ে বসে আছে ছেলেটা। তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। দেখতে দেখতে কেমন বড় হয়ে গেল ইভান! এই সেদিন ও হামাগুড়ি দিয়ে সিঁড়ি থেকে উপরে উঠত। লালা ফেলে ভিজিয়ে ফেলত বুক। সময় কত দ্রুত চলে যায়! দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ” বসে আছিস কেন?  এতবড় একটা ছেলে মাছ বেছে খেতে পারিস না। তোর বন্ধুবান্ধব কে বলে দেই এই কথা?”

“মা তুমি হলে হিন্দি মুভির মহিলা ভিলেন বুঝছ ! কই মাছে কাটা গুলা দেখছ? ভয়াবহ! এই কাঁটা বেছে খাওয়ার চেয়ে ফিজিক্সের থিওরি মুখস্ত করা অনেক সোজা! কে বলছে এই মাছ রান্না করতে? না খেলে আবার সারাঘর মাথায় তুলবে! মাছ খাইনা, মাছ খাইনা করে। কি যে যন্ত্রণা কর তুমি!”

নাজিয়া হাসলেন। আজ লাঞ্চ বক্স খুলে ইমতিয়াজের মুখের অবস্থা কি হবে ভেবেই হাসি পাচ্ছে!বেচারা কাঁটার জন্য মাছ খায়না। তার ফেভারিট হল চিংড়িমাছ। প্রায় সপ্তাহ হয়েছে চিংড়িমাছ শেষ হয়েছে ফ্রীজ থেকে।

৩.

“বসুন।ভাল আছেন নাজিয়া?আমার মনে হয়ে ছিল আপনি আবার আসবেন।”ব্যক্তিগত এচিভমেন্ট -- আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা

“আচ্ছা।এমন মনে হওয়ার কারন?”

অকারনে কাশলেন সাখওয়াত সাহেব। “আপনি কথা শেষ করেন নি সেদিন। মনে হয়েছিল আরো কিছু বলার ছিল। আপনি কফি খাবেন? এইসময় টায় আমি এক কাপ কফি খাই। চাইলে খেতে পারেন।”

“আপনার এসিস্টেন্ট ছেলেটার মেমোরি ভাল।আমাকে দেখা মাত্র চিনে ফেলেছে। ব্রিলিয়ান্ট!”

সাখওয়াত সাহেব হাসলেন। “ওর নাম মতিন। খুবই গাধা টাইপের ছেলে। আমার চেম্বারে প্রতিদিনের কিছু রুটিন ওয়ার্ক আছে,সেগুলো কখনোই সে ঠিক ভাবে করতে পারেনা। আমার ধারনা আপনি আগের বার ওকে বখশিশ দিয়েছিলেন। এদের কাছে এটা ইম্পরট্যান্ট বিষয়। তাই মনে রেখেছে। “

নাজিয়া হেসে ফেলল। ” হুম তাই হবে হয়ত। আমি জুরাইনে বড় হয়েছি। বাবা ওখানকার একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার ছিলাম আমরা। আমার একটা ছোট ভাই ছিল।সাত বছরে পানিতে ডুবে মারা যায়। অল্পবয়সী ছেলে দেখলেই ভাইটার কথা মনে হয়। মনে হয় ও  থাকলে এখন কত বড় হত।”

সাখওয়াত সাহেব তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তুমি টুনি? আশ্চর্য! বিস্মিত হলেন দারুণ ভাবে তিনি। ” প্রথম দিনই এত্ত চেনা লাগছিল! আমি চেয়েছিলামও জিজ্ঞেস করতে একবার! “

মাথানিচু করে রইল নাজিয়া। ” আপনি রাজশাহী চলে যাবার পর আর দেখা হয়নি বোধহয়। ভাল আছেন শামীম ভাই?”

নিস্তব্ধতা নেমে এল কক্ষে। প্রচণ্ড বিস্ময়ের সাথেসাথে অদ্ভুত এক অস্বস্তি বোধ করছেন সাখওয়াত সাহেব। নিরবতা ভাঙল নাজিয়া। “H.S.C. এর পর আমার হুট করে বিয়ে হয়ে গেল। তারপর আর জুরাইনের দিকে তেমন যাওয়া হয়নি। আমার বড়ফুপুকে মনে আছে আপনার? তিনি বেশ কায়দা করে বিয়েটা গুছিয়েছিলেন। একদিন দুপুরে বাসায় চলে এলেন তিনি। বাবাকে বললেন– “শোনেন ভাইজান, আপনার যে ফকিরি দশা! টুনির ভাল ঘরে বিয়ে দিতে গেলে জিহ্বা বের হয়ে যাবে। ভাল ছেলে পাইছি একটা। এইছেলের সাথে বিয়ে দিতে পারলে বুঝবেন আমাগো চৌদ্দ গুষ্ঠি ধন্য। ফুপুকে বাবা ভয় পেতেন। চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন–“টুনি মাত্র এইচ,এস,সি দিল। কিবা বয়স ওর!গ্রাজুয়েশন টা করুক। তারপর না হয় ভাবব। ফুপু ধমক দিলেন– “এইটা হইল বিয়ের উপযুক্ত বয়স। এইবয়সে মাইয়াগো চেহারায় আলাদা একটা ঝলকানি থাকে। আপনি তো এসব বুঝবেন না! অংক আর ইংরেজি বই নিয়া সারা জীবন কাটাইয়া দিলেন। “ফুপু এরপর মায়ের দিকে তাকালেন-“তোমরা বিয়ে দিবা না টুনির? পরে কিন্তু আইবুড়ো হইয়া বইসা থাকবে ঘরে!” মায়ের চোখে সম্মতি ছিল। আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম আমি।

চৌদ্দ গুষ্ঠি ধন্য করে একদিন রাতে ফুপুর বাড়ী তে বসে আমার বিয়ে হয়ে গেল। ছেলে ব্যবসায়ী। গাড়ী আছে, উত্তরায় বাড়ী। ধন্য হবার মতই। বিয়েতে বাবাকে তেমন খরচও করতে হলনা। বাড়ীর সাজসজ্জা দেখে আমি নিজেও হতবাক। এত বড়লোক বাড়ীর লোকেরা কেন আমায় বউ করল সেটা বুঝতে অবশ্য আমার কিছুদিন সময় লাগল। সে প্রসংগে পরে আসি।

যাই হোক, তিন দিনের মাথায় বাবা গেলেন আমাকে আনতে। কি অদ্ভুত জানেন! বাবা বসার ঘরে সোফায় বসে আছে একাএকা,পায়ের কাছে দুইটা মিষ্টির প্যাকেট। আমি নীচে নেমে অবাক। জড়িয়ে ধরলাম বাবাকে। জিজ্ঞেস করলাম- “কখন আসছ?” বাবা চুপ করে রইলেন। কাজের লোক কে জিজ্ঞেস করে জানলাম প্রায় দুইঘন্টা ধরে বাবা বসে আছেন একা একা। আমি চোখ কপালে তুলে একদৌড়ে শ্বাশুড়ির ঘরে গেলাম। বললাম -আমার বাবা এসেছে! সে নির্লিপ্ত ভাবে বলল – জানি। বলে দাও তুমি যাবেনা। আমি তাকিয়ে রইলাম হতবাক হয়ে। বললাম – কেন যাব না? আমার শ্বাশুড়ী প্রচণ্ড জোরে ধমক দিলেন — “বলছি যাবা না ; ব্যস যাবা না। এত তর্ক কর ক্যান!” আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। অসাড় পায়ে নীচে নেমে এলাম। বাবাকে বললাম — তুমি চলে যাও বাবা। আজ আমার শ্বাশুড়ীর শরীর টা ভাল না।” বাবা একটা কথাও বললেন না। চলে গেলেন চুপচাপ। আমি বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলাম কতক্ষণ। বাবা যেখানে বসেছিলেন, সে জায়গা টা স্পর্শ করলাম আমি। তখনো শরীরের উষ্ণতা লেগে আছে বাবার। বুক টা ফেটে যাচ্ছিল শামীম ভাই!”

সাখওয়াত সাহেব স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। নাজিয়া কাঁদছে। নিজেকে সামলানোর কোন চেষ্টা নেই তার।

চোখ মুছল নাজিয়া– ” আমার স্বামী এলেন রাতে।তাকে সব খুলে বললাম আমি। তিনি মাথা হাত রাখলেন আমার। বললেন– মা যখন চাইছেন না তুমি ওখানে যাও, তখন যেওনা আর। শুধুশুধু অশান্তি বাড়িয়ে লাভ কি!”

আমি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলাম– ” ওনারা আমার বাবা মা।আমি কেমন করে না দেখে থাকব! এটা কি করে সম্ভব! তিনি আমার কথার জবাব দিলেন না। সারাটা রাত জেগে রইলাম আমি। দুঃস্বপ্নের মত লাগছিল সবকিছু। কত কিছু যে মনে পড়ল! বাবার হাতধরে মেলা দেখতে যাওয়া, ঈদের আগের দিন রাতে মায়ের রাত জেগে রান্না করা, জ্বর হলে আমাকে বাবার ভাত খাইয়ে দেয়া, প্রতিদিন বিকেলে মায়ের তেল দিয়ে চুল বেধে দেয়া! আরো কত কিছু! এতগুলো বছরের ভালবাসা স্নেহ একরাতে ভেবেভেবে শেষ করতে পারলাম না আমি। একটু পানি খাব।

সাখওয়াত সাহেব পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন।

“ধন্যবাদ। দম নিল নাজিয়া। তারপর একসময় জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম ভোরের আলো ফুটছে একটু একটু করে। আমি বারান্দায় এলাম। মরে যেতে ইচ্ছে করছিল আমার জানেন! এদের সাথে যে যুদ্ধ করব সেই মনোবল বা আত্মবিশ্বাস কোন টাই ছিল না আমার। বয়সই বা কত তখন! ১৮/১৯! তাছাড়া মানুষের বৈষয়িক অবস্থান আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তা বাড়ায়।যেটা ওদের তুলনায় খুবই নগণ্য আমার! ধীরেধীরে শান্ত হলাম আমি। নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তত করলাম। বিসর্জন দিলাম আমার ১৮ টি বছর। কারন আমি বুঝতে পারলাম এছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই আমার। তারপর থেকে আমি একদম অন্য মানুষ। ধীরেধীরে মিশে গেলাম ও বাড়ীর প্রতিটা অমানবিক নিষ্ঠুর সংস্কারের সাথে।

“তারপর? “

“বেশকিছু দিন পর ফুপু এলেন।সবশুনে তিনি বললেন– এত্ত বড়লোক জামাই, তোর বাড়ী গিয়া বসবে কোথায়! চাইলে ভাইজান এত বড় ঘরে তোরে বিয়া দিতে পারতনা। আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া আদায় কর!আর একটা বাচ্চা নিয়া ফেল। দেখবি আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি নিঃশ্চুপ হয়ে শুনলাম শুধু।

বছর খানেক বাদে হঠাৎ মা মারা গেলেন। গিয়েছিলাম আমি। মায়ের মৃতদেহের পাশে চুপ করে বসে ছিলাম। নিজেকে মনেমনে শান্তনা দিলাম– মানুষ তো মরে যাবেই। আর মা রুগ্ন ছিলেন সবসময়। তাই মরে গেছেন। বাবা দূরে থেকে তাকিয়ে ছিলেন। চলে আসবার সময় আমার হাত টা ধরলেন। বললেন– ‘প্রতিদিন রাতে তোর মা তোর ঘর টায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।আমি কাছে গেলেই বলত– আমাদের একটা মেয়ে ছিল, টুনি।” ঘর কাপিয়ে হাসতে লাগল নাজিয়া– জীবন কি অদ্ভুত! তাইনা শামীম ভাই!”

বাবার আত্মসম্মান বোধ ছিল প্রবল। কোনদিন আর আমার শ্বশুড়বাড়ীর ছায়াও মাড়ান নি তিনি। কিন্তু আমি লুকিয়ে লুকিয়ে যেতাম মাঝেমাঝে। সে যাওয়ায় যে কত শংকা, অস্থিরতা! বাবা বুঝতেন। বলতেন–চলে যা তুই, এভাবে আসিস না মা। এমনি চলছিল জীবন। এরপর একদিন আমার শ্বাশুড়ী ডেকে বললেন- “বাচ্চাকাচ্চা নাওনা কেন তোমরা? কম দিন তো হইল না! আমি লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইলাম। ভাবলাম একটা বাচ্চা হলে মন্দ হয়না।

আমার মনে আছে, সেদিন ছিল ৯ জুন। শুক্রবার। খুব সকালে বাগানে পায়চারী করার অভ্যেস ছিল আমার। হঠাৎ দেখলাম গেট থেকে বয়স্ক মত একজন লোক ঢুকলেন, কোলে ৬/৭ মাসের একটা বাচ্চা। চেনা কেউ নয় তাই এগিয়ে গেলাম আমি। নাম জিজ্ঞেস করতেই কেমন সংকুচিত হয়ে গেল সে। তারপর একটা খাম এগিয়ে দিল। খামটা খোলাই ছিল। ভেতরের কাগজ টার ভাজ খুললাম আমি। এক কাজ করেন শামীম ভাই,  চিঠি টা আপনিই পড়েন। নিয়ে এসেছি। যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম।” খাম টা এগিয়ে দিল নাজিয়া। সাখওয়াত সাহেব ভাজ খুললেন চিঠির।

ইমতিয়াজ “

জীবনের চরম ভুল ছিল তোমাকে বিশ্বাস করা। আমার বোঝা উচিৎ ছিল আমাদের মত মেয়েদের কেউ জীবন সংগী করেনা কখনো। তুমিও তার ব্যতিক্রম ছিলেনা। তাই এতটা সময় পার হয়ে গেলেও আমার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারনি তুমি। ফ্লাটের মালিক জেনে গেছে আমি তোমার স্ত্রী নই। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই বাচ্চার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর তার কাছথেকেই জানলাম তুমি বিয়ে করেছ বেশ অনেক দিন। আমার সাথে এতদিন লিভটুগেদার, তারপর অন্য মেয়েকে বিয়ে করা। এসব নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলবনা। কিন্তু তোমার কঠিন অপরাধ হল এই সন্তান কে পৃথিবীতে আনা। ও” কার পরিচয়ে বড় হবে? আর ওকে নিয়ে সামনের দিকে চলাও আমার পক্ষে অসম্ভব। আমাকে ও তো বাঁচতে হবে। আমি অনেক বাস্তববাদী হলেও সাময়িক সময় তোমার প্রলোভনে ভেসে গিয়ে ছিলাম। তবে আর নয়। তোমার সন্তানকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিলাম। ঠিকানা বদল করেছি।

“জেনি”

সাবধানে চিঠিটা ভাঁজ করে সাখওয়াত সাহেব নাজিয়ার দিকে তাকালেন। মুখ ওপরের দিকে তুলে চোখ বন্ধ করে আছে সে। বসার ভঙ্গিতে অন্যরকম দৃঢ়তা। খানিক বাদে চোখ খুলল সে– পড়েছেন?

“হ্যাঁ”

“আমি বাচ্চাটাকে কোলে নিলাম। সোজা আমার শোবার ঘরে চলে গেলাম। এক ধাক্কায় ঘুম থেকে তুললাম ওকে। বাচ্চা দেখেই সে পরিস্থিতি আন্দাজ করে ফেলল। খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল– “জেনি এসেছে? আমি তীব্র ঘৃনায় চিঠিটা ছুড়ে দিলাম তার দিকে। সে বলল- “এত উত্তেজিত হবার কিছু নেই। জেনিকেই বিয়ে করতাম আমি। মা আর তোমার ফুপুর ষড়যন্ত্রে তুমি এসেছ এখানে বউ হয়ে। জেনিকে দেখলে বুঝতে, সে অসাধারণ!” চিঠিটা পড়ে নির্বিকার ভাবে সিগারেট ধরাল ইমতিয়াজ।

আমার কান্নাকাটি দেখে শ্বাশুড়ী বললেন– “বলছিলাম একটা বাচ্চা নিয়া ফেল। এই নস্ট মেয়েটার পাল্লায় পড়ে আমার ছেলেটা শেষ হয়ে গেছে। ঘরে বাচ্চাকাচ্চা থাকলে পুরুষ মানুষের সংসারে মন বসে। “

“তোমার একমাত্র ছেলেই হল সেদিনের সেই ছোট্ট বাচ্চাটা। তাইনা?”

“হ্যাঁ। ওর নাম ইভান। সেদিন আমি মনেমনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম, ইমতিয়াজের বাচ্চার মা আমি হব না, কখনওই না। তাকে জানিয়েও দিয়েছিলাম একথা। সে খুব অহংকারী ভঙ্গিতে বলেছিল– “As you wish.” ইভানকে আমি ভালবেসেই বড় করেছি। কখনো বুঝতে দেইনি আমি ওর মা নই। কিন্তু সে বড় হচ্ছে। একদিন এই সত্য জানবেই।” দারুণ ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হল নাজিয়া।

“তোমার শ্বাশুড়ি এখন কোথায়? “

“বছর দেড়েক আগে মারা গেছেন। এখন এই সাম্রাজ্যে একছত্র আধিপত্য আমার!” শব্দ করে হাসল নাজিয়া।

“আর স্যার, মানে তোমার বাবা?”

“গ্রামের বাড়ীতে চলে গেছেন। ওখানে লোকজন আছে, বাবাকে দেখাশোনা করতে পারে। ভাল আছেন। ছোট্ট একটা স্কুল করেছেন ওখানে। বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ভালই সময় কাটে তার!”

“আমি কিছু কথা বলতে চাই তোমাকে।”

“জ্বী, বলেন।”

“তুমি যেদিন প্রথম এসেছিলে সেদিনের কথা অনুযায়ী তুমি শেষ দুবছর থেকে বুঝতে পারছ যে – তোমার স্বামী কে তুমি ভালবাসনা। দেখ, বিয়ের পরই নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় তোমাকে। তারপর তুমি তোমার স্বামীর এতবড় একটা বিষয় জানতে পারলে। যেটা স্বাভাবিক ভাবেই কোন মেয়ের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তুমি মেনে নিলে এবং তার অবৈধ সন্তান ভালবাসা দিয়ে বড় করলে। বিষয় টা একটু অদ্ভুত না, টুনি?”

“হয়ত, জানিনা আমি।”

“আমার ধারনা স্বামী এবং তার পরিবারের প্রতি তীব্র ঘৃনা তোমার মধ্যে একধরনের প্রতিশোধ স্পৃহা তৈরী করেছিল। আর সেকারনেই তুমি এই বাচ্চাটিকে লালনপালন করেছ। স্বামীর কৃত অন্যায়টিকে তার চোখের সামনেই সযত্নে ধরে রেখেছ প্রতিনিয়ত । তুমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে স্বামীর ঔরসজাত সন্তানের মা কখনওই হবেনা। মনে কত টা ঘৃনা পোষণ করলে এতটা বছর এই সিদ্ধান্তে অনড় থাকা যায়, তা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখেনা। তুমি ধরে রেখেছ। কারন তুমি গত দুইবছর না, ১৭ বছর ধরেই স্বামী কে ভালবাসনা।”

এবার আসি ২য় প্রসংগে। আমার ধারনা, আসলে গত দুই বছর আগে তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছ- তুমি কি করতে চাও। আরেকটু খুলে বলি বিষয়টা। দুই বছর আগ পর্যন্ত তুমি তুমি একটা ট্র‍্যাকে চলেছ।তোমার সংসার, তোমার ছেলে সময়ের গতিতে গতানুগতিক ভাবে সামনে এগিয়েছে। তারপর হঠাৎ করেই তোমার হয়ত মনে হচ্ছে , এই সংসারে তোমার কোন ভিত নেই, এই সন্তান তোমার নিজের নয়, স্বামী কখনওই তোমার আপন ছিলেন না। এই বোধগুলো তোমাকে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছতে সাহায্য করেছে। মানুষ যখন তার গন্তব্য ঠিক করে ফেলতে পারে, তখনই সে তার অপ্রিয় গোপন সত্যকথা অন্যকে নির্দ্বিধায় বলতে পারে। তার নিরাপদ আশ্রয় কেও তুচ্ছ করতে পারে। তোমার ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে বলে আমার ধারনা। তুমি কি কোথাও চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছ?”

নাজিয়া তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। হ্যাঁ, আমি বাবার কাছে চলে যাব। গত ১৮ টা বছরের একটা দিনও আমি নিজের মত কাটাইনি। আমার বাকী দিন গুলো আমি আমার মত করে কাটাতে চাই। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে চাই খোলা আকাশের নীচে । বাবার হাত ধরে গভীর ভালবাসায় বলতে চাই– আমি এসেছি বাবা। আমার কোন পিছুটান নেই, কোন দায় নেই। মুক্ত হতে চাই আমি। যাচ্ছি, ভাল থাকবেন শামীম ভাই।”

সাখওয়াত সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। পেছন ফিরল নাজিয়া। “আপনি এত অদ্ভুত কেন বলেন তো! একটা বারও জানতে চাইলেন না,  এত বছর পর আমি আপনাকে কিভাবে খুঁজে বের করলাম! যেদিন ডাক্তারি পড়তে আপনি রাজশাহী চলে যাচ্ছিলেন। রাতে আমাদের বাড়ী এলেন বাবাকে সালাম করে বিদায় নিতে। বাসার গেট টার কাছে দাঁড়িয়ে আমি কাঁদছিলাম। আপনি আমাকে দেখে বললেন– আসি টুনি, ভালভাবে লেখাপড়া করো। একবারও জানতে চাইলেন না, কেন কাঁদছি! “

সাখওয়াত সাহেব প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন– সেদিন সে প্রশ্ন না করলেও আজ উত্তরটা তার জানা।

অজানা এক অপরাধ বোধে আক্রান্ত লোক টিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল নাজিয়া। আজ অন্যরকম প্রশান্তিতে আবিষ্ট তার মন। হাতের মুঠোতে ধরা ট্রেনের টিকিট টা আরও শক্ত করে চেপে ধরল সে…..।

নাজিয়া যেতে পারেনি৪.

পরিশিষ্টঃ নাজিয়া যেতে পারেনি। আসলে নাজিয়ারা যেতে পারেনা। কোন না কোন অদৃশ্য মায়ায় তারা আটকে যায়। তাকে শেষ মূহুর্তে আটকে দিয়েছিল অপার্থিব এক বোধ। জন্ম না দিয়েও সে যে কখন মাতৃত্বের জালে ভয়াবহ ভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল, সে নিজেও জানেনা। এক শেষ বিকেলের স্নিগ্ধ মায়াময় আলোতে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়েছিল– এতশত অপ্রাপ্তির মাঝেও নির্মল আনন্দ টুকু সে যার কাছ থেকে পেয়েছিল, তাকে ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়, কখনোই নয়।

এন টি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে