আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > মাহবুবুর রহমানের গল্প- মাটির পুতুল

মাহবুবুর রহমানের গল্প- মাটির পুতুল

m-rahman
মাহবুবুর রহমান

বাড়ির সামনে এক প্রশস্ত উঠোন। তার উত্তর পাশে একটি বরই গাছ। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে অনেক ডালপালা নিয়ে তিন তিনটি বিশাল সফেদা গাছ। তার ডান পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা একটি খেজুর গাছ। খেজুর গাছের পাশ দিয়ে দীর্ঘ সরু পথ পূর্ব দিকে এগিয়ে সদর রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। জ্ঞান হবার পর থেকেই এই গাছগুলোকে স্থির ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এসেছি। শীত এলেই বরই এবং সফেদা গাছ গুলো ফলে ফলে নুয়ে পড়ে। আর দীর্ঘদেহী খেজুর গাছটি আফগান দারোয়ানের মত রাত জেগে ফলবতী গাছগুলোকে পাহারা দেয়।

ঠিক এই খেজুর গাছটির নীচে সকাল হলেই বৃদ্ধ নেপতার হাঁটু গেড়ে বসে ডাক ছেড়ে বলে, ‘অলির মা খিদা লাগছে! কিছু খাইতে দিবানি?’

পরপর তিনবার একই ডাক দিয়ে সে অপেক্ষায় থাকে। আমিও জানি মা আমাকে ডেকে একখানা খাড়া টিনের থালায় কিছু পান্তা ভাত, একটি ভাজা মরিচ আর এক চিমটি লবণ দিয়ে পাঠাবেন।

আমি ভাতের থালাটি নিয়ে যেতেই তার চোখে মুখে ক্ষুধার্ত মানুষের বেঁচে থাকবার এক আদিম আকাঙ্খা ফুটে ওঠে। খেজুর গাছের নীচে বসে ঘটির জলে চটজলদি হাত ধুয়ে মুহূর্তে সেই ভাতটুকু গোগ্রাসে গিলে ফেলে। তার খাওয়ার উদগ্র সেই করুণ দৃশ্যটি দেখে মনে হয় পৃথিবীতে এরচেয়ে নিষ্পাপ সুন্দর কোন দৃশ্য হয় না।

খাওয়া শেষে বৃদ্ধ নেপতার অসীম করুণাময়ের দরবারে এই পরম উপাদেয় খাবারের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং আমার মায়ের সকল বংশধরদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তি কামনা করে এক দীর্ঘ মোনাজাত পেশ করে।
তারপর তার শীর্ণ দেহটি একটি জীর্ণ বেতের লাঠির উপর ভর করে ভিক্ষা করতে বের হয়।

সারাদিন রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে নেপতার ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে একটানা পথ চলতে থাকে। পথে পথে কোন গাছের নীচে বসে একটু বিশ্রাম করে। ঘটির জল দিয়ে শুকনো গলা ভিজিয়ে নেয়।

বহুজাতিক কোম্পানীগুলো যেমন দেশকে কতগুলো ব্লকে ভাগ করে তেল গ্যাস ভাগ করে খায়, নেপতারও তেমনি তার এলাকাটিকে কতগুলো জোনে ভাগ করে ভিক্ষা করে।
যেমন শনি মংগল ঘষিয়াখালী বাজার, রবি বৃহস্পতি ফুলহাতা বাজার, সোম বুধ শনিরঝড় বাজার। আর শুক্রবার নিজের পাড়া এবং জামে মসজিদ তার লক্ষ্য।

প্রতিদিন আধা সের থেকে পৌনে এক সের মোটা চালের মিশ্রণ আয় হয়। গ্রামে সাধারণত সবাই চাল ভিক্ষা দেয়। নগদ টাকার বড় অভাব। অর্ধেক চাল বিক্রি করে তেল নুন কেনে। যেদিন চাল কম মেলে সেদিন চালের সাথে মিষ্টি আলু কুচিকুচি কেটে মিশিয়ে ভাতের ঘাটতিটা পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করে।

যুদ্ধের পর তিন বছর পার হল। ক্রমে পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। গৃহস্থের ঘরে চাল নেই। আগে যারা দু মুঠো চাল ভিক্ষা দিত তারা এখন দেয় এক মুঠো। আর যারা আগে এক মুঠো দিত তারা ভিক্ষা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আধা পেট খেয়ে পুরো বেলা হেঁটে ভিক্ষা করার শক্তি থাকে না। তাই মাঝেমধ্যে এখান থেকে ওখান থেকে কচুর পাতা ডগা সমেত সিদ্ধ করে গিলে রাত পার করতে হয়।

হতদরিদ্র থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত পর্যন্ত এই অবস্থা। যুদ্ধের আগে মানুষের অভাব এত প্রকট ছিল না। এর উপর এখন প্রায় প্রতিদিন চুরি ডাকাতি লেগেই আছে। চাল ডাল তেলের দাম হুহু করে বেড়ে চলেছে। সবচেয়ে বড় সংকট লবণ নিয়ে। চিনির চেয়ে লবণের দাম অনেক বেশি। তাই ব্যবসায়ীরা লবণের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে লবণ হিসেবে বিক্রি করে। স্বাধীন দেশের এই কারবার নেপতারের মাথায় আসে না।

কদিন ধরে কোথাও লবণও পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেকের সঙ্গে সেও চার মাইল দূরের সাহেবের মাঠে গিয়ে ওখানকার লবণাক্ত মাটি এনে আগুনে জ্বালিয়ে পানি দূর করে লবণের নির্যাস বের করেছে। ভঙ্গুর শরীর এত ধকল সহ্য করতে পারে না। মাছ তরকারী ছাড়াই এক মুঠো মোটা ভাত খায়। কিন্তু লবণ ছাড়া তো ভাত গেলা যায় না। তাই বাধ্য হয়ে পাড়ার লোকেরা লবণ আহরণের এক নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে।

নতুন পদ্ধতিটি হল নারকেল গাছের যে ডগাগুলো, দক্ষিণ বাংলায় বলে গ্যারা, বুড়ো হয়ে ঝরে পড়ার উপক্রম, সেগুলো সংগ্রহ করে ডগার গোড়ার অংশ টুকরো করে কেটে পানিতে সিদ্ধ করে লবণাক্ত একটা নির্যাস বের করা। যদিও আসল লবণের স্বাদ থাকে না, তবু সাদা ভাত গেলার জন্য তা সহায়ক।

আজ মংগলবার। নেপতারের আজকের কর্মস্থল ঘষিয়াখালী বাজার। গ্রামের বাজার বসতে বসতে বিকেল। তাই সে পথে পথে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষে নিয়ে ধীরে ধীরে বাজারে পৌঁছায়।

শুরুতেই সালামের মুদি দোকান। সেখান থেকে একটু সর্ষের তেল চেয়ে নেয়। মন্নাফের দোকানে দুটো পিঁয়াজ, খলিফার দোকানে দুটো গোল আলু আর বিমল ডাক্তারের কাছে কাশির জন্য হোমিওপ্যাথির একটু ওষুধ চেয়ে নেয়।

সবশেষে মাছের দোকানে ঢুঁ মারে। মোছনার মাছের ডালায় এক বিশাল ইলিশ মাছ পড়ন্ত বিকেলের হালকা রোদে চিকচিক করছে। নেপতারের ঘোলা চোখ তা দেখে চকচক করে উঠল। কতদিন সে মাছ খেতে পায় না। যখন তার বউ বেঁচে ছিল বাড়ির নালায় শাড়ির কাপড় দিয়ে তৈরী ছাবি দিয়ে দু চারটে চিংড়ি ফাইসা ধরা পড়ত।
‘হেই দিন আর ফিরা আইব না! ‘ নেপতার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
সবাই তো বেঁচে থাকে সুখের আশায়, উন্নতির আশায়। নেপতার ভাবে সে তাহলে বেঁচে আছে কেন? আজ যদি ছেলেরা বেঁচে থাকত নিশ্চয়ই তারা তাকে সুখে রাখত। তিন তিনটা বাচ্চা তার। এক বছরের মধ্যে নিউমোনিয়া আর কলেরায় মরে গেল। শুধু সে বেঁচে রইল। আল্লার সব বিচার সে মেনে নিয়েছে কিন্তু সন্তান মৃত্যুর বিচার সে কোনদিন মেনে নিতে পারেনি।

সন্তানহারা এই বৃদ্ধ ভিখারীর বুকের কান্না শুনবার আর কেউ পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই। নিজের সঙ্গে নিজেই সে কথা বলে। আর সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে নিষ্ফল নালিশ পাঠায়।

একদিন সকালে মায়ের দেয়া পান্তা খেয়ে মোনাজাত শেষে তার শতছিন্ন থলিটা হাতরে একটা মাটির পুতুল বের করে আমার হাতে গুঁজে দিল। আমার চুলে তার কম্পমান হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘ মেলা থেইক্যা তোমার জন্য কিন্যা আনছি!’

আমি এই নিঃস্ব ভিখারীর বুভুক্ষু হৃদয়ের সর্বস্ব নিঙরে দেয়া স্নেহের সামান্য উপহারের অসামান্য বোঝাটি হাতে নিয়ে হতবিহ্বল হয়ে রইলাম।

দুর্বিসহ দিনগুলো এভাবে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলছিল। একদিন ভোরবেলা আমেনা বুবু কাঁদতে কাঁদতে এসে খবর দিল, গতরাতে নেপতার গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে!

যাক জগতের এই নিষ্ঠুর নির্মম পরিহাস থেকে নেপতার চিরতরে মুক্তি পেয়েছে। পৃথিবীর কারো কিছুই আসে যায় না নগন্য এক ভিখারীর অভিমানী মৃত্যুর যবনিকায়। শুধু তার দেয়া মাটির পুতুলটি আমার শৈশব কৈশোরের স্মৃতিসঙ্গী হয়ে আজো হৃদয়ে রক্ত ঝরায়। এখনো প্রতিদিন সকাল বেলা আমার কানে ভেসে আসে, ‘অলির মা খিদা লাগছে। কিছু খাইতে দিবানি?’

লেখক: চিকিৎসক

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে