আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > ময়মনসিংহ > টানা ৪৩ ঘন্টা সাঁতরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতিন্দ্র

টানা ৪৩ ঘন্টা সাঁতরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতিন্দ্র

টানা ৪৩ ঘন্টা সাঁতরে অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র

প্রতিচ্ছবি ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:

বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাঁতারু বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যর একক দূরপাল্লার সাঁতারে সুদীর্ঘ ১৪৬ কিলোমিটার ব্যাপী বিস্তৃত নদীপথ সাঁতরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাঁর এই একক দূরপাল্লার সাঁতার শেষ হয় প্রায় ৪৩ ঘন্টা ধরে ১শ’ ৪৬ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত সুদীর্ঘ নৌ-পথ সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার মধ্য দিয়ে।

এই ব্যাপক বিস্তারের নদীপথ সাঁতরে উঠে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাঁতারু মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতিন্দ্র (৬৫)। তিনি নেত্রকোনার মদন উপজেলার বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অথচ ক্ষিতিন্দ্র রাতেই হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর শরীর ঠিক সায় দেয়নি। শরীরের দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা কাটিয়ে উঠলেও ডান পায়ের আঘাতের যন্ত্রণা তিনি এখনও ঠিক কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

একটানা ৪৩ ঘন্টা ধরে সাঁতার কাটার সময় নদীতে পানির নিচে থাকা শক্ত খুঁটিতে পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন অদম্য সাহসী সাঁতারু এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

হাসপাতালে এই কয়দিন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ছিলেন তিনি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দলে দলে নারী-পুরুষ, এমনকি অসংখ্য শিশুরাও এসেছিল তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে এবং এক নজর দেখতে পাওয়ার জন্য।

অনেকেই আলোচিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা-সাঁতারুর সাথে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও দিচ্ছেন। তাঁকে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ক্ষিতীন্দ্র নিজেও বেশ উপভোগই করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার যেকোনো সময় হাসপাতাল ছেড়ে আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাই। বিশ্বরেকর্ড গড়তে এর আগে তিনি শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কংস নদী থেকে ১৪৬ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরতিহীন অবিরাম সাঁতার শুরু করেন।

সাঁতারু ক্ষিতীন্দ্র’র ময়মনসিংহ থেকে নেত্রকোনায় সাঁতরে আসার খবর শুনে পুরো জেলার অসংখ্য মানুষ রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নদী জুড়ে বিভিন্ন ঘাটে ও সড়কের আনাচে-কানাচে অপেক্ষা করতে থাকেন। তাঁকে দেখামাত্র উৎসুক নারী-পুরুষ ও কোমলমতি শিশুরা করতালি দিয়ে তাঁকে উৎসাহিত করতে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানায়।

পরে রোববার দুপুর ২টায় নেত্রকোনার মদনের মগড়া নদীর দেওয়ানবাজার ঘাটে অপেক্ষারত লক্ষাধিক জনতার ভিড়ের মধ্যে পাড়ে উঠে আসেন ক্ষিতীন্দ্র। সে সময় ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলার প্রাইভেট একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক খাঁন মোহাম্মদ ফজলুল বারী তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা করেন।

মদন পৌরসভার মেয়র দেওয়ান মোদাচ্ছের হোসেন সফিক ও ফুলপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমাণ্ডার মো. আব্দুল হেকিম এই দূরপাল্লার সাঁতারের সার্বিক আয়োজন করেছেন।

১৯৭০ সালে সিলেটের ধোপাদিঘি পুকুরে অরুণ কুমার নন্দীর ৩০ ঘন্টার বিরতিহীন সাঁতার দেখে উদ্বুদ্ধ হন সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত ক্ষিতীন্দ্র। পরে শুরু করেন নিয়মিত সাঁতার অনুশীলন। ওই বছরই মদনের জাহাঙ্গীরপুর উন্নয়ন কেন্দ্রের একটি পুকুরে টানা ১৫ ঘন্টা সাঁতরে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচিত ও প্রশংসিত হন।

এরপর ১৯৭২ সালে সিলেটের রামকৃষ্ণ মিশন পুকুরে ৩৪ ঘন্টা, সুনামগঞ্জের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুরে ৪৩ ঘন্টা, ১৯৭৩ সালে ছাতক উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুরে ৬০ ঘন্টা, সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরে ৮২ ঘন্টা এবং ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পুকুরে ৯৩ ঘন্টা ১১ মিনিট সাঁতার প্রদর্শন করে জাতীয় রেকর্ড গড়েছিলেন ক্ষিতীন্দ্র। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ডাকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে বিজয় মিছিল হয়।

১৯৭৬ সালে জগন্নাথ হলের পুকুরে ১ শত ৮ ঘন্টা ৫ মিনিট একটানা সাঁতরে নিজের পুরনো রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বিরল ঘটনার স্মৃতি ধরে রাখতে জগন্নাথ হলের পুকুরপাড়ে একটি তাঁর সম্মানে একটি স্মারক ফলক নির্মাণ করেছিল।

এছাড়াও বিভিন্ন সময় তিনি ঢাকা স্টেডিয়ামের সুইমিংপুল, মদন উপজেলা পরিষদের পুকুর এবং নেত্রকোনা পৌরসভার আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুরে একাধিক সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।

দেশের বাইরে ভারতেও তিনি দূরপাল্লার সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশ নেন। তারই অংশ হিসেবে ১৯৮০ সালে তিনি মাত্র ১২ ঘন্টা ২৮ মিনিট ধরে টানা সাঁতার কেটে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তর্গত মুর্শিদাবাদের ভাগিরথী নদীর জঙ্গিপুর ঘাট থেকে গোদাবরী ঘাট পর্যন্ত মোট ৭৪ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি জমিয়েছিলেন।

অদম্য সাঁতার প্রদর্শনী ও নতুন রেকর্ড সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন বঙ্গমাতার মুক্তি-সংগ্রামী বীর এই যোদ্ধা।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এ.এন.এস. কনসালট্যান্ট এই প্রখ্যাত সাঁতারু প্রতিচ্ছবিকে জানান, ৪৪ ঘন্টায় ১৪৬ কিলোমিটার সাঁতারই হয়ত তাঁর জীবনের শেষ সাঁতার। আর এই সাঁতারের বদৌলতে তিনি গড়তে চান বিশ্বরেকর্ডের এক অনন্য নজির।

রবিবার দুপুর ২টার দিকে নেত্রকোনার মদনে মগড়া নদীতে গিয়ে পৌঁছালে তিনি সাঁতার শেষ করেন। প্রখ্যাত সাঁতারু ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যর একক দূরপাল্লার সাঁতার দেখতে শত শত মানুষ নদীর তীরে এসে ভীড় জমান। সেই সাথে তারা করতালি দিয়ে এই দেশ বরেণ্য সাঁতারুকে উৎসাহিত করে।

ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যর সফরসঙ্গী বিমান চন্দ্র বৈশ্য জানান, সাঁতার শুরু আগে তিনি (ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র) আশা করেছিলেন ৩৬ ঘন্টা সময়ের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন। কিন্তু নদীতে তীব্র স্রোত এবং ডান পায়ের পাতায় কোন খুঁটির সাথে আঘাত লেগে ব্যাথা পাওয়ায় তাঁর সাত ঘন্টা সময় বেশি লেগেছে।

এ বয়সে ৪৩ ঘন্টা পানিতে থাকায় ও পায়ে ব্যাথা পাওয়ায় শরীর কিছুটা দূর্বল হয়ে পড়াতে তাঁর নিজ এলাকায় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আজ চিকিৎসা শেষে ছুটি নিয়ে বাড়িতে যাওয়ার কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার নেত্রকোনা জেলা ক্রীড়া সংস্থা তাঁকে সংবর্ধনা দেবে বলে জানা গেছে।

নেত্রকোনার মদন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ড ও ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা নাগরিক কমিটির যৌথ উদ্যোগে শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে এই সাঁতার শুরু হয়। ৬৬ বছর বয়স্ক এই সাঁতারু ফুলপুরের কংশ নদীর সরচাপুর ব্রীজের নীচ থেকে সাঁতার শুরু করে নেত্রকোনার মগড়া নদী হয়ে রবিবার দুপুর দুইটায় নেত্রকোনার মদনে পৌঁছান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য প্রতিচ্ছবিকে বলেন, আমি সিলেট অরুণ নন্দীর একক সাঁতার দেখে মুগ্ধ হয়ে এ সাঁতার প্রদর্শনীতে উদ্দীপনা পেয়েছি। দুঃখ একটাই আমার পরে এরকম ধারাবাহিকতায় কেউ আসেনি।

ক্ষিতীন্দ্র আরো বলেন, উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে গ্রাম-বাংলার এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারলে পরবর্তী প্রজন্ম বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। জীবনের শেষ সময়ে আমি একটি রেকর্ড করতে চাই। হয়ত এটিই আমার শেষ সাঁতার। আমার নামটি আমি গিনেজ বুকে লেখাতে চাই। এজন্য সরকারসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।

কাজী মোস্তফা/এফ এইচ/এ আর

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে