আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > রবির আলোর বিচ্ছুরণ

রবির আলোর বিচ্ছুরণ

smriti
স্মৃতি ভদ্র

“আমার চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ
চুনী হয়ে উঠলো রাঙা হয়ে
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠলো আলো পূবে- পশ্চিমে”

নিজের চেতনার মধ্যে দিয়ে সকল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে খুঁজতে চাওয়া, “আমিত্ব” কে জগতের সবকিছুর পুরাধার রূপ দানকারী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস ২২শে শ্রাবণ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের নামের সার্থকতা রেখেই সূর্যের মতো উজ্জ্বল সদা বাঙালীর জীবনে। বাঙালী আর বাংলাভাষাকে যিনি দান করেছেন সর্বোচ্চ মর্যাদা। একাধারে তিনি কবি, সাহিত্যিক,সংগীতস্রষ্টা, দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার এক ধনাঢ্য পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। যদিও জন্মসুত্রে পাওয়া সংস্কৃতিবান পরিবারের প্রভাবেই এমনটা হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। রবি ঠাকুরের  কাব্যপ্রতিভায় ভাবনার গভীরতা আর জীবনবোধের দর্শন খুব তীক্ষ্ণভাবে পরিলক্ষিত হয়। এজন্যই হয়ত বাঙালীর জীবনের যে কোন ক্ষণকে খুঁজে পাওয়া যায়, বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করা যায় রবি ঠাকুরের লেখা দিয়ে।

12366416_10205743234644681_4084639316235226867_n
ছবি- শিল্পী চারু পিন্টু’র সৌজন্যে। ১৯১৩ সালে কবি’র নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সময়।

একই সাথে রবীন্দ্রনাথ সমাজ সংস্কারকের ভূমিকাও পালন করে গেছেন অবলীলায়। সমাজের কল্যাণের উপায় হেতু গ্রামোন্নয়ন এবং গ্রামের দরিদ্র মানুষকে শিক্ষিত করার কথা সব সময় বলে গেছেন। সামাজিক ভেদাভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামীতে তিনি সব সময় ছিলেন তীব্র প্রতিবাদকারী। ১৯২১ সালে তৈরী করলেন” পল্লী সংগঠন কেন্দ্র”। কৃষির উন্নয়ন,চিকিৎসার সুব্যবস্থা,সাধারণ গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ছিল সংস্থার মূল উদ্দেশ্য। এগুলো থেকেই বোঝা যায় মানব আর তার উন্নয়ন ছিল কবির একান্ত ভাবনা। আর এ কারণেই কবিগুরুর কাছে ঈশ্বরের মূল ছিল মানব চৈতন্য। মানবতাবাদী এই কবি তাই বলে গেছেন,”আমি আছি,আমার ভাবনা আছে, আমার চেতনা আছে,তাই ঈশ্বর আছেন।”

নিজের চেতনাকে ঈশ্বরের প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানো এই মহাকবি এভাবেই তাঁর ” আমিত্ব” এর দর্শনকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, ঋদ্ধ করেছেন মানব চিন্তার জগৎকে। উপনিষদের আলোয় আসা এই দর্শন ছিল জার্মান আইডিয়ালিজম এর মূল উপাত্ত। আর নিজের দর্শন কে তিনি নিয়ে গেছেন আরেক ভাবসাধক লালন সাঁই এর কাছে। লালন সাঁইয়ের পরমাত্মার মাঝে নিজের লীন হবার যে সাধনা তার দ্যোতনা পাওয়া যায় রবি ঠাকুরের লেখার মাঝেও। তাই লালন সাঁইয়ের জীবনবোধের গভীরতা যে কবিগুরুকে ছুঁয়ে গিয়েছিল, তা নির্দ্ধিতায় বলা যায়। তাই তো কবিগুরু লালন সাঁইয়ের মানবাত্মার মাঝে দিব্যজ্ঞানের ভাবধারানুসারী হয়ে লিখেছেন,
“সীমার মাঝে অসীম তুমি
বাঁজাও আপন সুর।”

আর প্রকৃতি মানুষের সবচেয়ে বড় বিদ্যার আধার, এই ভাবধারায় বিশ্বাসী কবি প্রকৃতির মাঝে নির্মাণ করেন বিদ্যা গ্রহনের নিকেতন। বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকন্ঠে আম্রকুঞ্জ উদ্যানে “ব্রহ্মবিদ্যালয়” নামক একটি পরীক্ষামূলক বিদ্যালয় তৈরীর মধ্য দিয়ে কবি শুরু করেন প্রকৃতিকে শিক্ষার মূল শিক্ষক করার কাজটি। আর এই প্রকৃতির মাঝের বিদ্যালয়টিই হলো ” শান্তিনিকেতন “।

জীবনের শেষ পর্বে এসেও তিনি যে কোনো  ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কারের প্রতি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। শেষের চারবছর তিনি ধারাবাহিক ভাবে অসুস্থ থাকতেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরুর জীবনবোধ ও তাঁর দর্শন মানবকুলের চিন্তার আধার হয়ে থাকবে অনন্তকাল। কবিগুরুর মহাপ্রয়াণ দিবসের প্রাক্কালে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে