আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিশুতোষ > জানি বুঝি, কিন্তু মানি কি!

জানি বুঝি, কিন্তু মানি কি!

20770467_10215010104714305_2451496012605754006_n
সোমা দত্ত

গ্রীষ্মকাল যাই যাই ভাবে আছে, দুপুরটুকু বাদ দিয়ে সকাল সন্ধ্যা হিম হিম শীত

ল বাতাস, আসন্ন হাড় কাঁপানো ঠান্ডার আভাস দিয়ে যাচ্ছে সেই গেল সপ্তাহ থেকেই। যদিও দিনের হিসাবে এখনো সময় কিছু আছে গ্রীষ্মের হাতে।

আর এক সপ্তাহ পরেই স্কুলগুলোর দীর্ঘ দুই মাসের ছুটি শেষ হবে। শুরু হবে নতুন ক্লাশ, নতুন সেশন, নতুন স্কুলের বছর। সেইসাথে শুরু হবে বাচ্চা আর মা বাবাদের রুটিনবাঁধা জীবন।

সারাদিন অলস সময় কাটে বাচ্চাদের। দিনের এক বেলায় লাইব্রেরী, কোনদিন সাঁতার তো বাকী সময় বাসায় এটা সেটা খেলে, টিভির কার্টুন দেখে, গেমস খেলে মোটামুটি কাটার পর বিকেল বেলার সময়টুকু নির্ধারিত থাকে সাইকেল চালানো আর পার্কে যাওয়ার।
বাসা থেকে বের হয়ে, এদিকওদিক সাইকেল চালিয়ে তারপর পার্কের প্লে-গ্রাউন্ডে খেলা। আশেপাশের আরো অনেক বাচ্চারাও আসে খেলতে।

আমরা যে জায়গা টাতে থাকি, সেখানকার মূল বাসিন্দা মূলত শ্রীলংকান আর আফ্রিকান, তারপরেই আছে চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশী আর পাকিস্তানি। সাদা মানুষদের সংখ্যা খুব কম! বাচ্চারা যখন খেলে তখন তাদেরকে চোখেচোখে রাখার জন্য মা-বাবারা আশেপাশে বা সাথেসাথেই থাকে।

এইখানে প্রায় বিকেলেই যাওয়াআসার সুবাদে আমি একটা বিষয় বুঝতে পেরেছি যে, উল্লেখিত দেশগুলোর অভিভাবকদের পেরেন্টিং বা শাসন ব্যবস্থা মোটামুটি একরকম। কথা না শুনলে ধমক বা বকা দেয়া, রাগ করে খেলা বন্ধ করে নিয়ে যাওয়া, চোখ গরম করা এমন নানাবিধ উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা। সেইদিক থেকে সাদারা মোটামুটি উদাসীন ও বেশ রিল্যাক্সড ভাবে থাকে, অন্তত খেলাধুলা বিষয়ক ব্যাপারে।20708498_10214997237032621_477629913638476314_n

প্লে-গ্রাউন্ড এর কমন কিছু খেলা হলো- সুইং, স্লাইডিং, জাম্পিং, মাংকি বার নামক অংশে বানরের মতই ঝোলাঝুলি আর বালুর মধ্যে বসে বালু নাড়ানাড়ি (স্যান্ড ক্যাসেল বানানো) আর দৌড়াদৌড়ি করা! সব খেলাগুলির মধ্যে আমার ছেলের প্রিয় বান্দর ঝোলা আর মেয়ের প্রিয় বালুকণাময় ও দৌড়াদৌড়ি খেলা! পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাওয়া আর বালু চোখেমুখে যাওয়ার ভয়ে আতংকিত এই মা সারাক্ষণই এদের নজরদাড়িতে রাখি আর এটা না, ওটা না করে খবরদারি করতে থাকি!

এত কথা বলার মূল কারণে চলে আসি। কাল বিকেলবেলায় যথারীতি সাইকেল পরিভ্রমণের পর পার্কে খেলার সময় হলো। চেনা-অচেনা বেশ কিছু মা-বাবা ও বাচ্চাদের দেখাও মিলল। আমার ছেলেমেয়েরাও যথারীতি তাদের প্রিয় খেলায় মেতে উঠল। আমিও অভ্যাস মত আমার কাজ শুরু করে দিলাম।

আমার মেয়ের সাথে আরো একটা বাচ্চা খেলছিল, যাকে আমরা আগে থেকেই চিনি। কিছুক্ষণ পরে, ওদেরই বয়সী আরেকটি মেয়ে এসে যোগ দিল এবং তুমুল উদ্যোমে খেলা শুরু হলো। আমি দেখছি, সাথে অন্য দুই মাও দেখছে বাচ্চাদের।

বাংলা/ইংরেজি দিয়ে যা বলার বলে যাচ্ছি, না করে যাচ্ছি। তাতে কাজ যে খুব একটা হচ্ছিল তাও না! তাতে কি, মায়েদের কি আর থামলে চলে! হঠাৎ করে দৌড়াদৌড়ি একটু বেড়ে যাওয়ায়,
“আমি মেয়েকে বলছিলাম, ” এভাবে দৌড়ায় না মা, পড়ে গেলে ব্যাথা পাবে।”
আবার কখনো বলছিলাম, ” ডোন্ট রান, অর্থী। ডোন্ট রান।”
“বালু দিয়ে বেশী খেলো না, তোমার গায়ে লাগছে।”
“বালু ছুড়ে দিও না কাউকে, চোখে যাবে।”
“ডোন্ট প্লে টু মাচ উইথ স্যান্ড, ডোন্ট থ্রো স্যান্ড টু ইচ আদার।”

বাংলা/ইংলিশ দুটোই বলার কারণ ওর সাথে আরো দুজন বাচ্চা আর পাশে তাদের মা আছে(যদি ভেবে বসে, আমি সবগুলারে বকছি)। অন্য দুই মায়ের মধ্যে একজন(শ্রীলংকান) খুব হাল্কা স্বরে দুই/একবার “বি কেয়ারফুল আর না বলল বৈকি, কিন্তু অন্যজন (চাইনিজ) হেসে হেসে উপভোগ করছিল।

একটু পরে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল, ” ওয়াক বেবি ওয়াক, ওয়াকিং ইজ গুড দেন রানিং।”
” টাচ দ্য স্যান্ড ফর ফিলিং, ইফ ইউ থ্রো দিস, মে বি ইউ উইল গেট হার্ম অন ইউর আইস।”

কি হলো জানেন!? তিনজনই দৌড়ানো বন্ধ করে, হেঁটে এসে বালুতে বসে, সেই বালু দিয়ে ক্যাসেল বানানো খেলা শুরু করলো! বাচ্চাদের কে যে সরাসরি না না করলে আরো উৎসাহ বাড়ে, তা কি আমি জানি না!? বাচ্চাদের বুঝিয়ে বললে যে কাজটা ভালো হয়, তা কি আমি জানি না!! জানি, জানি অনেক আগে থেকেই জানি! কিন্তু মানি কি! মানে মেনে চলি কি!!

আসলে জীবনে এমন অনেক কিছুই আমরা জেনে বুঝেও, মেনে চলি না! আমি কিন্তু কাল থেকেই জানা শিক্ষা টুকু মেনে চলার চেষ্টা করছি, আর আপনারা!!??

লেখক: কানাডা প্রবাসী

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে