আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > ক্ষণজন্মা ধুমকেতুর আবির্ভাব

ক্ষণজন্মা ধুমকেতুর আবির্ভাব

স্মৃতি ভদ্র: নিজের স্বকীয়তা ভুলে দেশ ও সমাজ যখন অধীনস্থ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে, যখন হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের মিলনভূমি ভারতবর্ষের গৌরবের রাজটিকা হারিয়ে যাচ্ছিল অতল গহীনে, ঠিক তখন এক মহাপুরুষের আবির্ভাব। যুগের সন্ধিলগ্নে জন্ম নেওয়া ক্ষণজন্মা সেই মহাপুরুষ আধমরা ভারতবর্ষকে দান করেছিল অদম্য প্রাণ, শিকল ভাঙ্গার গান গেয়ে করেছিল উজ্জীবিত, বিদ্রোহের বানী জুগিয়ে করেছিল অনুপ্রাণিত। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

11953027_10206295648024074_4322340490422023312_n

আঁকা-ছবি: মামুন হোসাইন

ধুমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি, চেয়েছিলেন অধীনস্থতার শিকল ভাঙ্গতে, সামাজ্যবাদ আর বর্ণপ্রথার কালো থাবায় সাম্যের বিজয় পতাকা উড়াতে। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ,সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সৈনিক। কবি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। বিদ্রোহী ও ভাঙ্গার গান কবিতায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব খুব প্রকট।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই কবির সৈনিক জীবন শুরু। আর এই সৈনিক জীবনেই শুরু হয় কবির সাহিত্যচর্চা। কবি যখন করাচী সেনানিবাসে ছিলেন তখন তিনি মুক্তি, হেনা, ব্যথার দান, কবিতা সমাধি কবিতাগুলো লিখেন। আর সেনানিবাসের অনান্য সৈনিক বন্ধুদের নিয়ে দেশী -বিদেশী বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সংগীতচর্চাও করতেন তিনি এসময়। ধারণা করা হয় এখান থেকেই বিদেশী সংগীতের প্রাথমিক ধারণা পেয়েছিলেন কবি।

সৈনিক জীবন শেষে কলকাতায় “বঙ্গীয় মুসলীম সাহিত্য সমিতির” অফিসে বসা শুরু করেন কবি। আর এখান থেকেই কবির কবিপ্রতিভা আস্তে আস্তে সকলের সামনে আসতে শুরু করে। অসম্ভব মিশুক আর বন্ধুবৎসল ছিলেন কবি। সেই সময়ের স্বনামধন্য প্রায় সকল লেখক ও সাহিত্যিকের সঙ্গেই ছিল কবির ভাব।

18716523_1392042657548642_543715928_n

আঁকা-ছবি: ফারিয়া টিনা

এ সময়েই কবির সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে এই সময়েই। নিরহংকার কবি নিজে ১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করেন। আমৃত্যু সেই সম্পর্ক আমাদের কাছে দুই কবির হৃদয়ের বিশালতার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ধরা দেয়। পরবর্তীতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের “ধুমকেতু” পত্রিকা প্রকাশিত হবার লগ্নে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের শুভেচ্ছা বাণী,
” কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,
আয় চলে আয়রে ধুমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দূর্গশিরে,
উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন।”

সাম্প্রদায়িকতাকে প্রচন্ড ঘৃণা করতেন কবি। তাই অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা ছিল কবির ব্যক্তিজীবনে প্রবল। কবিপত্নী প্রমীলা ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আর কবির চার পুত্রের নামের মধ্যেও পাওয়া সেই অসাম্প্রদায়িকতার সুর। কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরূদ্ধ। নামগুলোতে দু’টি ধর্মকে একই সুরে বাঁধার কি সুন্দর প্রয়াস। যা আজকের ধর্মতে বিভক্ত জাতির জন্য খুব শিক্ষণীয়।

আসলে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে এত অল্প পরিসরে বর্ণনা করা অসম্ভব। ঠিক যেমন হিমালয়কে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। কবির জীবনদর্শন, মননশীল চিন্তার চর্চার মধ্যেই রয়েছে ঘুণে ধরা এই সমাজের পঙ্কিলতা থেকে উত্তরণের উপায়।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সংস্কৃতিকর্মী

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে