আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > মতামত-চিন্তা > রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরম্পরার অহংকার

রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরম্পরার অহংকার

রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরম্পরার অহংকার
সত্যরঞ্জন সরকার

রবীন্দ্রনাথ এক বিশাল বিস্ময়। ব্যপ্তি আর দ্যুতির বর্ণচ্ছটায় উদ্ভাসিত সাহিত্য সংস্কৃতির এক বৃহৎ বলয়। বিন্যাস ব্যঞ্জনায় রঙধনুর সপ্ত রং-ও তাঁর ¯স্নিগ্ধতার কাছে হার মানে। পরিমাণের ব্যাপকতা এবং গুণমানের সৌকর্ষ তাই সমকালীন সাহিত্যে আজও বিরল। সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনের নতুন নতুন ঘরানার জন্ম হলেও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে সব কিছুই ফ্যাঁকাশে মনে হয়। আর তাই ‘অলি বার বার ফিরে আসে’ এই নরোত্তমের কাছে। কারণ জাতিকে যারা পথ দেখান তাঁদের কাছে আমাদের বার বার ফিরে যেতে হয়।

রবীন্দ্রনাথ জন্মে ছিলেন ভারতবর্ষের পশ্চিম বাংলার প্রাণ কেন্দ্র কলিকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে কিন্তু সমগ্র বিশ্বের বর্ণ,গন্ধ,ছন্দ,গানে জীবনকে তিনি ভরিয়ে তুলেছিলেন। তার গ্রহিষ্ণুমন গ্রহন বর্জনের মধ্যে দিয়েই সীমা ও অসীমের সেতু রচনা করেছে। সমস্যা সংকুল সমাজ ব্যবস্থার প্রতি পদে পদে বিচরণ করার অভিজ্ঞতার জন্য হয়তো জন্মসূত্রে নগরের হলেও কর্মসূত্রে তিনি গ্রামের তথা স্বদেশকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় গভীর সমবেদনায় বোঝার চেষ্টা করেছেন। পেয়েছেন নিবিড় একাত্মবোধে-আবিলতা মুক্ত ভালবাসায়। তাই সমাজ ও দেশের নানা সমস্যা তাঁকে ভাবিয়েছে। প্রায় সময়ই শিক্ষা,ধর্ম -ভাষা সাহিত্য ও অংকনের নন্দন তত্ত্ব তার ভাবনার জগতকে উতলা করেছে। কারণ তিনি শুধু কবি নন,তিনি কবি মনীষী-দার্শনিক। সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের ভাবনা, কল্পনা, মন, মনন, চিন্তা, অভিজ্ঞতা তথা অনুভূতির শিল্প সম্মত অবয়বের ভিতর দিয়ে, পরম সত্যকে পাওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথ ব্যাকুল ছিলেন। তাঁর ভাষার ‘এই চরম সত্য  উপলব্ধির ফলে আমি নির্দ্ধিধায় বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, মানুষের মন যে ডাকে সবচেয়ে গভীর ভাবে সাড়া দেয় তাই হল সৌন্দর্য্য, সত্যম-শিবম-সুন্দরম’।তাছাড়া জীবনকে তিনি নতুন দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। যে দৃষ্টির মধ্যে ছিল অবিনশ্বর চিৎপ্রকর্ষময় সচ্চিদানন্দ আর যুক্তিবাদী মননশীলতা।

রবীন্দ্রনাথকে আমরা বাঙালীরা প্রায় যেন জন্ম সূত্রেই পেয়ে থাকি। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের বাতাস যেন, এ যে, কতখানি প্রাণদায়ী তা আমাদের ভাবার দরকার করে না। আমাদের চিন্তা ভাবনা, ভাষা, সাহিত্য,শিল্প,সংগীত,রুচি সব কিছুর মধ্যেই আছে রবীন্দ্রনাথ। জন্মকাল থেকে আমরা এই প্রাণবায়ু গ্রহন করেছি জ্ঞাতে অজ্ঞাতে। আমাদের আছে বলে আমরা ভাবি না। বিশ্ব মর্যাদায় তো দূরের কথা এশিয়া বলয়ের বাইরে প্রাপ্তির আশা যেখানে বর্তমান যুগে ক্ষীণ, আর তৎকালীন সময়ে বঙ্গজ ঋষি সরাসরি বিশ্ব কবি এবং নোবেল প্রাইজ নিয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে রাজ সিংহাসনে বসালেন-একি ভাবা যায়?

‘রবীন্দ্রনাথের মতো যুগসন্ধি কালের যে কোন মনীষী বা কর্মবীরকে বুঝতে হলে তাঁকে দেখতে হবে তার স্বদেশ, তার স্ব-কাল আর তার স্বভাবের দাবীর সঙ্গে মিলিয়ে। ভাষান্তরে বলতে পারি তাঁকে দেখতে হবে তার জাতীয় ঐতিহ্যের সংগে তার সমকালের প্রতি প্রকৃতির সঙ্গে তৎকালীন আধুনিকতার সঙ্গে এবং চরিত্রের বিশিষ্টতা বা তার নিজত্বের সঙ্গে মিলিয়ে। কারণ-

‘বিস্মৃত যুগে দুর্লভ ক্ষণে বেঁচে ছিল কেউ বুঝি,

আমরা যাহার খোঁজ পাই না তাই সে পেয়েছি খুঁজি।’

                                                                      – (রোগ শয্যায়-আমার দিনের শেষে ছায়াটুকু)

রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরম্পরার অহংকার

‘রবীন্দ্রনাথের মত আত্মনিমগ্ন শিল্পীর কতটাই বা প্রকাশ পেয়েছে ব্যবহারিক জীবনে,যদিও তিনি ছিলেন একাধারে কবি ও কর্মী তার জীবনে ছিল বরাবরের বিরোধ-বিতর্কে শোকে-দুঃখে, স্পন্দমান,সমাদর ও বিদূষণে দোলায়িত তবুও সেই সব তৎসময়িক তরঙ্গের অনেক গভীরে ছিল তাঁর শান্ত, সৌম্য, নৈঃশব্দ, ছিল একাগ্রতাও ঐকান্তিক প্রবর্তনা’। একদিকে আপন জনের মৃত্যু আত্মীয়দের সঙ্গে মনোমালিন্য, কর্মক্ষেত্রে কর্মনীতির প্রতি অবজ্ঞার জন্য মনোকষ্ট, অন্যদিকে পরিণত জীবনেও নিন্দার তীর্যক বান তাঁকে সইতে হয়েছে। যেমন-

‘তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা-

আমার সুরের অপূর্বতা

আমার কবিতা,জানি আমি

গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্র গামী’।

সাহিত্যের আনন্দের ভোজে।

নিজে যা পারি না দিতে নিত্য আমি থাকি তার খোঁজে

আর তাই তিনিই বলতে পারেন-

সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের চুরি করা

ভালো নয়,ভালো নয়,নকল সে সৌখিন মজদুরী।

অবজ্ঞার তাপে শুষ্ক নিরানন্দ সেই মরুভূমি

বসি পূর্ণ করি দাও তুমি’।

                                                              -(জন্মদিনে-ঐক্যতান)

আজও তিনি নিন্দা সমালোচনা থেকে রেহাই পাননি। অথচ কত সহজে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের জন্মোৎসবে বলেছিলেন, ‘যতদিন বেঁচে থাকা যায় ততদিন প্রীতি,ক্ষমা,ধৈর্য্য সহিষ্ণুতা , এগুলিই যথার্থ ভাবে প্রয়োজন। সম্মান না হলেও ক্ষতি নেই-চলে যায়’।একথা শুধু হয়তো তার মুখেই মানায়। কারণ তার নিজস্ব বিশ্বাসের বিম্ব ও সৃষ্টির ক্ষেত্রে কখনও ঘটনাবর্তে স্খলিত হয়নি। আর তাই বিশ্বতানের ধ্রুবপদের সুর শুনে ছিলেন তার জীবন গানে-যার জন্য তিনি গেয়েছিলেন-

‘আমি কান পেতে রই-

ও আমার আপন হৃদয় গহন দ্বারে বারে বারে’

রবীন্দ্রনাথের বহু রচনায় এমন সব বিষয় আছে যা চিরকালীন ও সার্বজনীন। আজকের দিনেও তা স্বাভাবিক ভাবে বহু প্রাসঙ্গিক, প্রেম প্রকৃতি, স্বদেশিকতা, সৌন্দর্য, প্রকৃতি, আধ্যাত্মচেতনা, মানবিকতাবোধ, আত্মতত্ত্বদর্শন ইত্যাদি রবীন্দ্র সাহিত্যে উজ্জ্বল ভাবে উপস্থিত। এসবের প্রাসঙ্গিকতা,আজও ফুরিয়ে যায়নি। প্রেম মনুষের জীবনে মৌল এবং প্রবল এক অনুভূতি। অনুভূতি প্রবন হৃদয় থেকে এ প্রেম উৎসারিত হয়,বর্ণিল রাগে বিকশিত হয় প্রেমের সে অমলিন কুসুম। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যৌবন লগ্নের আবহমান বাংলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সাথে প্রেমের লালিত কোমল অভিব্যক্তির কাব্যিক প্রকাশ আমাদের পরিপূর্ণ করে।

দক্ষিন ডিহির মৃণালিনী দেবীকে বধু রূপে বরণ করার পরে ভাবুক রবীন্দ্রনাথ ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্য গ্রন্থের হৃদয় আসন’ কবিতায় লিখেছেন-

‘কোমল দুখানি বাহু শরমে লতায়ে

বিকশিত স্তন দুটি আগুলিয়া রয়

তারি মাঝখানি কি রে রয়েছে লুকায়ে

অতিশয় সযত্নে গোপন হৃদয়’।

অথবা,সোনারতরী কাব্যে ‘নিদ্রিতা’ কবিতায় যে চিত্র লেখনীর সাহায্যে তিনি এঁকেছেন তাতে রবীন্দ্র মানসে যৌবন লগ্নের প্রত্যেক যুবকের কৌতুহলই ধরা পড়ে-

‘একটি বাহু বক্ষ করে পড়ি

একটি বাহু লুকায়ে একাধারে

আঁচলখানি পড়েছে খসি পাশে

কাঁচল খানি পড়িবে বুঝি টুটি

পত্র পুটে রয়েছে যেন ঢাকা

অনাঘ্রাত পুজার ফুল দুটি’।

আসা যাওয়া বিয়োগের বিচ্ছেদ পরিপূর্ণ এ পৃথিবীর আকাশ বাতাস। চলমানতা পৃথিবীর চিরন্তন রীতি। এক সময়ের প্রাণ প্রাচুর্য্যে উজ্জ্বল ঝলমলে আঙিনা একদিন কুয়াশার ধুসর রঙে ম্লান হয়ে যায়। এক সময় ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায় বাসন্তী উৎসব। বিবাগী বাতাস নৈঃশব্দের দেশে পাতা ঝরায়,গান শোনায়। আসলেই সব কিছুই একদিন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়। সাজানো বাগান, নিকানো আঙ্গিনা, পুষ্পিত বৈভব,গগনচুম্বী ঐশ্বর্য। প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম থেকে কারো পরিত্রাণ পাবার জো নেই। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃনালিনী দেবীর মৃত্যুর পরে ১৯২০ সালে লেখা এই কাবতাটি সেই কথাটাই মনে করিয়ে দেয়-

‘ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যামধারে

তোমার হাসিটি ছিল বড় সুখে ভরা

তোমার সে ভালো লাগা মোর চোখে আঁকি

আমার নয়নে তব দৃষ্টি গেছ রাখি।

আজি আমি একা দেখি দু’জনেরই দেখা

তুমি করিতেছ ভোগ মোর মনে থাকি

আমার তারায় তব মুগ্ধ দৃষ্টি আঁকি ।

‘তুমি আজি মোর মাঝে আমি হয়ে আছো

আমার জীবনে তুমি বাঁচো ওগো বাঁচো’।

কবির প্রিয়তমা পত্নী, প্রাণের দোসর আজ নয়ন সম্মুখে নেই। তবু ‘তুমি করিতেছ ভোগ মোর মনে থাকি’। কবির নিখিল বিশ্বে পরিব্যাপ্তি হয়ে আছে পত্নীর সোনালী স্মৃতি। উপরোক্ত কবিতায় পত্নীর বিয়োগ ব্যথায় ভরাক্রান্ত কবি হৃদয়ের হিরন্ময় উদ্ভাস পাঠক হৃদয়কে ব্যথিত করে, আপ্লুত করে। এখানে সংবেদনশীল হৃদয় প্রসূত মূর্ছনা আর উপমা অলংকারের শীতল প্রদীপ্ত অনন্য শ্রী ফুটিয়ে তুলেছে।

কবিতা মাত্রই ভাষার ভিন্নতর বিন্যাস এবং শ্রেষ্ঠ কবিতা ভাষায় সীমাবদ্ধ অসীমতা। কবিতার এই বৈশিষ্ট্যকেই সম্ভবত “শেলী” অনন্ত উৎসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন । যার মধ্যে এক যুগে লোক অবগাহন ও আনন্দিত হয় এবং অন্যতর যুগেও যার আর্কষন ও প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায় না। সেখানে প্রতি মানুষই অস্পষ্ট যন্ত্রনায় ভোগে। অনির্বচনীয় দুঃখ চিরকালই মানুষের হৃদয়কে ভরাক্রান্ত করে রেখেছে। অপ্রাপণীয়ের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্খায় মানব মন চির কালই আকুল। বৈষ্ণব দার্শনিকরা এই বিষয়টিকেই ব্যাখ্যা করলেন সীমা অসীমের সম্পর্কের রূপক দিয়ে। আর রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-

‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাঁজাও আপন সুর’।

সীমা শুধু অসীম চাইছে। অসীম কে পাবার জন্য সীমার প্রাণে যে কত যন্ত্রণা,কত অগণিত রূপে যে তার প্রকাশ ঘটেছে যেমন:-

‘বিশাল বিশ্বের আয়োজন মন মোর জুড়ে থাক অতি ক্ষুদ্র, তারি এক কোন’।

                                                                                    -(জন্মদিনে-ঐকতান)

রবীন্দ্রচ্ছটার দ্রুতির বিকিরন সাহিত্যধারে এক ‘সোনার উষার বিন্দু’। সভ্যতা যদিও যুথবদ্ধ মানুষের সংঘদ্ধ মনীষার ফল তার সংস্কৃতির ফসলে ঘোষিত হবে ব্যক্তি মানুষের জয়যাত্রা, কালের সীমা ও স্থানিক শৃঙ্খলা থেকে বিচ্যুত এক সমাজ নিরপেক্ষ ব্যক্তিবাদের বিমূর্ত রূপ ঋদ্ধ আঙ্গিক সর্বস্ব আত্মিকথনই আমরা লক্ষ্য করি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে-

‘মিলে গেছে ওগো বিশ্ব দেবতা মোর সনাতন স্বদেশে’

রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরম্পরার অহংকার

অথচ সর্ব দেশে সর্বস্তরে সর্ব মানবীয় ভূমিতে ছিল তাঁর সদা স্বচ্ছন্দ্য বিচরন। মানুষের বহতা জীবন, নদীরঘোরাফেরা, আর্বত,জোয়ার চরপড়া সবটাই তাঁর জীবন কবিতায় ফুল ফুটিয়েছে, দীপ জালিয়েছে। স্বদেশ ভাবনায় আমরা রবীন্দ্রনাথকে পাই এক অনন্য রবীন্দ্রনাথ হিসেবে। খ্যাতির চরম শিখরে উঠেও যে খ্যাতিকে নিমেষেই ছুড়ে দিতে পারেন একমাত্র রবীন্দ্রনাথ। মানবাত্মা যেখানে কাঁদছে রবীন্দ্রনাথের কলম সেখানে বজ্রের মত কঠিন এবং কঠোর। তিনি লিখেছেন-

‘আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে

দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে

বলো ক্ষমা করো-

হিংস্র প্রলাপের মধ্যে

সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুন্যবানী’।

                                                              -(আফ্রিকা)

অনেক গ্রহণ বর্জনের প্রক্রিয়া পেরিয়ে স্বদেশ ভাবনার যে পরিচয় আমরা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে পাই তাতে স্বদেশ প্রেমের যে পরাকাষ্টা তিনি দেখিয়েছেন, তা তুলনাহীন। ১৯২০ সালের বন্ধুবর অজিত চক্রবর্তীকে লেখা চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন-‘আমাদের জন্য একটি মাত্র দেশ আছে,সে হচ্ছে বসুন্ধরা। একটি মাত্র নেশন আছে- সে হচ্ছে মানুষ’। তাঁর স্বদেশ ছিল ত্রিভূবন অথচ যাঁরা কুণ্ঠা ছিল না গেয়েও উঠতে-

‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।

তোমাতে বিশ্বমায়ের, তোমাতে বিশ্বময়ীর আঁচল পাতা’।

আবার তিান জানালেন-

‘হেথা নয়, হোথা নয়, অন্য কোথা

অন্য কোন খানে-

এই উচ্চারণের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় এক বিশ্ব বিহারী রবীন্দ্রনাথকে যিনি-গাইতে পারেন,

‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’।

আবার তিনিই বলেন,

‘সব ঠাঁই মোর ঘর আছে,আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া

দেশে দেশে মোর ঘর আছে, আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া’।(উৎসর্গ)

‘দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না।…

নিজের সমস্ত ধন মন প্রাণ দিয়ে দেশকে যখনই আপন বলে জানতে পারব তখনই দেশ-আমার স্বদেশ হবে’।

(রবীন্দ্রনাথ-দেশের কাজ-পল্লী প্রকৃতি)

রবীন্দ্রনাথের মত এতখানি বিশুদ্ধ সম্মোহবর্জিত, মৌলিক ও সদর্থক স্বদেশ ভাবনা আজ কি নেতা-নেত্রীদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে? যাবে না বলেই যত দলাদলি যত রক্তপাত যত সংঘর্ষ।

শুধু দেশকে কেন? ‘ভালবাসা’ ছাড়া কাউকেই যথার্থভাবে আপন করা যায় না। যথার্থভাবে পেতে হলে নিজেকে যথার্থভাবে বিলিয়ে দিতে হয়। যথার্থভাবে দেওয়া অর্থ স্বার্থবর্জিত ভাবে দিতে হয়। আর সেখানেই দ্বন্দ্ব দেখা দেয় ‘আমির’ সঙ্গে। ব্যক্তিস্বার্থের বেড়াজালে ভোগ পিয়াসী মনকে অবদমিত রেখে কে পারে বৃহৎ ‘আমির’ মধ্যে ডুবে যেতে? তাই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘ যে দিকে আমি পৃথক সে দিকে স্বার্থও পাপ, যে দিকে ‘আমি’ এক সেদিকে ত্যাগও পুনঃ যে দিকে আমি আলাদা সেদিকে কঠোর অন্ধকার, যেদিকে সে এক, সে দিকে কোমল প্রেম। এভাবে ‘ আমার আমি ও বিশ্ব আমির মধ্যে চিরকাল খেলা করছে। তার জন্যই এত কেন্দ্রানুগ, কেন্দ্রাতিগ শক্তির বিরোধ। খেলাটা একবার বুঝতে পারলে ‘আমি’ ও ‘আমি না’র ‘দ্বন্দ্ব সমাধান হবে এক দ্বৈতের উপলব্ধিতে। সেই মহামানবের আগমনের জন্য আজকের মানবের তপস্যা। তপস্যার রাত্রি দীর্ঘ-কঠোরতা দুঃসহ, কিন্তু সিদ্ধি বিলম্বিত হলেও অনিবার্য’।

কারণ-

‘ আমার আমির ধারা মিলে যেথা যাবে ক্রমে ত্রমে’।

রবীন্দ্রনাথ এ ব্যাপারে প্রভাত কুমার মুখোপ্যাধায়কে আরও লেখেন-

‘যিনি ‘আমি’ নামক এ ক্ষুদ্র নৌকাটিকে সূর্য,চন্দ্র,গ্রহ,নক্ষত্র হইতে লোক  লোকান্তর,যুগ-যুগান্তর হইতে একাকী কালস্রোতে বাহিয়া লইয়া আসিতেছে,যিনি আমাকে লইয়া অনাদি কালের ঘাট হইতে অনন্তকালের ঘাটের দিকে কি মনে করিয়া চলিয়াছেন আমি জানি না, সমস্ত ভালোবাসা,সমস্ত সৌন্দর্যে আমি যাহাকে খন্ড খন্ড ভাবে স্পর্শ করতেছি, যিনি বাহিরে নানা এবং অন্তরে এক , যিনি ব্যাপ্তভাবে সুখ-দুঃখ, অশ্রু হাসি এবং গভীরভাবে  আনন্দ ‘চিত্রা’ গ্রন্থে আমি তাহাকেই বিচিত্রভাবে বন্দনা ও বর্ণনা করিয়াছি।

একথা অনস্বীকার্য যে মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের মূল্যবোধগুলি পুরানো হলেই তার সবগুলি বাতিল হয়ে যায় না। সমাজ সংসারে নানা ঘাত প্রতিঘাতে সবকিছু পালটে গেলেও অনেকগুলি মূল্যবোধের চির সত্য, প্রজন্ম, পরম্পরা থেকেই যায়। তার থেকে সরে এলে সমাজ সংসার টা যান্ত্রিক হয়ে যায়, মানব ধর্মে বিশ্বাসী,সংবেদনশীল বিবেকী মানুষেরা তখন সেগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য এগিয়ে আসেন। রবীন্দ্রনাথের ‘সভ্যতার সংকট ’ -এ তাই দেখতে পাই ‘‘ কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব, আশা করব মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘ মুক্ত আকাশে, ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে’। তাই-

‘কি জানি কি হল আজি , জাগিয়া উঠিল প্রাণ

দূর হতে শুনি মহাসাগরের গান’।

                                                                (নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ),

অথবা

‘বিশ্ব রূপের খেলা ঘরে কতই গেলাম খেলে-

অপরূপকে দেখে গেলাম দুটি নয়ন মেলে।’

                                                              (গীতাঞ্জলী-যাবার দিন)

রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরম্পরার অহংকার 2শান্ত, সৌম্য, সংযত বেদনার্ত অথচ ভবিষ্যত বিষয়ে অপরাজেয় আশা ও আস্থার গরীমাদীপ্ত তাঁর উচ্চারণ ‘সভ্যতার সংকট’ এ যেমন আছে তেমনি আমার জীবনে আছে নানা ভাবের খেলা, তাই আমার কাব্যেও বেজেছে নানা সুর। আমি শিল্পী, তাই জীবনকে কখনও এড়িয়ে যেতে চাই নি। আমি সর্বান্তবাদী সমগ্রকেই মানি।’

‘জীবনের খর স্রোতে ভাসিছ সদাই

ভুবনের ঘাটে ঘাটে-

এক হাটে লও বোঝাও শূন্য করে দাও অন্য হাটে।’

                                                                  -( বলাকা- শাজাহান )

একথা রবীন্দ্রনাথই বলতে পারেন। কারণ- ‘জগতের মধ্যে আমাদের এমন ‘এক’ নাই যাহা আমাদের চিরদিনের অবলম্বনীয়। প্রকৃতি ক্রমাগতই আমাদিগকে ‘এক’ হইতে একান্তরে লইয়া যাইতেছে-

বিমূর্ত ধারনাদি নিয়ে যাঁরা ভাবতে পারেন এবং জ্ঞানের সঙ্গে অস্তিত্বের সম্পর্ক বিশ্লেষণ এবং মানব প্রজাতির মানস বিকাশের ভিতর এই সম্পর্ক কত রকমের রূপ নিয়েছে তারই অনুসন্ধানে যাঁরা নিরন্তন ব্যাপৃত তারাই মনীষী। রবীন্দ্রনাথ মহা-মনীষী। কারণ কবিতা লিখতে গেলে ঘনীভূত আবেগের প্রয়োজন। অনুধাবন, অনুভূতির প্রগাঢ় প্রতীতিকে সঞ্চিত করে রাখার মতো আধারের উপস্থিতিতে ও থাকা চাই,এবং সেই সঙ্গে জীবন যন্ত্রণার মন্থনে উত্থিত দুঃখ-কষ্ট যন্ত্রণাময় তন্ময়তার মধ্যেমূল্য বোধের উদ্ভাস ও জরুরী এবং এই সমস্ত গুণাবলী বিচ্ছুরণের কারণেই অনিন্দ্য সুন্দর অণিবার্ন উজ্জ্বলতার রবীন্দ্র কাব্যে সর্বত্র বিদ্যমান তার ভাষায় ‘জীবনের অজ্ঞাতসারে অনেক মিথ্যাচার করা যায়, কিন্তু কবিতায় কখনও মিথ্যা কথা বলি নে-সেই আমার জীবনের সমস্ত গভীর সত্যের একমাত্র আশ্রয় স্থান।’

আর একারণেই সাহিত্য শিল্পের প্রসারে সদর্থক বিচরণের জন্য বাঙালীর কাছে রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরস্পরার অহংকার।

লেখক: কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত /এন টি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে