আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > জাতীয় > রাজাকারদের আতংক ছিলেন মেজর জিয়া

রাজাকারদের আতংক ছিলেন মেজর জিয়া

রাজাকারদের আতংক ছিলেন মেজর জিয়া

প্রতিচ্ছবি প্রতিবেদক :

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষী এবং ১৯৭১ সালে মুক্তযিুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ। পাকবাহিনী আর রাজাকারদের কাছে আতংকের নাম ছিল| তার দক্ষ আর অসম সাহসী নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীরা বিভিন্ন সময়ে রাজাকার এবং পাক বাহিনীদের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

শুধু মুক্তিযুদ্ধের সময়ই নয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করে গেছেন। তবে সেই কাজে এখন ছেদ পরেছে।

মুক্তিযুদ্ধের এই সূর্যসন্তান গুরুতর অসুস্থ্য অবস্থায় গত ৮ দিন ধরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ডাক্তারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদের লিভার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে লিভার প্রতিস্থাপন করা ছাড়া তাকে বাঁচানো বিকল্প কোন রাস্তা নেই। তাকে কয়েক দিনের মধ্যে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা চলছে বলে ছোট ভাই কামাল উদ্দিন জানিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে খুব কাছ থেকে দেখা শরনখোলা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম এ খালেক খান ও ইন্দুরকানী উপজেলার চরবলেশ্বর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিয়া মেজর (অবঃ) জিয়া উদ্দিনের বিষয়ে বলেন, অত্যান্ত সাহসী একজন মানুষ মেজর জিয়া উদ্দিন। তার নেতৃত্বে ও দিকনির্দেশনায় শরনখোলা, সুন্দরবন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করি। আজকে তিনি অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। আমরা তার আশু রোগ মুক্তি কামনা করছি।

মুক্তিযুদ্ধে তার অবস্মরনীয় অবদানের কথা মনে করে পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সমীর কুমার বাচ্চু বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়া ভাই ছিল আমাদের প্রেরণা। তার অসম সাহসীকতার কারনে পাক বাহিনী বিভিন্ন সম্মুখ যুদ্ধে পিছু হটতে বাধ্য হয়। জিয়া ভাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউদ্দিনের অবদান:

পশ্চিম পাকিস্তানের বৈশম্যমূলক আচারণ, শোষন, এবং অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব দিতে সারাদেশের মুক্তিকামী মানুষ গুলো যখন স্বাধীকার আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে লাগলো ঠিক তখন ১৯৭১ সালে ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম. এ জলিলের নির্দেশে সুন্দরবন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি শক্ত ঘাঁটি গড়ার জন্য এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন মুক্তিবাহিনীর একটি দল নিয়ে রায়েন্দা বাজারে আসেন এবং থানা থেকে রাইফেল, গোলাবারুদ এনে ভাগ করে দেন। মুক্তিবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও সুন্দরবন ভিত্তিক মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়ে, অস্ত্র সংগ্রহের জন্য চলে যান তিনি। এসময় তিনি মুক্তিবাহিনীর দল গঠনের জন্য পরামর্শ দেন এবং সকল সুগোগ সন্ধানী লুটেরা ডাকাত ও জন শত্রুদের প্রতিরোধের নির্দেশ দেন।

অল্প দিনের মধ্যে অস্ত্র গোলা বারুদ ও মুক্তিবাহিনীর একটি দল নিয়ে সুন্দরবনে আসেন এবং মুক্তিবাহিনীদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন। অত:পর  শরণখোলা- সুন্দরবন অঞ্চলে বিশাল মুক্তিবাহিনী দল ও ঘাঁটি গড়ে তোলেন। বগী সুন্দরবন এলাকায় তারা নিজস্ব উদ্যোগে ফরেস্ট অফিসের বনরক্ষীদের নিকট থেকে অস্ত্র সংগ্রহ ও দেশীয় বন্দুক ব্যবহার করেন।

তার নেতৃত্বে শরনখোলা-সুন্দরবন এলাকায় ছোট বড় ৫২টি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে বগি, তেতুলবাড়িয়া ও স্টুডেন্ট ক্যাম্পসহ ৪টি বড় ক্যাম্প ছিল এখানে। এসব ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীদের প্রশিক্ষন দেয়া হয়। প্রশিক্ষন নিয়ে তার নির্দেশনায় এক একটা গ্রুপে ভাগ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন জায়গায় অপারেশনে যেত। এছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যুবকদের এক একটা দলে ভাগ করে তিনি ভারতে প্রশিক্ষনের জন্য পাঠাতেন। ভারত থেকে প্রশিক্ষন ও অস্ত্র নিয়ে তারা সুন্দরবনে ফিরে এসে পাক বাহিনীদের অবস্থান জেনে পরিকল্পনা করে বিভিন্ন  এলাকায় অপারেশনের জন্য মুক্তিবাহিনীদের পাঠাতেন তিনি।

১৯৭১ সালের ১৮ আগস্ট তার পরিকল্পনায় সুন্দরবন এলাকার শেলা নদীতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বহনকারী খুলনা যাওয়ার পথে রকেট আক্রামন করলে রকেটটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং রকেটে থাকা পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা নিহত ও আহত হন।

১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীর সাব-সেক্টর হেড কোয়াটার সহ সমস্ত আস্তানায় পাকিস্তানী যৌথ বাহিনী ও রাজাকার সহ সপ্তাহ ব্যাপী সাঁড়াসি আক্রমণ করলে জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীরা প্রতিহত ও আত্মরক্ষায় সক্ষম হয়।

১৯৭১ সালের ১ জুন পাঞ্জাবী বাহিনীর নেতৃত্বে রাজাকারদের নিয়ে শরণখোলা থানার দোতলা বিল্ডিং এ ক্যাম্প স্থাপন করে। রায়েন্দা ইউনিয়ন  পরিষদ কার্যালয়ের দোতালায় ছোট একটি সেন্টি ক্যাম্প স্থাপন করে তারা। অবশ্য জুলাই মাসের শেষ দিকে রাজাকার মাওলানা ইউসুফের নেতৃত্বে রায়েন্দা বাজারস্থ আওয়ামীলীগ নেতা নাছির উদ্দিন আকনের দোতলা বিল্ডিং দখল করে রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর যৌথ ক্যাম্প স্থাপন করে যেখানে পাঞ্চাবী সহ অনেক বেশী সংখ্যক শত্রু বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে।

শত্রু বাহিনীর ওই শক্ত ঘাটি তছনচ করে দিতে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে মেজর জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা বাজারে রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। তার নেতৃত্বে ৭ ডিসেম্বর শরনখোলা হানাদার মুক্ত হয়। শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দার রনাঙ্গনে সম্মূখ যুদ্ধে শহীদ হন আসাদ, টিপু সুলতান, আলাউদ্দিন, গুরুপদ, আলতাফ। গুরুপদ ছাড়া অন্য চার শহীদের কবর স্মৃতিসৌধ রায়েন্দা পুকুর পাড়ে শহীদ মিনার চত্তর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আত্মত্যাগের এক ক্ষত চিহ্ন।

এরপর সেখান থেকে প্রায় ২ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মোড়েলগনজ বাজারে আক্রমন করেন তিনি। এসময় কুঠিবাড়িতে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে তখন পাক বাহিনী পিছু হটে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ কয়েক বছর পর তিনি সুন্দরবনে চলে যান। বঙ্গোপসাগরে তিনি মাছের ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান। এর আগে তিনি পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যানও ছিলেন।

ওয়ান ইলেভেনের সময় ফেরদৌস আহম্মেদ কুরশীর সাথে পিডিপি নামে একটি রাজনৈতিক পার্টি করেন তিনি।

এএম/এআর

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে