আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > খুলনা > যশোর বেনাপোল সড়ক: সেতুমন্ত্রীর নির্দেশেও বেহাল

যশোর বেনাপোল সড়ক: সেতুমন্ত্রীর নির্দেশেও বেহাল

benapole-jessore-road

প্রতিচ্ছবি যশোর প্রতিনিধি:

টানা বর্ষণ ও জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করায় বেনাপোল-যশোর মহাসড়কের ৩৮ কিলোমিটারে মধ্যে ৩০ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মহাসড়কের কার্পেটিং উঠে অসংখ্য ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ঈদের আগে সড়কটি সংস্কার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত রোববার যশোর সার্কিট হাউজে নির্বাহী প্রকৌশলীদের সাথে এক মত বিনিময় সভায় এই নির্দেশ দেন। সেখানে যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীরা তখন সোমবারের মধ্যে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার কথা জানালেও আজও তা হয়নি।

যে সড়কটির কারনে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে এতো কর্মযজ্ঞ। যার বুক চিরে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার মালামাল আমদানি-রফতানি করা হচ্ছে। প্রতিবছর বেনাপোল থেকেই সরকারি কোষাগারে জমা পড়ছে ৫ হাজার কোটি টাকা। সেই সড়কটির প্রতি কারও নজর নেই। যে কোন সময় বন্ধ হয়ে যেত পারে এই মহাসড়কটি। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বেনাপোল ও ভোমরা বন্দরের গুরুত্ব অপরিসীম। গত বছর এ সড়কটির কিছু অংশ কার্পেটিং করা হয়েছিল। তড়িঘড়ি করে কাজটি সম্পন্ন করতে জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হয় সড়কটি। ৬ মাস যেতে না যেতে কার্পেটিং উঠে আবার বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়।

জানা গেছে, ভারত থেকে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল ও সাতক্ষীরার ভোমরা শুল্ক স্টেশন দিয়ে আমদানিকৃত হাজার হাজার টন মালামাল এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। শত শত দেশি-বিদেশী পাসপোর্টযাত্রী ও পর্যটক এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে থাকেন। বর্তমানে  যশোর-বেনাপোল সড়কের অধিকাংশ স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে সড়কটি মৃত্যুর ফাঁদে পরিনত হয়েছে।

চট্রগ্রাম বন্দরের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে ঢাকার সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ যশোর-বেনাপোল সড়ক রয়েছে অবহেলিত। যশোর থেকে ৩৮ কিলোমিটার এই সড়কটির করুন দশার কারনে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এই সড়কটি দু‘দেশের মধ্যে সরাসরি সেতুবন্ধন সৃস্টি করেছে সৌহার্দ্য ও গ্রীণ লাইন পরিবহনের মাধ্যমে। হাজার হাজার ট্রাকে বেনাপোল পণ্যগার থেকে মালামাল নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌছে দেয়া হচ্ছে এই সড়কের উপর দিয়ে। দেশের রফতানিমুখী অসংখ্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চলছে সড়ক দিয়ে আনা পণ্য সামগ্রী দিয়ে। এই সড়কটি ব্যবহার করে দেশের সিংহভাগ ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প কারখানা সচল থাকলেও দিনে দিনে অচল হয়ে পড়ছে সড়কটি।

যার কারনে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলের বিশাল কর্মযজ্ঞ ব্যাহত হচ্ছে। ভাঙ্গা- চোরা, এবড়ো-থেবড়ো অসংখ্য ছোট বড় গর্ত ও খানা-খন্দরে ভরপুর গোটা সড়কটি। বেনাপোল বন্দরের শেড থেকে পণ্য লোড করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করতে এই সড়কের কারনে ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারন মানুষকে। বেনাপোলের সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন জানান, প্রতিদিন আমাকে যশোর থেকে বেনাপোল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসতে হয়। সড়কের অবস্থা দেখে বেনাপোল থেকে যশোর যেতে এবং যশোর থেকে বেনাপোল যেতে মন চায় না। তিনি দ্রুত এ সড়কটি মেরামত করে  সাধারন পরিবহন এবং পণ্যবোঝাই পরিবহন চলাচলের উপযোগি করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

শার্শার বাসিন্দা যশোর জজ কোর্টের আইনজীবী আব্দুল গফুর জানান, সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ খোয়া উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বাসের চালকরা গাড়ি চালাতে পারে না ঠিকমতো। তাই প্রতিদিনই আদালতে পৌছাতে দেরি হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ কেন যে এ সড়কটি মেরামত করছে না ভেবে পাই না।

নাভারনের নসিমন চালক আব্দুল মালেক জানান, আমাদের প্রতিদিনই যশোর থেকে মুদি দোকানের মালামাল আনতে হয়। এ সড়কে চলাচল করতে কষ্টের শেষ নেই। সেই সাথে সময়ও বেড়েছে তিন গুন। মাসের ১০ দিনই গাড়ি খারাপ হয়ে পথে বসে থাকতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা।

প্রাইভেট কার চালক বেনাপোলের জাহাঙ্গীর জানান, কোন অসুস্থ্য রোগী নিয়ে দ্রুত যশোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায় না। মনে হয় পথেই সে মারা যাবে।
বেনাপোল সোহাগ পরিবহনের ম্যানেজার শহিদুল ইসলাম জানান, সড়কের যে অবস্থা প্রতি ট্রিপে গাড়ি ঠিক করে আবার চালাতে হচ্ছে। গাড়ির ডেমারেজ বেড়ে গেছে দ্বিগুন। চালকরা অনেক সময় গাড়ি চালাতে অনীহা প্রকাশ করে থাকে।

সীমান্ত বাস মালিক সমিতির সহ সভাপতি হাফিজুর রহমান জানান, যশোর থেকে বেনাপোল আসতে আগে সময় লাগতো এক ঘন্টা। সড়ক খারাপের কারণে এখন দেড় ঘন্টায়ও বাস পৌছাতে পারছে না। অনেক বাস পথে বিকল হয়ে পড়ে থাকছে। গর্তের মধ্যে পড়ে বাসের চাকা বাস্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সড়ক মেরামত করা না হলে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক আজিম উদ্দিন জানান, বেনাপোল-যশোর এবং ঢাকাগামী পণ্যবাহি ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহন এ সড়কে চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়ায় গাড়ির মালিকেরা বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে। পণ্যবাহি ট্রাক খানাখন্দক রাস্তার উপর দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এ রাস্তায় তাদের গাড়ি চালাতে অনীহা প্রকাশ করছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর তথ্য মতে, বেনাপোল-যশোর মহাসড়কটি চার লেন বিশিষ্ট হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত চার লেন হচ্ছে না। ঐতিহ্যের স্মারক সড়কের দু‘পাশে রেইন্ট্রি (শিশু) গাছ রাখতে গিয়ে এ মহাসড়কটি চার লেন করা থেকে সরে এসেছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ৩৮ কিলোমিটার এই মহাসড়কের মধ্যে ২৮ কিলোমিটার মহাসড়কে মাত্র ৬ ফুট পর্যন্ত বাড়ানো হবে। বাকি  ১০ কিলোমিটার অংশই প্রশস্ত করা হবে না। গাছ রেখে ৩৮ কিলোমিটার মহাসড়কের ২৮ কিলোমিটারের দু’পাশে ৬ ফুট বাড়ানো যাবে। অর্থাৎ ২৮ কিলোমিটার রাস্তার বর্তমান প্রস্থ ২৪ ফুট থেকে বেড়ে হবে ৩০ ফুট। আর ১০ কিলোমিটার ২৪ ফুটই থাকবে। এতে করে রক্ষা পাবে এ মহাসড়কের দুই পাশের ২ হাজার ৩১২টি রেইন্ট্রি গাছ। যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বেনাপোল-যশোর মহাসড়কের দুই লেনের প্রশস্ততা বাড়ানো হবে।

যশোর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম জানান, মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে বৈঠকে সড়কটি আপাতত চলাচলের উপযোগী করার নির্দেশ দিয়েছেন। সে ভাবে কাজ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেনাপোল-যশোর মহাসড়কের কাজ শুরুর জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। খুব দ্রুত মহাসড়ক সম্প্রসারণ কাজের দরপত্র আহ্বান করা হবে। ঈদের পরপরই সড়কের কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।

সাজেদ রহমান / এম এম

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে