আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > লাইফ-স্টাইল > প্রসঙ্গ বয়ঃসন্ধি

প্রসঙ্গ বয়ঃসন্ধি

ডা. নাজিয়া আমিন
ডা. নাজিয়া আমিন

আপনার ছোট্ট শিশুটি প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হচ্ছে। এই বেড়ে ওঠার একটা পর্যায়ে দেখতে দেখতেই একসময় আপনার মেয়ে বা ছেলেটি আপনার চোখের সামনে বদলে যাবে। বদলে যাবে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই। আপনি চাইলেও একে আটকাতে পারবেননা।

বয়ঃসন্ধি। শৈশব ও কৈশোরের মধ্যবর্তী এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল। এসময় ছেলেমেয়েরা নিজের অন্য আরেকটি সত্ত্বার সাথে পরিচিত হয়। শরীরের ভেতরকার পরিবর্তনকে একটু একটু করে উপলব্ধি করতে শেখে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল আগে শুরু হয়। মেয়েদের ৮-১৩ বছর বয়সের মধ্যে বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয়। ছেলেদের বয়ঃসন্ধিকাল শুরু ১০-১৫ বছর বয়সে। কারো কারো ক্ষেত্রে এর আগে বা পরেও শুরু হতে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালে দেহের মাসল, হাড়, ব্রেইন, হার্ট, এককথায় শরীরের ওজন ও দৈর্ঘ্য বাড়ে। মুখমণ্ডলে ও কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন আসে। ছেলেদের দাড়ি, গোঁফ, আন্ডারআর্ম হেয়ার দেখা দেয়। হাত-পা ও বুক লোমশ হয়ে ওঠে। স্বপ্নদোষ শুরু হয়। মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয়। বক্ষ উন্নত হতে থাকে এবং কোমর মোটা হতে থাকে। এভাবে ধীরে ধীরে সেক্স অর্গানগুলোর বিকাশ হতে থাকে এবং প্রজনন ক্ষমতা অর্জন করে। ছেলেমেয়ে উভয়েই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ বোধ করে।

দেহের সাথ সাথে তাদের মনেও অস্থিরতা আসে। মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত চলে ভাঙা-গড়ার কাজ। স্বাভাবিকভাবে মানুষের সাথে মেলামেশার স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট হয়ে যায়। তারা একা বোধ করে। আত্মসচেতন, অত্যন্ত আবেগী ও অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে। সবকিছু নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অন্তর্দন্দ্বে ভোগে। ঠিকমতো খেতে চায় না। হঠাৎ করে রেগে যায়। এ সব আবেগ কখনো কখনো সংঘাতেও রূপ নেয়।

এসময়টা বাবা-ময়ের জন্য আনন্দদায়ক হলেও ছেলেমেয়েদের আচরণগত পরিবর্তন অনেক সময় কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠতে পারে। তাদের আচরণ সামলাতে অনেক বেগও পেতে হয় বাবামাকে। এ নিয়ে চিন্তায় পড়েন প্রতিটি বাবা-মা। তাই এসময়টা কৌশলী হতে হবে। আমাদের সময়ে এ বিষয়টাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হতোনা। কিন্তু সময় পালটেছে। তাই এখন বাবা মা হিসেবে আমাদেরও আচরণগত পরিবর্তনটা খুব জরুরী।

আপনার সন্তানের সাথে কথা বলুন। তাকে বলুন তার জীবনে কোন কোন পর্যায় আসতে যাচ্ছে। মেয়ে হলে তাকে পিরিয়ডের ব্যাপারে আর ছেলে হলে তাকে স্বপ্নদোষের বিষয়টা ব্যাখ্যা করুন।বয়ঃসন্ধিকালের সমস্ত পরিবর্তনগুলোর মাঝে এই পর্যায়গুলো খুব হঠাৎ করে শুরু হয়ে যায়। তখন সন্তানরা দিশেহারা হয়ে পড়ে, এমনকি ভয়ও পেয়ে যায়। আমাদের সমাজে সেক্স বিষয়ক যেকোনো জিনিস ট্যাবু হিসেবে ধরা হয়, যেখানে বিষয়টি আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সেক্স শব্দটি মাত্রই আমাদের কাছে নেতিবাচক, অথচ এটিই আমাদের টানে সবচেয়ে বেশি! যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা মানসিকতা সহজে পাল্টে ফেলা সম্ভব নয়। তবুও বিষয়গুলো যতই অস্বস্তিকর বলে মনে হোক না কেন, বয়ঃসন্ধিকালের সমস্ত দিক নিয়ে আপনার সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন। কথা বলার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করানোর জন্য অন্য কারো বা নিজের বয়ঃসন্ধিকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলুন। কথা বলার সময় ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখুন।

অতিরিক্ত খবরদারি ও অহেতুক নজরদারি করা উচিত নয়। ‘খবরদার আমার কথা অমান্য করবে না’, ‘আমি যা বলছি তাই কর’ এ রকম আচরণ আপনার সবেমাত্র বয়ঃসন্ধিতে পা দেয়া সন্তান একদমই পছন্দ করবে না। ওদের মতামতকে গুরুত্ব দিন। অতিরিক্ত আদর ও শাসন দুটোই ক্ষতির কারণ হতে পারে। ওদের সাথে সহানুভূতিশীল আচরণ করুন। আমরা হয়তো ভাবি তারা আমাদের কোন কথাই মন দিয়ে শোনেনা। আসলে তারা আমাদের সব কথাই খুব মন দিয়ে শোনে। একারণেই তারা খুব তাড়াতাড়ি ধারণা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। নিজের জীবনের পেছনের দিকে তাকিয়ে বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যা অনেকটাই বোঝা সম্ভব। কারণ জীবন থেকে নেয়া শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।

বয়ঃসন্ধির মানে এই নয় যে তারা বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অথবা পরিপক্বতার প্রমাণ দিতে কিংবা আত্মসংযম করতে সক্ষম। সন্তানের চিন্তা এবং পরিকল্পনা করার ক্ষমতা গড়ে তুলতেই আমাদের সমস্ত জড়তা কাটিয়ে তাদের হাতটি ধরতে হবে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের মধ্যে ভাল মূল্যবোধ গেঁথে দিতে হবে। আমাদের সন্তানের ভালমন্দ আমাদের। বাবা মা হয়ে যদি আমরা না পারি তাহলে আর কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

লেখক: রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর, আইসিডিডিআর, বি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে