আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > জাতীয় > অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে ইসিকে পূর্ণশক্তি প্রয়োগের সুপারিশ

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে ইসিকে পূর্ণশক্তি প্রয়োগের সুপারিশ

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে ইসিকে পূর্ণশক্তি প্রয়োগের সুপারিশ

ইফতি মাহবুব:

আগামী সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ও সেনা মোতায়েনের সুপারিশ করেছেন বিভিন্ন পত্রিকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে কেউ কেউ না ভোট প্রবর্তনেরও সুপারিশ করেন। এছাড়া ইসিকে পূর্ণশক্তি প্রয়োগ করারও পরামর্শ দেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।

তারা বলেন, কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে- সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহনের ভিত্তিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি অংশগ্রহন না করে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তারা। আর সুষ্ঠু ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনের জন্য জরুরী রাজনৈতিক ঐক্য।

সব দলের আস্থা অর্জনে কমিশনকে পরামর্শ দিয়ে গনমাধ্যম প্রতিনিধিরা বলেন, বর্তমান কমিশন এখন মাত্র টেস্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জনে তাদেরকে আরো অনেক পথ যেতে হবে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মত গনমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সংলাপেও নির্বাচনে সেনা মোতায়েন ও ‘না’ভোটের বিধান চালুর সুপারিশ এসেছে। দু’একজন প্রতিনিধি সেনা মোতায়েনের সরাসরি বিরোধিতা করলেও বেশিরভাগই জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের কথা বলেছেন। কেউ কেউ অবশ্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কমিশনকেই দায়িত্ব দিয়েছেন।

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে দুইদিনে সংলাপের প্রথম দিনে নির্বাচন কমিশন বুধবার বিভিন্ন পত্রিকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন। আগাওগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সকাল সোয়া ১০টায় শুরু হয়ে বেলা দুটো পর্যন্ত সংলাপ চলে। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা।

প্রথম দিন গনমাধ্যমের ৩৭জন প্রতিনিধিতে আমন্ত্রণ জানানো হলেও উপস্থিত ছিলেন ২৬ জন। সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সিনিয়র সাংবাদিক আবেদ খানসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক আমন্ত্রণ পেলেও সংলাপে যাননি।

বুলবুল

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বিএফইউজে সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সংলাপে বেশিরভাগ ব্যক্তিই সকল দলের অংশগ্রহন নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। ইসিকে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে হবে যাতে সকলে নির্বাচনে আসে।

সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সার্বিকভাবে অনেকেই মনে করেছন যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। আবার অনেকেই বলেছেন অনেক দেশে সেনাবাহিনী সুষ্ঠূ নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখছে তাহলে আমাদের দেশে সমস্যা কিসের। তবে আমি বলেছি, এটা সিভিল প্রশাসনের বিষয় সেনা মোতায়েন এখানে দরকার নেই। তবে তারা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকতে পারে।

তিনি জানান, আলোচনায় ‘না‘ ভোটের বিষয় এসেছে। অনেকে না ভোট চালুর বিষয়ে একমত হয়েছেন। অনেকে আবার বিরোধিতা করেছেন। একটি বিষয়ে আমরা সবই একমত হয়েছ যে নির্বাচনে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে বলেছি, প্রার্থীদের যে হলফনামায় গনমাধ্যমের প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের হলাফনামা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা দাবি করেছি তা প্রকাশ করার। গনমাধ্যম যদি হলফনামা পর্যবেক্ষণ করতে পারে তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রার্থীদের বিষয়ে একটি যাচাই করা যাবে। কেউ যদি সাংবাদিক বা পর্যবেক্ষক পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে সেই বিষয়টিও লক্ষ্য রাখতে হবে। এ বিষয়ে ইসিও আমাদের সাথে একমত হয়েছে। তারা বলেছেন, তাদের যে সমালোচনা হয় তাতে বন্ধু হিসেবে গনমাধ্যমকে পাশে পেয়ে থাকেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবগুলো এসেছে তা প্রথমত হলো- কিভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু করা যায়। সকল দলের অংশগ্রহনের ভিত্তিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। একই সঙ্গে নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কথা হয়েছে। সেনাবাহিনী থাকবে কি থাকবে না তা নিয়েও কথা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে সেনাবাহিনী দরকার সেটা করবেন। না চাইলে নয়। তবে, আমরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভুমিকাকে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের কথা বলেছি।

তিনি বলেন, মানুষ যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। কালো টাকার পথ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ‘না`ভোটের বিধান চালুর মত এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নঈম নিজাম বলেন, কোন ভোটারের কাউকেই ভালো না লাগতে পারে, এটা তার সাংবিধানিক অধিকার। তিনি বলেন, কিছু আসন পূনর্বিন্যাস করা দরকার। যেমন কুমিল্লা-১০ আসন ৯০ কিলোমিটার লম্বা। এই সংকটগুলো নিরসন করতে হবে। নির্বাচনে সন্ত্রাসী, মাস্তান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।

%e0%a6%a8%e0%a6%88%e0%a6%ae-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a6%ac%e0%a6%bf

তিনি বলেন, ভারতের নির্বাচন কমিশনের তুলনায় আমাদের নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে কম শক্তিশালী নয়। কমিশনকে দেখানোর জন্য মেরুদন্ড সোজা করার দরকার নেই। রিয়েল রোল প্লে করতে হবে। সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিরপেক্ষ ভোটের আয়োজন করতে হবে।

নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে বিপক্ষে মত দিয়ে প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান বলেন, সেনাবাহিনী নির্বাচনে নয়, সেনা মোতায়েন হতে পারে একমাত্র জাতীয় বিপর্যয়ে। নিয়মিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট। নির্বাচনে সেনাবাহিনী থাকলে অন্যান্য বাহিনীগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ২০০১ সালের নির্বাচনে সেনাবাহিনী ছিলো। সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও সেখানে দেখেছি নির্বাচনের পরপরই জামাত-শিবির ও বিএনপি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলে পড়েছিল। কাজেই নিয়মিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে জঙ্গি দমনে ভুমিকা রাখছে তেমনি সুষ্ঠু নির্বাচনে তারাই যথেষ্ট। আর আমি চাই নির্বাচন কমিশনই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ, আমি কমিশনকে অযোগ্য মনে করি না।

সুষ্ঠু ও অংশগ্রহনমুলক নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক ঐক্য জরুরী মন্তব্য করেন ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত। তিনি বলেন, আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহনমুলক নির্বাচনের কথা বলার চেষ্টা করেছি। এর পূর্বশর্ত হলো সব দলের অংশগ্রহন নিশ্চিত করা। এজন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য খুবই জরুরী। বিশেষ করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি অংশগ্রহন না করে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কাজেই দলগুলোর আস্থা অর্জনে কমিশনকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। আস্থা অর্জনে তাদেরকে আরো অনেক পথ যেতে হবে। নির্বাচনের প্রধান স্টেক হোল্ডার হলো রাজনৈতিক দল। তাদের সঙ্গে সংলাপ করাটা বেশি জরুরী।

শ্যামল দত্ত বলেন, কমিশন আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এমন আচরণ করবেন যাতে জনগনের আস্থা তৈরি হয়।

সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ বলেন, সংলাপে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই ধরনের নির্বাচন যেন ভবিষ্যতে না হয় সেজন্য কমিশনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনের আগের তিন বছরে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেননি এমন কর্মকর্তাদেরকে পদায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংলাপে অংশগ্রহনকারী দু’একজন ছাড়া সকলেই সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ সরাসরি এবং কেউ কেউ প্রয়োজনে সেনা মোতায়েনের কথা বলেছেন।

20864052_1878716085714045_476851479_n

বিএফইউজে একাংশের মহাসচিব এম আবদুল্লাহ তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পন্থা বের করতে হবে। দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে কেবল গ্রহনযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচন সম্ভব। নির্বাচনের আগে অবশ্যই চলতি সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। নির্বাচনে ভয়ভীতি মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।

মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী, ‘না’ ভোট, সীমানা পূর্ননির্ধারনসহ বিভিন্ন ষিয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি সেনা বাহিনী মোতায়েনের পক্ষে মত দিয়েছি। বলেছি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা হয়ে থাকে। আমরা বিচ্ছিন্ন কোন দ্বীপের বাসিন্দা নই যে আমাদের এখানে সেনা মোতায়েন করা যাবে না।

প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করার কথা বলেছি। প্রত্যোকটি দল যাতে দলের নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করে কমিশনকে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলেছি। তিনি বলেন, ভিন্ন কোন নামে যেন জামাত নিবন্ধিত হতে না পারে কমিশনকে তার জন্য সতর্ক থাকতে বলেছি।

সিনিয়র সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর তার প্রস্তাবনায় সেনা মোতায়েন ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন। তিনি বিএনপির নাম উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে ওই দলটির অনেক নেতার নামে মামলা রয়েছে। ওই মামলার সূত্র ধরে নির্বাচনের সময় যাতে হয়রানির শিকার না হতে হয় তার জন্য নির্বাচনকালে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের মামলার হয়রানি থেকে রেহাই দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আমানুল্লাহ কবীর সেনা মোতায়েনের পক্ষে মত দেন।

নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে কি না, সেটা রাজনৈতিক দলসহ সবার সঙ্গে সংলাপ শেষে নির্বাচন কমিশনাররা মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

আইএম / ডিডিআর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে