আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > গল্প: রঙ্গন আর নবনীতার গল্প

গল্প: রঙ্গন আর নবনীতার গল্প

এস এম নিয়াজ মাওলা
এস এম নিয়াজ মাওলা

এস এম নিয়াজ মাওলা:

(১)

যে কেউ দেখলে ভাববে রঙ্গন এক দৃষ্টিতে হাতে ধরা মোবাইলের স্ক্রীনে তাকিয়ে আছে। আসলে রঙ্গন তাকিয়ে নেই, রঙ্গন হারিয়ে গিয়েছে। রঙ্গন হারিয়ে গিয়েছে পঁচিশ বছর আগেকার সময়ে।

রঙ্গন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে তরুণ। সবকিছুতেই, সবজায়গাতেই রঙ্গন। ক্যাম্পাসের খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সামাজিক কাজ, আবার রাজনীতি- কোথায় নেই সে! ক্যাম্পাসের মধ্যমণি হলে একটা সমস্যা দেখা দেয়। সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে সে থাকে, কিন্তু তার কেন্দ্রবিন্দুতে কে থাকে, সেটা বোঝা মুশকিল হয়ে যায়। এমনকি মাঝে মাঝে সেই কেন্দ্রবিন্দুর অস্তিত্বের টের পাওয়াটাও কঠিন হয়ে যায়। এই যেমন, রঙ্গনকে অনেকেই ভালোবাসতো, কিন্তু রঙ্গন যাকে পছন্দ করতো- এই এতো এতো ভালোবাসার ভীড়ে তার অনুভূতিটা কী রঙ্গন কখনো জানতে পেরেছিল?

নবনীতাকে প্রথম থেকেই ভালো লাগতো রঙ্গনের। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মেয়েটির চোখ তাকে টেনেছিল, যে মেয়েটির মেধা তাকে মোহিত করেছিল, সে ছিল নবনীতা। অথচ তার অভিব্যক্তি রঙ্গন কখনো বুঝতে পারেনি। ধরতে পারেনি নবনীতার পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের আড়ালের মানুষটিকেও। তাই ক্যাম্পাসের মধ্যমণি হয়েও এক অজানা আশংকায় নবনীতাকে কখনই মনের কথা বলা হয়ে উঠেনি রঙ্গনের। নবনীতা ছিল রঙ্গনের গোপন ভালোবাসা!

আজ এতো বছর পর সেই গোপন নবনীতাকে রঙ্গন আবার খুঁজে পেল! খুঁজে পেল খোমোবইতে। দুপুরের খাওয়ার পর বিছানাতে শরীর এলিয়ে একটু বিশ্রাম নেবার ফাঁকে খোমোবইয়ের এখান থেকে সেখানে ঘুরতে ঘুরতে আচমকা পেয়ে গেল নবনীতাকে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকলো খোমোবইয়ে দেওয়া তার প্রোফাইল ছবির দিকে- সেই চোখ, সেই নাক, সেই চুল! একটুও পরিবর্তন হয়নি। রঙ্গনের বুকের বামপাশে যেনো চিনচিনে ব্যথা করতে লাগলো। বেশ কিছুটা সময় পর, রঙ্গন যেনো অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এলো। ইতস্তত মন নিয়ে শেষ পর্যন্ত খোমোবইতে বন্ধুত্বের অনুরোধ করেই ফেললো।

এরপর শুরু হল অপেক্ষার প্রহর। রঙ্গন দশ মিনিট পর পর খোমোবই চেক করতে লাগলো, নবনীতা বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহন করেছে কি না দেখার জন্য। প্রোফাইলে প্রাইভেসী দেওয়া থাকায় নবনীতা সম্পর্কে কিছুই জানা যাচ্ছিল না। কোথায় থাকে সে, কি করে, স্বামী কেমন, কয় সন্তান আছে ওর- কিছুই জানা নেই রঙ্গনের। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, রঙ্গনের উত্তেজনাও হতাশায় পরিণত হতে যাচ্ছে।

‘একটু পর পর মোবাইলে কি দেখ? ঐসব কাজ বাদ দিয়ে সংসারে মন দাও। আঠার বছর আমাকে জ্বালা যন্ত্রনা দিচ্ছ, আর দিও না। এই বুড়ো বয়সে কার সাথে চ্যাট করছো? মেয়ে মানুষ দেখলেই চুক চুক করার স্বভাবটা তোমার গেল না! প্রোস্টেট বড় হয়ে গেছে, ডাক্তারের কাছে যাও’, রিদিতার বাজখাই কন্ঠে রঙ্গন চুপসে গেল। ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে আসার পর রঙ্গন একবার ভেবেছিল নবনীতার কাছে যাবে, একবার হলেও জানতে চাইবে ওর মনের কথা। কিন্তু হেরে যাবার ভয়ে আর যাওয়া হয়নি। পরে বাবা মায়ের পছন্দ করা পাত্রী রিদিতাকে নিয়ে শুরু হলো তার পারিবারিক জীবন। রিদিতার অনেক কিছুই রঙ্গনের ভালো লাগে। স্বামীর প্রতি ভালোবাসা, সংসারের প্রতি টান, সন্তানদের প্রতি মমতা- অনেক কিছুই! কিন্তু মাঝে মাঝে এই রিদিতাকেও অসহ্য লাগে রঙ্গনের। রিদিতা খুব অহংকারী, খুব বদরাগী, খুব হিতাহিতজ্ঞানশূণ্য নারী এবং হঠাৎ করেই রেগে যায়। আর রেগে গেলে ভরা মজলিশে স্বামীকেও অপমান করতে ছাড়ে না। সবচেয়ে বড় কথা সন্দেহের বিষপাস্পে জর্জরিত সে। আঠারো বছরের এই সিরিয়াল নাটকে অভিনয় করতে করতে রঙ্গনও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই গুমোট, দম বন্ধ হওয়া পরিবেশ থেকে সে এবার মুক্তি চায়। সে এবার একটা সিদ্ধান্তে চলেই এসেছে। সেপারেশনে থাকাটাই তাদের জন্য ভালো হবে, রঙ্গনের জন্য মানসিক প্রশান্তির ব্যাপার হ, যদিও এখনো সিদ্ধান্তের কথা রিদিতাকে জানায়নি। তবে ওর কাছে মনে হচ্ছে খুব সহসাই জানাতে হবে।

ঘড়ির দিকে তাকালো রঙ্গন। বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। বাইরে যেতে হবে। হঠাৎ করে মোবাইলে নোটিফিকেশনের শব্দে চমকে গিয়ে দেখলো স্ক্রীনে মেসেজ এসেছে। নবনীতা রঙ্গনের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করেছে!

(২)

খুব চমকে গিয়েছিল নবনীতা! সকালে ঘুম থেকে উঠেই খোমোবইয়ে ঢুকে রঙ্গনের বন্ধুত্বের অনুরোধ পেয়ে থমকেই গিয়েছিল। যে কোন বন্ধু অনুরোধ মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সে অনেক চিন্তা ভাবনা করে থাকে। অনুরোধকারীর প্রোফাইল ঘুরে আসে, নিদেনপক্ষে যারা পারস্পরিক বন্ধু আছে, তাদের কারো কাছে বন্ধুত্বের অনুরোধকারী সম্পর্কে খোঁজ খবরও নিয়ে থাকে। কিন্তু রঙ্গনের ক্ষেত্রে যেন কোনো নিয়মই মেনে চলা হয়নি। দেখা মাত্রই নবনীতা অনুমোদন করে ফেলেছিল। তারপরই শুরু হল ধুকপুকানি!

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে আর কখনো রঙ্গনের সাথে নবনীতার দেখা হয়নি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেও যে খুব কথা হতো বা দেখা হত- ব্যাপারটা এরকম ছিল না। দুইজন দুই বিভাগে ছিল, কথা হবার সুযোগই ছিল কম। তবুও একবার কথা হয়েছিল। আন্তঃবিভাগ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নবনীতার উজ্জ্বল পারফরমেন্সে রঙ্গন নিজে থেকেই এগিয়ে এসেছিল কথা বলার জন্য। সেদিন থেকে কয়েকদিন নবনীতা ঘুমোতেই পারেনি। যখনই দেখা হতো রঙ্গনের সাথে চোখ নামিয়ে ফেলতো, কিন্তু বুকের মধ্যে দ্রিম দ্রিম শব্দ বেজে চলতো। রঙ্গন ক্যাম্পাসে এতো জনপ্রিয় ছিল যে, নবনীতা সেখানে তার কাছে যাবার কথা চিন্তাই করতে পারেনি। তারপর একদিন……

হ্যাঁ, তারপর একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ না করেই নবনীতার কপালে সিঁদুর উঠলো, হাতে পরলো শাখা। ভালো পাত্র, দেশের বাইরে থাকে- নবনীতার বাবা মা সুপাত্র হাত ছাড়া করতে চাইলেন না, কিন্তু হাত ছাড়া করে ফেললেন মেয়ের ভাগ্যকে, মেয়ের ভালোবাসাকে। বিয়ের কিছুদিন পরেই নবনীতা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে চলে এলো পৃথিবীর আরেক প্রান্তে। প্রথম প্রথম নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন স্বামী- ভালোই লাগছিল নবনীতার। স্বপ্নের মতো দিনগুলো চলে যাচ্ছিল। এরপর ধীরে ধীরে স্বামীর আসল চেহারা বেরিয়ে আসতে লাগলো। নবনীতা ছিল ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার। এরই মধ্যে দুই মেয়ের মাও হয়ে গেল সে। শেষ পর্যন্ত আর পারেনি! একসময় নবনীতা আবিষ্কার করলো তার হাত ধরার আর কেউ নেই। সেই থেকে দুই মেয়েকে নিয়ে জীবন সংগ্রামে নেমে আজ যখন কিছুটা সুখের হাতছানি দেখছে, তখনই রঙ্গমঞ্চে রঙ্গনের আবির্ভাব!

‘কেমন আছ তুমি?’ মেসেঞ্জারের শব্দে সচকিত হয়ে উঠলো নবনীতা। রঙ্গন ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছে মেসেঞ্জারে!

– ভালো। আপনি?

– খুব ভালো! তুমি কি আমাকে আপনি বলতে?

– কথা বলারই তো সুযোগ হয়নি আপনার সাথে, কীভাবে বলবো কি সম্বোধন করতাম!

– তাহলে তোমার ব্যাপার। ইচ্ছে করলে তুমি বলতে পারো। আপনার তুলনায় তুমিতে খুব কাছের মনে হয়, আপন মনে হয়।

– অনেকদিনের গ্যাপে তুমি বলতে খুব অস্বস্তি লাগে, সময়ও লাগে। এখন আপনিই থাকুক, সেটাই ভালো হবে।

নবনীতার সোজা সাপ্টা কথায় রঙ্গন যেনো কিছুটা চুপসে গেলো। নবনীতাও ক্ষুদে বার্তাটি পাঠিয়ে যেন লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কীভাবে সেটিকে ফিরিয়ে আনা যায়! কথা শুরুর আগেই কথা শেষ! তবুও যেন বন্ধ হলো না নবনীতা আর রঙ্গনের পথচলা! এ যেন তাদের ভালোবাসার গল্প!

গল্প: রঙ্গন আর নবনীতার গল্প

(৩)

‘নবনীতা, আজ হারানোর কিছু নেই আমার, পাবারও কিছু নেই। তাই একটা সহজ কিন্তু গোপন সত্য তোমার কাছে স্বীকার করতে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে মনে হয় এই কথাটা সেই পঁচিশ বছর আগে কেন বলিনি! তুমি ছিলে আমার সেই দূরন্ত সময়ের গোপন ভালোবাসা! তোমাকে নিয়ে ভাবতাম, ভাবতে খুব ভালো লাগতো। তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম, স্বপ্ন দেখতে সাহস লাগে। ভাবতাম, সেই সাহস আমার আছে। তোমায় নিয়ে কল্পনা করতাম, সেই কল্পনাকে যখন বাস্তবে নিয়ে আসবো- ঠিক তখনই একদিন দেখলাম তুমি নেই! কোথায় হারিয়ে গেলে! এতোটা বছর হয়ে গেল। স্ত্রী, সন্তান আর সংসারের কোলাহল থেকে যখন একটু আলাদা হয়ে যেতাম, আনমনে তোমার কথাই কেনো যেন ভাবতাম! আজও আমি জানি না, কেন সময় থাকতে তোমায় বলতে পারিনি – ভালোবাসি তোমায়!’

মেসেঞ্জারে রঙ্গনের এই ক্ষুদে বার্তা নবনীতা পড়ছে, আর নিরবে দুটো চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। ‘তোমায় দেখতে চাওয়াটা কি খুব বেশি চাওয়া হবে আমার জন্য?’ ‘এতোদিনে তোমার অস্বস্তি দূর হলো, সময়ও হলো! তুমি আমাকে তুমি বলছ!’ উৎফুল্ল হয়ে উঠলো রঙ্গন। নবনীতা বিয়ের পর নিউইয়র্কে চলে আসলেও, রঙ্গন থেকে গিয়েছিল ঢাকাতেই। এই বিশাল মহাদেশীয় দূরত্বকে দূরে ঠেলে দিল প্রযুক্তি।

প্রায় প্রতিদিন নবনীতা আর রঙ্গনের কথা হতো ভিডিও চ্যাটের মাধ্যমে। দুই মহাদেশের সময় মিলিয়ে দুইজন সারাদিন অপেক্ষা করতো কখন তারা কথা বলবে! একদিন ভিডিও চ্যাটের সময় হঠাৎ করেই রঙ্গন নবনীতাকে বললো, ‘তুমি ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাও না! এরপর থেকে আমার সাথে যেদিন কথা বলবে লিপস্টিক লাগাবে’। খুব অবাক হয়েছিল নবনীতা। জানতে চেয়েছিল লিপস্টিক লাগানো রঙ্গনের প্রিয় কি না।

– না, আমার প্রিয় না। তবুও আমি চাই। কেন জান? তুমি যদি লিপস্টিক লাগাও, মনে হবে কেউ একজন আমার কথা শুনছে। মনে হবে কেউ একজন আমার কথার গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ব্যাপারটা টিউনিং এর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ!

– তুমি আমার কথার গুরুত্ব দাও?

– অনেক। এই দেখো না, তুমি রবীন্দ্রনাথ খুব পছন্দ কর, তাই আমিও এখন রবীন্দ্রনাথ পড়ি। রবীন্দ্রনাথ শুনি। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ঘুমাই! রবীন্দ্রনাথ পড়তে গিয়ে কি মনে হয়েছে জান? এই দাঁড়িওয়ালা অসম্ভব জ্ঞানী ভদ্রলোক সেই অতীতেই মনে হয় আমাদের কথা জানতেন। তাই তিনি লিখে গিয়েছিলেন, ‘আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান, প্রানেরও আশা ছেড়ে সপেছি প্রাণ’!

– বিষ যখন পান করেছিই, তখন তাতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হতে চাই। আমার বলতে বাধা নেই, আমার বলতে লজ্জা নেই- রঙ্গন, আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি। এই ভালোবাসা যদি পাপ হয়, আমি সেই পাপের গর্বিত ভাগীদার।

– এতো ভালোবাসো আমায়? জানো তো, বেশি ভালোবাসলে কষ্ট পেতে হয়। কষ্টটাকে সহ্য করতে পারবে?

– যদি কেড়ে নিতে বলে কবিতা ঠাসা খাতা, জেনো কেড়ে নিতে দেবোনা। যদি ছেড়ে যেতে বলে শহুরে কথকতা, জেনো আমি ছাড়তে দেবোনা। আর আমি আমি জানি জানি চোরাবালি কতখানি গিলেছে আমাদের রোজ, আর আমি আমি জানি প্রতি রাতে হয়রানি হারানো শব্দের খোঁজ।

– বাহ্! তুমি রুপম আর অনুপমের গান শুন?

– আগে শুনতাম না। যেদিন থেকে জানি শ্রেয়া ঘোষাল, অনুপম, রুপম তোমার প্রিয়, সেদিন থেকে আমারও প্রিয় তারা। আমিও তাদের গান শুনি।

এভাবেই সময় বয়ে যেতে লাগলো। রঙ্গনের কাছ থেকে তার পরিবারের অশান্তির কথা শুনতে শুনতে নবনীতা যেনো তার অতীতেই ফিরে যেত। দুইজনের পারিবারিক অশান্তি, অতৃপ্তি দুইজনকেই যেনো আরো কাছে টেনে আনলো।

– নবনীতা, তুমি কি একটা ব্যাপার জান? যখন তুমি আমার সাথে কথা বলতে আসো, তোমার চেহারায় তখন দুই ধরনের পরিবর্তন দেখি। কথার শুরুতে তোমার চেহারায় একটা খুশি খুশি ভাব দেখা যায়, যেরকম দেখা যায় কোনো মেয়ের বিয়ে যখন ঠিক হয়। আবার যখন আমাদের কথা শেষ হয়, আমি তোমার চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকি। অবাক হয়ে দেখি সেখানে একটা কষ্ট, বেদনা কাজ করে। আমার খুব ভয় হয়! আমি কি তোমার এই ভালোবাসার যোগ্য?

নবনীতাও কথা হারিয়ে ফেলে। কী বলবে কিছু খুঁজে পায় না। আর তাই এই আধুনিক যুগেও আশ্রয় নিতে হয় হাতে লেখা চিঠির। খুব বড় চিঠি লিখতে পারে না নবনীতা। কোনো একটি বিষয়ের উপরে দুই তিন বাক্যের ছোট চিঠি! কিন্তু এইসব চিঠির খামে থাকতো নবনীতার হাতের ছোঁয়া, ভালোবাসার ছোঁয়া। রঙ্গন যেদিন প্রথম এই চিঠি পেয়েছিল, সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। বার বার ছুঁয়ে দেখছিল। বার বার এই দুই বাক্যের চিঠি পড়ছিল! ওর কাছে মনে হচ্ছিল ওর এই জীবনে এর থেকে আনন্দ আর কিছুতেই পায়নি! একবার এক চিঠিতে নবনীতা লিখেছিল, রঙ্গনের ভারী কন্ঠ খুব ভালো লাগে। এরপর থেকে রঙ্গন সকালে ঘুম থেকে উঠে গলা পরিষ্কার না করেই নবনীতার সাথে কথা বলতো। নবনীতাও ভারী কন্ঠের মাদকতায় হারিয়ে যেতো। হারিয়ে যেতো রঙ্গনের সাবলীল আর মনকাড়া হাসির যাদুতে।

এমনি করেই চলছিল নবনীতা আর রঙ্গনের গল্প।

শিল্পির পেন্সিলে, দূরত্বে দ্বৈতসত্তা

(৪)

এই ধরনের গল্পগুলো কখনোই মিলনান্তক হয় না। হতে দেয় না সমাজ, হতে দেয় না পারিপার্শ্বিক অবস্থা। আর তাই একদিন রঙ্গন নবনীতাকে জানিয়ে দিল আত্মীয় স্বজনদের চাপে আর সন্তানদের জন্য রঙ্গনকে ওর স্ত্রীর কাছে আবার ফিরে যেতে হবে। ফিরে যেতে হবে আগের সেই একঘেয়ে অশান্তিময় জীবনে। জীবনে কখনো কখনো অমূল্য কিছু পেয়েও ছেড়ে দিতে হয়- জীবনের জন্যই।

হয়তোবা উল্টা কিছু! হয়তোবা রঙ্গনই চেয়েছে পুরানো, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনে। সে জীবনে যতই অশান্তি থাকুক, যতই রিদিতার অত্যাচার থাকুক- সেটাতেই হয়তো রঙ্গন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। মাঝের নবনীতার সাথে সময়টুকু হয়তোবা ছিল নতুন কোনো এডভেঞ্চার! সেটা যাই হোক, আমার ভাবতে ভালো লাগে কিছু সময়ের জন্য হলেও সত্যিকার অর্থেই রঙ্গন নবনীতাকে ভালোবেসেছিল।

আমার বিশ্বাস, নবনীতাও তাই মনে করে। আর তাই আজো সে রঙ্গনকে ভুলতে পারেনি, প্রতিনিয়ত দিয়ে চলেছে তাকে দেবতার অর্ঘ্য! আজো সে সময় পেলেই খোমোবইয়ের মেসেঞ্জারে দেওয়া রঙ্গনের শেষ ক্ষুদে বার্তাটি পড়ে আর নীরবে অশ্রু বিসর্জন করে, ‘আমি জানি তুমি ভাববে আমি তোমার জীবনে তাহলে কেন এসেছিলাম! নবনীতা, আমি এসেছিলাম আমার জন্যই। তুমি আমার জীবনটাকে রাঙিয়ে দিয়েছিলে ভালোবাসা দিয়ে, যে ভালোবাসা আমি কোথাও পাইনি। আমি খুব বুভুক্ষের মতো থাকতাম তোমার সাথে কথা বলার জন্য, তোমাকে ভিডিওতে একটি বার দেখার জন্য। তোমার কাছেই আমি শিখেছি জীবনের মানে। তোমাতেই খুঁজে পেয়েছি আমার হারানো আত্মবিশ্বাস আর ভালোবাসা। তুমি জানো কি, ভালোবাসা আর একসাথে ঘর করা এক নয়! হয়তোবা আমি আমার স্ত্রীর সাথে একসাথে থাকবো, হয়তো এই জীবনের বাকী সময়টুকুও একসাথে পাড়ি দিবো, কিন্তু আমার নিশ্বাসে থাকবে তুমি, আমার চিন্তা চেতনায় থাকবে তুমি। সব ভালোবাসার মানেই একসাথে থাকা নয়, আর সব একসাথে থাকা মানেই ভালোবাসা নয়! নবনীতা, তোমার মনে আছে আমরা একসাথে রবীন্দ্রনাথের ‘আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান’ গানটি ইংরেজীতে অনুবাদ করেছিলাম? সেদিন আমার মনে হয়েছিল, আসলেই আমরা বিষ পান করেছি। আর জেনে শুনে করেছি বলেই এই বিষে আমাদের মরণ হয়তো এখনই হবে না, কিন্তু জেনো রেখো- যেদিন মরণ হবে আমার, সেদিন এই বিষের জন্যই হবে, সেদিন তোমার জন্যই হবে!’

More I see him, the more I suffer

And I relish the pain in silence

Yet cannot go too far as if I long to die

I submit myself to fiery fire

Knowingly am drunk with hemlock in dire

O! Handed you my life with no strings afire

The more thou sever me with thy smile

The more I long to quench thou desire

My longing for the eternal spring of love

Ending my love in misery abound.

*’আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান’- এই গানটির ইংরেজী অনুবাদের জন্য এক বন্ধুর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা।

**যদি কেড়ে নিতে বলে কবিতা ঠাসা খাতা, জেনো কেড়ে নিতে দেবোনা— শিল্পীঃ রুপম ইসলাম, সপ্তর্ষী মুখার্জী, গীতিকার: অনুপম রায়, এলবাম: অটোগ্রাফ।

এন টি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে