আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

10416991_10203883040897675_8914451482062484801_n
স্মৃতি ভদ্র

পর্ব_৬

মোতালেব শেখ আজ দুপুর গড়ানোর আগেই বাড়ি চলে এসেছে। বাড়ি এসেই করিমের খোঁজ করছে। মোতালেব শেখের ইচ্ছা করিম স্কুল পাশ দিলেই আড়তে বসিয়ে দিবে। বাপ আর ছেলে মিলে আড়তদারি করবে। তাই এখন মাঝেমধ্যেই করিমকে আড়তে যেতে বলে।

আর এদিকে করিমের ইচ্ছা স্কুল পাশের পর কোলকাতায় কলেজে ভর্তি হবে, অনেকগুলি পাশ দিবে। মস্ত বড় বিদ্বান হবে সে। কিন্তু করিম তার আব্বার ইচ্ছা জানে। এজন্য সে আড়তে খুব একটা যেতে চায় না। আব্বার সাথে করিম কেন যেন কিছু বলতে সাহস পায় না। আব্বা তাকে কখনো খারাপ মন্দ কিছু বলে না, তবে বড় গম্ভীর হয়ে থাকে। আব্বার যেদিন হেসে কথা বলে করিমের সাথে, সে দিনটা বড় অন্যরকম মনে হয় তার।

আমেনা বেগম বাপ আর ছেলের মাঝে সেতু। বাপ ছেলেকে কি বলতে চায়, তা ছেলেকে বুঝিয়ে বলে আমেনা বেগম। আবার ছেলের সব আবদার বাপের কাছে পৌছে দেয় আমেনা বেগম। তাই আজ করিম যখন নবীনদের বাড়ি, তখন মোতালেব শেখকে আমেনা ” আপনের ছেলে দিপেনের লগে খেলতে গেছে” বলে পরিস্থিতি সামলায়।

” হাতের কাজ সাইরা একটু এদিকে আইয়ো করিমের মা, দরকারী কথা আছে “মোতালেব শেখ বলে।

বড় ঘরের দাওয়ায় শতরঞ্জি বিছায়ে আমেনা একটা কাঁসার পানির জগ আর গ্লাস রাখে। এরপর ভাত, তরকারি রেখে গলা বাড়িয়ে মোতালেব শেখকে বলে, ” আপনে দাওয়াই আসেন, ভাত দেওয়া হইছে।” বলেই আমেনা আবার রান্নাঘরে গিয়ে কাঁচা পেঁয়াজ আর দুইটা পোড়া শুকনো মরিচ নিয়ে আসে। মোতালেব শেখ শেষ পাতে ডালের সাথে পোড়া মরিচ ডলে ভাত খায়, সাথে কাঁচা পেঁয়াজে আয়েস করে কামড় বসায়। আর সব শেষে প্লেটে ভাত শেষ হয়ে শুধু পড়ে থাকা ডালটুকু সুড়ুত সুড়ুত করে খায়। মোতালেব শেখের এই তৃপ্তি করে খাওয়া আমেনা হাতে তালপাখা নাড়তে নাড়তে দেখে।

মোতালেব শেখ খেতে বসে আরেকবার করিমের কথা বলে,”বিবি, তোমার ছেলে কি বিহান বেলা দুপুরের ভাত খাইবো? বেলা তো শেষ হইয়া আইলো।”

এই কথার উত্তর আমেনা বেগম দেবার আগেই মোতালেব শেখ বলে ওঠে,” আজ একটা ভাল খবর আছে বিবি। নাজিম মিয়া আড়তে আইছিলো আজ। তার বোনের একটা মাইয়া আছে বিয়ার যোগ্য। করিমের লগে সম্বন্ধ করতে চায়। আমি কথা দিয়া দিছি বিবি। নাজিম মিয়া খুব মান্যি লোক। বশিরপুরের মিয়াবাড়ির বড় ছেলে। সে আমার কাছে যেনতেন সম্বন্ধ আনবে না, আমার বিশ্বাস আছে।”

আমেনা বেগম বুঝতে পারে না সে খুশী হবে কি না। তার বাপধনের বিয়ের স্বপ্ন সেও দেখা শুরু করেছে। পুতুলের মতো একটা বউ আনবে সে তার বাপধনের জন্য। সারাদিন সেই টুকটুকে বউ এঘর ওঘর করবে, দেখেই শান্তি পাবে আমেনা বেগম। কিন্তু করিম যে কোলকাতা পড়তে যেতে চায়,এখন বিয়ে করতে রাজী হবে কিনা ভেবে বেশ চিন্তায় পড়ে যায়।

” আপনে আরেকটু ভাবতে সময় নিতেন। হুট কইরা রাজী হইয়া গেলেন। করিম এখনো স্কুল পাশ দিলো না” একটু থেমে থেমে বলে আমেনা বেগম।

” আরে স্কুল পাশ তো এ বছরেই হইয়া যাব। তা বিয়ার পর না হয় পরীক্ষা দিবো। শেখের ছেলের অত বিদ্যা দিয়া কি হইবো? তার তো চাকরী করনের দরকার নাই। আড়তদারি করলে কয়েকপুরুষের চিন্তা নাই।” কথা শেষ করে সুড়ুত সুরুত শব্দে প্লেটের ডাল শেষ করে। তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ে করিম শেখের চোখেমুখে। কিন্তু আজ আমেনা বেগমের চোখে সেই তৃপ্তি ধরা পড়ে না। আনমনা আমেনা বেগমের চিন্তা এখন বাপধনরে কিভাবে বোঝাবে সে!

করিম আর দিপেন্দ্যু বেশ পা চালিয়ে বেলা থাকতেই গ্রামে পৌছে। সারা পথ দিপেন্দ্যু বেশ চুপচাপ ছিল। বাড়ির কাছাকাছি এসে দিপেন্দ্যু করিমকে বলে,”কোলকাতার গল্প কেমন লাগলো রে করিম?”

বেশ উৎসাহ নিয়ে করিম বলে,”সে অনেক বড় আর অন্যরকম শহর মনে হলো আমার। বড় বড় বাড়ি, অফিস, কলের জল, ট্রাম খুব দেখতে মন চাইছে দিপেন।” বলতে বলতেই যেন করিমের চোখ খুঁজতে থাকে কোলকাতা।

করিম কে অবাক করে দিয়ে দিপেন্দ্যু বলে ওঠে,” কিন্তু গ্রামের মত সহজ নয়। কেমন যেন অদ্ভুত শহর মনে হলো আমার গল্প শুনে। কেমন যেন দূরের মনে হল আমার সে শহর! আমার গ্রামের মতো আপন নয়।” কেমন একটা বিষাদ খেলে গেলো দিপেন্দ্যুর চেহারায়।
#ক্রমশ

ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে