আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > আন্তর্জাতিক > দুর্নীতিতেই শেষ হল নওয়াজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

দুর্নীতিতেই শেষ হল নওয়াজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

দুর্নীতিতেই শেষ হল নওয়াজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারপ্রতিচ্ছবি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক:

মিয়া মুহম্মদ নওয়াজ শরীফ ১৯৪৯ সালে লাহোরে জন্ম নেন। একজন পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ এবং তিন বার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে বারবার এসেছেন আলোচনায়।

রক্ষনশীল পরিবারের ছেলে নওয়াজ, প্রথমবার ১৯৯০ হতে ১৯৯৩ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন। দ্বিতীয় বার ১৯৯৭ হতে ১৯৯৯ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাকিস্তান মুসলিম লীগ এর সদস্য। আন্তর্জাতিক ভাবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার জবাবে পাকিস্তানের পালটা পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষার আদেশ করার পর।

পাকিস্তানের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বাবা ছিলেন দেশটির খ্যাতিমান শিল্পপতি। ১৯৯০ ও ১৯৯৯ সালে দুই বার ক্ষমতাচ্যুত হন পাকিস্তান মুসলিম লীগ- নওয়াজের (পিএমএল-এন) দলপ্রধান নওয়াজ শরীফ। দ্বিতীয়বার সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশান্তরিত হন তিনি। বেশিরভাগ সময়ই থাকতেন সৌদি আরবে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় আসেন তিনি। তিনিই একমাত্র বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী যিনি তিন তিনবার ক্ষমতায় থেকেছেন। এর আগে বেসামরিক কেউ তাদের পাঁচ বছর মেয়াদকাল শেষ করতে পারেননি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পথচলা এতটা সহজ ছিলনা তার। এসেছে নানা ঘাত প্রতিঘাত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে তার পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার সমর্থক নিয়ে আন্দোলন করেছে তেহরিক-ই-ইনসাফের(পিটিআই) প্রধান ইমরান খান। ২০১৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে তা বাতিল করে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন পিটিআই প্রধান।

দুর্নীতিতেই শেষ হল নওয়াজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

এবার পানামা পেপার্স কেংলেংকারীতে ফেঁসে গেলেন চিরতরে। ধনী আর ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা কোন কৌশলে কর ফাঁকি দিয়ে গোপন সম্পদের পাহাড় গড়েছেন- সে তথ্য বেরিয়ে আসে পানামার ল ফার্ম মোসাক ফনসেকারের ফাঁস হওয়া সাড়ে ১১ লাখ নথিতে। সেসব নথিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে মরিয়ম এবং ছেলে হাসান ও হুসেইন নওয়াজের নামে অন্তত আটটি অফশোর কোম্পানি থাকার তথ্য এলে নওয়াজ শরিফ পরিবারের সম্পদ ও ব্যাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়ে পাকিস্তানজুড়ে হৈ চৈ শুরু হয়। নওয়াজের পরিবার দেশ থেকে টাকা পাচার করে যুক্তরাজ্যে সম্পদ গড়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।  নওয়াজের সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী মরিয়ম নওয়াজ ফাঁস হওয়া নথির তথ্য প্রত্যাখ্যান করে সেগুলো জাল বলে দাবি করেন। পাকিস্তানের অন্যতম শীর্ষ ধনী নওয়াজ নিজেও পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেন, অন্যায় কিছু তিনি করেননি।

২০ শে এপ্রিল, ভারতের আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়, পানামা পেপার্স থেকে মুক্তি নেই নওয়াজের। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে কাউকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ পাক সুপ্রিম কোর্ট আগেও দিয়েছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই দৃষ্টান্ত তুলে ধরে পিপিপি-র শীর্ষনেতা তথা পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি বলেছেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট যখন ইউসুফ রাজা গিলানিকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছিল, আমরা তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করিনি। আমরা নতুন প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছিলাম। নওয়াজেরও সেই পথই অনুসরণ করা উচিত।’’

দুর্নীতিতেই শেষ হল নওয়াজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

আবার ২১ এপ্রিল নওয়াজ শরীফের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে পাকিস্তান। সরকারের বিরুদ্ধে ‘একটি বড় জোট’ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ এর (এএমএল) প্রেসিডেন্ট শেখ রাশীদ। পানামা গেট কেলেঙ্কারিতে দেশের বাইরে নওয়াজ শরীফ ও তার পরিবারের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের কথা ফাঁস হয়েছিল। বিশ্বের আরও বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতা, রাজনীতিবিদ, তারকা পানামাগেইট ক্যালেংকারিতে ফেঁসে গিয়েছিলেন সেই সময়। এবং কোন সময়ে আদালতে নওয়াজ স্পষ্ট করে কোন বক্তব্য দিতে পারেননি। পানামা পেপার্স ঘটনায় পাকিস্তানের বিরোধী দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই), জামায়াত-ই-ইসলামি (জেআই), ওয়াতান পার্টি ও অল পাকিস্তান মুসলিম লিগ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের আবেদন করে। এ নিয়ে ব্যাপক আন্দোলনও শুরু করেছিল বিরোধী দলগুলো। তখন আদালত বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে সম্মত হন।

দুর্নীতিতেই শেষ হল নওয়াজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

গত ১৩ জুলাই পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যমকে নওয়াজ শরীফ বলেন, কারও অনুরোধে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন না। তবে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা তাকে পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ব্যাপারে লড়াইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। “পাকিস্তানের জনগণ আমাকে নির্বাচিত করেছে। একমাত্র তারাই আমাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারেন।” তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই নওয়াজকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে আসছে বিরোধীদলগুলো। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার দল বিরোধীদলের চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেয়েছে। ‘পাকিস্তানের জনগণ আমাকে নির্বাচিত করেছে। একমাত্র তারাই আমাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারেন।’ নিজের পরিবারকে জড়িয়ে প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার রাজনীতির মাধ্যমে কিছুই পায়নি। বরং রাজনীতির জন্য তারা অনেক কিছু হারিয়েছে।’

দুর্নীতিতেই শেষ হল নওয়াজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারএদিকে নওয়াজ শরীফ পদ থেকে সরে গেলে দুশ্চিন্তায় রয়েছে ভারত। এতে করে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। গত ১৪ জুলাই অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন ওমর ফারুক খান। এতে বলা হয়েছে পানামা পেপারস নিয়ে জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিমের (জেআইটি) তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। এতে মরিয়ম নওয়াজের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ করা হয়েছে। এতে ক্ষমতাসীন নওয়াজ পরিবারের বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ আয়সহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। জেআইটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৫ই জুন জেআইটির তদন্তকারীদের সামনে হাজির হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। কিন্তু এ সময় বেশির ভাগ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদকালে তিনি ছিলেন আনমনা। চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন।

এপ্রিলে বিচারক প্যানেলের মধ্যে তিনজন নওয়াজের পক্ষে এবং দুজন তার বিরুদ্ধে রায় দেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারির অভিযোগ থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পান নওয়াজ। সেই তদন্তের পর এবার নতুন রায় ঘোষিত হলো নওয়াজের বিরুদ্ধে। এ যাত্রায় আর রক্ষা পেলেন না নওয়াজ। ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হতে বাকি ছিল আর একবছর। কিন্তু তার আগেই বিদায়ী ঘন্টার সুরে চলছে নওয়াজের বিদায় প্রস্তুতি। দুর্নীতির অভিযোগ এনে রায় ঘোষণা, প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে সরে আসা, রাজনৈতিক সহিংসতা ইত্যাদি চড়াই উৎরাই পার হয়ে দীর্ঘদীন পর রদবদল হবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক হালচালের।

এন টি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে