আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > পরিবেশ > বিপন্ন বাঘ- বন্যপ্রাণি আইন সংশোধনের তাগিদ

বিপন্ন বাঘ- বন্যপ্রাণি আইন সংশোধনের তাগিদ

রয়েল বেঙ্গল টাইগার

নাজমুন নাহার তুলি:

যেখানে বাঘের ভয় সেখানে নাকি রাত হয়! আবার স্কুল থেকে ফিরে দাদুর কোলে বসে বাঘ আর বুড়ির গল্প শুনতে শুনতে প্রাণে জাগে ভয়, বাবারে হালুম মামা না জানি কি হয়! সার্কাসের দলে বাঘের খেলা, দুঃসাহসী জিম করব্যাটের বাঘ শিকার, বাঘের গল্পে জীবন্ত মানুষের ত্রাস, আতঙ্ক, শৈশবের আনন্দ বাঘ মামাকে ঘিরে। আর বাঙ্গালি হিসেবে বাঘের জন্য রয়েছে আলাদা প্রীতি। দেশে বীরত্ব ও শক্তির প্রতীক হিসেবে বাঘকে দেখা হয়। তবে এখন অনেকটাই বদলেছে সেই চিত্র। বাঘের ভয়ে আর কাবু হয়ে থাকেনা কেউ। সুন্দরবনের আশেপাশে রাত জেগে আগের মত আর পাহারাও দিতে হয়না। কারণ কমে গেছে বাঘের সংখ্যা। বাঘকে ভয় পাওয়ার বদলে বাঘকে মেরে ফেলায়, উল্টো বাঘই এখন আমাদের ভয়ে পালিয়ে চলে যাচ্ছে ভারতে। হুম, এটাই সত্যি। খাবার না পেলে, শান্তিতে বসবাস না করতে পারলে, বিচরণ ক্ষেত্র কমে গেলে, আর জীবন নিয়ে সংশয় থাকলে তো পালিয়ে বাঁচাই ভাল।

রয়েল বেঙ্গল টাইগারের স্নানউদ্বেগজনক হারে কমছে বাঘ। এর পেছনে যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক কারণ, রয়েছে মানবসৃষ্ট কারণও। প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের পরিপূর্ণতার জন্য বাঘদের দরকার। ফুড চেইনের সবচে উপরে বাঘের অবস্থান। এদের খাদ্যের প্রধান উৎস হরিণ। তবে এই হরিণগুলো এখন শিকারের প্রধান লক্ষ্য। একসময় সুন্দরবনের আয়তন ও পরিবেশ ছিল বাঘদের বসবাসের জন্য আদর্শ। তবে এখন ফারাক্কা বাঁধের কারনে মিঠা পানির যোগান কমে গিয়েছে, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকৃত পণ্যবাহী ট্রলারের কারণে দূষণ বেড়েছে অনেকাংশে। কৃষি, বসবাস এবং কাঠের প্রয়োজনে বনজঙ্গল উজাড় হচ্ছে আর বাঘের বসবাস উপযোগী এলাকা যাচ্ছে কমে। আশঙ্কাজনক হারে কমছে সংখ্যা। ২০০৪ সালের হিসেব মতে, সুন্দরবন প্রায় ৫০০ রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাঘের আবাসস্থল। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে পাগ মার্ক বা পায়ের ছাপ গণনা পদ্ধতিতে করা শুমারিতে দেখা গেছে, সুন্দরবনে ৪৪০টি বাঘ রয়েছে। কিন্তু ২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্রাপিং পদ্ধতিতে করা শুমারিতে দেখা যায়, সুন্দরবনে রয়েছে মাত্র ১০৬টি বাঘ। কেউ কেউ তো আবার বলছেন এর সংখ্যা ১০০ এর বেশি হবেইনা। ২০১৫ সালে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয় ক্যামেরা ট্র্যাকিং-এ দেখা যায় বাংলাদেশে মাত্র ১০০টি বাঘ আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মারা যাচ্ছে বাঘ, যেমন ঘুর্নিঝড় আইলা এবং সিডরের ধাক্কাও পড়ে বাঘের উপর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ মনিরুল খান জানান, ‘‘নতুন জরিপে বাঘ কমে যাওয়ার আশঙ্কাই সত্যি হলো। তবে বাঘের সংখ্যা আমাদের শঙ্কার চেয়েও অনেক কমে গেছে৷” তিনি জানান, ‘‘এর আগে আমার নিজস্ব গবেষণায় ২০০টির কাছাকাছি বাঘ থাকার তথ্য পেয়েছি৷”

তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বন বিভাগ ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবনে বাঘ কমে যাওয়ার প্রধান পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে চোরা শিকারিদের বাঘ শিকার, খাদ্য সংকট, বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে লোকালয়ে চলে আসা বাঘ পিটিয়ে হত্যা, বার্ধক্য ও লবণাক্ত পানি পানে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়া, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঘের মৃত্যু এবং সঠিক প্রজনন আবাস্থল না থাকা। পরিবেশ বিপর্যয় এবং তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এখনকার হারে চলতে থাকলে ২০৭০ সাল নাগাদ সুন্দরবন এলাকায় উচ্চতা বাড়বে ২৮ সে.মি.। ফলে সুন্দরবনের ৫০% এলাকা বিলীন হয়ে যাবে সমুদ্র গর্ভে। তখন বাঘেরা শুধু বইয়ের পাতায় ইতিহাস হয়েই থাকবে।

tiger_20616লোকালয়ে হামলার কারণে স্থানীয় লোকজন মেরে ফেলছে বাঘদের। ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরে চাঁদপাই রেঞ্জের জয়মনি বৈদ্যমারী, কাঁটাখালী, ধানসাগর এলাকার বনপ্রান্তবর্তী গ্রামগুলোতে একটি বাচ্চাওয়ালা বাঘিনীসহ চারটি বাঘ হামলা চালাত। তখন এলাকার লোক তাদের মেরে ফেলে। তবে বাঘের আক্রমনের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঘ গবেষক নাজমুল সাদত প্রতিচ্ছবিকে জানান, বাঘ বৃদ্ধি পেলেও তা আশেপাশের মানুষের উপর আক্রমণ করেনা। যারা বাঘের আঘাতে আহত তার বেশিরভাগ বনেই হয়েছে। আর যখন নিরাপদ আবস্থল ও খাবারের অভাব হয়, বিশেষত দুর্যোগের পরে তখন বুড়ো বাঘেরা মাঝে মাঝে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বাঘ প্রধানত ক্ষুধার তাড়নায় লোকালয়ে হানা দেয়। সাধারণত সুন্দরবনে বড় জলোচ্ছ্বাস হয়ে যাওয়ার কিছুকাল পরই বাঘ গ্রামে আশা শুরু করে। বাঘ গ্রামে হামলা করা শুরু করে এপ্রিলের মাঝামাঝি। বেশি করে মে-জুনে। শীতে হামলা কিছুটা কমে আসে। বাঘ খাদ্য হিসেবে চিতল হরিণ, শুয়োর এইগুলো বেশি খায়। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনার কারণে মায়া হরিণ, বানর, গুঁইসাপ, মাছ, কাঁকড়া খেয়ে স্বাদ বদল করে। তবে এভাবেও শেষরক্ষা হয়না। বিষাক্ত ফু্রাডিন বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলা হয় বাঘদের। ফুরাডিন একটি কীটনাশক, যা মৃত হরিণের গায়ে মাখিয়ে টোপ তৈরী করে বাঘ শিকার করা হয়। গুলি করে মারার চেয়ে এভাবে মেরে ফেললে সহজ প্রক্রিয়ায় বাঘের চামড়া উচ্চমূল্যে বাজারজাত করা যায়। মৃত বাঘের শরীর থেকে চোরা শিকারিরা চামড়া, মাথার খুলি, দাঁত, লিঙ্গ, হাড়সহ অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে দেয়। আন্তর্জাতিক কালোবাজারে বাঘের এসব প্রত্যঙ্গের ব্যাপক চাহিদা।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ থেকে গত ১৬ বছরে বিবিধ কারণে ৪২টি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে লোকালয়ে এসে পড়ায় স্থানীয় লোকজন পিটিয়ে হত্যা করেছে। ১৩টি, বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে ৮টি, অসুস্থ হয়ে মারা গেছে ২টি, ঘূর্ণিঝড় সিডরে মারা গেছে ১টি বাঘ। আর এই সময়ে চোরা শিকারিদের হাতে মারা পড়েছে ৮টি বাঘ। এর বাইরে বাঘের ১০টি চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১২ সালের ১১ জুন পাচারের সময় উদ্ধার হয় তিনটি বাঘের বাচ্চা। বাংলাদেশে বাঘ রক্ষায় দুটি প্রকল্প চালু রয়েছে একটি ‘বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান’ অন্যটি ‘বাঘ প্রকল্প’ ৷ প্রথমটি বাস্তবায়ন করছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং বন অধিদপ্তর। সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও স্থানীয় কয়েকটি সংস্থা। এই প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে ২০০৯ সালে, চলবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত।

গ্রামবাসীদের প্রহারের কারণে মৃত রয়েল বেঙ্গল টাইগারবিশ্বে রাজকীয় এই প্রাণির বসবাস রয়েছে অনেক দেশে। সুন্দর ও শক্তিশালি প্রাণির  তালিকার প্রথম ১০-এ রয়েছে বাঘ। পৃথিবীতে বাঘ রয়েছে ১৩টি দেশে। এরমধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০১২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাঘের সংখ্যা, বাংলাদেশে ৪৪০, ভারতে ১৭০৬, নেপাল ১৫৫, ক্যাম্বোডিয়া ২০, ভুটান ৭৫, লাওস ১৭, থাইল্যান্ড ২০০, ভিয়েতনাম ২০, মিয়ানমার ৮৫, মালয়েশিয়া ৫০০, ইন্দোনেশিয়া ৩২৫, চীন ৪৫, রাশিয়া ৩৬০। ১৯৯০ সাল থেকে এদের রাজত্বের আয়তন কমে গেছে ৪১% এই তের দেশের বাঘের বিচরণ এলাকার সম্মিলিত আয়তন দাঁড়িয়েছে ১১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারে।

২০১০ সালে রাশিয়ায় আর্ন্তজাতিক বাঘ সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষণ ও বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালে ঢাকা সম্মেলনেও ১০ দফা প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী বাঘের সংখ্যা ২০২২ সালের মধ্যে দ্বিগুন করার পরিকল্পনা করেছে গ্লোবাল টাইগার ইনিশিয়েটিভ বা জিটিআই। সেই অনুযায়ী অন্যান্য দেশে বাঘ বাড়লেও কমেছে বাংলাদেশে। তার উপর বাঘের একমাত্র আবাসস্থল সুন্দরবন রক্ষায় নেই যথাযথ উদ্যোগ । সুন্দরবনে বাঘ রক্ষায় কাজ করছে ওয়াইল্ড টিম নামে বাঘ গবেষণা সংস্থা। বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

বাঘ রক্ষা ও বাঘ বৃদ্ধির জন্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বাঘ গবেষক নাজমুল সাদত প্রতিচ্ছবিকে বলেন, ”শুধু ব্যক্তিগত ও বেসরকারী উদ্যোগে কাজ না করে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে সরকার। তারা যদি বিশ্ববিদ্যলয়গুলোতে বাঘ গবেষণা ও রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের যোগান দেয় তাহলে নতুন করে বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ তৈরি হবে। আবার বন্যপ্রাণি রক্ষা আইনের ত্রুটি মোচন করে নতুন কার্যকরি আইনের আওতায় আনতে হবে। পর্যাপ্ত যোগ্যতা সম্পন্ন বনকর্মী নিয়োগ দিতে হবে।” তিনি আরো জানান, ”বাঘের উপর নির্ভর করছে সুন্দরবনের ভাল থাকা। স্বাস্থ্যকর সুন্দর বনের জন্য দরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। বাঘ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সুন্দরবনে পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপেরও সুপারিশ করেছেন।”

প্রাণি বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের আশপাশের ১৭টি উপজেলার পাঁচ থেকে ছয় লাখ মানুষ সরাসরি বনের ওপর নির্ভরশীল। এদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। সরাসরি যারা বনের ওপর নির্ভরশীল, এরা বনের বৃক্ষ ও বন্য প্রাণী ধ্বংস করে। প্রায়ই দেখা যায়, বনের হরিণ শিকার হচ্ছে। এভাবে যদি বাঘের খাদ্য কমে যায়, তাহলে বাঘও একসময় বিপন্ন হবে। তাই বনের উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করে বাঘদের অভয়ারণ্য তৈরি করতে হবে। কারণ বাঘ বাচলে বেঁচে যাবে বন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে