আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > হাসান আজিজুল হকের গল্প : অভিজ্ঞতার অনুবাদ

হাসান আজিজুল হকের গল্প : অভিজ্ঞতার অনুবাদ

212202kalerkantho-03-02-17-01২২ মে ২০১৭,

মানুষের গল্প বলার ইতিহাস মানুষের সভ্যতার মতোই পুরোনো। তবে সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বতন্ত্র শাখা হিশেবে ছোটগল্পের আবির্ভাব হয় ঊনিশ শতকে-সামন্তব্যবস্থার জঠর থেকে পুঁজিবাদের উন্মেষের সাথে সাথে।পাশ্চাত্য রীতির অনুপ্রেরণায় বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের উদ্ভব ও বিকাশ ঊনিশ শতকের শেষদিকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাসাহ্যিতের প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার।

বাংলা ছোটগল্পের শুরুর কালে ছিল কাহিনী ও চরিত্র নির্ভর গল্পের প্রাধান্য। কিন্তু বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ঘটনা ও কাহিনী নির্ভর ভিক্টোরিয় রীতির গল্পের পরিবর্তে ঘটনা নির্ভরতা থেকে ক্রমেই ঘটনাহীনতা তথা অ্যান্টি-প্লট,অ্যান্টি-স্টোরির ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে এবং বিশ শতকের ষাটের দশকে এসে তা পূর্ণতা পায় যে ধারার লেখকদের হাতে হাসান আজিজুল হক তাঁদের প্রবলতম প্রতিনিধি। দেশবিভাগ,রাজনীতি,সাম্প্রদায়িকতা,রাঢ়বঙ্গের জীবন ও ভাষা,যুদ্ধ-সংঘাত,নারী-পুরুষের সম্পর্কের আবর্তন, নিম্নবর্গ-নিম্নমধ্যবিত্ত,শ্রেণির জীবনাচরণ, শোষক শ্রেণির সীমাহীন জুলুম-নিপীড়ণ ও তার বিরুদ্ধে শোষিতের মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা,দেশবিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির আভ্যন্তর  বিকার,ব্যাধি,অসঙ্গতি,জটিলতা এবং ক্লেদাক্ত -ক্ষয়িষ্ণু, গলিত-পচনশীল নষ্ট-ভ্রষ্ট সমাজ-রাষ্ট্র-ধর্মের কাছে ব্যক্তির অসহায়ত্ব-অস্তিত্বহীনতা,সেই অসহায়ত্ব-অনস্তিত্ব থেকে পুঞ্জিভূত হতে থাকা ক্ষোভ-সংগ্রাম তথা অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই,স্বপ্নভঙ্গ ও নতুন স্বপ্নের বীজ বপন-এসবই হাসান আজিজুল হকের গল্পের উপজীব্য।

book13369হাসান আজিজুল হকের মতো এত প্রখর সমকালবিদ্ধ ও বাস্তবতবাদী লেখক বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি পাওয়া যায়না। বাস্তবকে দুমড়ে বাস্তব নির্মাণ করা যাঁর লেখার উদ্দেশ্য,যিনি লেখককে মনে করেন ঘুণপোকা যার কাজ কাঠের উপরিতল কেটে ক্রমেই ভিতরে চলে যাওয়া,তারপর একের পর এক স্তর অতিক্রম করা,’বাস্তবকে বাস্তবতর করা কিংবা লেখককে যিনি তুলনা করে শুঁয়োপোকার সাথে,সমাজের বাস্তবকে প্রতিমুহুর্তে শুষে নেয়া যাঁর কাজ,আন্তরবাস্তবকে হাজির করেন যিনি পাঠকের সামনে তিনি আর কেউ নন হাসান আজিজুল হক,বংলা ছোটগল্পের ‘রাজপুত্তুর’। তাঁর নিজের ভাষ্যে: “বাস্তব পুরোটা ধরা দেয়না। কিছুটা লুকিয়ে থাকে।বাস্তবকে পুরোপুরি ধরাই লেখকের কাজ।” আর এজন্যই একজন সামান্য আখ্যানকার কিংবা কাহিনীকারে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননা হাসান। পাঠককে লঘু-চটুল বিনোদন দেয়ার মতো সহজ কাজকে তিনি বেছে নেননি কখনো। আপন জনপদ ও তার মানুষের স্বপ্ন-সম্ভাবনা, গণবিরোধী রাজনীতির অমোঘ পরিণতি হিশেবে ব্যক্তি ও সমাজের অবক্ষয় তাঁকে কলমযোদ্ধা হবার ব্রতী করে তোলে মাত্র ষোল বছর বয়সেই।গল্প লেখেননা হাসান,’অভিজ্ঞতার অনুবাদ’ করেন:

“অভিজ্ঞতার অনুবাদ করবো। অভিজ্ঞতার বাইরে যাবনা।তাকেই সামনে রেখে কল্পনা উড়বে।শব্দেরা বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা অর্জন করবে।অসংখ্য রং ও রেখা দেখা দেবে।জীবনের বহুমাত্রিকতা প্রকাশ পাবে।সমাজে,দেশে মানুষের বাস্তব জীবন্ত হয়ে উঠবে।” এই প্রতিশ্রুতির একটুও কি বাইরে গেছেন হাসান?তাঁর সমগ্র লেখালেখির জীবনে?’নামহীন গোত্রহীন’ গল্পের যে লোকটা যুদ্ধের শেষদিকে শহরে এসে পৌঁছায়,তার চোখ দিয়ে আমরা পাকিস্তানী বাহিনীর অমানবিক নির্যাতন,সাম্প্রদায়িক মনোভাব,বিধ্বস্ত শহর ও মানুষ,স্বজন হারানোর বেদনা প্রত্যক্ষ করি,সেই লোকটা কে? “যে লোকটি আলোয় অন্ধকারে শহরের গলিখুঁজির ভিতর দিয়ে সাপের মতো বুকে হেঁটে বেড়ায়, বড় রাস্তায় কেবলই জীপ চলে, পাকিস্তানী বাহিনীর লোকেরা অকথ্য নির্যাতনে মানুষ মারে,লোকটি ঢুকে পড়ে নিজের বা যে কারও বাড়িতে, উঠোনে গিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করে,পায় পাঁজরের অস্থি,শিশুর কচি করোটি,দীর্ঘ কালো চুলের রাশি সে লোকটি তো আমিই।ন’মাসের স্মৃতি অভিজ্ঞতা এমনি করেই লিখে রাখার চেষ্টা করি। মোটেই গল্প লিখিনা।” তাহলে,এরপরেও কি বলার অপেক্ষা রাখে হাসানের গল্পগুলো মূলত তাঁর জীবনেরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা? তাতে কিছু কল্পনার মিশেল হয়তো থাকে,সেটাও বাস্তবকে নিংড়ে বাস্তবতর করে নতুন বাস্তব তৈরির প্রয়াস। কেননা হাসান প্লেটোর সেই অমর বাণীকে লালন করেন,”ধারণার জগতই মূল। বাস্তবজগত তার একটা নকলমাত্র।”

মার্কেসকে বুঝতে হলে মার্কেসের গল্প-উপন্যাস পড়েই বুঝতে হবে এ কথা বলেছেন হাসান নিজেই। একইভাবে হাসানকে যথার্থভাবে বুঝতে হলে তাঁরা লেখা পড়তে হবে। এই প্রবন্ধে আমাদের ঝোঁক হাসানের গল্প লেখার পেছনে উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যতের কাম্য সমাজ নির্মাণে তাঁর গল্পের উপযোগীতা। হাসানের সব গল্পের আলোচনা করা এখানে সম্ভব হবেনা, তবে তাঁর গল্পবিশ্বের একটা স্কেচ আমরা এখানে আঁকতে চাই।

দীর্ঘ ৬২ বছর ধরে লিখছেন হাসান আজিজুল হক।প্রকাশিত হয়েছে ১০টি গল্পগ্রন্থ।প্রকাশিত অপ্রকাশিত গল্প মিলিয়ে প্রায় ৮০টির মতো গল্প।সর্বসাকুল্যে এই হলো হাসানের সাহিত্যের জগত (উলন্যাস-প্রবন্ধ-সাক্ষাতকার এখানে ধর্তব্য নয়), কিন্তু সংখ্যাগত দিক থেকে ছোট এই জগতে হাসান পাঠককে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেন নিজে নিস্পৃহ-নিরাসক্ত থেকে, যে নির্দয়-নিষ্ঠুর-ক্ষুরধার পৃথিবী পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেন, সেই পৃথিবীতে প্রবেশের জন্য পাঠকের প্রস্তুতি থাকা চাই।কোন সন্দেহ নেই একটি ‘ক্ষমাহীন বিশ্বের’ ‘নিষ্ঠুর তান্ত্রিক’ তিনি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি-সমাজনীতি হাসান আজিজুল হকের গল্পের প্রধান বিষয়।দেশবিভাগ,সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাতীয়তা,নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রামকে গল্পের বিষয়বস্তু করার কারণে হাসান আজিজুল হক চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এদিক থেকে তাঁকে তুলনা করা চলে সাদাত হাসান মান্টোর সাথে। আমরা আজও হাসান আজিজুল হকের যুগেই বাস করছি।দেশভাগ,দাঙ্গা,সাম্প্রদায়িকতা,অখন্ড ভারততত্ত্ব ও দ্বিজাতিতত্ত্ব ইত্যাদি প্রশ্ন আজও উপমহাদেশের জীবন ও রাজনীতিতে সক্রিয়।১৯৪৭ সাল ‘৪৭ সালেই শেষ হয়ে যায়নি,তেমনি ১৯৭১ শেষ হয়নি ‘৭১এই। ১৯৭১ সাল ছিল ‘৪৭ এর একটি প্রতি-মীমাংসা। কিন্তু উপমহাদেশে যেমন ‘৪৭ এর সংকট নি:শেষ হয়নি,তেমনি বাংলাদেশেও যেসব শর্ত-প্রতিশ্রুতি নিয়ে ‘৭১ হাজির হয়েছিল তার কোনটিই পরিপূর্ণভাবে পূরণ হয়নি। তাই ফুরোয়নি হাসানের গল্পের আবেদন। এ ব্যাপারে হাসান নিজেও সচেতন:

“বড় কোন ঘটনা যখন দেশকে আগাগোড়া আলোড়িত করে, সমাজজীবনের কাঠামোতে চিড় ধরিয়ে তাকে ভেঙে তছনছ করার উপক্রম করে তখন সাহিত্যে তার প্রবল উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।” হাসান মনে করেন সক্রিয়তাই সার্বিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে।তাই তিনি সর্বদা সাহিত্যিকের জাগ্রত থাকার পক্ষে মত দেন:

“যুদ্ধ বা রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটার পরেও যে সাহিত্যিক চুপ করে বসে থাকতে পারেন, তাঁকে অক্ষম বলাই যথেষ্ট নয়, তাঁর মানসিক জড়তা সম্পর্কেও আর সন্দেহ থাকেনা।” হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলোকে সময় ও প্রেক্ষিত বিবেচনায় তিনটি পর্বে বিভক্ত করা যায়:

ক. দেশভাগ ও প্রাক-মুক্তিযুদ্ধ পর্ব (১৯৬০-১৯৭০)

খ. মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর প্রাথমিক পর্ব তথা স্বৈরশাসনামল (১৯৭১-১৯৯০)

গ. ‘গণতান্ত্রিক’ শাসনকাল তথা মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয়পর্ব (১৯৯১-অদ্যাবধি)

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে হাসান আজিজুল হকের মতো সমকালবিদ্ধ ও বাস্তববাদী লেখক বাংলা সাহিত্যে বিরল।তাঁর গল্পগুলো ধারাবাহিকভাবে পাঠ করে গেলে যে কারোর পক্ষে উপমহাদেশের বিশেষত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির ধরণ,মানুষের চিরঅম্লান সংগ্রামী মানসিকতা সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া সম্ভব।১৯৬১-৭০ সময়কালে হাসানের দুটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়-সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য এবং আত্মজা ও একটি করবী গাছ।প্রথম গল্পগ্রন্থের শকুন ও তৃষ্ণা গল্পদ্বয় রাঢ়বঙ্গের সমাজবাস্তবতার উপর রচিত।শকুন গল্পটির নানা প্রতীকি তাৎপর্য রয়েছে।তবে গল্পের একেবারে শেষেরদিকে একটি বাক্য আমাদের স্তম্ভিত করে-‘শকুন শকুন মাংস খায়না।’ এই বাক্যটির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে লেখক মানবজাতিকেই উপহাস করেছেন।পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা উন্নত মস্তিষ্ক-প্রযুক্তি-অভিজ্ঞতার বলে একটি সভ্যতা গড়ে তুলেছে।সেই মানুষই শক্তি ও ক্ষমতার মোহে উন্মত্ত হয়ে বধ করছে মানুষকেই।নিজের সৃষ্ট সভ্যতাকে নিজেই ধবংস করে চলেছে।জমিরদ্দি ও কাদু শেখের বিধবা বোনের গোপন অভিসারের অনাকাঙ্ক্ষিত ফসল ফেলে রাখা মৃত বাচ্চাটি একই সাথে মানুষ ও শকুনের দলকে আকর্ষণ করে।মানুষ কর্তৃক মানুষের অস্বীকারের সাক্ষী হতে ছুটে আসে মানুষ,নিথর পড়ে থাকে মানবদেহ হয় শকুনের খাদ্য।এরকম নির্মম চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে লেখক মূলত তীব্র আক্রমণ করেছেন মানুষের শঠতা ও কৃত্রিম মূল্যবোধকেই।

1200px-hasan_azizul_huq

মানুষের অনমনীয় ও অবদমিত ক্ষুধার গল্প ‘তৃষ্ণা’। উদরপূর্তির বাসনা ও যৌনবাসনার গল্প ‘তৃষ্ণা’। গল্পের বাসেদ গরীব,ক্ষুধার্ত ও তীব্র যৌন লালসার অধিকারী।গ্রামের মানুষের কাছে সে ‘অবং’ বা ‘কাটাকাপ’। কৈশোর কাটিয়ে যৌবনে পদার্পণ করতে করতে সে ঢ্যাঙ্গা,অসুস্থ ও অক্ষম হয়ে ওঠে। শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন টের পাওয়ার পাশাপাশি সে টের পায় তীব্র ক্ষুধার তাড়না।পেটের ক্ষুধা ও জৈবিক ক্ষুধা বাসেদকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তীব্র ক্ষুধা বদলে দেয় তার জীবনদর্শন, সে বাঁচার জন্য খায়না, খাওয়ার জন্য বাঁচে, -‘শালা বেঁচে তো আছি খাবার লেগে’।অপরদিকে তার শরীর জুড়েও তীব্র হাহাকার। ওরস উপলক্ষ্যে আয়োজিত ভোজে সাধ্যের অতিরিক্ত খেয়ে শরীরকে অবশ করে ফেলে বাসেদ।ঝোপের আড়ালে সে শুনতে পায় শোষক মোড়লের বখাটে পুত্র সোহরাব ও সখির যৌনকর্মে লিপ্ত হবার পূর্বে দেনদরবার। সর্বগ্রাসী শারীরিক ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাসেদ তার প্রচন্ড দারিদ্র‍্য সত্ত্বেও সোহরাবের প্রস্তাবকৃত তিন আনার চেয়ে বেশি চার আনা দিয়ে সখিকে ভোগ করতে চায়। কিন্তু অতিরিক্ত আহারের দরুণ পর্যুদস্ত হয়ে সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।এখানে লেখক জীবনের সার্বিক অসমতা ও সংকটের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। অর্থের প্রভাবে বখাটে সোহরাব সখির অভাবজনিত অসহায়ত্বকে পুঁজি করে, অপরদিকে পেটের অতিরিক্ত ক্ষুধাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে দৈহিক সংস্রবের সক্ষমতা হারিয়ে বাসেদ মৃত্যুকেই শেষ অবলম্বন করে।বাসেদ নিজেও কিন্তু গোপন যৌনাচারেরই ফসল। বাসেদের মা অন্য পুরুষের সান্নিধ্যে গিয়েই জন্ম দিয়েছে বাসেদকে।প্রকৃতপক্ষে,রাঢ়বঙ্গের নিম্নবর্গের মানুষের সীমাহীন দারিদ্র‍্য, প্রাত্যহিক যথেচ্ছ যৌনাচার ও বেঁচে থাকার ‘তৃষ্ণা’ এই গল্পে বাঙময় হয়ে উঠেছে।ক্ষুধা কেবল বাসেদকে নয়, পুরো গ্রামবাসীকেই কাতর করে রাখে। ‘শকুন’ ও ‘তৃষ্ণা’ গল্পের ধারাবাহিক পাঠ আমাদের মনে ঘোরতর সন্দেহের উদ্রেক করে -কাদু শেখের বিধবা বোনের ফেলে যাওয়া মৃত শিশুটি কি জীবনের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের দরুণ বাসেদ হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘তৃষ্ণা’ গল্পে?

‘উত্তরবসন্তে’ দেশবিভাগের তিক্ত অভিজ্ঞতার গল্প।দেশবিভাগের কারণে নিজ দেশ ত্যাগ করে অপর দেশকে আপন করে নেয়ার তীব্র দুঃসহ যাতনা এবং অপরিসীম দুর্ভোগ থেকেই হাসান এই গল্পটি লিখেছেন।কী আশ্চর্য দক্ষতা ও পরম মমতায় হাসান বাংলাদেশকে আপন করে নিয়েছেন! কোন লেখককে প্রায়ই তাঁর একটি সাহিত্যকর্ম দিয়ে বিচার করতে হয়।সেই অনিচ্ছুক দায় যদি আমাদের কখনো পালন করতে হয় হাসানের ক্ষেত্রে তাহলে সম্ভবত তাঁর ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পের কথা বলতে হবে। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাই ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগকে তরান্বিত করেছে বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক মত প্রকাশ করেন(যদিও বর্তমান প্রবন্ধের লেখক এত খন্ডিত ও অসম্পূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক ঘটনাকে বুঝতে চাননা)। দেশবিভাগের ফলে ভারতবর্ষ রাজনৈতিকভাবে কতটা লাভবান হয়েছে সেই রায় দেবার দায়িত্ব ইতিহাসকে দিয়ে আমরা এটুকু অন্তত বলতে পারি-অসংখ্য মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে, স্বজনহীন হয়েছে,উঠোন থেকে আলাদা হয়েছে রান্নাঘর। সহায়-সম্বলহীন উদ্বাস্তু মানুষের বিষাদময় জীবন বিধৃত হয়েছে ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পে।দেশবিভাগের রাজনীতি মানুষকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে তুলেছে, তার কান্নাভেজা দীর্ঘশ্বাসের পরিচয় এই গল্পে মেলে।প্রবল রাজনৈতিক চেতনার অধিকারী লেখক পাঠককে একটি বাস্তব ও দৈনন্দিন সংকটের মুখোমুখি করেন, পাশাপাশি একটি নৈতিক জটিলতা, তীব্র অভাব ও ক্ষুধার সামনে সকল বানানো সামাজিক-ধর্মীয় অনুশাসন ছাইয়ের মতো মিলিয়ে যায়, কিন্তু চেতনার গভীরতর দ্বন্দ্ব কঠোরতম বাস্তবতার মুখেও কাঁটার মতো খচখচ বিঁধে থাকে। সামাজিক নৈতিকতা ভেঙে পড়লেও গল্পের বৃদ্ধ পিতার ব্যক্তিগত কৃত্রিম নৈতিকতার অহং টিকে থাকে। মূলত এটা বৃদ্ধের আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়।নিজের কন্যাকে তিনি তুলে দেন বখাটেদের হাতে। বিনিময়ে হাত পেতে টাকা নেন অথচ নিজেকে প্রবোধ দেন এই বলে যে তিনি ধার নিচ্ছেন, পরিশোধ করে দেবেন। দুনির্বার ক্ষুধা কোন শিক্ষা-আব্রু-নৈতিকতা মানেনা। দেশভাগের মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে উপমহাদেশের সাধারণ মানুষের কোন হাত ছিলনা, কিন্তু এই বিভক্তি ভিটে-মাটিহীন করেছে অগণ্য মানুষকে। নতুন ঠিকানায় সেই মানুষেরা নিরাপদ ও সম্মানজনক আশ্রয় পেলনা কেন? রাজনীতির প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থতার একটি সম্মিলিত চরিত্র অবশ্যই আছে যা আমরা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছি। কারণ এই পরাজিত, জীবন্মৃত মানুষেরা আমাদের সামনে অনিবার্য অস্বস্তি হয়ে উপস্থিত থাকে, তাদের মনে রাখার অর্থই হলো ব্যর্থতার গ্লানি বহন করা। দেশবিভাগ কতটা নি:স্ব করেছে মানুষকে তা গল্পের একটি বাক্যেই পরিস্কার হয়:

‘কিন্তু ভেতরে কি ঠান্ডা নেই? একই রকম, একই রকম।দেশ ছেড়েছে যে তার ভেতর বাইরে নেই। সব এক হয়ে গেছে।” জীবনযুদ্ধে পরাজিত এই বৃদ্ধ একটি করবী গাছ লাগিয়েছেন। গাছের ফুল নয়, বিচির জন্য অপেক্ষা করেন তিনি, বিচিতে ‘চমৎকার’ বিষ হয়। এই বিষই কি বৃদ্ধ ও তাঁর আত্মজার মুক্তির শেষ উপায়? এই গল্পটি পড়ার পরে হাসান আজিজুল হককে জীবনে মহান অথচ নির্মোহ শিল্পী বলে মনে হয় এবং গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও কমলকুমার মজুমদারের সমগোত্রীয় ভাবলে খুব বেশি ভুল হয়না।

book7275 ‘আমৃত্যু আজীবন’ গল্পটি একটি বর্ণনামূলক গল্প।বাংলার মানুষের আমৃত্যু আজীবন শোষণ ও দারিদ্র‍্যের বিরুদ্ধে মর্মস্পর্শী সংগ্রাম এ গল্পের সমগ্র পরিসরকে মহাকাব্যিক মর্যাদা দান করেছে। শোষকশ্রণি যুগে যুগে টিকে ছিল এবং থাকবে এই রুঢ়সত্য করমালি জানে- ‘কেউ মারতি পারেনা।ওরা মারা যায়না। কোনদিন।’ কিন্তু প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আমরণ লড়াই করমালিরা করেছে। এ থকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে,”পরাজয় স্বীকারের জন্য মানুষের জন্ম নয়।”

১৯৭১-৯০ কালপর্বে হাসানের চারটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।এর মধ্যে শোণিত সেতু,জীবন ঘষে আগুন, ভূষণের একদিন, নামহীন গোত্রহীন,কেউ আসেনি, ফেরা, ঘরগেরস্থি,পাতালে হাসপাতালে, সরল হিংসা, খনন, অচিন পাখি, আমরা অপেক্ষা করছি, মিনি মাগনার চুমকুড়ি, মাটির তলায় মাটি, পাবলিক সার্ভেন্ট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী এদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি ও মানুষের ক্রমবর্ধমান নাভি:শ্বাস গল্পগুলোতে উঠে এসেছে।

সামন্ত শ্রেণি বা শোষকের বিরুদ্ধে নিম্নশ্রেণির সম্মিলিত শক্তির জাগরণ ‘জীবন ঘষে আগুন’ গল্পের সারবস্তু। নিম্নশ্রেণির মানুষকে দীর্ঘকাল ধরে নিষ্পেষি করলে তাতে প্রতিশোধের বহ্ন প্রজ্জলিত হয় বলেই গল্পের এরুপ নামকরণ। ভূষণের একদিন নামহীন গোত্রহীন কৃষ্ণপক্ষের দিন, কেউ আসেনি, ফেরা গল্পগুলো মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত। নামহীন গোত্রহীন গল্পের লোকটা উন্মাদের মত কোদাল নিয়ে উঠানে আসে এবং ‘পৃথিবীর ভিতরটা নাড়িভুঁড়ি সুদ্ধ বাইরে আনতে’ মাটি আলগা করতে থাকে। এই একই স্পৃহা লেখককেও তাড়িত করেছে সবসময়, “সমকালীন জীবনকে আমূল কেটে কেটে বিশ্লেষণ করে দেখানো, সব কটি স্তর, সবরকম আঁশ, তার গভীরতম স্বরুপ, জীবনের সমস্ত তন্তু আলাদা করে ফেলা”– কেই হাসান তাঁর কাজ হিশেবে নিয়েছেন। কেউ আসেনি গল্পের গফুর ও ফেরা গল্পের আলেফ মূলত ভিন্ন কোন সত্তা নয়।গফুরের জীবনের অসমাপ্তিকে গল্পকার আলেফের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং দেশ স্বাধীন হবার পরেও নিম্নশ্রেণির বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের অবর্ণনীয় দু:খ-কষ্ট-সংগ্রামের গল্প ঘর গেরস্থি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশ থেকে বহু মানুষের ন্যায় সংখ্যালঘুরাও ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। দেশ স্বাধীন হবার সাথে সাথেই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে রামশরণের মতো অনেকেই দেশে ফিরে আসে কিন্তু এসে নিজেদের ভিটেমাটি পায়না।যুদ্ধপরবর্তী সরকারের অসচেতনা, দায়িত্বহীনতা ও নির্লিপ্ততা এই গল্পে উন্মোচিত হয়েছে।সংখ্যালঘুদের উপর এদেশের বখাটে যুবকেরাও অত্যাচার-লুন্ঠন চালিয়েছে এই সত্য লেখক তুলে ধরেছেন। গৃহহীন রামশরণের ক্ষোভ তাই স্বাভাবিক: “স্বাধীন হইছি আমরা- ঘৃণায় আর রাগে রামশরণের গলার আওয়াজ চিড় খেয়ে গেল, স্বাধীন হইছি তাতে আমার বাপের কি?আমি তো এই দেহি, গত বছর পরাণের ভয়ে পলালাম ইন্ডেয়-নটা মাস শ্যাল কুকুরের মতো কাটিয়ে ফিরে আলাম দ্যাশে। আবার সেই শ্যাল কুকুরের ব্যাপার।ছোওয়াল মিয়ের হাত ধরে আজ ইস্টিশান, কাল জাহাজঘাট….স্বাধীনটা কিসি, আঁ? আমি খাতি পালাম না— ছোওয়াল মিয়ে শুকিয়ে মরে, স্বাধীনতা কোঁয়ানে? রিলিফের লাইনে দাঁড়াও ফহিরের মতো— ভিক্ষে করো লোকের বাড়ি বাড়ি।….. স্বাধীন হইছি কি হইছি আমি বোঝবো কেমন করে? আগে এট্টা ভিটে ছিলো, এখন তাও নেই। আমি স্বাধীনটা কিসি?” মুক্তিযুদ্ধের পরপরই স্বাধীন দেশের মানুষের এই স্বপ্নভঙ্গের প্রসঙ্গে লেখক নিমোক্ত মন্তব্য করেছেন, “মানচিত্রের জলজ্যান্ত বাংলাদেশ দপদপ করে জ্বলছে আর সেই বাংলাদেশকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছে মানুষ। ১৬ ডিসেম্বরের পরে ভারত থেকে ফিরে আসা নিরন্ন সর্বস্ব-খোয়ানো মানুষ স্ত্রী-পুত্র-কন্যার হাত ধরে বাংলাদেশ খুঁজে মরছে; নেই, নেই তার কেউ নেই,কিছু নেই। ভিটেমাটি ঘরবাড়ি নেই, দিগন্ত থেকে দিগন্তে শুধু খুঁজে মরা, নেই কোথাও নেই বাংলাদেশ।স্বপ্নের বাংলাদেশ নয়, ক্ষুধার অন্নের বাংলাদেশ, বিরামের ঘর-বাড়ির বাংলাদেশ, আবরণের ঘর বাড়ির বাংলাদেশ, বাস্তব বাংলাদেশ!”

যুদ্ধোত্তর কালে নতুন বাংলাদেশে প্রশান্তি আর স্বচ্ছল স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করবে রাতারাতি এমন দাবি কেউ না করলেও, দেশেই একটা লুটেরা, জুলুম-নিপীড়ক শ্রেণির উত্থান হবে এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও লুটপাটের দরুণ সর্বময় দুর্ভিক্ষ, বেকারত্ব, দারিদ্র‍্য, স্বজনপ্রীতি, অশান্তি দেশকে কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় স্বৈরশাসন। সেই বর্ণনা পাই সাক্ষাতকার গল্পে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে অব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বৈষম্য-দুর্ভোগের চিত্র পাওয়া যায় পাতালে হাসপাতালে, মধ্যরাত্রির কাব্যি গল্পে এবং যুদ্ধের পর দুর্ভিক্ষের ফলে অসহায় কয়েকজন নারী স্বামী-সন্তান-সংসার বাঁচাতে নিজেদের শরীর বিক্রি করতে শুরু করে। উপায়ন্তরহীন এই নারীদের সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার গল্প ‘সরল হিংসা’। তারা উপোস থাকলেও দয়াদাক্ষিণ্য চায়না, চায় বেঁচে থাকার রসদ, “আপনের দয়া চাইনে আমরা, ভিক্ষে না, জিনিষ নে দাম দ্যান।”

মূলত, উচ্চবিত্ত মানুষ কর্তৃক অস্বীকৃত-অবহেলিত ‘পতিত’ নারীর জাগরণও স্পষ্ট এ গল্পে। খনন গল্পটিতে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের খাল কাটা বিপ্লবকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন লেখক। এই সময়ের আরো দুটি উল্লেখযোগ্য গল্প-অচিন পাখি ও আমরা অপেক্ষা করছি। অচিন পাখি গল্পে বন্দী চন্দনা সামরিক স্বৈরশাসনের কাছে জিম্মি বাংলাদেশের মানুষের প্রতীক।শেষদিকে চন্দনার আকাশে উড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে লেখক জনগণের অনিবার্য মুক্তির দিকেই আলোকপাত করেছেন। আমরা অপেক্ষা করছি গল্পে রক্তের বিনিময়ে বিপ্লবকে সার্থক করার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন লেখক এবং দেশের বাম-ডান রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বার্থপরতা ও মৌলিকত্বহীনতার প্রসঙ্গ গল্পকার রাখঢাক ছাড়াই উপস্থাপন করেছেন। ১৯৭১ সালে সর্বস্তরের মানুষের ত্যাগ তিতিক্ষার ফসল হিশেবে স্বাধীনতা এলেও তার ফল ভোগ করছিল এবং করছে দেশের রাজনৈতিক শ্রেণি।স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিপ্লবী কর্মীরা দেশের নিরীহ মানুষের স্বার্থে কাজ করলেও উচ্চশ্রেণির কাছ থেকে জনগণের মুক্তি ছিনিয়ে আনতে পারেনি। কেননা, এই রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা স্বার্থান্ধ হয়ে তাদের দলগুলোকে বিভক্ত করে রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দিয়েছে ক্রমে ক্রমে। ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ গল্পেও তাই খুব স্বাভাবিকভাবে সামরিক স্বৈরাশাসনের সময়ে গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতিকে আক্রমণ করেছেন লেখক। এই গল্পের একটি আজও অমোঘ সত্য হয়ে প্রতীভাত বাংলাদেশে: “জনগণের কাছে যেতে হবে কেন ক্ষমতা যখন জনগণের কাছ থেকে আসেনি?…আসল কথা হচ্ছে ক্ষমতাটা যিনি দখলে রেখেছেন তাঁর শাসন জনগণ মেনে নেবে।”

18393020-_uy1513_ss1513_হাসান আজিজুল হকের গল্পের শেষ পর্ব, অর্থাৎ ১৯৯১- বর্তমানকাল পর্যন্ত আমরা একই বাংলাদেশ খুঁজে পাই। শোষন, নিপীড়ণ, বৈষম্য, যেখানে সময়ের সাথে সাথে আরও প্রকট হয়েছে। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে রয়েছে, রোদে যাবো, খুব ছোট্ট নিরাপদ নির্জন, কোথায় ছোবল, মাটি পাষাণের বৃত্তান্ত, মা মেয়ের সংসার, সম্মেলন, মানুষটা খুন হয়ে যাচ্ছে, বিলিব্যবস্থা,বিধবাদের কথা এবং অগ্রন্থিত গল্প দিবাস্বপ্ন, স্বপ্নেরা দারুণ হিংস্র ইত্যাদি। মা মেয়ের সংসার গল্পে গ্রাম্য ক্ষমতাসীন তরুণ সমাজের নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের পরিচয় পাওয়া যায়।বখাটে তরুণেরা একই সাথে ধর্ষণ করে মা ও মেয়েকে, ফলে মা ও মেয়ে উভয়েই গর্ভধারণ করে। বখাটেদের ঘৃন্যকাজের চিহ্ন শরীরে বয়ে বেড়ায় মা ও মেয়ে। স্খলিত চরিত্রে এ সকল তরুণদের পিতারাই সমাজের ভন্ড মোড়ল মোল্লার ন্যায় ফতোয়া জারি করে। মা মেয়ের শাস্তির বিধান করে বা সমাজ থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়। তবে গল্পকার এখানে পুরুষশাষিত সমাজের নির্লজ্জ দ্বৈতচরিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সত্তা হিসেবে মা কে হাজির করেছেন।

সম্মেলন গল্পটির একটি উক্তিই যথেষ্ট বর্তমান সময়ের স্বরুপ উন্মোচন করতে “এখন দেশের সরকার এই ব্যবসায়ীদেরই সরকার, কাজেই দেশের সরকারকেই এখন দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু বললে অর্থনীতির ভাষায় তাকে ভুল বলা চলেনা।”

স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী পাকিস্তানী চেতনাধারী চক্র ধীরে ধীরে শিকড় সম্প্রসারিত করে বাংলাদেশে। তাদেরকে সমাজ ও রাজনীতি করার অধিকার দেয় এদেশের শাষকশ্রেণী। ফলস্বরুপ আজ অবধি এই চক্র বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বাংলাদেশ নির্মাণের চেষ্টায় সক্রিয় রয়েছে। ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী দোসরদের বিচারের লক্ষ্যে গণ আন্দোলন তৈরি করে এই কমিটি। মানুষটা খুন হয়ে যাচ্ছে গল্পের মা কেও আমরা লক্ষ জনতার সামনে বক্তৃতা দিতে দেখি, “আমি মা, আমি বিচার চাই, আমি বাংলাদেশের সমস্ত মায়ের পক্ষ থেকেই বিচার চাই।”

বিশাল আয়তনের বিধবাদের কথা গল্প বা উপন্যাসিকাটি স্বতন্ত্র আলোচনার দাবিদার। তবে এইটুকু বলা যায় যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্ট বাংলাদেশে শরীয়তের কট্টরতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, হিংস্রতা, হনন, ভাইয়ে ভাইয়ে পারস্পরিক রক্ত পিপাসা ও একজন কর্তৃক অন্যজনকে নিশ্চিহ্ন করণের জিঘাংসা, নারীভাবনা, নিরাপত্তাহীনতা, লিঙ্গশোষন, পিতৃতান্ত্রিকতা কি নেই এই টেনে বড় করা ছোট গল্পে, কিংবা ছোট করে লেখা উপন্যাসে?

হাসান কে নিয়ে লেখা কি শেষ হয়? তবু আমাদের শেষ করতে হয়। হাসান আজিজুল হক আমাদের সেই যথার্থ তুলিধর যিনি তাঁর জীবনে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে যেমনভাবে চিনেছেন, বুঝেছেন সেই নিরিখেই এক বিশাল ব্যপ্ত সময়ের দলিল লিপিবদ্ধ করে গেছেন। আমাদের জন্য সক্রিয় পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে তাঁর গভীর বেদনা, তিক্ত ক্ষোভ, তীব্র ক্রোধ ভাষার মধ্য দিয়ে ঝলসে উঠেছে। যার মাধ্যমে আমাদের সামনে হাজির একটি অখন্ড দেশ, তার বহু বিচিত্র মানুষ। হাসান চান তার লেখা কাজে লাগুক, একটি বৈষম্যহীন সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে : “জনগণের জন্য আন্দোলনে যারা যুক্ত হয়েছে, আমার লেখা সেখানে কিছু কাজে আসলে ও আসতে পারে। ৯৫ভাগ মানুষ যেখানে সাংঘাতিক নিপীড়ণের মধ্যে থাকেন, সেখানে পুরো সমাজটাই অসুস্থ ব্যাধিগ্রস্ত।… আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে আমাদের এই অসম্ভব সমাজের চেহারাটা যদি লেখায় তুলে ধরতে পারি, তাহলে যারা সুস্থতার সন্ধান করছেন তাদের বলতে পারব, না, এই অবস্থাটা চলতে দেওয়া যায় না। এই ব্যাধিগ্রস্ত সমাজের পুরোপুরি নিরাময় হওয়া দরকার। আর লেখালেখিতে যদি সর্বমানবিক একটা কিছু আনতে পারি তাহলে সমস্ত মানুষের জন্য, চিরকালের সুস্থ সমাজের পক্ষে আমার লেখা যাবে।”১১ চেখভ এর গল্প পড়ে লেনিন এর মনে হয়েছে সমস্ত রাশিয়া পাগলাগারদে পরিণত হয়েছে,একথা হাসানের মাধ্যমেই আমরা জানি, তেমনি হাসানের গল্প পড়ে আমাদের মনে হয়,আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্যাধি। হাসান সেই ব্যাধি চিহ্নিত করেছেন, আমাদের কাজ সেই ব্যাধি নিরাময় করা।

kalerkantho-03-02-17-02

লেখক :সারোয়ার তুষার

তথ্যনির্দেশ: আলোচ্য প্রবন্ধের ১-৩,৪,৫,৭-৯,১০,১১ নম্বর টিকাসমূহ নেয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ,হাসান আজিজুল হক,কথা প্রকাশ,প্রথম প্রকাশ-২০১২ এর সাহিত্যের বাস্তব,ছোটগল্পে থাকা না থাকা,বাংলাদেশ :পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়,জীবনের জঙ্গমতা:লেখকের দায়,বাংলাদেশ পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায় নামক প্রবন্ধ থেকে এবং ৬নং টিক নেয়া হয়েছে হায়াৎ মামুদ,মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা,১৯৬৮ থেকে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে